আজকালের প্রতিবেদন: ভারতকে ১৮ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউজিল্যান্ড। 
কোটি কোটি ভারতীয়র মাথায় হাত। 
বুধবারের সবথেকে বড় ব্রেকিং নিউজ প্রথমটা। কিন্তু দ্বিতীয় লাইনটা ছেঁটে ফেলে দিতে হচ্ছেই। কারণ মহেন্দ্র সিং ধোনি এবং রবীন্দ্র জাদেজা। এই দুজন না থাকলে ভারতের হারটা ১৮ রানের বদলে ১১৮ রানেও হতে পারত। এই দুজন না থাকলে ম্যাচ কিছুতেই শেষ ওভার পর্যন্ত গড়াত না। এই দুজন না থাকলে সত্যিই মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে হত, ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ে একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয় না?‌
কিন্তু কোনোটাই হয়নি। কিছুই ভাবতে হবে না। আশাভঙ্গ হলেও এমএসডি আর স্যর জাদেজা ভারতীয় ক্রিকেটকে যথাস্থানেই সযত্নে রেখে এলেন।
ভারতের ইনিংস শুরু হওয়ার মিনিট ২০–‌র মধ্যে স্কোরবোর্ডে ১, ১, ১। দুই মহারথী রোহিত শর্মা, বেরাট কোহলি এবং লোকেশ রাহুলের রান। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ওভারে তিনজন পরপর আউট হয়ে যাওয়ার পর ভারত যখন ৩ উইকেটে ৫ রান, তখন অনেকেই হয়ত ম্যাঞ্চেস্টারের আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির খোঁজ করেছেন। এরপর দীনেশ কার্তিক (‌৬)‌ ফিরে যাওয়ায় তাঁরা হয়ত জল নিয়ে বাউন্ডারি লাইন পর্যন্তও চলে এসেছিলেন। ভাবছিলেন, ‘‌দিই এক বালতি জল ঢেলে এই মরা উইকেটে’‌। মরা, না প্রাণশক্তিতে ভরপুর ম্যাঞ্চেস্টারের এই উইকেট, সে আলোচনায় পরে আসা যাবে। কিন্তু ১০ ওভারে ২৪/‌৪ হয়ে যাওয়ার পর ভাবনা–‌চিন্তা শুরু হয়েছিল ভারতের ইনিংস ২০ ওভার পর্যন্ত টিকবে, না ২৫ ওভার, নাকি মেরেকেটে ৩০ ওভার?‌ ১৫০ রানও উঠবে?‌
হার্দিক পান্ডিয়া (‌৩২)‌ আর ঋষভ পন্থ (‌৩২)‌ পঞ্চম উইকেটে ৪৭ রান যোগ করার পর ভাবনার একটু উন্নতি হয়। যাঁরা ২০–‌২৫ ওভার বা ১৫০ পানের হিসেব করছিলেন, তাঁদের মনে হয়, যে দল একটা মাত্র ম্যাচ হেরে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছে, তারা লড়াই করবে না?‌ যে দলে কোহলি, রোহিতের মতো ব্যাটসম্যান রয়েছেন, তাঁরা তাড়াতাড়ি ফিরে গেলেও তাঁদের ফলোয়াররা ২০০ রানেও পৌঁছবেন না?‌ কিন্তু ঋষভ সবে যখন জমে উঠতে শুরু করেছেন, তখন স্যান্টনারের দেওয়া লোভে পা দিয়ে ফিরে যান। তখন উইকেটে আবির্ভাব ধোনির। হার্দিককে নিয়ে এগোচ্ছিলেন। রান যে খুব উঠছিল, তা নয়। কিন্তু দুজনকে দেখে মনে হয়েছিল সহজে হাল ছাড়বেন না। ৩১তম ওভারে হার্দিকও স্যান্টনারের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফিরলেন। তিনি যখন ফিরে যাচ্ছেন, তখন ধোনিকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ক্যামেরায় দেখা গিয়েছিল। ওই কয়েক সেকেন্ডের ছবিটাই বলে দিয়েছিল পরের দেড় ঘণ্টায় কী হতে চলেছে। ওই কয়েক সেকেন্ডের ছবিটাই বুঝিয়ে দিয়েছিল ধোনির স্বগতোক্তি, ‘‌ইস, তুই চলে গেলি। একটু থাকতে পারলি না?