শিবাজী চট্টোপাধ্যায়: মাত্র ৬৯ বছরের জীবন। মাত্র ৬৯টা বসন্ত। কিন্তু এই ছোট্ট সময়ে তাঁর জীবনখাতার প্রতি পাতার হিসেবনিকেশে শুধুই দেওয়ার ঘরের পাল্লা ভারী। যোগবিয়োগের খেলায় কেবলই কাটাকুটি। সেখানে যেন শুধুই হেমন্তে পাতা খসে পড়ার শব্দ। মনের ঘরের একাকী কোণে রিক্ততা আর শূন্যতার কথোপকথন। তবু সব কিছুকে পাশ কাটিয়ে তিনি নিজেকে করে তুলেছিলেন মহীরুহ। বাংলা সঙ্গীতদুনিয়ার মসিহা। কী এক অদম্য চেষ্টায় হয়ে উঠেছিলেন মাইলস্টোন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নামটাই একটা ‘‌ইনস্টিটিউশন’‌। তবু কম আঘাত তো দেয়নি তাঁকে জীবন। একদিকে চরম দারিদ্র‌্যের সঙ্গে লড়াই, অন্যদিকে সামাজিক ঘাত–প্রতিঘাতে রক্তাক্ত হৃদয়। সব মিলিয়ে জীবনপুরের এক লড়াকু পথিক। শুধু মনের খবরটাই রয়ে গেল অজ্ঞাতে। তবু আশ্চর্যের ব্যাপার, এত লড়াইয়ের মধ্যেও তাঁর সঙ্গীতজীবন ছিল প্রায় ৬০ বছরের!‌ সুতরাং গান যে তাঁর ধমনীতে বইত এটা বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না। 
ব্যক্তি হেমন্ত ছিলেন প্রথম দিকে পঙ্কজ মল্লিকের অন্ধ ভক্ত। তখন চোখকান বন্ধ করে পঙ্কজ মল্লিককে কপি করতেন। কোনও জলসায় ডাক পেলে পঙ্কজ মল্লিকের গানই তখন একমাত্র অবলম্বন ছিল। সে সময় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে লোকজন ‘‌ছোট পঙ্কজ’‌ বলে ডাকতে শুরু করেছিল। ক্রমে গান তাঁর জীবনে এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছোল যে, লেখাপড়া ছেড়ে দিলেন দুম করে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, যদি বাঁচেন গানকে ধরেই বাঁচবেন। 
এদিকে ভাইবোন, দাদাবউদি–সহ একটা গোটা পরিবারের ভার তখন ওঁর ওপর। কী করবেন?‌ কীভাবে বাঁচাবেন পরিবার?‌ কীভাবে বাঁচাবেন নিজের স্বপ্নকে?‌ গানের টিউশন করা শুরু করলেন। আর্থিক সঙ্কটে দীর্ণ, জীর্ণ হেমন্তদার সেই সময়টায় কোনও বিশ্রাম ছিল না। দিনরাত গানের টিউশন করতেন। হেমন্তদা মারা যাওয়ার পর একবার ওঁর বউদি কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, সেই সময়টায় একদিন টিউশনে যাওয়ার জন্য বউদির কাছ থেকে ৪ আনা পয়সা নিয়েছিলেন। রাতে বাড়ি ফিরে বউদির ওপর রেগে কাঁই। বললেন, একটা অচল পয়সা দিয়ে দিয়েছ?‌ জানা গেল, পয়সাটা চালাতে না পারায় ভবানীপুর থেকে শ্যামবাজার হেঁটে যাতায়াত করতে হয়েছে।  
