দেবাশিস দত্ত, লন্ডন, ১০ সেপ্টেম্বর- সব কি শেষ?‌ হয়ত। খানিকটা ক্রিকেটের চিরকালীন অনিশ্চয়তার প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কথা মাথায় রাখলেও বলা যায়, ইংল্যান্ড মঙ্গলবার ওভাল টেস্ট জিতছে। এবং ৪–‌১ ব্যবধানে সিরিজ জেতার জন্য জো রুটদের দরকার ৭ উইকেট। আর ভারতকে জিততে হলে (‌শিউরে উঠছি)‌ ৪০৬ রান!‌ বিরাট কোহলি ফিরে গেছেন শূন্য রানে। ৪ বছর আগের দুঃসহ স্মৃতি যেন উসকে দিয়ে গেল আবার। স্কোরবোর্ডে তখন লেখা ছিল ২ উইকেটে ১ রান। পারলে তিনিই পারবেন, এই অবস্থায় ব্রডের অফস্টাম্পের বাইরের বল ড্রাইভ করতে গিয়ে দিলেন খেঁাচা। এবং বেয়ারস্টোর গ্লাভসে জমা হয়ে গেলেন তিনি। ওই সময় জো রুটদের উল্লাস দেখে মনে হল, তঁারা তখনই জিতে গেছেন। দিনের খেলার শেষে অ্যালিস্টার কুক জানিয়ে গেলেন যে, ওই সময় বেন স্টোকস তঁাকে বলেছিলেন, ‘‌মনে হচ্ছে মঙ্গলবার আর মাঠে আসতে হবে না।’‌ দ্রুত ৩ উইকেট ভারত হারিয়েছে বটে, কিন্তু পরবর্তী ১৬ ওভারে ভারত আর কোনও উইকেট হারায়নি। ৪৬ রানে ক্রিজে আছেন লোকেশ রাহুল (‌যিনি এই সিরিজে ১৫টি ক্যাচ ধরেছেন)‌ এবং অজিঙ্ক রাহানে (‌১০)‌। এই পরিসংখ্যান দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ভারতকে এখন পাহাড়–‌সমান উচ্চতা টপকাতে হবে। কঠিন, খুব কঠিন, প্রায় অসম্ভব। এজন্যই তো শুরুতে লিখেছি ৪–‌১ হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ।
মোটেই সময় ভাল যাচ্ছে না ভারতের। এই পরিস্থিতিতে সোমবার দিনের শুরুতেই ইশান্ত শর্মা প্রথম ওভারেই চোট পেয়ে মাঠের বাইরে। সময় মোটেই ভাল যাচ্ছে না। ইংল্যান্ড যখন সকাল থেকে সমানতালে ভারতীয় বোলারদের পিটিয়ে রান তুলে যাচ্ছিল, তখন উইকেটকিপারের পেছনে রাখা হেলমেটে বল লাগার কারণে ইংল্যান্ডের ঘরে জমা পড়ল বাড়তি অপ্রত্যাশিত ৫ রান। সময় খারাপ হলে যা হয়। অধিনায়ক জো রুট এবং অ্যালিস্টার কুককে যখন আউট করা যাচ্ছিল না, তখন বিরাট কোহলি নিয়ে এসেছিলেন হনুমা বিহারিকে। পরপর ২ বলে তঁার নিরীহ অফস্পিনে ইংরেজ শিবিরের দুই শীর্ষস্থানীয় ব্যাটসম্যান আউট হয়ে গেলেন। ততক্ষণে অবশ্য ৩৬১ রানে এগিয়ে গেছে ইংল্যান্ড। বলছিলাম না, সময় খারাপ যাচ্ছে। তার ওপর হনুমা বিহারি হঠাৎ মুখে চোট পেয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত ৪৬৪ রানের লক্ষ্য নিয়ে নেমে দিনের শেষে ভারত তুলতে পেরেছে ৩ উইকেটে ৫৮ রান। শুরুতেই ধাওয়ান (‌১)‌ ফিরে গেলেন এলবিডব্লু হয়ে। তঁার মনে