দেবাশিস দত্ত, লন্ডন: অপরাজিত ৮৬ রানের একটি অত্যাশ্চর্য ইনিংসের কথা স্বয়ং রবীন্দ্র জাদেজাও সম্ভবত ভাবতে পারেননি, ৪ উইকেট (‌দ্বিতীয় ইনিংসেও নিয়েছেন আপাতত মইন আলির উইকেট)‌ নেওয়ার পর ৮ নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতে নেমে তিনি শেষ পর্যন্ত ভারতকে ম্যাচে রাখতে পারবেন। কিন্তু পেরেছেন। অবশ্যই একটি স্মরণীয় ইনিংস। যে ইনিংসে ছিল মেঠো জেদ এবং উপেক্ষার আগুন। ওভালেই তিনি সত্যিকারের ‘‌স্যর’ জাদেজা হয়ে উঠেছিলেন।
শনিবার বিকেলের পরিস্থিতিতে ইংল্যান্ডের অন্তত ১০০ রানের ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু হনুমা বিহারী এবং রবীন্দ্র জাদেজা সপ্তম উইকেটে ৭৭ রান যোগ করে পরিস্থিতি পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেন। হনুমা ফিরে গেলেন ৫৬ রান করে। কট বেয়ারস্টো বোল্ড মইন। রবিবার সকালে প্যাভিলিয়ন প্রান্তের মাঠের দিকে হরভজন সিংকে দেখেই ছুটে এসেছিলেন মইন আলি এবং আদিল রশিদ। কী করা উচিত?‌ হরভজন বাতলে দিয়েছিলেন, সবসময় যে ক্ষতের ওপর বল রাখতে হবে, এমন কোনও কারণ নেই। সবাই ভাববে, ক্ষতে পড়ে বল ভেতরের দিকে আসবে। কিন্তু কখনও কখনও সোজা হয়ে যাবে কয়েকটা ডেলিভারি। তখন পেয়ে যাবে ব্যাটের আউটার এজ। হনুমা এবং ইশান্ত শর্মাকে ফেরালেন মইন। দুটি ক্ষেত্রেই বল সোজা হয়ে ব্যাটের আউটার এজে লেগে বেয়ারস্টোর হাতে জমা পড়েছিল। হনুমা ফিরে যাওয়ার পর ইংরেজ দর্শকরা ধরে নিয়েছিলেন খুব তাড়াতাড়ি ভারতের ইনিংস শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু জাদেজা কখনও ইশান্তকে নিয়ে, কখনও বুমরাকে নিয়ে একান্ত নিজস্ব ঢঙে ইংরেজ বোলারদের পিটিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক জো রুট। ঘনঘন বোলার পরিবর্তন করেও তিনি জাদেজাকে থামিয়ে রাখতে পারছিলেন না। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে আপাতত তিনি ব্রাত্য। চলতি সফরে প্রথম ৪ টেস্টে তঁাকে রাখা হয়নি প্রথম এগারোয়। এই পরিস্থিতিতে প্রথম সুযোগ পাওয়া মাত্র তিনি বুঝিয়ে যাচ্ছেন, তঁাকে বাইরে রেখে ঠিক করেননি বিরাট কোহলি। সুনীল গাভাসকার, হরভজন সিং–‌রা সাউদামটন থেকেই বলে আসছেন জাদেজাকে খেলাতে। ওভালে সুযোগ দিতে বাধ্য হলেন অশ্বিনের চোট বেড়ে যাওয়ায়। এমন দুর্দান্ত সাফল্যের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠেয় রাজকোট ও হায়দরাবাদে যে জাদেজাকে প্রথম এগারোয় রাখা হবে, এটা এখন থেকেই চোখ বুজে বলা যায়। (‌ওই দুটি টেস্টের একাদশে হনুমা বিহারীও থাকবেন)‌।
