দেবাশিষ দত্ত

নতুন একটা বিএমডব্লু দাঁড়িয়েছিল ড্রেসিংরুমের লাগোয়া ঢালু রাস্তায়। অপেক্ষা করছিলেন পাকিস্তানের জোরে বোলার মহম্মদ আমের। লাক্সারি বাসের অপেক্ষায় না থেকে পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা, যে যার পরিচিত স্থানীয় বন্ধুদের গাড়িতে চড়ে হোটেলে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। হঠাৎ আমেরের মাথার ওপর তাকিয়ে দেখি ছোট একটা সাইনবোর্ড। ইউ আর এন্টারিং ইনটু আ লায়ন্স কেভ। ঠিক পেছনেই অতিথি দলের ড্রেসিংরুম এবং সেখানে ঢোকার আগেই ওইরকম একটা ঝাঁজালো সতর্কবার্তা।
মানেটা সহজ। প্রতিপক্ষকে নিজের শিবিরে ঢোকার আগেই চমকে দাও। বার্তাটার কথা ভাবুন। জোহানেসবার্গের ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামের অতিথিদের ড্রেসিংরুমে ঢোকার আগে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, প্রতিপক্ষ হল সিংহ এবং তাদের ডেরায় ঢুকে আপনাকে লড়াই করতে হবে। সিংহের গুহায় ঢুকে জিতে বেরিয়ে আসার জন্য যে দৃঢ়তা, আন্তরিকতা, সততা, দক্ষতা জরুরি, সেগুলিতে শান দিয়ে লড়াই করার আহ্বান জানাতে যেন বলা হচ্ছে পরোক্ষভাবে অতিথি দলকে। এটাই কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটের ঝাঁজ। বল কি ওদেশে ঘোরে না?‌ অবশ্যই ঘোরে। কিন্তু ঘোরে কম। বাইশ গজের জমিতে থাকে গতি এবং বাউন্স। যা কাজে লাগিয়ে জোরে বোলাররা তো বটেই, টেস্ট ম্যাচের পরের দিকে স্পিনাররাও বাড়তি সুবিধা আদায় করে নিতে পারে, অতিরিক্ত বাউন্স কাজে লাগিয়ে।
এমন গুহায় বিরাটবাহিনীকে থাকতে হবে প্রায় দু’‌মাস। এই সময়ে, পরীক্ষার আগে নাওয়া–‌খাওয়া ভুলে যেভাবে প্রস্তুতিতে মন দিতে হয় পরীক্ষার্থীদের, ঠিক সেভাবেই, কড়া চ্যালেঞ্জ নেওয়ার পালা শুরু হয়েছে সবে তিনদিন। কেপটাউন টেস্টে কী হবে, কারা জিতবে, এটা তো আমরা জেনে যাব পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায়। কিন্তু কেপটাউন টেস্টই তো শেষ কথা হতে পারে না। টেবল মাউন্টেনের সামনে নিউল্যান্ডসের যে মাঠে প্রথম টেস্ট খেলতে হবে ভারতকে, তার চেয়ে অনেক বেশি গতিসম্পন্ন উইকেট অপেক্ষা করে আছে সেঞ্চুরিয়ান পার্ক এবং ওয়ান্ডারার্সে। সব মিলিয়ে গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে চলে লড়াই। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। ব্যাট–‌বলের লড়াই ছাড়াও চলে পরোক্ষভাবে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডে বা এমন–কি নিউজিল্যান্ডেও ক্রিকেটাররা যেভাবে স্লেজিং করে থাকে, এখানে তা হয় আরও গম্ভীরভাবে। কায়দাটাই আলাদা। ওদের স্লোগান ‘‌রাফ অ্যান্ড টাফ’‌। পেশিশক্তিতে বিশ্বাসী ওরা। গতিতে বিশ্বাসী। সব কিছুতেই উড়িয়ে লন্ডভন্ড করে দেওয়াই যেন ওদের মূল লক্ষ্য। সাধে কী আর নিজেদের শিবিরকে হাসিম আমলারা সিংহের ডেরা হিসেবে তুলে ধরেছে!‌
