সংবাদ সংস্থা, নিউ ইয়র্ক: জন ম্যাকেনরো, জিমি কোনর্সরা বহু বিতর্কে জড়িয়েছেন। কিন্তু এ জিনিস এর আগে বিশ্বটেনিসে দেখা যায়নি। ইউএস ওপেনের মহিলাদের ফাইনালে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটালেন সেরেনা উইলিয়ামস। খেলা চলাকালীন চেয়ার আম্পায়ারকে সটান বলে দিলেন, ‘‌আপনি চোর’‌। তাঁর বিরুদ্ধে লিঙ্গবৈষম্যের অভিযোগও আনলেন। ফলে নাওমি ওসাকার প্রথম জাপানি হিসেবে গ্র্যান্ড স্লাম জেতার ইতিহাস ম্লান হয়ে গেল নিউ ইয়র্কের আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে রবি–সন্ধ্যার নাটকে। ঘটনার (আসলে ঘটনাবলির। নাকি কেলেঙ্কারির) সূত্রপাত ম্যাচের দ্বিতীয় সেটে।
ঘটনা ১:‌ কোচিং বিতর্ক
দ্বিতীয় সেটের রাশ তখন পুরোপুরি ওসাকার হাতে। দেখা গেল সেরেনার কোচ প্যাট্রিক মুরাতোগলু গ্যালারি থেকেই সেরেনাকে ইশারায় কিছু বলছেন। চেয়ার আম্পায়ার কার্লোস ‌র‌্যামোসের নজর এড়ায়নি সেটা। খেলা চলাকালীন কোচিং নেওয়ার (‌অন কোর্ট কোচিং)‌ ‌অপরাধে সেরেনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করেন তিনি। সেরেনা তখনই একপ্রস্থ তর্ক জুড়ে দেন। বলেন, মুরাতোগলু স্রেফ তাঁকে ‘তাতাচ্ছিলেন’। শুধু তা–ই নয়, সেই সময় তিনি উল্টোদিকের কোর্টে ছিলেন। যদিও পরে মুরাতোগলু স্বীকার করে নেন, তিনি কোচিংই করাচ্ছিলেন। বলেন, ‘‌এটা সত্যি, আমি কোচিং করাচ্ছিলাম। কিন্তু ওসাকার কোচ সাশা বাজিনও সারাক্ষণ ওটাই করছিলেন। সবাই দেখেছে।’‌
ঘটনা ২:‌ র‌্যাকেট আছড়ানো
পঞ্চম গেমে দুটি ডাবল ফল্ট করে ফেলেন সেরেনা। ওসাকা ৪–‌৩ গেমে এগিয়ে যান। মাথা গরম করে কোর্টে র‌্যাকেট আছড়ে ভেঙেই ফেলেন সেরেনা। দ্বিতীয়বার নিয়ম ভাঙার জন্য তাঁকে সতর্ক করে ওসাকাকে এক পয়েন্ট দেন আম্পায়ার। সেরেনা প্রথমে সেটা বুঝতে পারেননি। কোর্ট বদল করার সময় ব্যাপারটা বুঝে আম্পায়ারের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমার মাথাতে কিছু ঢুকছেই না। যখনই এখানে খেলতে আসি, কিছু না কিছু সমস্যা তৈরি হয়। আমাকে মোটেই গ্যালারি থেকে কোচিং করানো হয়নি (পরপর তিনবার একই বাক্য)। আপনাকে এটা ঘোষণা করতে হবে যে, আমাকে গ্যালারি থেকে কোচিং করানো হয়নি। আমি ঠকিয়ে (চিট) কিছু করিনি। আমাকে গ্যালারি থেকে শেখানো হচ্ছে?‌ এটা আপনি বলতে পারলেন কী করে?‌ আপনার ক্ষমা চাওয়া উচিত! এখনই ক্ষমা চাওয়া উচিত! আমি জীবনে কখনও প্রতারণা করিনি। আমার একটা মেয়ে আছে। সে কী শিখবে?‌ আমি কখনও তঞ্চকতা করিনি। আপনি আমার কাছে ক্ষমা চান!’ কোর্টের পাশে দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে সেরেনা চিকার করে বলতে থাকেন, ‘আমার চরিত্র নিয়ে আপনি এভাবে প্রশ্ন তুলতে পারেন না! হ্যাঁ, আপনি আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন! ক্ষমা চেয়ে নিন। যতদিন আপনি বাঁচবেন, ততদিন যেন আমার কোনও ম্যাচে আপনাকে না দেখি। আপনি একটা মিথ্যুক। বলুন কখন ক্ষমা চাইবেন?‌ এখনই চান। এখনই বলুন ‘‌সরি’‌। নইলে আর একটাও কথা বলবেন না। একদম চুপ! আমি ঠকাচ্ছি, এটা বলার সাহস আপনার হয় কী করে?‌ আপনি তো আমার থেকে একটা পয়েন্ট চুরি করে নিয়েছেন। আপনি তো চোরও।’‌
ঘটনা ৩:‌ গেম কাড়া হল সেরেনার
আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে তখন নাটক তুঙ্গে।

