দেবাশিস দত্ত: আমরা তো এতদিন জানতাম, শচীন তেন্ডুলকার হলেন তঁার প্রিয় ব্যাটসম্যান। কিন্তু দেওয়ালির দিন তঁার নতুন অ্যাপ উদ্বোধন ‌পর্বে জানতে পারা গেল যে, বিরাট যখন অনূর্ধ্ব–‌১৯ বিভাগে খেলতেন, তখন তঁার প্রিয় ক্রিকেটার ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার হার্শেল গিবস। এই সূত্র ধরেই জনৈক নবেন্দ্র সিং ভারত অধিনায়ককে পাল্টা আক্রমণ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘‌তাহলে তো বিরাটের উচিত দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে বসবাস করা।’‌ এটা আসলে ঢিলের বদলে পাটকেল মারার ব্যাপার। বিরাটকে কোনও ভক্ত পছন্দ করেন না এবং সেই ব্যক্তির ভাল লাগে ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের। যা শুনে বিরাট বলেছিলেন, ‘‌আপনি তাহলে বিদেশে গিয়ে বসবাস করুন। ভারতবর্ষের কোনও ক্রিকেটারের খেলা যদি পছন্দ না করেন, তাহলে ভারত ছেড়ে বিদেশে চলে যান।’‌ আগুনে ঘি ঢালার মতো মন্তব্য।
ভারত অধিনায়ক হিসেবে কি কখনও কোনও ভক্তকে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া যায়?‌ গ্যালারি থেকে কত কথাই তো উড়ে আসে!‌ বিরাটের আসলে এই ডেলিভারিটা খেলা উচিত হয়নি। অফস্টাম্পের বাইরের বল যেভাবে ছেড়ে দেন, সেভাবেই ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল। এখন তঁাকে হজম করতে হচ্ছে নানা কটুকথা। যেমন এক)‌ তাহলে বিরাট কেন অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া সেঞ্চুরিটাকে সেরা সেঞ্চুরি হিসেবে চিহ্নিত করেন?‌ ওটা তো বিদেশের মাটিতে পাওয়া। কেন তিনি ইংল্যান্ডে সাফল্য পাওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিলেন?‌ ওটা তো আক্ষরিক অর্থেই বিলেত। দুই)‌ কেন তিনি বিদেশে জেতার ব্যাপারে এত জোর দিচ্ছেন?‌ তিন)‌ কেন তিনি শুধুই ভারতে খেলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না?‌ চার)‌ যতদূর মনে হচ্ছে, এবারের আইপিএল আয়োজন করতে হবে বিদেশে। তাহলে বিরাট যেন এবার আইপিএলে অংশগ্রহণ না করেন। পঁাচ)‌ কেন তিনি ইতালির তাসকানিতে বিয়ে করতে ছুটেছিলেন?‌ বিবাহের অনুষ্ঠানটা ভারতেই করতে পারতেন, এরকম অবাঞ্ছিত নানা প্রশ্ন তুলে বিরাটকে আক্রমণ করা শুরু হয়েছে। নেহাতই অপ্রয়োজনীয় এই পরিস্থিতি।
একই সঙ্গে উঠে আসছে ক্রিকেট জীবনে ঘটে যাওয়া তঁাকে ঘিরে নানা বিতর্ক। সামনে অস্ট্রেলিয়া সফর। চলছে পুজোপার্বণের মরশুম। এই সময় অ্যাপ–‌এর উদ্বোধন করে বেচারা বিপদে পড়ে গেছেন। ২০১৩ সালে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের অম্বাতি রায়ডুর সঙ্গে তঁার বিবাদ, ওই একই বছরে গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে রান আউটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তঁার সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়— এ সব ঘটনা তুলে এনে অনেকেই বলছেন ভারত অধিনায়ক কি আরেকটু মাথা ঠান্ডা রাখতে পারেন না?‌ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বিরাটকে আক্রমণ করতে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাক্তন কোচ রে জেনিংসের একটি লম্বা মন্তব্য তুলে ধরা হচ্ছে, যা তিনি করেছিলেন ২০১৩ সালে। বলেছিলেন, ‘‌আমার মনে হয় বিরাট নিজেও জানে যে, ওর ঘাড়ের ওপর একটা গরম মাথা রয়েছে। ওর বোঝা উচিত যে, এর থেকে নিজেকে পাল্টানো উচিত। যথেষ্ট কম বয়স। আমাদের উচিত ওকে সময় দিয়ে এই ত্রুটিগুলি শুধরে নেওয়ার। বিরাট মোটেই স্টুপিড ক্রিকেটার নয়, স্মার্ট গাই। অধিনায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু ওর বোঝা উচিত, দেশবাসী অনেক জিনিস পছন্দ করে না। তাই, একই ভুল যেন ও বারবার না করে। এটাই যদি চলতে থাকে, যদি আচরণে পরিবর্তন না আনতে পারে, তাহলে কিন্তু তা ওর চরিত্রে পাকাপাকিভাবে ঢুকে যাবে। এমনকী ভারতেও অধিনায়কের আচরণ যদি জনতা গ্রহণ না করেন, যদি একজন অধিনায়ক দেশের সব লোকের সমর্থন না পান, এই ধরনের চরিত্রের বদগুণের জন্য, তাহলে তো ওকে হেঁাচট খেতে হবে। বিরাট যদি সত্যিই ভারতের অধিনায়ক হতে চায়, ওকে কিন্তু দেশের নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। নিজেকে পাল্টাতে হবে। এ সব ব্যাপার শেখার জন্য যদি কোনও কোর্সে ভর্তি হতে হয়, তাহলে সেখানেই ওর যাওয়া উচিত।’