সংশয় ছিল তিনি বোধহয় আউট হননি। ভাল কথা, তাহলে ডিআরএস চাইতে হবে। নন–‌স্ট্রাইকার রাহুলের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ১৫ সেকেন্ড অতিক্রম হওয়ার পর ডিআরএস চাইলেন। সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ায় আম্পায়ার ‘‌না’‌ বলে দিলেন। আম্পায়ার অনুমতি দিলেও লাভ হত না। কারণ অ্যান্ডারসনের বলে পরিষ্কার আউট ছিলেন। পুজারাকেও (‌০)‌ এলবিডব্লু করলেন অ্যান্ডারসন। তিনিও ডিআরএস চাইতে দেরি করলেন, পরিষ্কার আউট থাকা সত্ত্বেও। ব্যাটিং করতে জানে না, বোলিং–‌ফিল্ডিংয়ে গলদ। এই সফরে দেখছি, ডিআরএস–‌এর আবেদন করতেও জানে না ভারত। সময়টা সত্যিই খারাপ যাচ্ছে।
মোটেই শুভ লক্ষণ নয়। ইশান্ত শর্মা না থাকায়, ভারতীয় বোলিংকে খুবই সাধারণ স্তরে নামিয়ে এনেছিলেন কুক, রুটরা। ফলত, কোনওরকম অলৌকিক ঘটনা না ঘটলে ৪–‌১ হওয়ার দিকেই এগোচ্ছেই ওভাল টেস্ট। চলতি সিরিজে এত খারাপ বোলিং এই প্রথম হল। ইংরেজ ব্যাটসম্যানরা যত এগিয়েছেন, তত বেদম হয়ে পড়েছেন ভারতীয় বোলাররা। এমন হওয়ারই কথা। যখন উদ্দীপ্ত হওয়ার মতো কিছু ঘটে না, তখন সেরাটা দেওয়া কঠিন। খুব কঠিন। জিওফ্রে বয়কট মজা করে বললেন, ‘‌বেনিফিট ম্যাচেও এত খারাপ বোলিং হয় না।’‌ আলগা বোলিং। কুক এবং রুট দুজনেই সেঞ্চুরি পেয়ে গেলেন। ভারত ক্রমশ যেন সেঁধিয়ে গেল।
এটা অ্যালিস্টার কুকেরই টেস্ট। জীবনের শেষ টেস্টে সেঞ্চুরি করলেন। নাগপুরে, ১২ বছর আগে অভিষেকে সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন। জীবনের প্রথম ও শেষ টেস্টে সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন এর আগে ৪ জন— অস্ট্রেলিয়ার রেগি ডাফ, বিল পন্সফোর্ড, গ্রেগ চ্যাপেল এবং মহম্মদ আজহারউদ্দিন। কুক এই তালিকায় পঞ্চম স্থানে থাকলেন।
টেস্টে মোট রান করে গেলেন ৩৩টি সেঞ্চুরি–‌সহ ১২,৪৭২ রান। টপকে গেলেন সাঙ্গাকারাকে (‌১২,৪০০)‌। সবচেয়ে বেশি রান করার তালিকাতেও থাকলেন ৫ নম্বরে। আগের ৪ জন হলেন— শচীন তেন্ডুলকার, রিকি পন্টিং, জাক কালিস এবং রাহুল দ্রাবিড়। যখন ব্যাট করতে এসেছিলেন, তখনও গোটা মাঠ দঁাড়িয়ে উঠে হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। ১৪৭ রান করে আউট হওয়ার পর গোটা মাঠ জুড়ে আবেগের যে বিস্ফোরণ দেখলাম, তা মনে থাকবে। আর কখনও টেস্টে খেলবেন না, ফিরছেন ড্রেসিংরুমের দিকে। দলকে বিপন্মুক্ত করে দিয়ে গেলেন। ম্যাচ জেতার সম্ভাবনা তৈরি হল তঁার ইনিংসে। আবেগতাড়িত হয়ে জনতা আবার দঁাড়িয়ে উঠে বিদায় সংবর্ধনা জানালেন। এই ম্যাচ যদি জো রুটরা জিততে পারেন, তাহলে অ্যালিস্টার কুককে দিতে পারবে দল আরও গভীরতর আবেগের সংবর্ধনা। ম্যাচের যা গতিবিধি, সেদিকেই এগোচ্ছে ওভাল। (‌ম্যান অফ দ্য ম্যাচের পুরস্কারও পেতে পারেন কুক)‌।
