সৌমিত্র কুমার রায়: ম্যাচ চলাকালীন মাইক্রোফোনে ঘোষক বলে চলেছেন, ‘মাঠে বাজি ফাটাবেন না। ম্যাচ কমিশনারের নিষেধ।’ কে কার কথা শোনে তখন! মোহনবাগান মাঠে তখন যেন আগাম দীপাবলী! গ্যালারি থেকে ফানুস উড়ছে। রং মশাল জ্বলছে। তুবড়ি জ্বলছে। সন্ধে নেমে এলেও মোহন গ্যালারি, মাঠ তখন রঙিন। চারিদিক আলোয় উদ্ভাসিত। ন’বছর বাদে ঘরোয়া লিগ জয়ের উৎসব। 
শুধু কি আগাম দীপাবলি?‌ মোহন গ্যালারিতে উড়ছে সবুজ–মেরুন আবির। ম্যাচ শেষে একে অপরের গালে সমর্থকরা সবুজ আবিরে রাঙিয়ে দিলেন। এ যেন আগাম হোলিও বটে। ম্যাচ শেষে মোহনবাগান মাঠ, গ্যালারি, তঁাবুতে আবেগের বিস্ফোরণ। ফেন্সিং টপকে পিলপিল করে মাঠে ঢুকে পড়লেন সমর্থকরা। লাঠি উঁচিয়ে তাঁদের থামানোর ক্ষমতা নেই পুলিশেরও। কতজনকে আটকাবে। পুলিস একবার চেষ্টাও করেছিল, কিন্তু জনপ্লাবন কি আর লাঠি উঁচিয়ে আটকানো যায়। মাঠে ঢুকে অনেকেই প্রথমেই শুয়ে পড়ে মাঠকে চুম্বন করলেন। ম্যাচ শেষে ডিপান্ডা ডিকা, পিন্টু মাহাতোরা মাঠ থেকে বেরোবেন কী, মাঠের মধ্যেই বন্দি সমর্থকদের হাতে। রীতিমত একেকজন ফুটবলারকে ‘হাইজ্যাক’ করে নিচ্ছিলেন মোহন জনতা। অদূরে দাঁড়িয়েও কোনও ফুটবলারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তঁারা তখন মোহন জনতার জনজোয়ারে ভাসছে। ডিপান্ডা ডিকা, হেনরিকে তো কোলে তুলে নিয়ে নাচ শুরু। দুই বিদেশি হাসি মুখে সমর্থকদের ভালবসারা অত্যাচার সহ্য করে গেলেন। সমর্থকরা নিজে হাতে ফুটবলারদের মিষ্টি মুখ করান। 
মাঠে একপ্রস্থ চলার পর বাকিটা সাজঘরে। সাজঘরে ঢুকে ডিপান্ডা নিজের মিউজিক সিস্টেমে ইংরেজি গান চালিয়েছিলেন। তাতে কিছুক্ষণ নাচলেন মোহন ফুটবলাররা। তারপর অবিনাশ রুইদাস গান বদলে দেন। বাজতে শুরু করে, ডোয়েন ব্রাভোর ‘উই আর দ্য চ্যাম্পিয়ন্স’। ব্যাস, মোহন ফুটবলারদের তখন পায় কে। দরজা বন্ধ ড্রেসিংরুমে বাইরেও আওয়াজ আসছিল। নাচ–গানের পর এবার পালা কোচকে নিয়ে সেলিব্রেশনের। শঙ্করলাল চক্রবর্তীকে ড্রেসিংরুমে এনে জলের বোতলের ছিপি খুলে তঁার মাথায় ঢেলে দেওয়া হয়। কোচকে চ্যাংদোলা করে তুলে নাচ শুরু অরিজিৎ, সৌরভদের। ন’বছর পর লিগ জয় তো রয়েছে। সেইসঙ্গে, চিরশত্রু ক্লাবের বড় টাকার ইনভেস্টর, বিশ্বকাপার। সব পেরিয়ে লক্ষ্যে সফল। প্রথমে টুটু বসু ড্রেসিংরুমে ফুটবলারদের সঙ্গে দেখা করেন। দেখা করে ২ লাখ টাকা নিজের পকেট থেকে পুরস্কার ঘোষণা করেন টুটু। তারপর ড্রেসিংরুমে ঢুকে ফুটবলারদের শুভেচ্ছা জানিয়ে আসেন দেবাশিস দত্ত, সৃঞ্জয় বসুরা। টুটুরা বেরোনোর পরই সাজঘরে ঢুকে কোচিং স্টাফ, ফুটবলারদের প্রত্যেকের জন্য ৫০০০ টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন সচিব অঞ্জন। লিগ জয়ের আনন্দে তখন কর্তাদের আমরা–ওরা বিভেদের দেওয়াল ভেঙে চুরমার। মোহন ড্রেসিংরুমের দেওয়ালে টাঙানো ফ্রেমে লেখা রয়েছে, ‘সাকসেস—লেটস ডু ইট টুগেদার।’ হ্যাঁ, মোহনবাগানের এই টিমটার একতাই ইউএসপি। সেটা প্রমাণ হল। কর্তাদের মধ্যে যতই বিবাদ চলুক, ফুটবলাররা নিজেদের কাজটা করে গেছেন। টুটু, দেবাশিস, সৃঞ্জয়রা নয় এসেছিলেন, এই টিমটা গড়ার সময় যঁারা কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তঁাদের অনেকেরই গরহাজির ছিলেন এ দিনের উৎসবে। সৃঞ্জয় বসু বলছিলেন, ‘দেশেও তো পঁাচ বছর অন্তর ভোট হয়, তা বলে দেশ কি থেমে থাকে? লড়াই লড়াইয়ের জায়গায়। মাঠে হবে শুধু ফুটবল। সবার আগে আমি একজন মোহনবাগান সমর্থক। সেই জায়গা থেকে আজকের লিগ জয়ে সবাই মিলে আনন্দ করছি।’ গালে সবুজ আবির মেখে দেবাশিস দত্ত বলেন, ‘আমরা আই লিগ গুরুত্ব দিয়েছিলাম। আই লিগ এসেছিল। এবার শুরু থেকেই কলকাতা লিগ জয় টাaর্গেট করা হয়েছিল। এই লিগ জয়টা অবশ্যই স্পেশাল। এই সাফল্যে অবশ্যই কৃতিত্ব দিতে হয় কোচ শঙ্করলাল চক্রবর্তীকে, উনি দারুণ ভাবে টিমকে মোটিভেট করে চ্যাম্পিয়ন করিয়েছেন।’ টুটুর কথায়, ‘আজ কোনও লড়াইয়ের কথা নয়। আজ আমরা সবাই এক। টিম জিতেছে। মন ভরে আনন্দ করছি।’
সবের মাঝে একটা আক্ষেপ। ম্যাচ শেষে একদল সমর্থক ‘সনিকে চাই, সনিকে চাই’ বলে চিৎকার করছিলেন। রাতের দিকে সনি নর্ডি ফোন মারফত লিগ জয়ের জন্য অধিনায়ক শিলটন পালকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। দূরে থেকে সনিও লিগ জয়ের জোয়ারে ভেসে গেছেন।‌‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top