বিশ্রাম অবশ্য কোনওদিনই ছিল না। পরবর্তিকালে যখন নিজেকে বাংলা গানের জগতে একমেবদ্বিতীয়ম করে তুললেন তখনও একতিল বিশ্রাম পাননি। শুধু কর্তব্য করতে করতেই ক্ষয়ে গেছেন ভেতরে ভেতরে। তবু কোনওদিন তাঁকে বিরক্ত হতে দেখা যায়নি। নিজের পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা তো ছিলই। অন্যদিকে আইপিটিএ–তে বেলার সঙ্গে আলাপ এবং পরবর্তিকালে বিয়ে হওয়ার পর বেলা বউদির পরিবারের যাবতীয় দায়িত্বও এসে পড়ে। বলতে গেলে হেমন্তদাই তখন হয়ে গেলেন বউদি–র বাপেরবাড়ির পরিবারের অভিভাবক। অর্থ দিয়ে, সামর্থ্য দিয়ে এই দুই পরিবারকে আগলে রেখেছেন হেমন্তদা। কোনওদিন নিজের চাওয়া–পাওয়া বা আনন্দর দিকে ফিরে তাকাননি। বিলাসিতার তো নামমাত্র ছিল না। প্রিয়জনদের বাঁচাতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তবু মুখের হাসিটি কখনও ম্লান হতে দেখিনি। 
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মাইলস্টোন হয়ে ওঠার পেছনে বেলা মুখোপাধ্যায়ের ত্যাগও কম ছিল না। তবু মনের কোনও গভীরে বউদির বেশ কিছুটা অভিমান লুকোনো ছিল। অভিমানের মোড়কে কষ্টও বলা যায়। বউদি নিজেই বলেছিলেন, যখন তাঁর হেমন্তদার সঙ্গে দেখা হয়, তখন হেমন্তদার থেকে নাকি ওঁর নামডাক বেশি ছিল। কিন্তু পরবর্তিকালে হেমন্তদার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর তাঁর স্বপ্নের সমাধি হয়ে যায়। তাই শেষের দিকে বোধহয় বউদির মধ্যে একটা ক্ষোভ বা অনুশোচনা কাজ করেছিল। ভেবেছিলেন, আমিও তো পারতাম। কিন্তু সংসার সামলাতে গিয়ে হয়ে উঠল না। আসলে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এমন একটা সূর্য ছিলেন যাঁর প্রচণ্ড তেজের কাছে অনেকের আলোই ম্লান হয়ে যেতে বাধ্য ছিল। হেমন্ত প্রতিভার কাছে বেলা ছিলেন অনেক কম। তবু বেলা যে স্বামী গরবে গরবিনি ছিলেন তা তাঁকে দেখে বিলক্ষণ বোঝা যেত। 
হেমন্তদার মনে বহু কষ্ট ছিল। বহু দুঃখের খতিয়ান তিনি সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। নিজের মেয়েকে নিয়েও তাঁর একটা দুঃখের জায়গা ছিল। মেয়ে রাণু খুব ভাল গান গাইত। ভারী মিষ্টি গলা ছিল। কিন্তু রাণুর যখন নিজেকে প্রতিষ্ঠার সময় তখন মেয়েকে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়ার মতো সময় হেমন্তদার হাতে ছিল না। তখন তিনি মধ্যগগনে। নিজের কর্তব্য পালনের জন্য অর্থের পেছনে ছুটছেন প্রতিনিয়ত। কিন্তু রাণু হয়তো ভেবেছিলেন বাবা তাঁকে শিল্পী হিসেবে চেনানোর ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা নেবেন। চাহিদাটা যে খুব অনুচিত তা বলছি না। তবু সেই চাহিদার মর্যাদা দেওয়ার মতো সময় তখন হেমন্তদার ছিল না। সুতরাং রাণুর আর সেই পরিচিতি পাওয়া হয়ে ওঠেনি। এই নিয়ে মেয়ের বাবার ওপর যথেষ্ট অভিমান ছিল। কিন্তু রাণু তো তাঁর বাবার অবস্থার কথা জানতেন। তাঁর মাথার ওপর কত বড় বোঝা ছিল তাও জানতেন। তাই বাবার অপেক্ষায় বসে না থেকে রাণুর নিজে উদ্যমী হওয়া বোধহয় উচিত ছিল। হেমন্তদার মৃত্যুর আগে বাপ–মেয়ের সেই মান– অভিমানের পালা সাঙ্গ হয়েছিল। ছেলে জয়ন্ত কিন্তু মোটেই বাবার মতো গলা পাননি। তবু গান যে একেবারেই গাইতেন না তেমনটা নয়। কিন্তু নিজে থেকে একেবারেই গাইতে চাইতেন না। জোর করলে বলতেন, গলা কি আছে?