সৌমিত্র কুমার রায়, ভুবনেশ্বর, ১৬ এপ্রিল- সুনীল ইজ অন এ মিশন।
গোড়াতেই কথাটা বলে চিবুক শক্ত করে ফেললেন বেঙ্গালুরু এফসি কোচ অ্যালবার্ট রোকা।
ভারতীয় ফুটবলে সুনীল ছেত্রির প্রবেশ সুবেদার হিসেবে। এ দেশের ফুটবল উপগ্রহে তখন রঙের ছটা ছড়াচ্ছেন বাইচুং ভুটিয়া। তারপর সুনীলের লড়াইটা শুধু অস্তিত্ব জানান দেওয়ার সীমায় আটকে থাকেনি। সেই মিশন দিন, মাঠ, ম্যাচের ঘেরাটোপ পেরিয়ে সত্যি অনেক বড় হয়ে গেছে। সুবেদার সুনীল ছেত্রি এখন কর্নেল। বেঙ্গালুরুর কাছে তো বটেই। গোটা দেশের ফুটবল গোলকে সুনীল এখন কর্নেল। রোকা না বললেও তঁার জার্সির নেমপ্লেটে অদৃশ্য কালিতে লেখা হয়ে গেছে ওই কথাটা।
সুনীল ইজ অন এ মিশন।
এ–‌সব কথা উঠতই না, যদি ম্যাচটা অ্যাড্রিনালিনের যুদ্ধ হয়ে না দাঁড়াত। বেঙ্গালুরু বনাম মোহনবাগান। শুনবেন, গায়ে কঁাটা দেবে, শিহরন জাগবে, টেনশনে আক্রান্ত হবেন। আর যদি এ–‌সবের কিছু না হয়, তাহলে ভারতীয় ফুটবল বৃত্ত থেকে আপনার দূরত্ব এক লহমায় অনেকটাই বেড়ে যাবে। 
দু’দলের কোচ, ফুটবলাররা মানছেন। মঙ্গল–বিকেলে সুপার কাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালটা ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা আকর্ষণীয় ম্যাচ। দু’দলের কোনও কোনও  ফুটবলার আবার বলছেন, ম্যাচটা ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম কঠিন ম্যাচ। টুইটার, সোশ্যাল সাইটে ছড়িয়েছে, নীল বনাম সবুজ–মেরুন যুদ্ধটা তো ভারতীয় ফুটবলের এল ক্লাসিকো। যা শুনে হাসছেন বেঙ্গালুরুর অন্যতম সেরা অস্ত্র মিকু। হাসি থামিয়ে জুড়ে দেন, ‘ক্লাসিকো নিয়ে না ভেবে যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হল, ওদের সমর্থক আমাদের তুলনায় বেশি। হতে পারে কালকের ম্যাচটা আমরা অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে নামছি।’ বাগান কোচ শঙ্করলাল চক্রবর্তীরও একই মত, কালকের ম্যাচটা ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচ।’‌
এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সুনীল ছেত্রি যেন দামামা ফোঁকার দায়িত্বখানা নিয়েছেন। বিপক্ষ টিমে সোনি নর্ডির অনুপস্থিতিতে। শঙ্কর যেমন বলছিলেন, সুনীল অবশ্যই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। তবে, আধুনিক ফুটবলে কোনও একটা ফুটবলারের ওপর টিম নির্ভর করে না। ফুটবল এখন অনেক বেশি টিম গেম।’ শঙ্কর যেটা বললেন না, সেটা হল, কলিঙ্গ রণক্ষেত্রে ব্লু–কামান ভোঁতা করতে তঁার ভরসা টিম গেম। বেঙ্গালুরু টিমের অন্যতম প্রধান শক্তি হল উদান্তা–মিকু–সুনীলের ট্রায়ো। যা থামাতে দুই সাইডব্যাক (গুরজিন্দার, অরিজিৎ বাগুই) এবং দুই উইঙ্গারের (নিখিল, ফৈয়াজ) ওপর দায়িত্ব বর্তেছে। সেই সঙ্গে শঙ্করের কাজ একটু হলেও সুবিধে করে দিয়েছেন শত্রু শিবিরের প্রাক্তন সদস্য ক্যামেরন ওয়াটসন। বেঙ্গালুরু টিমে খেলার অভিজ্ঞতা কোচের সঙ্গে ভাগ করেছেন ওয়াটসন। তঁার কথায়, ‘গত বছর সুনীলকে লোড নিতে হত বেশি। কিন্তু, এ বছর মিকু সেই প্রেসারটা নিচ্ছে। ফলে সুনীল অনেক বেশি ফ্রি খেলতে পারছে।’ মাঝমাঠে যুদ্ধটা কিছুটা হলেও মিকু বনাম ওয়াটসন। মিডফিল্ড থেকে বিএফসি–সাপ্লাই লাইন কাটার বাড়তি দায়িত্ব পেয়েছেন ওয়াটসন। রোকার দলে ট্রায়ো নিয়ে মিকুর বক্তব্য, ‘উদান্তা তরুণ ফুটবলার। অনেকদিন ধরে রয়েছে টিমে। ওর গতিটা আমাদের সুবিধে করে দেয়। ম্যাচে ও দারুণ ক্রস রাখে, আমি আর সুনীল তা থেকে গোল করি।’
দু’দলের মুখোমুখি সাক্ষাতের ট্র্যাক রেকর্ডের পাল্লা ঝুঁকে শঙ্করের দলের দিকেই। আই লিগ, ফেড কাপ, এএফসি মিলিয়ে দু’দলের মোট ১৩ বার সাক্ষাতে বাগান জিতেছে ৫ বার, ড্র ৫, বিএফসি জিতেছে ৩টি ম্যাচ। ট্র্যাক রেকর্ডের প্রসঙ্গ আমলই দিতে চান না শঙ্করলাল, ‘ওটা অতীত। বর্তমান নিয়ে বঁাচতে হবে। ওরা গুরুত্বপূর্ণ তিনটে ম্যাচেই জিতেছে।’ বোঝাই যাচ্ছে, পরিসংখ্যান রয়ে যায় খাতায়–কলমে, এ ধরনের হাই ভোল্টেজ ম্যাচের আগে এ সমস্ত পরিসংখ্যান কোচ–ফুটবলারদের মাথায় থাকে না। পরিসংখ্যানের বদলে দুই যুযুধান পক্ষে ভেসে বেড়ায় ‘বদলা’, ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ শব্দগুলো। বাগানের কাছে যেমন গতবারের ফেড কাপের ফাইনালে হারের শোধ নেওয়ার ম্যাচ, সুনীলদের কাছে ম্যাচটা অল্পের জন্য আইএসএল না পাওয়ার খিদে মেটানোর ম্যাচ।  
এবার দু’দলেই অনেক পরিবর্তন হয়েছে। গতবারের ফেড কাপ ফাইনালের বাগানের প্রথম একাদশের একজনও নেই মঙ্গলবারের ম্যাচে। তাতে কী। মোহনবাগান যেমন আই লিগের অন্যতম সেরা দল, বেঙ্গালুরু তেমনই আইএসএলের অন্যতম সেরা টিম। দু’দলের লড়াইয়ের মাঝে আই লিগ বনাম আইএসএলের বারুদের গন্ধও রয়েছে। অন্যতম হাই ভোল্টেজ ম্যাচের আগে দু’দলের কোচ–ফুটবলারদের শরীরী ভাষায় ছাপ না থাকলেও ভিতরে ভিতরে ফুটছেন। আত্মবিশ্বাসই চুঁইয়ে পড়ছে বাগান কোচের গলায়, ‘ওদের মোকাবিলার জন্য আমরা প্রস্তুত। পরিবর্তিত সময়ে বিএফসি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।’ রোকার গলাতেও সমীহের সুর, ‘মোহনবাগান টুর্নামেন্টের অন্যতম কঠিন প্রতিপক্ষ। দুটো দলই অনেক বদলেছে। কালকের ম্যাচে আমরা ফেবারিট নয়, ম্যাচটা সহজ হবে না।’
শঙ্করলালকে তাতাচ্ছে গত ফেড ফাইনালে হারটা। সঞ্জয় সেনের দল ২–০ হেরেছিল। ‘গতবার ফেড কাপের ফাইনালে বেঙ্গালুরুর পারফরমেন্স জীবনে ভুলব না। ম্যাচে রোকা তিনবার ফর্মেশনে বদল এনেছিল। সারা ম্যাচে একচ্ছত্র আধিপত্য রেখে খেলেছিল। গতবার মোহনবাগানের সেরা টিম থাকা সত্ত্বেও। সারা জীবন মনে রাখার মতো।’
বিখ্যাত সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েলের ভাষায়, ‘ফুটবল হল গোলাগুলি ছাড়া যুদ্ধ।’‌ গত কয়েক বছরের মতো মঙ্গলবারের ম্যচটাও বোধহয় তা জানান দেবে।‌‌

রোদ–‌ছায়ার সঙ্গে খেলা আক্রাম, ডিকার। ছবি:‌ রনি রায়‌
 

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top