দেবাশিস দত্ত, লন্ডন: ঘুমপাড়ানি ক্রিকেট!‌ কিছুটা তাই–‌ই। অ্যালিস্টার কুক জীবনের শেষ টেস্টে নিজের ক্রিকেট–‌স্বভাবের সেরাটা মেলে ধরলেন একেবারে নিজস্ব ঘরানায়। ঝুঁকি নেব না, পারলে আউট করে নাও। ক্যাচ তোলেননি তা নয়, ব্যক্তিগত ৩৭ রানের মাথায় ইশান্ত শর্মার বলে গালিতে তঁাকে ফেলে দেন অজিঙ্ক রাহানে। তবু তিনি উইকেট ছেড়ে পালিয়ে যাননি। ঠিক করেই ক্রিজে এসেছিলেন যে, কিছুতেই নিজের উইকেট ছুঁড়ে দেবেন না। যে ঘরানার ক্রিকেটে তিনি অভ্যস্ত, সেই খুটে খুটে রান করার দিকে নজর দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত বুমরার বলে বোল্ড হলেন তিনি। করলেন ৭১। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ইংল্যান্ড ৪ উইকেটে ১৪০। কুক আউট হওয়ার পর রুট আর বেয়ারস্টো ফিরে গেলেন কোনও রান না করে। ইংল্যান্ড ১ রানের মধ্যে ৩ উইকেট হারাল। বুমরা ১ ওভারে তুলে নিলেন ২ উইকেট। পরের ওভারে ইশান্ত নিলেন আরও এক।
অন্যদিকে মইন আলি অবশ্য ৩৩ রানে ব্যাট করে যাচ্ছেন‌। তিনি এখনও পর্যন্ত খেলেছেন ১২৫ বল। তিন নম্বরে ব্যাট করতে এসে তিনিও ঝুঁকি নিচ্ছিলেন না। তবে মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর তিনি ২৩ বার মহম্মদ সামির বলে বেঁচে যান। তিনি ফরোয়ার্ড খেলছিলেন আর সামির বল কিছুতেই তঁার ব্যাটের নাগাল পাচ্ছিল না। এর মাঝে বুমরার বলে দ্বিতীয় স্লিপে খেঁাচা দিয়ে বেঁচে যান। ক্যাচ ফেলে দিয়েছিলেন বিরাট কোহলি।
প্রথম ৪ ঘণ্টায় আমরা কী দেখলাম?‌
দেখলাম, ইংল্যান্ড দর্শকদের আনন্দের কথা মাথায় না রেখে ঠুকুর ঠুকুর করে নিজেদের উইকেট আগলে রাখছিলেন। স্ট্র‌্যাটেজিটা পরিষ্কার:‌ যতক্ষণ সম্ভব উইকেটে পড়ে থাকো, রানের গতি নিয়ে বেশি ভাবার দরকার নেই। এভাবেই ভারতীয় বোলারদের ক্লান্ত করে দেওয়াই ছিল তঁাদের রণকৌশল। এ ব্যাপারে তঁারা, ম্যাচ জেতার ক্ষেত্রে, কতটা সফল হবেন, তা ভবিষ্যৎই বলবে। প্রয়োজনে ড্র হবে, কিন্তু হেরে যাব না— এটাই যেন তঁাদের রণকৌশলের মূল সুর।
ইংল্যান্ডের প্রথম উইকেট তুলে নিলেন রবীন্দ্র জাদেজা। ভাল খেলছিলেন, কিন্তু জাদেজার বলে ফ্লিক করতে গিয়ে লেগ স্লিপে কে এল রাহুলের হাতে ধরা পড়লেন জেনিংস (‌২৩)‌। এরপর মইন আলির সঙ্গে জুটি বেঁধে দ্বিতীয় উইকেটে কুক যোগ করলেন ৭৩ রান। নিজে ৫০ পেরোতে নিলেন ১৩৯ বল। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে যে, তিনি কতটা রক্ষণাত্মক ছিলেন। উল্টোদিকে দঁাড়ানো মইন আলিও তঁাকে অনুসরণ করছিলেন ছায়ার মতো। কোন বোলার তঁাদের পরাস্ত করছে, কোন ডেলিভারিতে খেঁাচা দিতে দিতে বেঁচে যাচ্ছেন, এ সব ব্যাপারে নজর দিতে চাইছিল না এই ইংরেজ জুটি। লাঞ্চের পর সুইং একটু বেশি হল। কিন্তু তাতে বিশেষ সমস্যায় ফেলতে পারা যায়নি। কুক, ‌মইন ঠিক করে এসেছিলেন আলগা বল ছাড়া রানের খেঁাজে তঁারা যাবেন না।

