আজকালের প্রতিবেদন: কলকাতা তথা রাজ্যে ‘মোমো আতঙ্ক’ ছড়িয়ে পড়তেই  কম্পিউটার গেমিং নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে। ভারতের সঙ্গেই গত এক সপ্তাহে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন ধরনের মারণ–খেলা নিয়ে আবার আলাপ আলোচনা শুরু হয়েছে। 
বিষয়টা খুব নতুন নয়। নয়ের দশকের শুরুর দিক থেকে ভারতে একরকমের কম্পিউটার গেমিং চালু হয়। যে গেম টিভি ব্যবহার করে খেলা হত। এরপর কম্পিউটারেই গেম খেলা শুরু হয়। ভারতে ইন্টারনেটের বাড়বাড়ন্ত না হওয়া পর্যন্ত সেসব অফলাইন গেমই ভরসা ছিল। ক্রমে বাড়তে শুরু করে অনলাইন গেমিংয়ের প্রবণতা। সহজে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে বসে থাকা একজনের সঙ্গে  গেমের লড়াইয়ে নামতে পারছেন, খেলতে পারছেন সরাসরি। সেই রোমাঞ্চের কারণেই এই প্রজন্ম ঝুঁকে পড়ে অনলাইন গেমিংয়ের দিকে। শুরু হয় নানা পরীক্ষা। সেই থেকেই ভারতে তার প্রভাব পড়তে থাকে। ফলে ফের নড়েচড়ে বসে বিশ্ব।
রাশিয়া থেকেই একের পর এক ‘‌সুইসাইড গেম’ নেটজগতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সুইসাইড গেম, কারণ, শেষপর্যন্ত এগুলি খেলোয়াড় বা খেলোয়াড়ের আশপাশের কোনও লোকের ক্ষতি করতে নির্দেশ দেবে। সেটাই হবে শেষ বাজি জেতার চ্যালেঞ্জ। ইউরোপ, আমেরিকায় বছর দশেক ধরে এই সুইসাইড গেমের বাড়বাড়ন্ত।  বিজ্ঞানীরা ২০১০‌–‌‌’১১ সাল নাগাদ সন্ধান করে দেখেন, রাশিয়া গেমের আঁতুড়ঘর হলেও বেশিরভাগ গেম তৈরি হচ্ছে ইউরোপেই। গেমগুলির সমস্ত তথ্য, এমনকী, নির্মাণকৌশল থাকছে ‘‌ডার্ক ওয়েব’‌–‌‌এ। 
সাই‌বার বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ইন্টারনেটে যে বিপুল পরিমাণ তথ্য বা ডেটা দেখা যায়, তা আসলে বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অদৃশ্য তথ্যভাণ্ডারের ১ থেকে ২ শতাংশ। বাকি সবটাই ‘‌ডার্ক ওয়েব’ বা ওয়েব দুনিয়ার অন্ধকার জগৎ। যেখানে ড্রাগ স্মাগলিং, অস্ত্রপাচার থেকে বিট কয়েনের বেআইনি ব্যবসা, দেহব্যবসা, পর্নোগ্রাফি ও সুইসাইড গেমিং চলতে থাকে। 
একাধিক আন্তর্জাতিক রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়েছে এমন একাধিক খেলা, যা এখনও ভারতে আসেনি। কিন্তু আমেরিকা–ইউরোপে আগে থেকেই আতঙ্ক তৈরি করেছিল। কিন্তু সেগুলি রুখেছে প্রশাসন। ব্লু হোয়েল বা মোমো ছাড়াও এমন গেমের তালিকা দীর্ঘ। তার মধ্যে একটি ‘‌পাস আউট চ্যালেঞ্জ’‌। ২০১০ সাল থেকে নানা সময়ে এই গেম একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটিয়েছে। এই গেমে বলা হয়, সাময়িকভাবে নিজের বা খেলতে সম্মত হওয়া বন্ধুর গলা টিপে ধরে কিছুক্ষণের জন্য অক্সিজেন আটকে দিতে। এই প্রাণঘাতী খেলায় ২০১০ সালে মৃত্যু হয় এক রুশ কিশোরের। ইউটিউবে সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে ‘‌সল্ট অ্যান্ড আইস চ্যালেঞ্জ’‌। সেখানে হাতের ওপর রাখতে হয় নুন। তার ওপর রাখতে হয় আইস কিউব। নুন বরফের গলনাঙ্ক নামিয়ে দেয় মাইনাস ২৬ ডিগ্রিতে। ফলে হাতে ‘‌ফ্রস্ট বাইট’‌ হয়ে যায়। পুরো কর্মকাণ্ড তুলতে হয় ভিডিওতে। এতে মৃত্যু না হলেও অঙ্গহানি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপান, কোরিয়া এবং রাশিয়া থেকে এই ধরনের গেমিং পরিষেবা পরিচালিত হয়। সেগুলিতে লিপ্ত রয়েছেন অনেক প্রতিভাবান সফটওয়্যার প্রোগ্রামার। তাঁরাই তৈরি করছেন এই জাতীয় গেম। হতে পারে ব্যবহারকারীর ডেটা বা তথ্য হাতাতেই এই গেমগুলি বাজারে আনার কথা ভাবা হচ্ছে। কেউ এই গেম খেললে তাঁর নির্দিষ্ট ‘ডিভাইস’ বা যন্ত্রের ডেটা সরাসরি চলে যেতে পারে গেমের মালিকের কাছে। সেখানে তথ্যগুলি ‘হোস্টিং’ বা সংগৃহীত হয়। মূলত বিশ্ববাজারে প্রচারমূলক কাজের জন্য অনেক বড় বড় সংস্থা এই ডেটা কিনতে চায়। বেআইনি পথে সেই ডেটা বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জনের রাস্তা খুলে যায় গেমগুলির মালিকদের কাছে। ‘স্যাডিস্ট’ মানসিকতাও কাজ করে। মানুষের ক্ষতি করা বা ভয় দেখানোয় মানসিক আনন্দ পায় গেমনির্মাতারা।
ইন্টারনেট ঘাঁটলেই দেখা যাবে, ডার্ক ওয়েবের বাড়বাড়ন্ত দিন দিন বেড়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ডার্ক ওয়েবের প্রভাব এড়িয়ে যাওয়ার জন্য যে তথ্যপ্রযুক্তিগত ক্ষমতা দরকার, তা প্রথম বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই নেই। তৃতীয় বিশ্বের দেশের কাছে থাকা তো দূর অস্ত! তাতে আরও ঝামেলা বাড়ছে। কারণ, একদিকে প্রযুক্তির উন্নতি যেমন একটা দেশকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তেমনই তৈরি করছে অনেক ছিদ্র এবং নিরাপত্তার অভাব। যার ফাঁক গলে ঢুকে পড়ছে এসব মারণ খেলা। ভারতও যার বাইরে থাকতে পারছে না।    ‌

জনপ্রিয়

Back To Top