শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়: ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। সম্ভবত দিনটি সমগ্র বিশ্বেই পালিত হবে। এই দিনটি পালন করার যৌক্তিকতা সম্ভবত বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ উপলব্ধি করে না। সভ্য মানুষের কাছে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের চেয়েও বর্তমানে পরিবেশ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ আমাদের কাছে বেঁচে থাকার পূর্ব শর্ত, আমাদের কাছে শুধু বাৎসরিক আলোচনা নয়। বায়ু দূষণের পরিমাণ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। বাতাসে কার্বন–‌ডাই–‌অক্সাইড, সালফার–‌ডাই–‌অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, লেড অক্সাইডের মতো অতি বিষাক্ত বায়বীয় গ্যাস মিশে গিয়ে মানুষের জীবনে তীব্র সঙ্কট ডেকে আনছে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যা কিছু আছে, তার সঙ্গে যোগ আছে পরিবেশের। পরি ও বেশ–‌এর মধ্যে ‘‌পরি’‌ উপসর্গের অর্থ হল চারপাশ এবং ‘‌বেশ’‌ কথার অর্থ হল ভাল। পরিপূর্ণ অর্থ দাঁড়ায়, ‘‌চারপাশের ভাল’‌।
পরিবেশের ইংরেজি হল Environment‌। এই ইংরেজি শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ আঁভিরোঁ থেকে। ফরাসি শব্দ Er–‌এর ইংরেজি হল in ‌এবং Viron‌–‌এর ইংরেজি হল To Encircle ‌বা বেষ্টন করা। অর্থাৎ বাংলায় পরিবেশ, ফরাসিতে আঁভিরোঁ এবং ইংরেজিতে Environment ‌প্রায় সমার্থক। পৃথিবীর সকল বস্তুকে যা বেষ্টন করে আছে। সেটাই পরিবেশ, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে পৃথিবী সূর্যের গ্রহ এবং সূর্যের যত গ্রহ বা উপগ্রহ আছে তার কোনওটিতেই এখন পর্যন্ত প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে, অন্য গ্রহের বা উপগ্রহের পরিবেশ মানুষকে ভাবায় না। কিন্তু পৃথিবীর পরিবেশ নির্ভর করে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বলতে বোঝায় জীবনধারণের অনুকূল তাপমাত্রা, বায়ু, জল, বায়ুর উপাদান (‌প্রধানত অক্সিজেন)‌ মাটি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল Ozone ‌Gas–এর স্তর যা মানুষ, জীবজন্তুকে অতি বেগুনি রশ্মি থেকে বাঁচায়।
কারণ, ওজনের স্তর অতি বেগুনি রশ্মিকে শোষণ করে নেয়। পৃথিবীর উত্তাপ বেড়ে যাওয়ার জন্য ওজনের স্তর ভেঙে যাচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা পরিবেশকে মূলত দু ভাগে ভাগ করেছেন। ১)‌ Abiotic ‌২)‌ Biotic. ‌Abiotic ‌যার মধ্যে আলো, বাতাস, জল–‌মাটি, পাহাড়–‌পর্বত, সাগর–‌মহাসাগর, নদ–‌নদী, হ্রদ, জলাশয়, ঝর্না, বনভূমি, তৃণভূমি, মেরু অঞ্চল, মরুভূমি, তৃণলতা, গুল্ম, বৃক্ষ প্রভৃতি। Biotic‌–‌এর মধ্যে পড়ে জীবজগৎ ও মানুষ।
প্রাকৃতিক পরিবেশ ছাড়াও কৃত্রিম পরিবেশ আছে যা মানুষ সৃষ্টি করে। যার মধ্যে রয়েছে পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন পরিবেশ। যদি পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায় অথবা দীর্ঘস্থায়ী প্রবল শীত পড়ে, যদি পানীয় জলের অভাব ঘটে অথবা বাতাসে বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তাহলে সব জীবজন্তু মারা পড়বে এবং মানুষও তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে না। মানুষ ব্যতীত অন্য জীব Abiotic ‌ও Biotic পরিবেশ বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু মানুষকে বাঁচতে হলে একসঙ্গে কৃত্রিম পরিবেশের প্রয়োজন আছে। যেমন সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, উৎপাদন, ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি প্রভৃতি। কিন্তু সব ধরনের পরিবেশের সঙ্গে সমস্ত জীবনের প্রতি মুহূর্তে একটা পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া সংগঠিত হয়। এই নিয়মেই বহু প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে আবার অনেক প্রাণী উন্নত হয়েছে। মানুষ বহু ক্ষেত্রেই আবার অনন্তকাল থেকে প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব করার চেষ্টা করে আসছে এবং তার ফলস্বরূপ যে প্রতিক্রিয়া হয়ে চলেছে, তা মানব সমাজের কাছে আপাত উন্নতি মনে হলেও, পরিণামে ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে।
যে কোনও দেশের ভূখণ্ডের ৩৩ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে তার পরিমাণ মাত্র ২০ শতাংশ। ভূমিক্ষয়, নদীতে পলিজমা, পুকুর বা জলাশয় বুজিয়ে দেওয়া, খালবিল সংস্কার না করার জন্য চাষের প্রচুর ক্ষতি হচ্ছে।
