দলে জায়গা খোয়াতে হয়েছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইংল্যান্ডকে একাই জেতাচ্ছেন মইন আলি। ‘কামব্যাক ম্যান’–কে নিয়ে লিখলেন অনির্বাণ মজুমদার।

ছোটবেলায় প্র‌্যাকটিসের জন্য মাঠে পৌঁছতে অন্য বাচ্চাদের যে সময় লাগত, মইন আলির লাগত তার দ্বিগুণেরও বেশি। তাঁর ট্যাক্সিচালক বাবার গাড়িটি এত পুরনো হয়ে গিয়েছিল, যে একটু এগোনর পরেই গরম হয়ে যেত। গাড়ি থামিয়ে ইঞ্জিন ঠাণ্ডা করে আবার চালানো শুরু করতে হত। বারপাঁচেক এভাবে থামা–‌চলার পর পৌঁছতে পারতেন প্র‌্যাকটিসে। ফেরার সময়ও তাই। বিরক্ত হলেও সেই তখন থেকেই বাস্তবের সঙ্গে যুঝতে শিখেছেন মইন। তাই ছোটবেলার ওই গাড়িটার মতো গত ছ’মাসের থামা–‌চলা ক্রিকেট জীবনকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন।
এ বছরের জানুয়ারির শেষদিক। অস্ট্রেলিয়ায় অ্যাশেজ সিরিজে এমন পারফরমেন্স করেছিলেন, যে তাঁকে নিয়ে রীতিমতো হাসি–‌ঠাট্টা শুরু হয়েছিল। ক্রিকেট পণ্ডিতরা পরামর্শ দিয়েছিলেন, ইংল্যান্ডের এক নম্বর স্পিনার হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে মইন যেন ব্যাটিংয়ে মন দেন। তাহলে অন্তত যদি কিছুটা এগোতে পারেন। কিন্তু নিজের ওপর আস্থা ছিল মইনের। জানতেন, ওই গাড়িটা যেমন বারবার থেমে গেলেও গন্তব্যে পৌঁছত, তেমন তিনিও পারবেন। 
একটা জিনিস মাথায় ছিল তাঁর— আঙুলের চোটের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় বলটা ঠিকমতো গ্রিপ করতে পারেননি।
ছ–মাস পর আঙুলের চোট সারিয়ে ‘ডিউক’ বলটা শক্ত করে হাতে ধরে মইন প্রমাণ করে দিয়েছেন, তিনিই এই মুহূর্তে ইংল্যান্ডের এক নম্বর স্পিনার। স্পিনের বিরুদ্ধে প্রবল পরাক্রমশালী ভারতীয় ব্যাটিংকে প্রায় একাই শেষ করে দিয়ে ইংল্যান্ডকে ৩–‌১ ফলে টেস্ট সিরিজ জিতিয়েছেন। এক ম্যাচ বাকি থাকতেই।
বার্মিংহামে ভারতের বিরুদ্ধে চলতি সিরিজের প্রথম টেস্ট শুরু হওয়ার আগেই মইনকে ইংরেজ অধিনায়ক জো রুট জানিয়ে দেন, আদিল রশিদের জন্য তাঁকে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়া একজনের জন্য জাতীয় দলের জায়গা খোয়ানোটা হজম হয়নি মইনের। কিন্তু রাগ, অভিযোগ, অভিমানের মতো নেতিবাচক অনুভূতিগুলোকে কাছে ঘেঁষতে না দিয়ে মইন ঠিক করেন, কাউন্টিতে খেলেই ফর্মে ফিরবেন।