রান হয়তো বেশি নয়, কিন্তু ইটের ওপর ইট সাজিয়ে বাড়ি তোলার মতো এই জুটিও কিন্তু খুচরো রান নিয়ে ইংল্যান্ডকে নির্ভরতা দেওয়ার দিকে নজর দিয়েছেন ঠান্ডা মাথায়। ওভাল মাঠের ২২ গজ বরাবরই ব্যাটসম্যানদের স্বর্গ। ডব্লু জি গ্রেসের আমল থেকে এ মাঠের চরিত্র এমনই। তাই এ মাঠের শর্ত হল একটাই— টস জেতো, ব্যাট করো এবং স্কোর বোর্ডে বড় রান ঝুলিয়ে দাও। ইংল্যান্ড সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছিল। পরপর ৩টি উইকেট পড়ে যাওয়ায় কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে।
অভিষেক হল হনুমা বিহারীর। সুনীল গাভাসকার মনে করেন, ‘‌এটা ঠিক হল না। কারণ, সফরের শুরু থেকেই করুণ নায়ার ছিল দলের সঙ্গে। তাহলে টেস্ট ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরি পাওয়া এই ক্রিকেটারকে সুযোগ দেওয়া হল না কেন?‌ তার চেয়েও যেটা বড় কথা, তা হল, হনুমা কিন্তু প্রথম ১৮ জনের তালিকায় ছিল না। পরে তঁাকে উড়িয়ে আনা হয়েছে।’‌ এ ব্যাপারে দলের যুক্তি হতে পারে এটা যে, হনুমা কিন্তু অল্প হলেও অফস্পিন করতে পারেন। জানি না, এরপরে তঁাকে ব্যবহার করা হবে কি না। তবে প্রথম ৪ ঘণ্টায় হনুমা হাত ঘুরিয়েছেন মাত্র ১ ওভার।
দল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক চলছেই ভারতীয় শিবিরে। আগের তিন দিনে রবি শাস্ত্রী এবং অজিঙ্ক রাহানে বলেছিলেন, রবিচন্দ্রন অশ্বিন সম্পূর্ণ সুস্থ। অথচ টসের সময় বিরাট কোহলি বলে গেলেন, ‘‌চোট বেড়ে গেছে, তাই অশ্বিনকে রাখা হয়নি।’‌ কোনটা ঠিক?‌ কে ঠিক?‌ আমরা তো অধিনায়কের সঙ্গেই থাকব।
চলতি সিরিজের শুরু থেকেই ভারতের প্রথম এগারো বাছা নিয়ে নানা ভুলভ্রান্তি ঘটেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় যেমন অজিঙ্ক রাহানেকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এখানে চেতেশ্বর পুজারাকে ছেঁটে ফেলা হয়েছিল অপ্রত্যাশিতভাবে। অজিঙ্ককে পরে ফেরানো হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকায়। তেমনি এখানেও পুজারাকে ফেরাতে বাধ্য হয়েছিল দল পরিচালন কমিটি। ওভালে হনুমাকে সুযোগ দিয়ে একটা ফাটকা খেলা হল। উপেক্ষা করা হল দলের সঙ্গে থাকা করুণ নায়ারকে। উইকেটের চরিত্র বুঝতে ভুল করা, দল নির্বাচনে নাগাড়ে পক্ষপাতিত্ব করাও এবারের সিরিজ হারের অন্যতম কারণ। ব্যাটিং ব্যর্থতা অবশ্যই পরাজয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তবু নিরপেক্ষ চোখ দিয়ে যঁারা সিরিজের গতিবিধি বিচার করতে চাইবেন, তঁারা কিন্তু দল পরিচালন কমিটির উন্নাসিকতা এবং নিরপেক্ষহীনতার কথাও উল্লেখ করবেন।
পুনশ্চ:‌ ইংল্যান্ড চেয়েছিল হোয়াইট ওয়াশ করতে। ৫–‌০ ব্যবধানে জিততে পারা যায়নি। কিন্তু এই সিরিজে প্রত্যেকটি টেস্টে টসে জিতেছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক জো রুট। টসে হোয়াইট ওয়াশ, সত্যিই হল!‌‌‌‌‌

 

 

শেষ টেস্ট। কুককে গার্ড অফ অনার দিল ভারতীয় দল। ঝকঝকে ৭১ রানের ইনিংসও বেরোল ব্যাট থেকে। ছবি:‌ পিটিআই‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top