‌’‌৯২ সালে, সাদা–‌কালোর ভেদাভেদ ভুলে, ভারত প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়েছিল। বর্ণবৈষম্যের বেড়াজাল কেটে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মূল স্রোতে ফিরে এসেছিল সবে কেপলার ওয়েসেলসের দক্ষিণ আফ্রিকা। মনে আছে, যেভাবে ভারতীয় দলকে স্বাগত জানানো হয়েছিল ওদেশে, তা, গত ৩৭ বছরের পেশাদারি জীবনে দেখিনি। মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলার মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের কারণে এই দুই দেশের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই জমজমাট। সেখানে ২১ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মূল স্রোত থেকে সরে থাকার কারণে, সেবারের সিরিজ প্রবল গুরুত্ব পেয়েছিল প্রথম দিন থেকেই। হোটেল, রাস্তাঘাট, বাজার, মাঠ, গ্যালারি— সর্বত্র ছিল আতিথেয়তার ছোঁয়া। কিন্তু মাঠের মধ্যে এই আতিথেয়তার কোনও প্রতিফলন ছিল না। সর্বত্রই শুধু ওরা জিততে চেয়েছিল। গত ২৫ বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়েও, ভারত কিন্তু জিতে ফিরে আসতে পারেনি ওদেশ থেকে। দু–‌একটা টেস্ট ম্যাচ, পাঁচ–‌ছটা ওয়ান ডে ম্যাচ জিতেছে ভারত। কিন্তু কখনই দাপট নিয়ে জিততে পারেননি তেন্ডুলকার, আজহারউদ্দিন, দ্রাবিড়, গাঙ্গুলিরা। বছরের পর বছর, সিরিজের পর সিরিজ। দেখে কে বলবে, ২১ বছর ওই দেশ আন্তর্জাতিক স্তরে ক্রিকেট খেলেনি।
আমরা চমকে গিয়েছিলাম ইডেনে অ্যালান্ড ডোনাল্ডকে দেখে। লম্বাচওড়া চেহারা। যেমন গতিতে রান–‌আপের শুরু থেকে দৌড় শুরু করেন, বল করেন আরও জোরে। সঙ্গে বিষাক্ত সুইং। নতুন নাম দেওয়া হল, সাদা বিদ্যুৎ। হোয়াইট লাইটনিং। সত্যিই তাই, গতিতে ঝলসে দিয়ে উইকেট তুলে নেওয়াতেই ছিল তাঁর আনন্দ। উইকেট পাওয়ার পর যে ভঙ্গিমায় তিনি দু’‌হাত তুলে কখনও শর্ট মিড উইকেট বা কখনও এক্সট্রা কভারের দিকে দু’‌হাত ছড়িয়ে ছুটে যেতেন, তা দেখে মনে হত সবুজ ঘাসের বুকে যেন কোনও সাদা পাখি আকাশের দিকে উড়ে যেতে চাইছে। অল্প দিনের মধ্যেই অ্যালান্ড ডোনাল্ড হয়ে উঠলেন এক আকর্ষণীয় চরিত্র। দুর্দান্ত বোলার এবং অসাধারণ চরিত্র। হ্যান্সি ক্রোনিয়ের নেতৃত্বে, বব উলমারের প্রশিক্ষণে নিজেকে প্রতিদিন উন্নতি করতে শুরু করেছিলেন। ভারতের এখনকার জোরে বোলাররা দু’‌ওভার বল করার পর বাউন্ডারি লাইনে গিয়ে জলের বোতল চাইতে থাকেন। ক্লান্ত হয়ে পড়েন সহজেই, কয়েকশো ঘণ্টা জিমন্যাশিয়ামে কাটানোর পরও। অথচ, নিজেকে আরও ক্ষুরধার করে তোলার জন্য ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেট খেলার ধকল নিতে চেয়েছিলেন বছরের পর বছর, হাসিমুখে। সাধে কী আর একজন চ্যাম্পিয়ন বোলার হয়ে উঠেছিলেন।
তো, শুধু একা অ্যালান্ড ডোনাল্ড নয়। সেভাবে গ্রেম পোলক, পিটার পোলক, মাইক প্রোক্টরদের মতো সুপারস্টার ক্রিকেটার গত ২৫ বছরে হয়তো উঠে আসেননি। কিন্তু অ্যালান্ড ডোনাল্ড, শন পোলক, মাখাইয়া এনতিনির মতো বোলার, হাসিম আমলা, এবি ডি’‌ভিলিয়ার্সদের মতো ব্যাটসম্যানরা দক্ষিণ আফ্রিকাকে জেতানোর জন্য নিজেদের ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। যে পেশাদারি ভঙ্গিমা ছিল সাতের দশকে গ্রেম পোলকদের দলে, তা যেন, উত্তরাধিকার সূত্রে থেকে গিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা শিবিরে, ২১ বছর ক্রিকেটের মূল স্রোত থেকে সরে গিয়েও। এখনও, এই ২০১৮ সালে, গত শতাব্দীর শেষের দিকে যে দুর্ধর্ষ দল দক্ষিণ আফ্রিকার ছিল, সেরকম শক্তিশালী দল না থাকা সত্ত্বেও, ফ্যাফ ডুপ্লেসিসরা মরণ কামড় দেওয়ার মতো লড়াই কিন্তু করবে। সিংহরা আছেন সিংহের গুহাতেই।
