দেবাশিস দত্ত,ম্যাঞ্চেস্টার: বিরাট কোহলিরা সুইৎজারল্যান্ডে বেড়াতে গেলেন নাকি?‌ আচ্ছা, ইন্ডিয়া টিম বুধবার রাতে ডিনার করেছিল?‌
একে মেজাজ খিঁচড়েছিল, নিউজিল্যান্ড ফাইনালে চলে যাওয়ায় তার ওপর যদি সকাল সকাল কেউ এমন টিপ্পনী কেটে এসএমএস করে, তখন মেজাজ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবু কোনওরকমে ওই বন্ধুদের উত্তর দিলাম— (‌ক)‌ বিরাট এবং অনুষ্কা সকালেই ভারতের পথে রওনা হয়ে গেছে। সব টিকিট একসঙ্গে পাওয়া যায়নি বলে বিভিন্ন ভাগে রোহিতরা দেশে ফিরবেন। (‌খ)‌ হেরে যাওয়ার পর ডিনার করেনি ভারতীয় দল, এই খবর আমার কাছে নেই।
●‌ ●‌ ●‌ ●‌ ●‌
খেলা যত গড়িয়েছে, তত খবর এসেছে, দেশের মানুষ হতাশ হওয়ার চেয়েও ফাইনালে না উঠতে পারায় ফুঁসছে। তাতে অবশ্য কিছু যায়–‌আসে না এই টিম ইন্ডিয়ার। ২০০৩ সালে জোহানেসবার্গে ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে কচুকাটা হওয়ার পর ভারতীয় শিবিরের অনেকেই খাওয়াদাওয়া করেননি। সান অ্যান্ড স্যান্ড হোটেলের ২০ তলা বলতে গেলে নিষ্প্রদীপ হয়েছিল। কারও মুখে ছিল না কোনও কথা। সবাই যে যঁার মতো মুখে কুলুপ এঁটে বসেছিলেন। ২০০৭–‌এ ত্রিনিদাদের হিলটন হোটেলে বাংলাদেশের কাছে কানমলা খাওয়ার পর ক্রিকেটাররা বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালে রোহিত শর্মার ভেঙে পড়া ছাড়া, বাকিরা মোটামুটি স্বাভাবিক ছিলেন। এখানে যে ১৫ জন ক্রিকেটার ছিলেন, তঁাদের মধ্যে থেকে দীনেশ কার্তিককে জোর করিয়ে অবসরগ্রহণ করানো উচিত। ধোনির ব্যাপারটা আলাদা। বাকি ১৩/‌১৪ জন নিশ্চয়ই আগামীতে দলে থাকবেন। ওঁদের বাদ দেওয়ার হিম্মত নির্বাচকদের নেই। যতদিন না বোর্ডে নতুন শাসক আসছে, ততদিন রবি শাস্ত্রী এবং তঁার অনুগত কোচ‌বাহিনীর সরে যাওয়ার কোনও খবর নেই। সম্ভাবনাও দেখছি না। বিরাট তঁাদের চাইছেন বলে ওঁরা হয়তো থেকে যাবেন। তবে, ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে প্যাট্রিক ফারহার্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেল বুধবার নিউজিল্যান্ডের কাছে ১৮ রানে হারার পরেই। মানুষটা গত ৪ বছর ধরে ভারতীয় শিবিরকে সত্যিই সেবা করে গিয়েছেন। আর ভাল লাগছিল না। অস্ট্রেলিয়ায় ফিরতে চান। সুতরাং ছুটি নিলেন। কিন্তু অন্যরা থেকে যাবেন, যথারীতি। এই দল অনেক বেশি পেশাদার, বুদ্ধিমানও বটে। ওঁরা জানেন, দেশবাসী এরপর অন্য অনেক প্রসঙ্গ নিয়ে মেতে থাকবেন। সামান্য যে কয়েকজন সোশ্যাল মিডিয়ায় গালাগাল করবেন, তাতে ওঁদের শরীরে কোনও অঁাচড় লাগবে না। সুতরাং ভয় পাওয়ার কোনও খবর নেই। অধিনায়ক বিরাট কোহলি তো নিজেই বলে দিয়েছেন, বিশ্বকাপে এবার ভারতীয় দল সেমিফাইনালের হার ছাড়া যেভাবে খেলেছে, তাতে গর্ব হচ্ছে। সাধারণ দর্শকরা একমত না হলেও, বিরাট কোহলির কিছু যায়–‌আসে না।
হ্যঁা, যে কথা বলছিলাম। বৃহস্পতিবার ভারতীয় দলের লন্ডন চলে যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে থাকার ইচ্ছা ছিল টেমস নদীর ধারে পার্ক প্লাজা রিভারসাইড হোটেলে। আইসিসি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল, ফাইনালে উঠলে লন্ডন শহরের প্রাণকেন্দ্র রয়্যাল ল্যাঙ্কাস্টারে থাকতে হবে। গঁাইগুঁই চলছিল অনেকদিন ধরে। আইসিসি কিন্তু বিরাটদের ওই অনুরোধ মেনে নেয়নি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। এই প্রথম ইন্ডিয়ার দাদাগিরি হেঁাচট খেল। বিরাটদের সব আবদার ভারতীয় বোর্ড মেনে নিতে পারে, আইসিসি তা শুনবে কেন?‌ পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ফাইনালে উঠলে তঁাদের র‌য়্যাল ল্যাঙ্কাস্টারেই থাকতে হবে। নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরে যাওয়ায়, টিম ইন্ডিয়ার পার্ক প্লাজায় থাকতে কোনও অসুবিধে রইল না। বিরাট যেমন ম্যাঞ্চেস্টার থেকেই দেশের পথে রওনা হয়ে গেলেন। আবার কেউ কেউ বৃহস্পতিবারের মধ্যে হিথরো বিমানবন্দর থেকে বা বার্মিংহামের বিমানবন্দর থেকে ভারতে ফেরার উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু দলের বাস গেল লন্ডনে। যতদিন না পর্যন্ত টিকিট পাওয়া যাচ্ছে, ততদিন টেমস নদীর ধারের হোটেলেই থাকতে হবে ওঁদের। ফাইনালে উঠলে, সাপোর্ট স্টাফ–‌সহ গোটা দলেরই ১৬ জুলাই ভারতে ফেরার টিকিট কাটা ছিল। এখন সব সূচি পাল্টে যাচ্ছে।
ভারত থেকে আসা ধনী ক্রিকেটপ্রেমীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। কলকাতা থেকেই এসেছেন বহু ক্রিকেটপ্রেমী। কালোবাজারে ফাইনালের টিকিট বিক্রি হয়েছে ৫ লক্ষ টাকারও বেশি দামে।

