নজরুল ইসলাম: ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই হনহন করে হেঁটে গেলেন কাস্টমসের রিজার্ভ বেঞ্চের দিকে। বিপক্ষ কোচের সঙ্গে সৌহার্দ্য বিনিময়ের পরেই হারিয়ে গেলেন সমর্থকদের ভিড়ে। মিনিটখানেক পরেই আবিষ্কৃত হলেন। দেখা গেল তাঁকে তুলে ধরে শূন্যে ছুঁড়ে দিচ্ছেন সমর্থকেরা। সমর্থকদের বাঁধনহারা উল্লাসের মাঝেও আশ্চর্যরকম ভাবে নির্লিপ্ত মোহনবাগান কোচ শঙ্করলাল চক্রবর্তী। এটাই তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। ব্যর্থতায় যেমন ভেঙে পড়েন না, তেমনি সাফল্যেও বাড়তি কোনও আবেগ নেই। অনেক পরে নিজের ঘরে সবুজ–‌মেরুন কোচকে যখন পাওয়া গেল, তখনও তাঁর মধ্যে উত্তেজনার কোনও বহিঃপ্রকাশ নেই। তবে কলকাতা লিগ জয় যে কোচ হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়ে গেল, মেনে নিয়েছেন শঙ্করলাল চক্রবর্তী। ম্যাচের পর তিনি বলেন, ‘‌আমার ফুটবলজীবন বলুন কিংবা কোচিংজীবন, এটা আমার কাছে একটা মাইলস্টোন। আমার ফুটবলজীবন তো বিগ জিরো। কোচ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলাম। কোচ হিসেবে শুধু ম্যাচ জিতলেই হয় না। যে–‌কোনও কোচের কাছে ট্রফি একটা বড় ব্যাপার। এই ট্রফিটা আমার কোচিং কেরিয়ার প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে সহযোগিতা করবে। কোচিং কেরিয়ার সুন্দরভাবে শুরু হল।’‌ দীর্ঘ ৮ বছর পর সবুজ–‌মেরুন তাঁবুতে লিগ এনে দিলেও বাড়তি উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে নারাজ শঙ্করলাল। তিনি বলেন, ‘আমি আবেগপ্রবণ নই। তাই উচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছি না। চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও ভেঙে পড়তাম না। এই জয়টা আগামী দিনে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করবে। গত বছর এই কাস্টমসকে হারিয়েই সিকিম গভর্নর্স গোল্ড কাপ জিতেছিলাম। এ বছর সেই কাস্টমসকে হারিয়েই লিগ চ্যাম্পিয়ন হলাম। এটাকেই আমি লিগের ফাইনাল ম্যাচ হিসেবে ভেবে নিয়েছিলাম।’‌ এই লিগ জয় যে সহজ ছিল না, দাবি করেছেন বাগান কোচ। তাঁর কথায়, ‘‌৮ বছর ধরে সদস্য–সমর্থক–কর্তারা অপেক্ষা করে ছিলেন। সেই অধরা মাধুরী অবশেষে হাতে এসেছে। এ বছর পরিস্থিতি খুব জটিল ছিল। কারণ ঘরে–বাইরে নানারকম সমস্যা ছিল। অর্থনৈতিক সমস্যাও ছিল। ফুটবলাররা সব কিছু দারুণভাবে ওভারকাম করেছে। এটা ওদের কৃতিত্ব। এই লিগ জয় অন্যরকম তৃপ্তি দিচ্ছে।’‌ লিগের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে এফসিআই ম্যাচকেই মনে করছেন শঙ্কর। তাঁর যুক্তি, ‘‌ডার্বির পর যে–‌কোনও ম্যাচই কঠিন হয়। ইস্টবেঙ্গল ডার্বির পর পিয়ারলেসের কাছে হারল। আমাদের এফসিআই ম্যাচ শুধু জিতলেই হত না, গোলপার্থক্যও বাড়িয়ে রাখার দরকার ছিল। এই জায়গায় ইস্টবেঙ্গল পিছিয়ে গেল, আমরা এগিয়ে গেলাম। আমার মনে হয় এফসিআই ম্যাচটাই লিগ জয়ের টার্নিং পয়েন্ট।’‌ একগুচ্ছ জুনিয়র ফুটবলার তাঁর কোচিংয়ে উঠে এসেছেন। তাঁদের আলাদা করে কৃতিত্ব দিয়ে গেলেন শঙ্করলাল। তিনি বলেন, ‘‌ওদের ঠিক জুনিয়র বলব না, তরুণ। সৌরভ, পিন্টুরা ১০ ম্যাচ আগে যে জায়গায় ছিল, তার থেকে অনেক উন্নতি করেছে। তবে ওটা ওদের কৃতিত্ব, ওরা ভাল খেলেছে বলেই তো আমাকে সুযোগ দিতে হয়েছে। আমি শুধু ওদের আত্মবিশ্বাস দিয়েছি।’‌ সৌরভ দাস, পিন্টু মাহাতোর মতো তরুণ ফুটবলারদের উঠে আসা বাগান কোচের কাছে বড় প্রাপ্তি। লিগ জয়ের পর তাঁবুতে নিজের ঘরে ফিরে প্রথম ফোন করেছিলেন স্ত্রী পৌলোমীকে। তাঁকে ছাড়াও এই লিগ জয় উৎসর্গ করছেন অনেককেই। শঙ্করলাল বলেন, ‘‌অনেকজনকে এই লিগ জয় উৎসর্গ করছি। তাদের মধ্যে র‌য়েছে আমার স্ত্রী পৌলোমী, যিনি   আমাকে মোহনবাগান ক্লাবে নিয়ে এসেছিলেন সেই সুভাষদাকে, সঞ্জয়দা সহযোগিতা করেছেন, তাঁকে। যে সময় সঞ্জয় চলে গেলেন, তখন অভ্যন্তরীণ অবস্থা খারাপ ছিল। সেই সময় দেবাশিসদা, টুম্পাইদারা দায়িত্ব দিয়েছিলেন, বর্তমান কর্তারা দারুণ সহযোগিতা করেছেন। সবাইকে এই জয় উৎসর্গ করছি।’‌ যাঁর হাত ধরে কোচিংয়ে এসেছিলেন, সেই সুভাষ ভৌমিক কলকাতা লিগে ব্যর্থ। অথচ তিনি সফল। সুভাষ ভৌমিককে হারিয়ে কি চ্যাম্পিয়ন হলেন?‌ এই প্রসঙ্গে শঙ্করলাল বলেন, ‘‌ফুটবলে এটাই চলে। সুভাষদা তো এই প্রথম নয়, এর আগেও বহু উত্থান–পতন দেখেছেন।’‌ তবে মোহনবাগান ম্যাচে প্রচুর দর্শক আসায় খুশি শঙ্কর। তিনি বলছিলেন, ‘‌মোহনবাগানের প্রত্যেক ম্যাচে প্রচুর দর্শক হয়েছে। দল ভাল খেলেছে বলেই এত দর্শক। তার মানে আমরা সঠিক পথে হেঁটেছি। এই রাস্তাতেই হাঁটতে হবে আই লিগের জন্য।’‌ লক্ষ্য এবার আই লিগ। তবে কলকাতা লিগ জিতলেও শঙ্করলাল বদলাবেন না। তাঁর মুখেই শোনা গেল, ‘‌শঙ্করলাল বদলাবে না। আগে যেমন ছিলাম, তেমনি থাকব।’‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top