বোঝার চেষ্টা করছিলাম, দীর্ঘকাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট না খেলেও দক্ষিণ আফ্রিকা কীভাবে নিজেদের দেশের পরিকাঠামোকে এতটা শক্তিশালী করে রাখতে পেরেছিল। দেশের হয়ে খেলার যখন ব্যাপার নেই, তখন তো বহু ক্রিকেট প্রতিভার হারিয়ে যাওয়ার কথা। সেখানে প্রতিভারা হারিয়ে না গিয়ে ক্রিকেটের কক্ষপথে থাকার চেষ্টা করে গিয়েছেন এবং ভালবাসার ক্রিকেটকে আরও ভালভাবে ভালবাসার রাংতায় মুড়ে নিজেদের মন ও প্রাণ সঁপে দিতে পেরেছিলেন বলে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার সময়ও পেয়েছেন আনন্দ। যদি লড়াইয়ের কথা বলা হয়, তখন সবার আগে ভেসে ওঠে অস্ট্রেলিয়ার নাম। কেন দক্ষিণ আফ্রিকা নয়, এ প্রশ্ন আমরা তুলেছি বহুবার। গত ২৫ বছরে অন্তত ১০ বার নেলসন ম্যান্ডেলার দেশে যেতে হয়েছে পেশার খাতিরে। এবং প্রত্যেকবারই মনে হয়েছে, সাদা–‌কালোর সমস্যা যদি না আসত, তাহলে, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আরও অনেক নামকরা পেশাদার ক্রিকেটার উঠে আসত।
আমাদের দেশে যেমন ক্রিকেট এক নম্বর খেলা। কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চলছে ব্যাট–‌বলকে কেন্দ্র করে। একটি অলিম্পিক পদকের জন্য মাথা খুঁড়তে হয় আসমুদ্রহিমাচল। ব্যাডমিন্টন, জিমন্যাস্টিকস, অ্যাথলেটিক্স, শ্যুটিং, দাবা খেলেন অনেকেই। কিন্তু ক্রিকেটের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম নয়। রাগবি, ফুটবলের পর ক্রিকেটের স্থান। তবু, বছরের পর বছর কী চমৎকার ক্রিকেটারদের–‌ই না উপহার দিয়ে আসছে বিশ্ব ক্রিকেটকে দক্ষিণ আফ্রিকা। ক’‌দিন আগে কথা হচ্ছিল জন্টি রোডসের সঙ্গে। আমাদের আমলে জন্টির মতো দুর্ধর্ষ ফিল্ডার যে আসেনি, তা নিয়ে কোনও তর্ক হওয়াই উচিত নয়। কেউ কেউ মহম্মদ আজহারউদ্দিন, হার্শেল গিবস, রজার হারপার, গাস লোগি, রিকি পন্টিংদের মতো কয়েকজন ভাল ফিল্ডারের নাম উল্লেখ করবেন, কিন্তু জন্টির সঙ্গে এঁদের কি তুলনা করা উচিত?‌ ইদানীং ভারতে থাকছেন জন্টি। কন্যার নাম রেখেছেন সিডনি। টানা ৯ বছর ছিলেন মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের ফিল্ডিং কোচ। এই সবে দায়িত্ব ছেড়েছেন। এখন এই উপমহাদেশে শরীর সুস্থ রাখা নিয়ে বক্তব্য পেশ করে বেড়াচ্ছেন। এহেন জন্টি তাঁর দেশের ক্রিকেটের এমন ধারাবাহিক সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘‌ছোটবেলা থেকে আমি হকি–‌ফুটবল, টেবিল টেনিস–‌ক্রিকেট খেলেছি। শুধু আমি নই, দক্ষিণ আফ্রিকার স্কুলে স্কুলে সব খেলায় অংশগ্রহণ করাটা বাধ্যতামূলক। শেষ পর্বে এসে আমার সামনে ছিল দুটো অপশন। হয় ক্রিকেট, নয় হকি। আমি বাবার পরামর্শ শুনে ক্রিকেটকে বেছে নিয়েছিলাম।’