 

 

 

এখন চাহিদা কমছে ভারতীয় সমর্থকদের জন্য। ইংরেজরা এখন হন্যে হয়ে টিকিটের খেঁাজ করছেন। ওঁরা ধরেই নিয়েছেন ভারত ছিটকে যাওয়ার পর ট্রফি জয়ের ব্যাপারে রানির দেশ অনেকটাই এগিয়ে গেছে।
আপাতত ভারতীয় শিবিরের হিরো রবীন্দ্র জাদেজা। চেষ্টা করেও পারেননি। ৫৯ বলে ৭৭ রান করার পথে ৪টি চার ও ৪টি ছয় মেরেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, নিউজিল্যান্ডের বোলারদের বিশেষ পাত্তাই তিনি দিতে চাননি। তিনিও হতাশ। তাই ম্যাচের শেষে বলেছিলেন, ‘‌আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম। পারিনি। এটুকু বলতে পারি, শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত দলকে ফাইনালে তোলার চেষ্টা করতাম। ব্যাড লাক, আউট হয়ে গেলাম। কাজটা শেষ করে শিবিরে ফিরতে পারিনি।’‌ 
জাদেজার সমর্থকরা বলছেন, ভারত ফাইনালে উঠলে জাদেজাকে বসানোর হিম্মত টিম ম্যানেজমেন্টের হত না। ঠিকই তো। স্যান্টনারের মতো স্পিনারকে খেলতে গিয়ে ভারতের নামকরা ব্যাটসম্যানদের হাঁটু কেঁপে গিয়েছিল। সেখানে জাদেজা আরামসে স্যান্টনারকে খেলেছেন। বোঝা যায়নি যে, তিনি চাপের মধ্যে আছেন। তবু, তঁাকে সুযোগ দেওয়ার ব্যাপারে কত রকমের বাহানা তৈরি করা হচ্ছিল। এখন অবশ্য তঁারাই বলছেন, রবীন্দ্র জাদেজা ইজ আ ম্যাগনিফিশেন্ট ক্রিকেটার। ভাবখানা এরকম:‌ সেমিফাইনালে সুযোগ না পেলে সৌরাষ্ট্রের এই বঁাহাতি অলরাউন্ডার নিজের যোগ্যতা মেলে ধরার সুযোগই পেতেন না। চমৎকার!‌ রাজা যত বলে, পারিষদ বলে শতগুণে— ভারতীয় শিবিরের এক সাপোর্ট স্টাফ চেষ্টা করছিলেন জাদেজাকে শুরুতে সুযোগ না দেওয়ার ব্যাপারে এমন যুক্তি পেশ করতে। বুঝলাম, দল পরিচালন সমিতির কথাবার্তা এটা। তিনি শুধু সাংবাদিক–সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে তোতাপাখির মতো বলে ফেললেন, এই যা। সত্যিই ঠিক, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি.‌.‌.‌‌। বিরাট ঠিকই বলেছিলেন, তঁারা দুঃখ পেয়েছেন, কিন্তু ধ্বংস হয়ে যাননি। ভারতের মতো দেশে মোটামুটি ভাল ক্রিকেট খেললে ধ্বংস হয়ে যেতে হয়। বিরাটরা জানেনও না, বুধবার রাতে তঁাদের কত সমর্থকের বাড়িতে রান্নাবান্না হয়নি, খাওয়াদাওয়া করার উৎসাহ পাননি, বহু হুইস্কির পেগ তেতো মনে হয়েছে। দামি ওয়াইনে চুমুক দিয়ে বিস্বাদ মনে হয়েছে। ওঁদের চোখের জলে কী–‌ই বা আসে–‌যায় বিরাটদের!‌‌‌‌‌

ম্যাচের পর ম্যাঞ্চেস্টারে বিরাট। বুধবার। ছবি: এএফপি

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top