কুক আউট হওয়ার পর থেকেই সবাই জানতে চাইছিলেন, ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা কখন করা হবে?‌ অধিনায়ক রুট এদিন চালিয়ে খেলে ১৪ নম্বর টেস্ট শতরান করার সঙ্গে সঙ্গে দলকে দিয়ে গেলেন ১২৫ রানের একটি মূল্যবান ইনিংস।‌ কুক এবং রুটের দুটি সেঞ্চুরির দৌলতে ইংল্যান্ড কিন্তু ম্যাচ জেতার পাসওয়ার্ড পেয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত চা–‌পানের প্রায় ১ ঘণ্টা পর ৮ উইকেটে ৪২৩ রান তুলে ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করে দিলেন রুট। ভারতের সামনে কঠিন সংগ্রাম। কঠিন তো বটেই, এখন কার্যত অসম্ভব। ইশান্তের অনুপস্থিতিতে টিম ম্যানেজমেন্টের অপছন্দের জাদেজাকে বল করতে হল ৪৭ ওভার। ১৭৯ রান দিয়ে পেলেন ৩ উইকেট। ‌বিহারি পেলেন ৩ উইকেট, ৩৭ রানে। বিদেশে সেরা পর্যটক দল স্বীকৃতি পাওয়া যাদের লক্ষ্য, তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের শেষ সুযোগ পাচ্ছেন মঙ্গলবার।‌‌

স্কোর
ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংস‌ ৩৩২। 
ভারত প্রথম ইনিংস ২৯২। 
ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংস (‌গত দিনের ২ উইকেটে ১১৪ রানের পর)‌:‌ কুক ক পন্থ ব বিহারী ১৪৭, রুট ক পরিবর্ত ব বিহারী ১২৫, বেয়ারস্টো ব সামি ১৮, স্টোকস ক রাহুল ব জাদেজা ৩৭, বাটলার ক সামি ব জাদেজা ০, কারেন ক পন্থ ব বিহারী ২১, রশিদ অপরাজিত ২০, অতিরিক্ত ২৫, মোট (‌৮ উইকেটে, ডিঃ)‌ ৪২৩। উইকেট পতন:‌ ৩/‌৩২১, ৪/‌৩২১, ৫/‌৩৫৫, ৬/‌৩৫৬, ৭/‌৩৯৭, ৮/‌৪২৩। বোলিং:‌ বুমরা ২৩–‌৪–‌৬১–‌০, ইশান্ত ৮–‌৩–‌১৩–‌০, সামি ২৫–‌৩–‌১১০–‌২, জাদেজা ৪৭–‌৩–‌১৭৯–‌৩, বিহারী ৯‌.‌৩–‌১–‌৩৭–‌৩।‌ 
ভারত দ্বিতীয় ইনিংস:‌ রাহুল অপরাজিত ৪৬, ধাওয়ান এলবিডব্লু ব অ্যান্ডারসন ১, পুজারা এলবিডব্লু ব অ্যান্ডারসন ০, কোহলি ক বেয়ারস্টো ব ব্রড ০, রাহানে অপরাজিত ১০, অতিরিক্ত ১, মোট (‌৩ উইকেটে)‌ ৫৮। উইকেট পতন:‌ ‌১/‌১, ২/‌১, ৩/‌২। বোলিং:‌ অ্যান্ডারসন ৫–‌২–‌২৩–‌২, ব্রড ৫–‌০–‌১৭–‌১, মইন আলি ৪–১–৮–০, কারেন ২–১–১–০, স্টোকস ২–১–৮–০। ‌‌

শতরানের পর কুক 

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top