দেবাশিস দত্ত, লন্ডন: কথা ছিল সকাল ১০টায় চারতলায় রিচি বেনো কমেন্ট্রি বক্সে দেখা করার। নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছে গিয়ে দেখি তিনি হাসছেন, ‘‌আমি আগেই বলেছিলাম, ক্রিকেট মাঠে ফিরলে আমি সুস্থ হয়ে উঠব। এই দেখুন, আমি কতটা সুস্থ। বন্ধুবান্ধবরা মাঠের অন্যপ্রান্তে যেতে বলছে। কিন্তু আমি যাচ্ছি না। কারণ, অতটা পথ গেলে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ব। এখন যা বয়স, তাতে যতটুকু এনার্জি আছে, তা খরচ করব শুধুই ক্রিকেটের পেছনে।’‌ জিওফ্রে বয়কটের পোশাকের এক বিশেষ ঘরানা আছে। ম্যাচিং করা সোয়েটার, শার্টের রঙের। সেই রঙের ট্রাউজার এবং জ্যাকেট। টুপিতে নিজের সই। বেঙ্গালুরুর একটি কোম্পানি এই টুপিগুলি তৈরি করে পাঠিয়ে দেয় তঁার কাছে, নিয়ম করে। রবিবার ছিল চাঁপাফুলের রঙের প্রভাব, তঁার শরীর জুড়ে। প্রথম থেকেই তিনি ছিলেন নিজের মেজাজের তুঙ্গে। কথা বলতে ভালবাসেন, পরবর্তী ৩৫ মিনিট নিজেই একেকটি প্রসঙ্গ তুলছিলেন আর উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন। মাঝেমধ্যে আমি পাল্টা প্রশ্ন করার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। এবং নিজেকে থামিয়ে পরমুহূর্তেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন।
জিওফ্রে বয়কট:‌ আমি জানি না, এই হনুমা বিহারী এবং রবীন্দ্র জাদেজা কতক্ষণ ব্যাট করতে পারবে। যদি মাথা ঠান্ডা রেখে, বল ছেড়ে ইনিংস তৈরির দিকে মন দেয়, তা হলে তৃতীয় দিনের উইকেটে রান করতে পারবে। এই রান দিয়ে জেতা যাবে কি না, তা বলা কঠিন।
বয়কট:‌ ভারত যদি ওভাল টেস্টে জেতেও, তা হলেও তো আর সিরিজ জিততে পারবে না। অথচ একটা সুযোগ ছিল বিরাটদের। কিন্তু নিজেরাই সেই সুযোগ নষ্ট করেছে।
 কেন বলছেন?‌
বয়কট:‌‌ বিরাট যদি মনে করে থাকে, প্র‌্যাকটিস ম্যাচ না খেলে কোনও সিরিজ জিতবে, তা হলে আমি ওর সঙ্গে একমত হতে পারছি না। কাউন্টি ক্রিকেট শুরু হয়ে যায় এপ্রিল মাস থেকে। ওদের উচিত ছিল এপ্রিলে এসে মাস দেড়েক থেকে এদেশে পরিবেশের সঙ্গে ধাতস্থ হওয়া। একেকটা কাউন্টিতে দু’‌জন করে খেলতেই পারত। সে সব না করে, প্র‌্যাকটিস ম্যাচের দিন কমিয়ে দিয়ে নিজেদের মনের মতো শিডিউল তৈরি করে নিয়েছিল। স্টুপিড।
 চেতেশ্বর পুজারা, ইশান্ত শর্মা কিন্তু সিরিজ শুরু হওয়ার আগে কাউন্টি ক্রিকেটে খেলেছেন।
বয়কট:‌‌‌ হ্যঁা, তার সুফল ওরা পেয়েছে। সাউদামটনে পুজারা যেদিন সেঞ্চুরি করল, সেদিন হোটেলে ওর সঙ্গে দেখা। আমিও ছিলাম ওদের হোটেলেই। মজা করে বললাম, ইয়র্কশায়ারের হয়ে রান পাওনি। কিন্তু ওখানে খেলার অভিজ্ঞতাটা কাজে লাগিয়ে একেবারে সেঞ্চুরি করে ফেললে!‌ আই ওয়াজ হ্যাপি ফর হিম।
(‌হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ায় বেশি পরিশ্রম করতে পারছেন না। এমনকি অপরিচিত লোকজনের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে চাইছেন না। পাছে কথা বলতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। হঠাৎ সেক্রেটারিকে বললেন, ‘‌দরজাটা বন্ধ করে দাও। আমি এখন কোনও ভিজিটরের সঙ্গে কথা বলতে পারব না।’‌)‌
বয়কট:‌‌‌‌ ভারত জিতবে কী করে?‌ প্রথমত, দরকার ছিল প্রপার প্ল্যানিংয়ের। দ্বিতীয়ত, ক্রিকেটারদের যোগ্যতার অভাব। এমন একটা উইকেটকিপার নিয়ে এসেছে, যে কিনা টি২০ ওস্তাদ। বিলেতে ক্রিকেট খেলা এত সহজ?‌ ইংল্যান্ডের উইকেটকিপার জনি বেয়ারস্টোর সঙ্গে আমার পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। ব্রুস ফ্রেঞ্চের নাম মনে আছে?‌ ইংল্যান্ডের প্রাক্তন উইকেটরক্ষক। এই ফ্রেঞ্চ কিন্তু দিনের পর দিন ওর সঙ্গে কাজ করে শিখিয়েছে, হাউ টু বিকাম আ গুড উইকেটকিপার। বাধ্য ছেলের মতো জনি কিন্তু মন দিয়ে ওর কথা শুনে নিজেকে তৈরি করেছে। ভারতে তো খারাপ উইকেটরক্ষক নেই! কিরমানি ওয়াজ আ টপ ক্লাস উইকেটকিপার। কিরণ মোরে। এদের কাছে কেন যায় না ঋষভ পন্থ?