গালিগালাজ করার জন্য সেরেনার থেকে একটি গেম কেড়ে নেন আম্পায়ার। ওসাকা  এগিয়ে যান ৫–‌৩ গেমে। অগ্নিশর্মা সেরেনা র‌্যামোসকে বলেন, ‘‌আপনি কি মস্করা করছেন?‌ এটা কি ছেলেমানুষি হচ্ছে?‌ আপনাকে চোর বলেছি বলে একটা পয়েন্ট কেড়ে নিলেন?‌ আমি প্রতারক নই। আগেও বলেছি আপনাকে ক্ষমা চেয়ে নিতে। নাহ্‌, আর পারা যাচ্ছে না। কোথায়?‌ রেফারি কোথায়?‌’‌
ঘটনা ৪:‌ কোর্টে রেফারি পরিস্থিতি দেখে টুর্নামেন্ট রেফারি ব্রায়ান আর্লি কোর্টে আসতে বাধ্য হন। তখন সেরেনা কাঁদছেন। স্টেডিয়ামও সেরেনার পক্ষ নিয়ে ফেলেছে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে আর্লিকে সেরেনা বলেন, ‘‌এটা ঠিক নয়। উনি আমাকে বলছেন, আমি নাকি গ্যালারি থেকে কোচের পরামর্শ নিচ্ছি। আমি এটা করিনি। এটা ঠিক নয়। আপনি তো আমাকে চেনেন। জানেন, আমি কী ধরনের মানুষ। বলুন, এগুলো কি ঠিক হচ্ছে?‌ এ নিয়ে অনেকবার এরকম হল। এটা ঠিক নয়। মুখ খোলার জন্য একটা গেম কেড়ে নেবে?‌ আপনি জানেন, পুরুষ খেলোয়াড়রা এর থেকেও অনেক খারাপ কথা বলে পার পেয়ে যাচ্ছে। পুরুষ বলেই ওদের কিছু বলা হয় না। আমি একটা সামান্য কথা বলেছি— চোর‌। কারণ, উনি আমার থেকে ১ পয়েন্ট চুরি করেছেন। জানি না, এজন্য কী ফল ভোগ করতে হবে। আমি একজন মেয়ে বলে আপনারা আমার সঙ্গে যা খুশি তাই করবেন?‌ আপনিও জানেন, যা হল, সেটা ঠিক নয়। কিন্তু আমি জানি, আপনি সেটা স্বীকার করবেন না। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত বদলাবেন না। কিন্তু আবার বলছি, এগুলো ঠিক হচ্ছে না। প্রত্যেক বছর এখানে আমার সঙ্গে কিছু না কিছু ঘটবেই।’‌ নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে ততক্ষণে চেয়ার আম্পায়ার র‌্যামোসকে কোর্ট থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। 
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তাঁর থাকার কথা থাকলেও তিনি সেখানে আর আসেননি।
ঘটনা ৫:‌ পুরস্কার বিতরণ
সেরেনাকে ওসাকার ‘‌রোল ‌মডেল’‌‌ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তখন স্টেডিয়াম জুড়ে তুমুল চিৎকার, টিটকিরি। ওসাকা কাঁদছেন। টুপি দিয়ে সেই কান্না ঢাকার চেষ্টা করছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে সেরেনাই এগিয়ে আসেন। বলেন, ‘‌আসুন সবাই মিলে এই মুহূর্তটাকে দারুণ ভাবে উপভোগ করি। আর আওয়াজ, টিটকিরি নয়। আমরা পজিটিভ হই। নাওমিকে অভিনন্দন। আর টিটকিরি নয়। দর্শকদের ধন্যবাদ। আপনারাই বিশ্বের সেরা দর্শক। আবার এখানে খেলার আশায় রইলাম।’‌ এরপর ওসাকাকে জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নেন।
ঘটনা ৬:‌ সাংবাদিক সম্মেলন
সেরেনা বলেন, ‘‌আমি এখানে বসে বলতে পারব না যে, আম্পায়াকে চোর বলা আমার উচিত হয়নি। আমার মনে হয়েছে, উনি আমার থেকে একটা গেম অন্যায় ভাবে কেড়ে নিয়েছেন। কিন্তু ছেলেরাও আম্পায়ারদের অনেক কিছু বলে। মহিলাদের অধিকারের জন্য আমি লড়াই করছি। লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমার লড়াই। ওঁকে চোর বলার জন্য আমার থেকে একটা গেম কেড়ে নেওয়ার মানেই হল লিঙ্গ বৈষম্য। কোনও ছেলে যদি ওঁকে চোর বলে, উনি তার থেকে একটা গেম কেড়ে নিতে পারবেন?‌ আমার মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল।’‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top