দেবাশিস দত্ত, লন্ডন: ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের পতাকা ওড়ানোর জন্য যে ক্রিকেটাররা ঘাম–‌রক্ত ঝরিয়েছিলেন, সেই স্বর্ণযুগের ক্রিকেটার হয়েও মাইকেল হোল্ডিং এখনকার ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট সম্পর্কে কোনও আলোচনা করতে চান না, ‘‌আমি জানি না, ওখানে কী হচ্ছে বা কী হবে। আমার কোনও আগ্রহ নেই। যে ব্যাপারে আগ্রহই নেই, সে ব্যাপার নিয়ে কথা বলব কেন?‌ আমায় জামাইকায় যেতে হয় আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে। তবে, থাকি মায়ামিতে। কখনও দক্ষিণ আফ্রিকা, কখনও অস্ট্রেলিয়া, কখনও–‌বা ইংল্যান্ডে থাকতে হয় ধারাভাষ্যের কারণে। তাই দেশের ক্রিকেট সম্পর্কে কোনও খবর রাখার সুযোগ পাই না। রাখতেও চাই না।’‌ বোঝা গেল, এখনকার প্রশাসকদের খামখেয়ালিপনা নিয়ে তিনি বিরক্ত। এবং জানেন একা তঁার পক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের হাল ধরা সম্ভব নয়। তার চেয়ে বরং দূরে থাকাই ভাল, এই নীতিকে সামনে রেখে এগিয়ে চলেছেন। এতটাই বীতশ্রদ্ধ যে, যখন জানতে চাইলাম, এই মুহূর্তে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে সবচেয়ে জোরে বল করেন কে?‌ মাথা নেড়ে বললেন, ‘‌বলত পারব না। আমি খেঁাজই রাখি না। তাই আমাকে আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট সম্পর্কে প্রশ্ন করে বিব্রত করবেন না।’ এর পর অন্য প্রসঙ্গে ঢুকতেই হল।
চলতি সিরিজের শুরু থেকে তিনি বলে আসছিলেন, বোলার হার্দিক পান্ডিয়া তেমন আহামরি কিছু নয়। এবং চাইলে তঁার পরিবর্তে একজন ব্যাটসম্যানকে খেলানো উচিত, যাতে ব্যাটিং গভীরতা বেড়ে যায়। অবশেষে হার্দিককে ওভাল টেস্টে বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট, ‘‌আমি খুশি বা অখুশি, এটা কোনও বড় ব্যাপার নয়। হার্দিকের যে যোগ্যতা কম, হয়ত আছে প্রতিভা, কিন্তু আমি তা দেখতে পাইনি। হয়ত সে প্রতিভা প্রস্ফুটিত হয়নি এখনও। কিন্তু প্রথম চার টেস্টে ওকে খেলিয়ে ভুল করেছে ইন্ডিয়া। হার্দিককে বসাতে বড্ড দেরি করে ফেলল বিরাটরা। আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম, যখন শ্রীলঙ্কা বা ভারতে ওর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দেখে দ্য গ্রেট কপিলদেবের সঙ্গে তুলনা শুরু হয়েছিল। রিডিকিউলাস।’‌
এর পর তঁার কাছে জানতে চাইলাম, চলতি সফরে ভারতের যে জোরে বোলাররা ভাল বোলিং করছেন, তঁাদের সম্পর্কে তঁার অভিমত। একে একে তিনি তঁার মতামত জানালেন।
যশপ্রীত বুমরা:‌ ঘোড়া যেমন গ্যালপ করে, বুমরার দৌড়ের ভঙ্গিতে রয়েছে তেমন একটা মিল। প্রচণ্ড বুদ্ধিমান বোলার। একটু অকোয়ার্ড অ্যাকশন। একেবারে তৈরি বোলার। ওকে বুঝতে হবে, সব ঘরানার ক্রিকেটে খেলা উচিত হবে কি না। ওয়ার্কলোডটা ভাগ করে নিতে হবে। সব ঘরানার ক্রিকেটে খেললে কিন্তু নিঃশেষিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