ব্যাপক কীটনাশক ব্যবহার, তেল ও কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, নানা রাসায়নিক ব্যবহার করে বিষাক্ত তরল ও বায়বীয় গ্যাস বৃদ্ধিও পরিবেশের ওপর গভীর আঘাত। মনুষ্যসমাজ আজ এক উভয়সঙ্কটের সামনে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আজকে ৭৫০ কোটিতে পৌঁছে গেছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎপাদন করতেই হবে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দূষণও বৃদ্ধি পাবে অর্থাৎ একদিকে উন্নয়নের কারণে দূষণ বৃদ্ধি, অন্যদিকে উন্নয়ন ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারবে না। এমনই এক গভীর সঙ্কটের সামনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের পক্ষ থেকে ১৯৭২ সালে স্টকহোমে (‌সুইডেনের রাজধানী)‌ ৫ জুন প্রথম পরিবেশ বিষয়ে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন শেষ হয় ১৬ জুন অর্থাৎ ১২ দিনব্যাপী এই সম্মেলনে ১১৩টি দেশের ১২০০ প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭২ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচবার ওই শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং আঠারো বার বিশ্বের দূষণ হ্রাস ও উষ্ণায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। তা ছাড়া (‌১)‌ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ (‌২)‌ দারিদ্র‌্য দূরীকরণ (‌৩)‌ ভোগবাদ নিয়ন্ত্রণ (‌৪)‌ আর্থিক বৈষম্য হ্রাস (‌৫)‌ উন্নততর প্রযুক্তির সাহায্যে বর্জ্য হ্রাস ও দূষণ বিষয়েও আলোচনা হয়। দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা হল, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল শীর্ষ দেশের জনসংখ্যার ব্যাপক বৃদ্ধি এবং উন্নত দেশগুলির জনসংখ্যা বিশ্বের জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ অথচ উন্নত দেশগুলিতেই দূষণের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। চূড়ান্ত ভোগবাদ বিশ্বে তৈরি করেছে ব্যাপক দূষণ। পৃথিবীর দূষণের ২০ শতাংশ তৈরি করছে আমেরিকা ও চীন।
দারিদ্র‌্য মানুষের চেতনার পরিপন্থী। ক্ষুধা নিবৃত্তি আগে না পরিবেশ আগে— এই প্রশ্ন উঠে আসে। ধনী দেশগুলি যদি অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিকে নিঃশর্ত সাহায্য করে দারিদ্র‌্য দূরীকরণে সাহায্য করে, তা হলে পরিবেশ অনেকটাই রক্ষা পাবে, নচেৎ যেভাবে জনসংখ্যা বাড়ছে তাতে ২০৬১–‌৬২ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ১৪০০ কোটি। মনে রাখতে হবে, বিশ্বের জনসংখ্যা ১২০০ কোটি হলেই সমগ্র পৃথিবীর জন্য অশনি সঙ্কেত। বর্তমান পৃথিবীকে ছাতার মতো ঢেকে রয়েছে গ্রিন হাউস গ্যাস, যা বিশ্বের উষ্ণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। মেরুপ্রদেশ ও বরফ–‌ঢাকা পাহাড়ের বরফ গলে যাচ্ছে, ফলে সমুদ্রে জলের স্তর বাড়ছে। ফলে নদীর তীরবর্তী শহর ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলির সামনে সমূহ বিপদ।
কিয়োটোতে যে বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলন হয়েছিল, সেখানে স্থির হয়েছিল ১৯৯০ সালে পৃথিবীর গড় দূষণের মাত্রা যা ছিল, তার থেকে প্রত্যেক দেশকে ৩০ শতাংশ হারে দূষণের মাত্রা কমাতে হবে। এই প্রস্তাবে সই করতে অস্বীকার করে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া। স্বাক্ষর করেও প্রত্যাহার করে নেয় রাশিয়া ও কানাডা। পরবর্তীকালে স্থির হয়, বিশ্ব জুড়ে বৃক্ষরোপণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা হবে এবং ধনী দেশগুলি তার জন্য অর্থ সাহায্য করবে। মনে রাখতে হবে, মানুষ প্রতিদিন ২৮ হাজার বার–‌এর বেশি শ্বাস নেয় অর্থাৎ অক্সিজেন নেয়। এ ছাড়া পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী অক্সিজেন নেয় কিন্তু কোনও ভাবেই অক্সিজেন তৈরি করে না। কেবলমাত্র গাছই অক্সিজেন তৈরি করে।
সর্বশেষ পরিবেশ সংক্রান্ত সম্মেলন হয়েছে প্যারিসে, যেখানে ১৪০টি সিদ্ধান্তে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। দারিদ্র‌্য দূরীকরণ, শিল্পায়নের আগে যে উষ্ণতা ছিল (‌১৯৯০ সাল)‌ তার থেকে ২°‌ সেন্টিগ্রেড কম উষ্ণতা বৃদ্ধি, গ্রিন হাউস গ্যাস যাতে কম নির্গম হয় তার ব্যবস্থা করা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার প্রভৃতি বিষয়গুলি গুরুত্ব পেয়েছে। পরিবেশ দূষণ কোনও একটি দেশের বিষয় নয়। প্রয়োজন সব দেশ মিলে কঠোরভাবে পরিবেশ সংক্রান্ত আইন মেনে চলা, নচেৎ বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী।‌

জনপ্রিয়

Back To Top