নটিংহ্যামে তৃতীয় টেস্টে তাঁর সতীর্থরা যখন  কোহলিদের কাছে নাস্তানাবুদ হচ্ছেন, তখন স্কারবরোতে উরস্টারশায়ারের হয়ে কাউন্টিতে তিন নম্বরে নেমে ডাবল সেঞ্চুরি এবং ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়ে রুটদের আবার তাঁর কথা ভাবতে বাধ্য করেছেন মইন। তার ওপর সাউদাম্পটনের উইকেটের চরিত্র এবং ক্রিস ওকসের চোট চতুর্থ টেস্টে জায়গা করে দিল মইনকে। প্রথম দিন তাঁর ১৪১ বলে ৪০ রান ইংল্যান্ডকে ৬ উইকেটে ৮৬ রান থেকে টেনে তুলতে সাহায্য করেছিল। দ্বিতীয় দিন পাওয়া গেল স্পিনার মইনকে। তাঁর প্রথাগত অফ স্পিনের কুল–‌কিনারা করতে পারেননি ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। মইন তুলে নিলেন ৫ উইকেট।
মরশুম শুরুর আগে বোলিং কোচ সাকলাইন মুস্তাকের কাছে গিয়েছিলেন মইন। তাঁকে একটা ছোট পরামর্শ দেন পাকিস্তানের প্রাক্তন অফ স্পিনার— বল ডেলিভারি করার সময় ডান হাতটা যেন শরীরের আরও কাছে থাকে। 
টেকনিকের সেই সামান্য বদলটাই ব্রহ্মাস্ত্র হয়ে গেল মইনের। বল ছাড়ার সময় শরীরের ভারসাম্য বেড়ে গেল এবং বোলিং অ্যাকশনটা অনেক বেশি ‘মোমেন্টাম’ দিয়ে শেষ হতে লাগল। বলের গতিও কমিয়ে দিলেন মইন। যাতে বাতাসে বল ‘‌ড্রিফট’‌ করে বেশি।‌ 
সহজভাবে বললে, মইন নিজের বোলিংকে অনেক সরলীকৃত করে আনলেন। মূল লক্ষ্য স্থির করলেন— অ্যান্ডারসন, ব্রডদের বোলিংয়ের পর ডানহাতি ব্যাটসম্যানের অফস্টাম্পের বাইরে উইকেটে যে ক্ষত তৈরি হয়, সেটা কাজে লাগাতে হবে। চতুর্থ টেস্টে প্রথম ইনিংসে ৩০ শতাংশ ডেলিভারিই সেখানে ফেলতে পেরেছিলেন তিনি। তথাকথিত স্পিন খেলতে বিরাট বীর কোহলিদের মনে একটা ধন্ধ তৈরি করেছিলেন। তাতেই প্রথম ইনিংসে ৬৩ রানে ৫ উইকেট।
দ্বিতীয় ইনিংসে যখন বল করতে এলেন, তখন উইকেট আরও শুকনো। এবং ডানহাতি ব্যাটসম্যানের অফস্টাম্পের বাইরের ক্ষতগুলো আরও ভয়ঙ্কর। মইন জানতেন, তাঁর হাতেই ম্যাচের ভাগ্য। কিন্তু সেজন্য নিজেকে একবারের জন্যও বাড়তি চাপে ফেলেননি। টানা ১৩ ওভার বল করার সময় কোহলির উইকেটটাও প্রায় পেয়েই গিয়েছিলেন। কিন্তু এলবিডব্লুর জোরালো আবেদন নাকচ হয়ে যায়। কোহলি এবং রাহানে ক্রমশ তাঁর বিরুদ্ধে সহজ হয়ে যান। 
কিন্তু ছোটবেলার ওই গাড়িটা মইনকে ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছিল। তিনি জানতেন, ১টা উইকেট তুলে নিতে পারলেই বাকিগুলো চলে আসবে। অবশেষে চা–বিরতির ঠিক আগে সবুরে মেওয়া ফলল। তাঁর বল কোহলির গ্লাভসে লেগে জমা পড়ল শর্ট লেগে। ইনিংস শেষ করলেন আরও ৩ উইকেট নিয়ে। আর ম্যাচ শেষ করলেন? ম্যাচ–সেরার পুরস্কার নিয়ে।
ওহ্‌, ম্যাচ শেষে আরও তিনটে তথ্য সামনে এল—
ভারতের ১ নম্বর স্পিনারের পরিসংখ্যান: ৫১.‌৫–‌১০–‌১২৪–‌৩ 
ইংল্যান্ডের ১ নম্বর স্পিনারের পরিসংখ্যান: ১৪–‌‌৩–‌৪০–‌০ 
আর ইংল্যান্ডের কাজ চালানো স্পিনারের? ৪২–‌৪–‌১৩৪–‌৯ 
ভাগ্যিস ছোট্ট মইনের জীবনে বাবার লজঝড়ে পুরনো গাড়িটা ছিল!

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top