‌ জন্টির এই মন্তব্যের মাঝে যে ব্যাপারটা পরিষ্কার, তা হল, খেলাধুলোর প্রতি ওদেশের অভিভাবকদের আন্তরিক ভালবাসা। খেলতেই হবে সব ছাত্রছাত্রীকে। তবে না মানসিক বিকাশ ঘটবে, তবে না দেশকে অলিম্পিক পদক পাওয়ার জন্য মাথা খুঁড়ে মরতে হবে না বছরের পর বছর। এবার আপনারাই বলুন, কেন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ উঠে আসবে না?‌ স্কুলজীবনের শেষ পর্বে সব খেলার কর্তাদের মধ্যে চলে টাগ ‌অফ ওয়ার। কোন স্কুলের কোন ছাত্রকে কোন খেলায় টেনে নিয়ে যাওয়া যায়! জন্টিকে যেভাবে নিশ্চিত হকি–‌তারকা হতে দেননি ডারবানের ক্রিকেট–কর্তারা। প্লিজ, দয়া করে সাতের দশকে, কলকাতা ফুটবলের দলবদলের ‌সঙ্গে এই টানাপোড়েনকে গুলিয়ে ফেলবেন না। ওটা দক্ষিণ আফ্রিকা। যে দেশ অভয়ারণ্যের জন্য বিখ্যাত। বাঘ–‌সিংহের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কখন যেন নিঃশব্দে ওদেশের সভ্য সমাজে ঢুকে পড়ে লড়াকু ক্রীড়াবিদদের তৈরি করে। এভাবেই কিন্তু সিংহের গুহা তৈরি হয় আপনা থেকেই।
’‌৯২ সালে প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাওয়ার সময় বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম, কীভাবে মূল স্রোত থেকে দূরে সরে থেকেও অসাধারণ পরিকাঠামো তৈরি করতে পেরেছিল দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিটা শহর। প্রত্যেকটি শহরে মাঠে ঢোকার পর মনে হয়েছে, খেলাধুলো করতে হলে এমন মাঠেই সুযোগ পাওয়া উচিত। এ ব্যাপারে আমাদের কৃতিত্ব দিতে হবে ডা.‌ আলি বাখারকে। কীভাবে টাকা জোগাড় করতেন জানি না, শুধু জানি তাঁর অ্যাটাচি কেসে যে চেকবই থাকত, তা তিনি মেলে ধরতেন দুনিয়ার সেরা ক্রিকেটারদের সামনে। এভাবেই তিনি মাইক গ্যাটিং, জিওফ বয়কট, কুক, গ্রাহাম গুচ–‌সহ দুনিয়ার নামকরা ক্রিকেটারদের মোটা টাকার বিনিময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছেন। কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি অত্যাচারের কারণে গোটা দুনিয়া যখন তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তখন, আমরা মেনে নিতে পারিনি গ্রাহাম গুচদের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। একদিকে বর্ণবৈষম্য, অন্যদিকে ক্রিকেট খেলার জন্য লোভনীয় হাতছানি। গর্জে উঠেছিল গোটা ক্রিকেটদুনিয়া। আমরা গুচ, গ্যাটিংদের অর্থপিশাচ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলাম। বর্ণভেদ উঠে যাওয়ার পর আলি বাখারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, কেন তিনি ওইভাবে লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে অন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারদের দক্ষিণ আফ্রিকায় উড়িয়ে নিয়ে যেতেন?‌ জবাব দিয়েছিলেন, ‘‌দেশের ক্রিকেটকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, এ ছাড়া আমার কোনও উপায় ছিল না। আমি চেষ্টা করতাম, কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটাররা যেন সমাজে বঞ্চিত না হয়, তাই প্রতিটি রাজ্যে আমার লক্ষ্য ছিল একটাও কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটারকে যেন অকারণে বাদ না দেওয়া হয়। তা করতে গিয়ে প্রচুর সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু