দেবাশিস দত্ত: ডান পা সুইমিং পুলের জলে। বঁা পা বঁাদিকে হেলানো। লম্বা শরীর চেয়ারে এলিয়ে দিয়েছেন। সূর্যালোক থেকে বঁাচানোর জন্য ইংরেজি দৈনিকে মুখ ঢাকা। ১৯৮১ সালে বর্ষশেষের দু’‌দিন আগে সাতসকালে গ্র‌্যান্ড হোটেলে ঢুকে সেভাবেই দেখা গিয়েছিল তঁাকে। রিসেপশন থেকে কাচের দরজা ঠেলে সুইমিং পুলের অন্যপ্রান্তে দঁাড়িয়ে সোনালি লম্বা চুল দেখে মনে হয়েছিল, উনিই বব উইলিস। 
একটু জোরে ‘‌হ্যালো’‌ বলতেই চোখ থেকে খবরের কাগজটা সরিয়ে অবাক হলেন। অপরিচিত কাউকে ওইভাবে সুইমিং পুল এলাকায় ডাকা যায়?‌ ‘‌সরি’‌ বলে টুক টুক করে প্রশ্ন করতে শুরু করেছিলাম। ইশারায় অদূরে থাকা ওয়েটারকে একটা চেয়ার দিতে বললেন। কলকাতা, দিল্লি টেস্টে গ্যারি সোবার্সের রানকে বয়কটের টপকে যাওয়া, অ্যাশেজ সিরিজে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো, কলকাতা টেস্ট ম্যাচ নিয়ে ভাবনা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্নোত্তরের ফঁাকে মজা করে বলেছিলেন, ‘আপনাকে মর্নিং ম্যান বলে ডাকব। এর আগে এত সকালে আমাকে কেউ ইন্টারভিউয়ের সামনে দঁাড় করায়নি।’‌
শেষ দেখা গত বিশ্বকাপে ভারত–নিউজিল্যান্ড সেমিফাইনালের শেষে। লিফটে নামছিলেন। ফার্স্ট ফ্লোরে লিফট থামতেই  চিৎকার, ‘‌মর্নিং ম্যান!’‌ কে জানত, ওটাই তঁার সঙ্গে শেষ দেখা। মাঝে অজস্রবার বিভিন্ন ক্রিকেট–‌খেলিয়ে দেশে দেখা হয়েছিল। কখনও প্রেস বক্সে, কখনও মাঠের ধারে। খেলা ছাড়ার পর থেকেই সোনালি চুল ঝরতে শুরু করেছিল। ক্রিকেটীয় উচ্চতায় হয়তো অ্যান্ডারসন, স্টুয়ার্ট ব্রড, ইয়ান বথামের মতো ইংরেজ বোলাররা টপকে গিয়েছিলেন তঁার ৩২৫ টেস্ট উইকেটের মাইলফলককে। কিন্তু একজনও বলেননি, উইলিসের বোলিংয়ে তেমন ঝঁাঝ ছিল না। এমনকী, তঁার ৭ বলে (‌একটি নো বল ছিল) ৬টি বাউন্ডারি মারা সন্দীপ পাটিলও বললেন না, ‘ম্যাঞ্চেস্টারে দিনটা আমার ছিল। ববের নয়। যদি ভাবি, আমার মতো কেউ ওকে পেটাতে পারেনি, তাহলে আমার চেয়ে বড় মূর্খ আর কেউ নেই। দুর্দান্ত বোলার!‌ ওর ৯০ টেস্টের ক্রিকেট কেরিয়ারে আমার মারা ৬টা বাউন্ডারি হয়তো একমাত্র ব্ল্যাক স্পট।’‌ আরও বললেন, ‘প্রথমটা ছিল কভার ড্রাইভ, পরেরটা টেনিস শট, তৃতীয় বল স্কোয়্যার ড্রাইভ, শেষ বলটা পুল।’‌
বছর চারেক আগে জো রুটকে সাইট স্ক্রিন থেকে তঁার দৌড় নকল করে ডেলিভারি করতে দেখে উইলিস বলেছিলেন, ‘‌বেঁচে গেছো, আমার সময় ব্যাটিং করতে হয়নি। চোয়াল ভেঙে যেত।’‌ জীবনের শেষ টেস্টে অ্যালিস্টার কুকও উইলিসের বোলিং অ্যাকশন নকল করতে গিয়ে একটা উইকেট পেয়ে যান। ধারাভাষ্যে থাকা উইলিস বলেছিলেন, ‘‌অস্ট্রেলিয়ার রিক ম্যাককসকারের সামনে গিয়ে আমার অ্যাকশন নকল করো। ও বারণ করবে। কারণ, আমার বাউন্সারে ওর থুতনি ফেটে গিয়েছিল।’‌ জোরে বোলাররা নাকি গুরুগম্ভীর ভাব বয়ে বেড়ান। বব উইলিস ছিলেন সম্পূর্ণ উল্টো। খেলতে খেলতে মজা করাটাও যে জীবনের অঙ্গ, সেটা ডেভিড গাওয়ার, গ্রাহাম গুচরা বারবার বলেছেন। তঁার মৃত্যুর পরও গাওয়ার বলেছেন, ‌সবচেয়ে মিস করবেন উইলিসের মজাগুলো।‌ বাকিরা মিস করবেন তঁার ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসা লম্বা সোনালি চুলের ওঠানামা এবং সাইট স্ক্রিন থেকে বেঁকে এসে অনবদ্য ডেলিভারিগুলো।‌‌ 

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top