পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে যেতে লড়ছে এক ষোড়শী। বিপক্ষে শক্তিধর রাষ্ট্রপ্রধানরা। তবু পরোয়া নেই। গ্রেটা থু্নবার্গের অকুতোভয় লড়াই নিয়ে লিখলেন নূপুর চক্রবর্তী।

রাজা তোর কাপড় কোথায়?‌ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর লেখা ‘‌উলঙ্গ রাজা’‌ কবিতায় রাজার সামনে এই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল এক শিশু। দেশকালের বেড়াজাল ভেঙে পরিবেশ রক্ষায় দুনিয়ার শক্তিধর রাষ্ট্রনেতাদের ভূমিকা নিয়ে সেই প্রশ্নটাই অন্যভাবে তুলে ধরেছে এক সুইডিশ কন্যা। দূষণের অসুর বধ করে পরিবেশ রক্ষার জন্য বৈঠক করেছেন বিভিন্ন দেশের শীর্ষকর্তারা। কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। ফল মিলছে না। এই অবস্থায় রাষ্ট্রপুঞ্জের মঞ্চ থেকে চোখ রাঙিয়ে গোট বিশ্বকে চমকে দিয়ে আচমকা খবরের শিরোনামে গ্রেটা থুনবার্গ।
শোরগোল পড়েছে ষোড়শীর প্রশ্নবাণে। ঘাম জমেছে উন্নতদেশের রাষ্ট্রকর্তাদের কপালে। রক্তচক্ষু দেখাচ্ছেন তাঁরা। কিশোরীর চেহারা নিয়ে মশকরা করতেও পিছপা হচ্ছেন না অনেকে। মেয়েদের যাঁরা ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত, ভুরু কুঁচকে তাঁরা দেখছেন গ্রেটাকে। আবার উল্টোদিকে বইছে প্রশংসার বন্যা। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম এই মেয়ের পোস্টারে ছয়লাপ। পরিবেশ রক্ষার চিন্তায় নাবালিকার ঘুম নেই। ভবিষ্যৎ দূষণমুক্ত করার চিন্তায় বঁুদ। কার্বন নিঃসরণ কমানোই লক্ষ্য। পরিবেশ রক্ষাকর্মী হিসেবে তামাম দুনিয়ায় পরিচিত এই স্কুলপড়ুয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় হু হু করে বাড়ছে তার ভক্তের সংখ্যা। অনেকে ভাবছেন, নোবেল পুরস্কারও পেয়ে যেতে পারে ‘‌গ্রেটা দ্য গ্রেট’‌। 
 ২০০৩ সালের ৩ জানুয়ারি সুইডেনের অপেরা গায়িকা মেলেনা এর্নাম্যান জন্ম দেন গ্রেটার। বাবা ভান্তে থুনবার্গ মেয়ের মুখ দেখে খুশিতে ডগমগ। কিন্তু বয়স বাড়তে না বাড়তেই একের পর এক রোগের উপসর্গ প্রকাশ পেতে শুরু করে গ্রেটার শরীরে। অ্যাসপার্গাস সিন্ড্রোম, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার, সিলেক্টিভ মিউটিজমের শিকার গ্রেটা। যদিও কোনও অসুখকেই পাত্তা দেয়নি নাবালিকা। 
২০১১ সাল। গ্রেটা তখন ৮ বছরের। পরিবেশ রক্ষার ভাবনা পেয়ে বসে তাকে। কথায় বলে ‘‌চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম’‌। সত্যি করে ছেড়েছে গ্রেটা। মেয়ের কথায় খাদ্যাভ্যাস বদলে তার বাবা–মা এখন ভেগান। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশ রক্ষায় বিমানে চড়া ছেড়েছেন তাঁরা। 
২০১৮ সাল। দেশ–বিদেশে ছড়িয়ে পড়ল গ্রেটার নাম। সমবয়সি আর পাঁচটা ছেলেমেয়ে যখন পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে ঢুকছে, গ্রেটা তখন সুইডেনের সংসদের সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে বসে। তাতে লেখা ‌‘স্কুল স্ট্রাইক ফর দ্য ক্লাইমেট’। অর্থাৎ ‌‌জলবায়ুর জন্য স্কুল ধর্মঘট‌। প্রতি শুক্রবার ১৫ বছরের একটা মেয়ে সংসদের সামনে বসে থাকে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন অনেকে। সম্ভবত ভাবতে পারেননি নাবালিকার হিমশীতল চাউনির কাছে থমকে দাঁড়াবে গোটা দুনিয়া। 