আমি দমে যাইনি। আমার লক্ষ্য ছিল একটাই, যেভাবেই হোক আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে হবে আমার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকাকে। সব ক্রিকেটার যে রাজি হতেন আমার প্রস্তাবে, তা নয়। কিন্তু আমি নাগাড়ে দুনিয়ার সেরা ক্রিকেটারদের প্রস্তাব দিয়ে গিয়েছি দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে অংশগ্রহণের জন্য। সেরা ক্রিকেটাররা আসা মানে সেই রাজ্যের ক্রিকেটারদের সামনে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা পাওয়ার সুযোগ। এ কারণে আমি তো ভিভিয়ান রিচার্ডসের মতো ক্রিকেটারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। চেয়েছিলাম যে কোনও মূল্যে স্যার ভিভিয়ানকে আমাদের দেশে তুলে আনতে। ব্ল্যাঙ্ক চেক অফার করার ব্যাপারটা তো গোটা পৃথিবী জানে।’‌ ভিভের মতো ক্রিকেটার একবার বাখারদের দেশে, বিশেষত ওই সময় খেলা মানে, এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে, কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটারদের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সমাজ হাট করে দরজা খুলে দিচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি তো তেমন ছিল না। যা ছিল, সেখানে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি অত্যাচারের ছবিটাই ছিল জোরালো। তাই, ধন্যবাদ জানিয়ে ভিভিয়ান রিচার্ডস, ব্ল্যাঙ্ক চেক ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘‌এক মানুষ, এক ভোট। এই নীতি যেদিন অনুসৃত হবে দক্ষিণ আফ্রিকায়, সেদিন আমি বিনেপয়সায় দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে ক্রিকেট খেলব।’‌
বর্ণবৈষম্য উঠে যাওয়ার পর, সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলি বাখার নিয়ে গিয়েছিলেন ভিভিয়ানকে তাঁদের দেশে। গোটা দেশ আবেগ, উত্তেজনায় ভেসে গিয়েছিল। স্বয়ং নেলসন ম্যান্ডেলা ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন ভিভিয়ানকে, তাঁদের দেশে আসার জন্য। ততদিনে ভিভ খেলা ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু শ্রদ্ধেয় ম্যান্ডেলা জানতেন, গোটা দেশে যখন কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছিল, তখন স্যার ভিভিয়ানের কাছে বিশাল অঙ্কের টাকার প্রস্তাব পেয়েও, তিনি তা গ্রহণ করেননি। এ জন্য, প্রকাশ্যে তিনি আবারও ভিভকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। ওই সময়ে ওদেশে যে পরিবেশ ছিল, সেখানে শুধুই পাওয়া যায় কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি উপেক্ষা। ব্লুমফনটিনের কথাই ধরা যাক। হ্যান্সি ক্রোনিয়ে, অ্যালান্ড ডোনাল্ডদের শহর। জোলা বাডের শহর। এই শহরে, কোনও কৃষ্ণাঙ্গকে থাকার অধিকার দেয়নি সরকার। মহম্মদ আজহারউদ্দিন, অজিত ওয়াদেকারদের সঙ্গে, ৯২–‌তে আমরাও প্রথম বিদেশি হিসেবে ওই শহরে পদার্পণ করেছিলাম। পরে শুনেছি, পাশের শহর থেকে ওই সময় এক কৃষ্ণাঙ্গ নাপিত ব্লুমফনটিনে আসতেন। কিন্তু সূর্যাস্তের আগেই তাঁকে ওই শহর থেকে বেরিয়ে যেতে হত। এতটাই