দেবাশিস দত্ত, লন্ডন, ১১ সেপ্টেম্বর- অবশেষে ৪–‌১। বিদেশের মাটিতে সেরা দল যে এখনও হয়ে উঠতে পারেনি বিরাটের ভারত, এটা শিবিরের চঁাইরা মেনে নিলেই সম্ভবত ভাল করবেন। সেরা হওয়ার পথে এটা বললে হয়ত রবি শাস্ত্রী সম্পর্কে ভারত জুড়ে এমন বিষোদ্গারের বহিঃপ্রকাশ ঘটত না। শর্মিলা ঠাকুরের হাত থেকে ট্রফি নেওয়ার পর ইংল্যান্ড অধিনায়ক বলে গেলেন, ‘‌ভারতও ভাল খেলেছে।’‌ সৌজন্যবোধ, হামবড়াই ভাব দেখাননি ইংল্যান্ড অধিনায়ক। দুনিয়ার একনম্বর দলকে হারানোর পরও যিনি বিপক্ষ দল সম্পর্কে ভাল কথা বলতে পারেন, তিনিই তো ক্রিকেটার। ভারত হারল ১১৮ রানে। ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হলেন ১৬১ টেস্ট খেলে বিদায় নেওয়া অ্যালিস্টার কুক। ভারতের কোচ রবি শাস্ত্রী সিরিজের সেরা হিসেবে বেছে নিয়েছেন স্যাম কারেনকে। আর ইংল্যান্ড শিবিরের কোচ ট্রেভর বেলিস মনে করেন, বিরাট কোহলিই ছিলেন সিরিজের সেরা ক্রিকেটার। তাই দু’‌জনকেই আলাদা করে ৫ লিটারের শ্যাম্পেনের বোতল তুলে দিয়ে পুরস্কৃত করা হল।
ইংল্যান্ড যা চেয়েছিল, রুটরা তা সবই পেয়ে গেলেন। এক, সিরিজ জয়। দুই, ওভালে অ্যালিস্টার কুকের বিদায়ী টেস্টে তঁাকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়া। তিন, পৃথিবীর জোরে বোলারদের মধ্যে জিমি অ্যান্ডারসনের ৫৬৪ উইকেট পেয়ে গ্লেন ম্যাকগ্রাথের রেকর্ড টপকে যাওয়া। একই টেস্টে সব লক্ষ্যপূরণ করে ফেলল ইংরেজ শিবির। খেলার শেষেই জানতে পারা গেল, কুক চেয়েছিলেন তঁার উপস্থিতিতেই যেন অ্যান্ডারসন টপকে যেতে পারেন গ্লেন ম্যাকগ্রাথকে। এবং কুকের অভাব যে তিনি অনুভব করবেন এবং তঁার ইচ্ছা অনুযায়ী অ্যান্ডারসন যে শেষ পর্যন্ত মহম্মদ সামিকে বোল্ড করে গ্লেন ম্যাকগ্রাথকে টপকে যেতে পেরেছেন, এতে তিনি তৃপ্ত।.‌.‌. কথা বলতে বলতে কেঁদেই ফেলেছিলেন অ্যান্ডারসন। এটাই জীবন, এটাই ক্রিকেট।
‌৩ উইকেটে ৫৮— এই অবস্থায় যখন দিনের খেলা শুরু হয়েছিল, তখন গোটা ওভালের কাছে প্রশ্ন ছিল, কখন খেলা শেষ হবে,‌ কখন হারবে ভারত?‌ এই প্রশ্নকে সামনে রেখে অ্যান্ডারসনের প্রথম ওভারেই লোকেশ রাহুল যখন ফ্লিক করে বল বাউন্ডারিতে পাঠালেন, তখনও বোঝা যায়নি, খেলা চলবে দিনের শেষ পর্যন্ত। একসময় মনে হয়েছিল, ভারত জিততে না পারলেও অন্তত ড্র করে ফেলবে। সিরিজ শেষ হবে ৩–‌১। বৃহস্পতিবার সকালে মুম্বইয়ের শহর বিমানবন্দরে যখন নামবেন ওঁরা, তখন এই ড্রয়ের কারণে ক্ষোভের উদ্গীড়ন ততটা হবে না। জানি না, ৪–‌১ হওয়ার পর পচা টম্যাটো নিয়ে অত্যুৎসাহী কোনও সমর্থক স্বাগত জানানোর জন্য সাতসকালে বিমানবন্দরে যদি পৌঁছে যান, অবাক হবেন না। রবি শাস্ত্রী–‌সহ গোটা দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এখন এতটাই, ব্যতিক্রম বিরাট কোহলি।
খেললেন বটে লোকেশ রাহুল। পেলেন পঞ্চম টেস্ট শতরান। সিডনি, কলম্বো, জামাইকা, ওভাল। ৫টির মধ্যে দেশের এই ৪টি জায়গায় সেঞ্চুরি হয়ে গেল তঁার। সোজা ব্যাটে খেলেন। বিশেষ লাবণ্য রয়েছে তঁার ব্যাটে। কিছুই হারানোর নেই যখন, তখন একটা শেষ চেষ্টা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। শুরুতে সঙ্গী ছিলেন অজিঙ্ক। অকারণে মইন আলিকে সুইপ মারতে গিয়ে আউট হয়ে হয়ে গেলেন অজিঙ্ক (‌৩৭)‌। কট জেনিংস। এরপর তো ম্যাচ হারার মুহূর্ত ছাড়া অন্য কিছুর জন্য অপেক্ষা করার মতো পরিস্থিতি ছিল না ওভালে। কিন্তু ২০ বছরের ঋষভ পন্থকে নিয়ে দু’‌জনে মিলে ছেলেখেলা করলেন ইংরেজ বোলারদের নিয়ে। পিচ অনেকটাই নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল। তবু, এই জুটি কিন্তু ষষ্ঠ উইকেটে ২০৪ রান তুলে ইংরেজ শিবিরে টেনশনের চোরাস্রোত পৌঁছে দিয়েছিলেন। ড্র করলেও ইংল্যান্ড ৩–‌১ ব্যবধানে জিতত। প্রমাদ গুনছিলেন সবাই। ড্র হয়ে গেলেই শিবির থেকে চিলচিৎকার ভেসে আসত। বলেছিলাম না, আমরাই সেরা। একটি ড্র করার সঙ্গে সঙ্গে যে ৩–‌১ ব্যবধানকে মুছে ফেলা যায় না, এটা কি সাধারণ দর্শকেরা বোঝেন না!