চাপের মুখে ভেঙে পড়ার ক্রিকেটার তিনি নন। অন্য একধরনের আক্রমণাত্মক মানসিকতা নিয়ে ক্রিকেট খেলেন। এই মুহূর্তে সফরে থাকলেও জাদেজা যে দল পরিচালন কমিটির গুডবুকে ছিলেন না, এটা এখন সবাই জানেন। এই পরিস্থিতিতে নিজেকে ফিট রেখে সুযোগের অপেক্ষায় থাকার জন্য যে কঠিন মানসিকতার প্রয়োজন, তা খেলাধুলো সম্পর্কে জড়িত থাকা সব ক্রীড়াপ্রেমী মানুষরাই জানেন। জাদেজার অপরাজিত ৮৬ রানের ইনিংসের দৌলতে ফস্কে যাওয়ার মুহূর্ত থেকে কোনওরকমে ঝুলে থাকতে পারছে ভারত। ৪০ রানে পিছিয়ে থাকা ভারতের সামনে ম্যাচ জেতার একটা চ্যালেঞ্জ যে সোমবার থেকে শুরু হবে, তেমন একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে, চলতি সিরিজের গতি অনুযায়ী চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করার সময় আবার যদি হেরোবাবুরা ব্যর্থতার চাদর নিজেদের শরীরে জড়িয়ে ফেলেন, তাহলে ৩–‌২ হওয়ার সম্ভাবনা অধরা থেকে যাবে।
ঘটনা এটাই যে, রবিবার ভারত কিন্তু লড়েছে। এদিন প্রথম ৪ ঘণ্টায় ইংল্যান্ড প্রথম সারিতে থাকতে পারেনি। কিছুটা পিছিয়ে পড়তে হয়েছিল জাদেজার দাপটে। তারপর মহম্মদ সামি যেভাবে কিটন জেনিংসকে বোকা বানিয়ে বোল্ড করলেন, তাতে ইংল্যান্ড যেন আরও খানিকটা পিছনে চলে গেল। এই জেনিংস সম্পর্কে কিছুই বলার নেই। এত কম যোগ্যতা নিয়ে কীভাবে তিনি চলতি সিরিজে ১০ ইনিংসে ইংল্যান্ডের মতো দলের হয়ে ওপেন করে গেলেন, তা দেখে ইংরেজরাও বিস্মিত। এখনও শিক্ষানবিশ। প্রচুর শিখতে হবে। যোগ্যতা নয়, প্রধান নির্বাচক এড স্মিথের কোটায় দলে থাকছেন বলে এখানকার প্রচারমাধ্যম জানাল। সব দেশের সব নির্বাচকরাই এখন এভাবেই নিজেদের পছন্দের ক্রিকেটারকে দলে ঢুকিয়ে যাচ্ছেন।
মরশুম শেষ হয়ে আসছে ইংল্যান্ডে। এ কারণে এখন এদেশের সব উইকেট হয়ে দঁাড়িয়েছে শুকনো নারকেলের ছোবড়ার মতো। বল ঘুরছে ভালই। ক্ষতের কল্যাণে বল কখনও লাফাচ্ছে, কখনও সোজা হয়ে যাচ্ছে। খেলা যত এগোবে তত উইকেট খারাপ হবে। মাথায় রাখতে হবে যে, ভারতকে দ্বিতীয় ইনিংস খেলতে হবে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির উইকেটে। ২০০২ সালে সৌরভ গাঙ্গুলির ভারত হেডিংলিতে জিতেছিল জিওফ্রে বয়কটের একটি পরামর্শে। কী করা উচিত টস জিতে?‌ সৌরভকে তখন বয়কট বলেছিলেন, ‘‌চোখ বুজে প্রথমে ব্যাট করো। হেডিংলির উইকেটের নিচে কোনও জল নেই। একেবারে খটখটে শুকনো উইকেট।’‌ সৌরভ সেই পরামর্শ অনুযায়ী টস জিতে প্রথম ব্যাট করে চতুর্থ ইনিংসে ইংল্যান্ডকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে ম্যাচ জিতে নিয়েছিলেন। হরভজন সিং এবং অনিল কুম্বলের ঘূর্ণি বলে ইংল্যান্ড উড়ে গিয়েছিল। এখানে কিন্তু বিরাটদের আরও ভাঙা উইকেটে ব্যাট করতে হবে সোম এবং মঙ্গলবার।‌‌
তৃতীয় দিনের শেষে ইংল্যান্ড যাবতীয় অস্বস্তি নিয়েও ২ উইকেটে ১১৪ রান তুলেছে। প্রথম ইনিংসে ৪০ রানে এগিয়ে থাকা ধরলে, ব্যবধান আপাতত ১৫৪ রানের। কুক অপরাজিত আছেন ৪৬ রানে, সঙ্গী অধিনায়ক রুট ২৯ রানে। রবীন্দ্র জাদেজা বলে গেলেন, ‘‌২৫০ রানের লক্ষ্য হলে ভারত তাড়া করে ম্যাচ জিতে নেবে।’‌ ভাল কথা। আর যদি লক্ষ্য ৩২৫ বা তার বেশি রান হয়ে যায়?‌ বিরাট কি একবার শেষ চেষ্টা করবেন না?‌ এজন্যই ওভালে ঝুলে থাকছে ভারত। ‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top