‌ একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিরাটকে আক্রমণ করতে গিয়ে ২০১২ সালের অস্ট্রেলিয়া সফরে গ্যালারির উদ্দেশে তঁার ডান হাতের মাঝের আঙুল তুলে ধরে দেখানোটা যে বীরেন্দ্র শেহবাগ পছন্দ করেননি, সেটাও তো এখন কঙ্কালের মতো বেরিয়ে আসছে। ওই সময়ে কিন্তু কোহলিকে সাসপেন্ড করে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ম্যাচ রেফারির কাছে ক্ষমাটমা চেয়ে (‌বলেছিলেন, ‘‌প্লিজ ডোন্ট ব্যান মি’‌)‌ সে যাত্রায় ছাড় পেয়েছিলেন।
এখন প্রশ্ন হল, এভাবেই কি চলবে?‌ দেশের অধিনায়কের গুরুত্ব কতটা, সেটা তো বুঝতে হবে বিরাটকে। দলের কোচের কথাও কি বিরাট শোনেন?‌ ভবিষ্যতে এমনও শুনতে পারা যাবে যে, ওই দর্শককে বিদেশে পাকাপাকিভাবে চলে যাওয়ার জন্য শাবাশি দেওয়া হয়েছে দলের পক্ষ থেকে। এতটুকু অবাক হবেন না, যদি অদূর ভবিষ্যতে এমন খবর দলের অন্দরমহল থেকে ছিটকে আসে।
কী চমৎকার ক্রিকেট খেলছেন বিরাট। দুনিয়ার সেরা ব্যাটসম্যান হয়েও কেন নিজেকে শৃঙ্খলার চাদর দিয়ে বেঁধে রাখতে পারছেন না, সিওএ প্রধান বিনোদ রায় বিরাটকে নিয়ে ভালবাসায় হাবুডুবু খান দায়িত্বে আসার পর থেকেই। তিনি কিন্তু এ ব্যাপারে, এই বিতর্কের সময় ঠান্ডা মাথায় বিরাটকে বুঝিয়ে বলতে পারেন যে, এমন আলগা মন্তব্য করার উচিত হয়নি তঁার। শচীন তেন্ডুলকারের সব রেকর্ড তিনি ভাঙছেন, এই ছবিটা যখন আমরা দেখছি, তখন কী দরকার অন্য সব ব্যাপারে মাথা ঘামানোর?‌ হাতে গোনা যে দু–‌একজন প্রচারমাধ্যমের প্রতিনিধি ‘‌ভক্ত’‌ হিসেবে কাজ করেন, বিরাটকে এভাবে বুঝিয়ে বলার ব্যাপারটা তঁাদের কাছে আশা করাই অন্যায়। বিরাট যেদিন বড়সড় বিপদে আটকে যাবেন, সেদিন কিন্তু ওঁদের টিকিও দেখা যাবে না। মাসির সেই কান কাটার গল্প মনে আছে তো?‌
অথচ, বিরাট কিন্তু আপাদমস্তক একজন বুদ্ধিমান ক্রিকেটার। ইতিমধ্যেই বলতে শুরু করেছেন যে, বিশ্বকাপের কথা ভেবে বুমরা, ভুবনেশ্বর কুমার, উমেশ যাদবদের মতো জোরে বোলারদের বিশ্রাম দেওয়া উচিত। যাতে তঁারা ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ খেলার সময় তরতাজা থাকতে পারেন। খুব ভাল পরামর্শ। বোর্ড এমন পরামর্শ মেনে নেবে কিনা, তা পরের ব্যাপার। কিন্তু বিরাট তো বলেছেন। অধিনায়ক হিসেবে তিনি এখন থেকেই বিশ্বকাপের কথা ভাবনাচিন্তা করতে শুরু করে দিয়েছেন। এর মাঝে তঁার নিজের অ্যাপ উদ্বোধন করার দিনে যে বিতর্কটা তৈরি হল, সেটা মোটেই কাম্য ছিল না। তবে, যে ভদ্রলোক এই বিতর্ক তৈরির নায়ক বা খলনায়ক, তঁার কথা একবার শুনে নেওয়া যাক, ‘‌বিরাটের যোগ্যতা ফুলিয়ে–‌ফঁাপিয়ে দেখা হয়। আমি কিন্তু বিরাটের খেলায় এমন কিছু বিশেষ দক্ষতা দেখতে পাইনি।’‌ এটা কি মেনে নেওয়া যায়?‌ বিরাট কোহলির ব্যাটিংয়ে যদি স্পেশ্যালিটি না থাকে, তাহলে কি ওই দর্শক বলবেন দয়া করে, এই মুহূর্তে দুনিয়ায় কার ব্যাটিং দেখতে তিনি পছন্দ করেন?‌ প্লিজ, প্লিজ নামটা দয়া করে বলবেন?‌ স্মিথ?‌ ওয়ার্নার?‌ রুট?‌ উইলিয়ামস?‌ প্লিজ, একটা নাম বলুন। তা না হলে বলতে হবে, আপনি অকারণে গায়ের জোরে বিরাটকে আক্রমণ করতে চেয়েছিলেন। বিরাট যদি দয়া করে এই গূঢ় সত্যটা উপলব্ধি করতেন, তাহলে ওই ভদ্রলোককে বিদেশে পাকাপাকিভাবে চলে যাওয়ার কথা বলতেন না।
বিরাট, বন্ধু হিসেবে একটা কথাই বলব, গোটা পৃথিবী যখন রয়েছে আপনার হাতের তালুতে, তখন খামোকা কেন বারবার আলগা মন্তব্য করে আমাদের মতো অনুগামীদের অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছেন?‌‌‌‌‌‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top