‌ আরে আমি তো রয়েছি আজ। আমি যে আজ অন্য টেম্পারামেন্ট, ডিটারমিনেশন নিয়ে নেমেছি।’‌ এরপর ধোনির ব্যাট থেকে এল ‌৭২ বলে ৫০। ঘণ্টা দুয়েকের ইনিংসের স্ট্রাইক রেট হয়ত ৬৯.‌৪৪, হয়ত তাঁর কাছ থেকে দেখা গেছে মাত্র ১টি করে চার ও ছক্কা, কিন্তু তবু তাবড় বিশেষজ্ঞদেরও বলতে শোনা গেছে, এটাই ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। ওই সময় ধারাভাষ্য দেওয়া সৌরভ গাঙ্গুলিও বারবার বলছিলেন, ‘‌শেষ দু ওভারে যদি ১৬–‌১৭ রানও দরকার হয়, ভারত পারবে। কারণ এই পরিস্থিতিতে ধোনির থেকে বিপজ্জনক আর কাউকে আমি দেখিনি।’‌
ধোনিকে আরও বিপজ্জনক যিনি করে তুললেন তিনি রবীন্দ্র জাদেজা। ৫৯ বলে ৭৭ রান করলেন। ৪টি করে চার আর ছক্কা। পান্ডিয়া ফিরে যাওয়ার পর যে ধোনিকে আপশোস করতে দেখা গিয়েছিল, জাড্ডুর ছোঁয়ায় ধোনির সেই টেম্পারামেন্ট, ডিটারমিনেশন কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল। মনেই হয়েছিল, কাউকে একটা পেলে শ’‌ খানেক রানের জুটি খাড়া করে দিতে পারবেন ধোনি। আর তখনই ম্যাচ চলে আসবে হাতে। হলও তাই। সপ্তম উইকেটে তাঁর ও জাদেজার জুটিতে ১৭ ওভারে উঠল ১১৬ রান। ম্যাচটা হাতে এল না গাপটিলের এক থ্রোয়ে ধোনিকে রান আউট করায়। ধোনির ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে। কেন তিনি এত পরে?‌ হয়ত বিরাট কোহলির মনেও এই প্রশ্ন আছে। তাঁকে কিন্তু ভারতীয় ইনিংসের মাঝপথে কোচ রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে বেশ উত্তেজক ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখা গেল।
একটা কথা স্বীকার করে নেওয়া ভাল, এই ম্যাচের আগে পর্যন্ত ম্যাঞ্চেস্টারের অব্যবহৃত উইকেটটা সেভাবে বোঝা যায়নি। না হলে মঙ্গলবার নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং দেখতে দেখতে যেখানে মনে হচ্ছিল, এটা একটা বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল ম্যাচ হচ্ছে, সেখানে বুধবার মনে হচ্ছে, আহা, সেমিফাইনালের লড়াই তো এরকমই হওয়া উচিত।
বলতে হবে ক্রেগ ম্যাকমিলানের কথা। নিউজিল্যান্ডের এই প্রাক্তন ক্রিকেটার এখন সে দেশের ব্যাটিং কোচ। ধোনি আর জাদেজা যখন ম্যাচ প্রায় বার করে নিচ্ছিলেন, তাঁদের দাপটে যখন উইলিয়ামসন খেই হারিয়ে ফেলছিলেন, তখন তিনি হঠাৎ সাজঘর থেকে বেরিয়ে চলে যান বাউন্ডারি লাইনের ধারে বসে থাকা দ্বাদশ ব্যক্তি কলিন মুনরোর কাছে। মুনরো মারফৎ ম্যাকমিলানের কিছু একটা টোটকা এসে পৌঁছয় উইলিয়ামসনের কাছে। তারপরেই হঠাৎ ভারতের রান তোলার গতি কমতে শুরু করে।
আর বলতে হবে সঞ্জয় মঞ্জরেকারের কথা। তিনি প্রমাণ করে দিলেন হেরে গেলেও কোহলি, রোহিত, বুমরারা সত্যিই মন জয় করে নিয়েছেন ক্রিকেট বিশ্বের। ম্যাচের শেষে যে তাঁর প্রথম টুইট, ‘‌ওয়েল প্লেড জাদেজা!‌’‌ থুড়ি, টুইট নয়, মঞ্জরেকারের সংশোধনী।  ম্যাচের স্কোরকার্ড ১৬ পাতায়

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top