স্কুল না গিয়ে পরিবেশ রক্ষার জন্য মেয়ের লড়াই নিয়ে প্রথম দিকে গ্রেটার বাবা দোনামোনা করেছিলেন। কিন্তু মেয়ে বাড়িতে দুঃখী–দুঃখী মুখে বসে থাকবে, তা তো হয় না। সেই ভাবনা থেকেই মেয়ের পাশে দাঁড়ান তিনি। স্কুলের শিক্ষক–শিক্ষিকারাও প্রথমে দোলাচলে ছিলেন। কাজটা ভাল। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর প্রথম কাজ পড়াশোনা। সেসব ফেলে পরিবেশের জন্য স্কুল কামাই করে সংসদের সামনে ধর্নায় সায় ছিল না তাঁদের। কিন্তু পরে মত বদলান তাঁরাও। 
কিন্তু পরিবেশ রক্ষার জন্য স্কুল ধর্মঘটের ভাবনার সূত্রপাত কীভাবে?‌ 
২০১৮ সালে আমেরিকার একটি স্কুলে বন্দুকবাজের তাণ্ডবের পর সেখানকার অনেক পড়ুয়া স্কুলে যেতে চায়নি।  বন্দুকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য ফ্লরিডায় মিছিল করেছিল তারা। সেই মিছিলই লড়াইয়ের পথ চিনিয়ে দেয় গ্রেটাকে। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুল বন্ধ করে পরিবেশ রক্ষার যুদ্ধে নেমে পড়ে সে। 
আগে থেকেই অবশ্য পরিবেশ সংক্রান্ত নানা সভা, বিতর্কে অংশ নিতে শুরু করেছিল মেয়েটি। অন্যদের ভাবাতেও চেয়েছিল। কেউ তখন আগ্রহ দেখায়নি। তবু ভেঙে পড়েনি সুইডিশ কিশোরী। ‘একলা চলো’র নিজস্ব মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে এগিয়ে গিয়েছে। পরিবেশ বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমে কানাডা, চিলি, মেক্সিকো বিভিন্ন দেশ ঘুরে সেখানকার পরিবেশ রক্ষা কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছে। পুরস্কৃত হয়েছে। উদ্যমী গ্রেটার প্রশংসায় পঞ্চমুখ রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্টোনিও গুটেরাস–ও।
লড়াইয়ের একটা পর্বে দেশের সাধারণ নির্বাচনের আগে প্যারিস চুক্তির কথা তুলে সুইডেন সরকারের কাছে কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য পদক্ষেপ করতে দাবি করেছিল গ্রেটা। সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে তার নাম। তাকে দেখে বিশ্বের ২৭০টি শহরের ২০ হাজার পড়ুয়া অনুপ্রাণিত হয়ে পরিবেশ রক্ষায় সামিল হয়। তৈরি হয় ‘‌গ্রেটা এফেক্ট’‌।
চলতি বছর আগস্টে ব্রিটেন থেকে নিউইয়র্ক রওনা হয় গ্রেটা। বিমানে নয়, জলপথে। কারণ, কার্বন নিঃসরণ কমানো। সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রপুঞ্জের জলবায়ু সংক্রান্ত আলোচনার মঞ্চে রাষ্ট্রনেতাদের উদ্দেশ্যে গর্জে ওঠে সুইডেনের কন্যা— ‘‌আমার এখানে থাকার কথা নয়। মহাসাগরের ওপারে কোনও দেশের স্কুলে পড়াশোনার কথা। তবু আপনারা আমার কাছে আশার সন্ধানে এসেছেন?‌ আপনাদের এত স্পর্ধা হয় কী করে?‌ ফাঁকা বুলি আউড়ে আমার স্বপ্ন, আমার শৈশব চুরি করেছেন। মানুষ কষ্ট পাচ্ছে, মারা যাচ্ছে। বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ছে। গণবিলুপ্তির দিকে চলেছি আমরা। আর আপনারা টাকার খেলায় মত্ত। আর্থিক বৃদ্ধির চিরন্তন রূপকথা শোনাচ্ছেন। আপনাদের এত স্পর্ধা হয় কী করে? ‌মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে লোক ঠকাচ্ছেন। তরুণরা আপনাদের বিশ্বাসঘাতকতা ধরে ফেলেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চোখ খোলা। আমাদের বোকা বানাতে চাইলে আমরা আপনাদের ক্ষমা করব না।’‌‌ 
শুনে গ্রেটার সমালোচনা শুরু করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাঁক্রো। কান দেয়নি ‘গ্রেটা দ্য গ্রেট’।

জনপ্রিয়

Back To Top