গোঁড়ামি ছিল ওই শহরের কর্তা–‌ব্যক্তিদের। এসব জানা সত্ত্বেও গুচ, বয়কটরা গিয়েছিলেন আরও কিছু পাউন্ড রোজগারের জন্য। স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস যাননি। এ জন্যই তিনি গোটা পৃথিবীতে সিংহের মতোই ঘুরে বেড়াতে পারেন। এ জন্যই তিনি কয়েক কোটি পাউন্ড পাওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাস লেখার সময় যেমন অর্থপিশাচ ক্রিকেটারদের কথা লিখতে হবে, তেমনি লিখতে হবে ভিভিয়ান রিচার্ডসের এই নির্লোভ মানসিকতার কথাও।
এমন দেশে ইতিহাস তৈরির লক্ষ্যে বিরাট কোহলি–‌রবি শাস্ত্রীরা এবার গেলেন। যাওয়ার আগে, বিরাট বলে গেলেন, তাঁর বা তাঁর দলের প্রমাণ করার কিছু নেই। সবে বিয়ে করেছেন, গোটা দেশজুড়ে শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ বর্ষিত হয়েছে তাঁর ও অনুষ্কার ওপর। এসব সত্ত্বেও বিরাটের এই মন্তব্যটা ভাল লাগেনি অনেকেরই। আমরা জানি, তিনি এখন টেনিস–‌তারকা জকোভিচের মতো ফিট। তিনি এখন, বলতে গেলে, প্রতিদিনই ব্র‌্যাডম্যান, লারা, ভিভ, শচীনদের কোনও না কোনও রেকর্ড ভাঙছেন। আরও ভাঙবেন, এ ব্যাপারটাও নিশ্চিত। কিন্তু তার মানে কি দক্ষিণ আফ্রিকায় ভাল খেলার দায় নেই?‌ ভারত কখনও জিতে ফেরেনি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে। আমরা সবাই চাইছি বিরাটের নেতৃত্বে টিম ইন্ডিয়া এবার এবি ডি’‌ভিলিয়ার্সদের গুহা থেকে যেন জিতে ফিরতে পারে। গোটা দেশ শুভেচ্ছার ডালি সাজিয়ে, এই তো ক’‌দিন আগে তাঁদের মুম্বই থেকে রওনা করে দিল। সেখানে বিরাট কিনা বলে বসলেন যে, এই সফরে তাঁদের কিছু প্রমাণ করার নেই!‌ আলবৎ আছে বিরাট। জিততে হবে, হারাতে হবে দক্ষিণ আফ্রিকাকে এবার। এটাই তো প্রমাণ করার ব্যাপার। আমরা অবশ্য এ মুহূর্তে বিরাটের এমন আলগা কথাবার্তা শুনেও না শোনার ভান করে থাকছি। কারণ, তাঁর প্রতি আমাদের ভালবাসা। সৌরভ গাঙ্গুলি পর্যন্ত বলেছেন, বিরাট যখন দায়িত্বে আছে, তখন আমরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারি। একদম ঠিক। আমরাও নিশ্চিন্তে আছি। সবচেয়ে যেটা বড় কারণ, তা হল, ওঁর সততা, সাহস। এবং অবশ্যই যোগ্যতা। এই তিনটে গুণের মিশেলে ক্রমশ তিনি বিরাট কোহলি হয়ে উঠেছেন। আমাদের কোনও কৃতিত্ব নেই। লড়াই করেছেন, পরিশ্রম করেছেন, বুদ্ধি খাটিয়েছেন এবং দুনিয়ার অন্যতম সেরা ক্রিকেটার হয়ে উঠছেন ধীরে ধীরে। এটা তো আমরা সবাই মেনে নিয়েছি। কিন্তু কিছুই প্রমাণ করার নেই, দায় তাঁর, এটা মানতে গিয়ে হোঁচট খেতে খেতে নিজেদের সামলে নিচ্ছি বটে। তবে মন্তব্যটা কানে লেগে আছে। কিছুতেই সরিয়ে ফেলতে পারছি না।
 গ্রেম স্মিথ বলেছেন, কেপটাউনের উইকেটে শুকনো ভাব থাকবে। কারণ, এবার এই পাহাড় ও সমুদ্রঘেরা শহরে বৃষ্টি সেভাবে হয়নি। খরা হয়েছিল। তাই, উইকেটের নিচে স্যাঁতসেঁতে ভাবটা থাকবে কম। ইশান্ত শর্মা তাই বলে গেলেন, সেঞ্চুরিয়ান এবং জোহানেসবার্গের চেয়ে কেপটাউনের উইকেটে ততটা সজীব ভাব থাকবে না। তার মানে এই যে, প্রথম টেস্টে সেভাবে ভারতকে হয়তো আগুনে বলের মোকাবিলা করতে হবে না। তাই কি?‌ বহুদিন পর ডেল স্টেইন ফিরছেন। জোরে বোলাররা, যখনই চোট সারিয়ে প্রত্যাবর্তন করে থাকেন, তখন তাঁরা, অদ্ভুত এক রসায়নে, বাড়তি জোশ নিয়ে ফেরেন। কাকতালীয়, হয়তো। মর্নি মর্কেল থাকবেন, থাকবেন রাবাদা রাও। তবু, ব্যক্তিগতভাবে আমি কিন্তু মনে করি ডেল স্টেইনই হবেন সবচেয়ে বিপজ্জনক বোলার। সিংহের গুহায় ঢোকার সময় স্টেইন যদি সবার আগে হুঙ্কার দিতে দিতে একের পর এক ভারতীয় উইকেট তুলে নেন, অবাক হবেন না।