বয়কট:‌‌ হ্যঁা, যে কথা বলছিলাম। ভারত জিতবে কী করে?‌ নেই দু’‌জন ভাল ওপেনার। মিডল অর্ডার এই ভাল, তো এই খারাপ। নট কনসিস্টেন্ট অ্যাট অল। একমাত্র বিরাট কোহলি ছাড়া কারও ওপর নির্ভর করা যায় না। বরাবরই বিরাট ভাল ব্যাটসম্যান ছিল। আস্তে আস্তে বেটার ব্যাটসম্যান হয়ে উঠল। বিলেত–‌ফেরত বিরাট হল গ্রেট ব্যাটসম্যান। এটাই ওর প্রগ্রেস রিপোর্ট। ৪ বছর আগের বিরাটের সঙ্গে এই সফরের বিরাটের কোনও তুলনাই হয় না। কোনও সন্দেহ নেই, এখন সব ঘরানার ক্রিকেট মিলিয়ে বিরাট ইজ দ্য বেস্ট। স্টিভ স্মিথ ভাল, কিন্তু আমি বিরাটকেই আপাতত এগিয়ে রাখছি। সবচেয়ে ভাল লাগল, ওর শেখার প্রবণতা। ক্রিজের বাইরে দঁাড়িয়ে সুইং ভাঙার আগে শট নেওয়ার ব্যাপারটা প্রচুর প্র‌্যাকটিস করে এসেছে। তার মানে, ও নিজেকে আরও উন্নত মানের ব্যাটসম্যান হিসেবে তুলে নিয়ে যেতে চাইছে। একই সঙ্গে রান করার খিদের কথা বলতে হবে। এই খিদে না থাকলে, এই শেখার প্রবণতা আসত না।
 আপনি নিজে কখনও এভাবে ক্রিজের বাইরে দঁাড়িয়েছেন?‌
বয়কট:‌‌‌ প্রথমেই বলে রাখি, ক্রিজের বাইরে দঁাড়ানোটা অন্যায় নয়। এটা একটা অ্যাডজাস্টমেন্টের ব্যাপার। এবং এটা আয়ত্তে আনতে বিরাটকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে। অথচ আদিল রশিদ বা মইন আলিকে যখন ও খেলছে, তখন কিন্তু ও ক্রিজের ভেতর চলে যাচ্ছে। হি ইজ জাস্ট আ টপ ক্লাস ব্যাটসম্যান। সুইং ভাঙার জন্য আমি ক্রিজের বাইরে দঁাড়াতাম না। আমি অপেক্ষা করতাম। সুইং ভাঙুক, তার পর আমার পায়ের নড়াচড়া শুরু হত। বুঝতেই পারছেন, একটু দেরিতেই খেলতাম।
বয়কট:‌‌‌‌ একা বিরাটের পক্ষে ইংল্যান্ডে এসে সিরিজ জেতা কঠিন। একমাত্র সফল হল জোরে বোলিং বিভাগ। দে আর শার্প। এই তীক্ষ্ণতা ব্যাটিং বিভাগে দেখিনি। অথচ ভারত বরাবরই ভাল ভাল ব্যাটসম্যান উপহার দিয়েছে বিশ্বক্রিকেটকে। আমি শুনলাম, বীরেন্দ্র শেহবাগ বলেছে, ওদের আমলের বোলাররা ২০ উইকেট তুলে নিতে পারেনি। তাই ওরা হারত। অ্যাবসলিউটলি কারেক্ট। এখন দেখছি উল্টো। বোলাররা সফল, ব্যাটসম্যানরা ব্যর্থ।
বয়কট:‌‌‌ হ্যঁা, যে কথা বলছিলাম। ভারত কেন সিরিজ জিততে পারল না?‌ না পারার আরেকটা কারণ হল, দল নির্বাচনে ভুল। চেতেশ্বর পুজারাকে বাদ দেওয়া তেমনই একটা ঘটনা। ছেলেটার ১২টা ডবল হান্ড্রেড আছে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে। পুজারাকে কি কেউ বাদ দেয়? একইভাবে বলব, হার্দিক পান্ডিয়াকে অনেক বেশি সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আইপিএল খেলে ভারতে এখন অনেকেই রকস্টার। কিন্তু বিলেতে তাদের বিশেষ জায়গা থাকে না। এখানে রান করতে হলে শিখে আসতে হয়। বল এখানে নড়ে। এখানে বল করার জন্য থাকে বিশেষ লেংথ। এগুলো জানতে হয়। হঠাৎ বিমান থেকে নেমে ইংল্যান্ডে টেস্ট ক্রিকেট খেলা যায় না। ১৯৩২ সাল থেকে ভারত ইংল্যান্ডে ক্রিকেট খেলতে আসছে। এখনও এই প্রাথমিক ব্যাপারস্যাপারগুলো শিখে উঠতে পারল না ভারত?‌
বয়কট:‌‌ আমি আসলে ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের ফ্যান। তাই ভারত খারাপ খেললে আমারও মনখারাপ হয়। কারণ, আমি এতবার ইন্ডিয়ায় গেছি যে, ওদেশের প্রেমে পড়ে গেছি বহুদিন। ক্রিকেটপ্রেমীদের যে উন্মাদনা রয়েছে ভারতে, তা দেখে অবাক হয়ে গেছি। একমাত্র কন্যা এমাকে তাই আমি ভারতে নিয়ে গিয়ে ওদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। তাজমহল দেখেছে ও। আমি বেশি দিন বঁাচব না। কিন্তু চাইব, এমা যেন ভারতীয় বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যায়।‌‌‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top