মহম্মদ সামি:‌ টেরিফিক বোলার। চমৎকার রানআপ, অ্যাকশনও খুব ভাল। এখানে ঠিক কেমন বল করতে হবে, সেটা ও দ্রুত বুঝে নিয়েছে। এবং বলের সেলাই ডেলিভারির পরও থাকছে সোজা। এটা একটা ভাল বোলারের লক্ষণ। অনেক ইমপ্রুভ করেছে সামি।
ইশান্ত শর্মা:‌ এত ভাল বল করতে ইশান্তকে আগে কখনও দেখেছেন?‌ আই ডাউট। এটা ঘটনা, অনেকগুলি টেস্ট ও খেলেছে। এবং এতকাল যা করতে পারেনি, তা ও এখন করে দেখাচ্ছে। বঁাহাতি ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে ও চমৎকার বল রাখছে। রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে বল করতে এলেই সব বঁাহাতি ব্যাটসম্যান অস্বস্তিতে পড়ে যাচ্ছে। এই সফরে তো অ্যালিস্টার কুককে ইশান্ত একাই পাগল করে দিল।
নিজেই তুললেন বিরাট কোহলির প্রসঙ্গ, ‘‌প্রথম যখন ওকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, আমি একা প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, এ ছেলেটা কিন্তু অনেক দূর যাবে। আমি বলেছি বলেই ও আজ বিরাট কোহলি হয়ে উঠেছে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। আই সিম্পলি লাইক দ্য বয়। সব সময় প্রাণোচ্ছল। একটা কিছু করতে চায়। এখন তো ও দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান। ৪ বছর আগে বিরাট ইংল্যান্ড সফরে এসে তেমন কিছুই করতে পারেনি। বলা ভাল, ব্যর্থ হয়েছিল। অথচ এই সফরে ইতিমধ্যেই ৫৪০ রান করে ফেলেছে। সুইং, সিম, স্পিন— সব ধরনের বোলিংয়ের বিপক্ষে আজ ও ওস্তাদ। এখানে রান করার জন্য ও যে কত ভেবেছে, কত পরিশ্রম করেছে, তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ওর এবারের ব্যাটে। ওর আক্রমণাত্মক মানসিকতা নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলে বটে, আমি কান দিই না। আপনারাও দেবেন না। অত্যন্ত বড় জাতের ক্রিকেটার। একা ইন্ডিয়া টিমকে টানছে।’‌
এবার ঢুকলাম দুনিয়া জুড়ে চলা নানা ক্রিকেটীয় প্রসঙ্গে। যেমন স্মিথ, ‌ওয়ার্নারদের শাস্তির মেয়াদ নিয়ে তঁার কিছু বলার আছে কি না। উত্তর দিলেন হোল্ডিং, ‘‌শাস্তি না দিলে ডিসিপ্লিন ধরে রাখা যাবে না। এটা সমাজের নিয়ম। তাই এই ৩ জনকে শাস্তি দেওয়ার কারণে একটা বার্তা তো সব দলের কাছে পৌঁছে গেছে যে, বলের চামড়া প্রকাশ্যে তোলা যাবে না। আমাদের আমলে মার্শাল, গার্নারদের বলের চামড়া তোলার প্রয়োজনই হত না। গতি, বাউন্সার.‌.‌.‌ ফিনিশ অপন্যান্ট। আর এখন তো বলের চামড়া না তুললে রিভার্স সুইং হবে না। তাই সব দলকেই লুকিয়ে–‌চুরিয়ে বলের চামড়া তুলতে হয়। আর স্মিথ, ‌ওয়ার্নাররা ধরা পড়ে গেল!‌ না পড়লে এই অপকর্ম চালিয়ে যেত ওরা।’‌