‌ আশা করি বাগাড়াম্বর এখন বন্ধ থাকবে কিছুদিন। স্বীকার করতেই হবে, ২৫ দিনের সিরিজের শেষে সব হারিয়ে মন্থর হয়ে যাওয়া উইকেটেও সাহস করে যেভাবে লোকেশ রাহুল এবং ঋষভ পন্থ ব্যাটিং করে গেলেন, তা ওভাল মনে রাখবে। শুনতে ভাল লাগবে, মধ্যাহ্নভোজের বিরতি থেকে চা–‌পানের বিরতি— এই ২ ঘণ্টায় রাহুল ও পন্থ ৩০ ওভারে তুলেছিলেন ১৩১ রান। জুটি ছিল অবিচ্ছিন্ন। এতটাই আক্রমণাত্মক হয়ে ব্যাট করছিলেন দু’‌জন যে, মনে হচ্ছিল জিততে না পারলেও, এই দু’‌জনের উপস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ ড্র হয়ে যেতে পারে। ড্র হয়নি। কিন্তু এই দুই ব্যাটসম্যানকে বাহবা দিতেই হবে। রাহুল আউট হয়েছেন ১৪৯, ঋষভ ১১৪ রানে। এই দু’‌জনের প্রস্থানের পর ম্যাচ ঢলে পড়েছিল ইংল্যান্ডের দিকে। শেষ পর্যন্ত তা–‌ই ঘটল। আদিল রশিদের যে বলটা লেগ স্টাম্পের অনেক বাইরে পড়ে রাহুলকে বোল্ড করে দিল, সেটা দেখে অনেকের মনে পড়ে গেল শেন ওয়ার্নের বলে মাইক গ্যাটিংয়ের বোল্ড হওয়ার দৃশ্য। ওয়ার্ন সেদিন যখন বল করেছিলেন, তখন উইকেট এতটা রুক্ষ ছিল না। এবং তিনি ওভার দ্য উইকেট বল করেছিলেন। রশিদের কৃতিত্ব, এক্ষেত্রে কিছুটা খাটো, কারণ বল করেছিলেন রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে। এবং পেয়েছিলেন পঞ্চম দিনের ভাঙা উইকেট। ভাল লাগল অসুস্থ হয়েও ইশান্ত শর্মার ক্রিজে এসে লড়াই করার উদ্যোগ দেখে। এটা ঘটনা, এমন পরাজয় সত্ত্বেও ভারত কয়েকটি ইতিবাচক ব্যাপার নিয়ে দেশে ফিরছে। এশিয়া কাপের পর খেলতে হবে রাজকোট এবং হায়দরাবাদের পাটা উইকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দুটি টেস্ট। ভারত জিতবে দুটি টেস্টই। তখন হাত–‌পা না ছুঁড়ে এই ৪–‌১ ফলাফলের কথা মাথায় রাখলে ভাল হয়। একনম্বর দলের পক্ষে ৪–‌১ ব্যবধানে হারের পর আস্ফালনটা ঠিক যেন মানায় না।‌‌
স্কোর
ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংস: ৩৩২
ভারত প্রথম ইনিংস: ২৯২
ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংস: ৪২৩/‌৮ (‌ডিঃ)‌
ভারত দ্বিতীয় ইনিংস (‌গত দিনের ৩ উইকেটে ৫৮ রানের পর)‌:‌ রাহুল ব রশিদ ১৪৯, রাহানে ক জেনিংস ব মইন ৩৭, বিহারী ক বেয়ারস্টো ব স্টোকস ০, পন্থ ক মইন ব রশিদ ১১৪, জাদেজা ক বেয়ারস্টো ব কারেন ১৩, ইশান্ত ক বেয়ারস্টো ব কারেন ৫, সামি ব অ্যান্ডারসন ০, বুমরা অপরাজিত ০, অতিরিক্ত ২৬, মোট ৩৪৫। উইকেট পতন:‌ ৪/‌১২০, ৫/‌১২১, ৬/‌৩২৫, ৭/‌৩২৮, ৮/‌৩৩৬, ৯/‌৩৪৫। বোলিং:‌ অ্যান্ডারসন ২২.‌৩–‌১১–‌৪৫–‌৩, ব্রড ১২–‌১–‌৪৩–‌১, মইন ১৭–‌২–‌৬৮–‌১, কারেন ৯–‌২–২৩–‌২, স্টোকস ১৩–‌১–‌৬০–‌১, রশিদ ১৫–‌২–‌৬৩–‌২, রুট ৬–‌১–‌১৭–‌০।‌
 ইংল্যান্ড জয়ী ১১৮ রানে। 
সিরিজে জয়ী ৪–১।
 ম্যাচের সেরা:‌ অ্যালিস্টার কুক।
 সিরিজের সেরা:‌ বিরাট কোহলি ও স্যাম কারেন।

 জোড়া শতরান। জুটিতে ২০৪ রান। পরস্পরকে অভিনন্দন পন্থ, রাহুলের। 

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top