এ ব্যাপারটা রটে গিয়েছে গোটা পৃথিবীতে যে, ঘাসের উইকেট বানাও। সঙ্গে থাকুক বাউন্স। জোরে বোলারদের পরামর্শ দেওয়া হোক অফ স্টাম্প লক্ষ্য করে ক্রমাগত বল করে যেতে। এবং উইকেটের পেছনে যদি থাকে তৎপর একঝাঁক ফিল্ডার, তাহলে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের কাবু করে ফেলার ব্যাপারটা হয়ে যাবে সহজ। ৪ বছর আগে অ্যান্ডারসন, ব্রডরা এই রাস্তা দেখিয়েছেন বিলেতে। এই ফর্মুলা কপি করে, ফেসবুকের ভাইরালের মতো যা ছড়িয়ে পড়েছে, সব জোরে বোলারের নোট বইয়ে। এখন কিন্তু সবাই জানেন যে, বাড়তি বাউন্স এবং সুইং করিয়ে বিরাটবাহিনীকে সমস্যায় ফেলা যায়। এটাই আপাতত প্রধানতম চ্যালেঞ্জ, বিরাটদের সামনে। কেপটাউন টেস্টে, এই সমস্যাটা সেভাবে হয়তো প্রকট হবে না, কিন্তু পরের দুটি টেস্টে এই সমস্যাটা যে ফণা তুলবেই, এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।
তাহলে ভারত জেতার কথা ভাবছে কী করে?‌ প্রধানত, ভারতীয় বোলিং। এই মুহূর্তে জোরে বোলাররা সত্যিই খুব উন্নতি করেছে। তাই ইশান্ত, ভুবনেশ্বর, সামি, উমেশ, বুমরারা যে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিংকে, একইরকমভাবে, চাপে রাখবেন তাতেও কোনও সন্দেহ নেই। মোদ্দা কথা হল, ভারতীয় বোলিং যদি ডানা মেলতে পারে, তাহলে টিম ইন্ডিয়া আকাশে ওড়ার সুযোগ পাবে। সৌরভ গাঙ্গুলি অবশ্য মনে করেন, ভারতীয় ব্যাটিং যদি ক্লিক করে যায়, তাহলে, সিংহের গুহা থেকে সসম্মানে বেরিয়ে আসা সম্ভব। এতকাল ওদেশ থেকে না জিতে ফেরার অন্যতম কারণ হল, নিজেদের প্রতি ধারাবাহিকভাবে আত্মবিশ্বাসী মনোভাব ধরে রাখা। এবার কিন্তু কোচ এবং অধিনায়ক–‌সহ গোটা দল বিশ্বাস করছে, অবশ্যই দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো যায়। ঘরপোড়া গরুর মতো অবস্থা আমাদের। এমন আত্মবিশ্বাসী কথাবার্তা শুনেও যেন তা হজম করতে পারছেন না অনেকেই। কিছুই প্রমাণ করার নেই কোনও তাগিদ, স্বয়ং অধিনায়কের মুখে একথা শোনার পরও অনেক ক্রিকেটপ্রেমী বিশ্বাস করতে চাইছেন না, বিরাটরা সিংহের গুহা থেকে বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে আসতে পারবেন। সফরে ভারত তিনটি টেস্ট, ৬টি একদিনের আন্তর্জাতিক এবং ৩টি টি–‌২০ ম্যাচ খেলবে। সিংহের গুহা থেকে জিতে ফেরার কথা বোঝাতে গিয়ে সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা প্রধানত তিনটে টেস্ট সিরিজ জয়ের কথাই বোঝাতে চাইবেন। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের পুরনো অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ৩ ঘরানার ক্রিকেটেই গুহার ভেতরে টিম ইন্ডিয়াকে কেশর ফোলানো সিংহবাহিনীকেই দেখতে পাওয়া যাবে। ■

জনপ্রিয়

Back To Top