হেলমেটের আবিষ্কারের পর ব্যাটসম্যানদের সুবিধা–‌অসুবিধা সম্পর্কে জানতে চাইলাম, ‘‌বলের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে নিলে মুখে বা হেলমেটে লাগবেই। যদি কেউ শেষ মুহূ্র্ত পর্যন্ত বলের গতিবিধি অনুমান করে তাকিয়ে থাকতে পারে, তাহলে মুখে লাগার আগে সে বলের লাইন থেকে সরে যাবে। হেলমেটে লাগলে আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় ঠিকই, তাতে জীবন হয়ত বঁাচে, কিন্তু আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যাটসম্যানরা চাইবে না হেলমেটে বল লাগুক। এখন তো জোরে বলের সামনে অধিকাংশ ব্যাটসম্যান চোখ সরিয়ে ফেলছে। তাই বল লাগছে হেলমেটে। হেলমেটে না লাগিয়ে ব্যাটিং করার মধ্যে যে বীরত্ব ভিভিয়ান রিচার্ডস দেখিয়ে গেছে, তা এ প্রজন্ম কল্পনাও করতে পারবে না।’‌
ডিউক, কুকাবুরা এবং এসজি— এই তিন ধরনের বলে খেলা হচ্ছে এখন দুনিয়ায়। তিন ধরনের পরিবর্তে এক কোম্পানির বলে খেলা হওয়া উচিত কি?‌ ‘‌আমি এটা নিয়ে বিশেষ চিন্তিত নই। যে কোনও সফর শুরু হওয়ার আগে সেই সিরিজে যে ধরনের বল ব্যবহার হয়, তা আগের থেকে সংগ্রহ করে অনুশীলন করলেই ধাতস্থ হয়ে ওঠা যায়। তিন ধরনের বলে বোলিং করাটাও একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। এই বৈচিত্র‌্যটা থাকুক না। ভারত এখানে খেলতে আসার আগে পাকিস্তান এসেছিল। এবং শুনেছি, এখানে আসার আগে অ্যাবটাবাদে পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা ডিউক বলে অনুশীলন করে এসেছিল। হুইচ ইজ গুড।’‌
ইশান্ত শর্মা, চেতেশ্বর পুজারারা বলছেন যে, কাউন্টি ক্রিকেটে খেলার সুবাদেই তঁারা এই সফরে ভাল খেলতে পারছেন। মেনে নিলেন মাইকেল হোল্ডিংও, ‘‌আমাদের আমলে আমরা সবাই কিন্তু নিজেদের যোগ্যতায় নতুন নতুন অস্ত্র আনতে পেরেছিলাম কাউন্টি ক্রিকেটে খেলে। বিনিময়ে ওরা নিংড়ে নিত। এখন তো ১ মাস, ১৫ দিন বা ২ ‌মাসের চুক্তিতে কাউন্টি ক্রিকেটে খেলা যায়। আমি খুব বেশি খেলিনি। তবে আমাদের অ্যান্ডি রবার্টসকে ওরা খুব খাটিয়েছিল।’‌
মাইকেল হোল্ডিংয়ের সঙ্গে কথা বলা মানেই, স্পষ্টবাদী হয়ে ওঠার ব্যাপারে নিজেকে অনুপ্রাণিত করার সুযোগ পাওয়া। ইদানীং টি–‌২০ বা একদিনের ক্রিকেটে তঁার আগ্রহ একেবারেই নেই। এমনকি এই ধরনের ক্রিকেট দেখার জন্য মাঠে আসতে চান না। তাই ধারাভাষ্য বক্সেও তঁাকে দেখা যায় না। নিজেই মনে করেন, টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এবং এ জন্য দায়ী করেন তিনি প্রশাসকদের, ‘‌আমি একা তো প্রতিবাদ করে লাভ হবে না!‌ তাই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। চাইব, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত যেন টেস্ট ক্রিকেট বেঁচে থাকে। এমন চমৎকার ঘরানার ক্রিকেটকে মেরে ফেলার উদ্যোগ নিচ্ছেন অনেকেই। ওঁদের কাছে অনুরোধ, চেষ্টা করুন, পঁাচ দিনের ক্রিকেটকে যেন বঁাচিয়ে রাখা হয়।’‌‌‌‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top