‌ কী গাইব!‌ এ জন্য জয়ন্তর মনে অবশ্য কোনওদিন কোনও ক্ষোভ দেখিনি। বাবার প্রতি তাঁর কোনও অভিমানও ছিল না। আসলে আমার সবসময় মনে হয়েছে একটা হেমন্তের মধ্যে বহু হেমন্তের বসবাস। সেখানে যেমন ছিলেন ঘোর সাংসারী হেমন্তদা, সেরকমই ছিলেন ব্যক্তি হেমন্তদা, মানবিক হেমন্তদা, লড়াকু হেমন্তদা এবং অবশ্যই নিজের অন্তরে কষ্টকে লালন করা একজন আদ্যন্ত শিল্পী। কর্মই যাঁর জীবনের এক এবং একমাত্র আদর্শ। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, গীতার কর্মযোগ অধ্যায়টা বোধহয় হেমন্তদা নিজের জীবনের আদর্শ করে নিয়েছিলেন। আর সেই আদর্শ পালন করে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। 
৬০–৭০–এর দশক। তুমুল হেমন্তযুগ। যেখানেই হাত দিয়েছেন সোনা ফলেছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় যেন এক খনি। যেখানে বিভিন্ন রত্নের সহাবস্থান। সেই সঙ্গে উত্তমকুমার। এমন রাজযোটক জুটি তো বাংলা সিনেমা আর পায়নি। এ যেন ঈশ্বর নির্দিষ্টই ছিল। সিনেমায় উত্তম মানেই হেমন্তকে চাই–ই। আর সুরে, গানে হেমন্ত মানে উত্তমকে পেতেই হবে। এ যেন পরিচালক–প্রযোজকদের এক অলিখিত নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সূর্য চিরন্তন হলেও তার আলোকে আড়াল করার একটা চেষ্টা তো থাকেই। হেমন্তদাকেও সেই অপচেষ্টার মধ্যে পড়তে হল। চেষ্টা চলল, কীভাবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাজ কমিয়ে দেওয়া যায়। কীভাবে তাঁকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেওয়া যায়। তার থেকেও যেটা ঘৃণ্য চেষ্টা সেটা হল জোর তৎপরতা শুরু হল হেমন্ত–উত্তম জুটিকে ভেঙে দেওয়ার। কী জঘন্য ষড়যন্ত্র!‌ ফলও হল। ‘‌বিশ সাল বাদ’‌ ছবিতে হেমন্তদার ইচ্ছে ছিল ওয়াহিদা রহমানের বিপরীতে উত্তমবাবুকে নায়ক করার। কিন্তু অদৃশ্য কারণে উত্তমকুমার রাজি হলেন না। নায়ক হলেন বিশ্বজিৎ। ঘটে গেল মনকষাকষি। উত্তম–হেমন্ত জুটিতে চিড় ধরল। অথচ দু’‌জন দু’‌জনকে কী শ্রদ্ধাটাই না করতেন। খুব কষ্ট পেয়েছিলেন হেমন্তদা। উত্তমকুমারের লিপে হেমন্তর গান কমে যেতে লাগল। হেমন্তদাও বোধহয় অভিমান থেকে উত্তমবাবুর লিপে সেভাবে গাইতে চাইছিলেন না। জীবনের একটা অন্য মোড়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ওই সময়টা আমার মতে হেমন্তদার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায়। 
উত্তম আবহাওয়া থেকে বেরিয়ে এসে তখন যে কোনও নায়কের লিপেই গান গাইতে শুরু করলেন। কে ছিলেন না সেই তালিকায়?‌ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়,অনুপকুমার, শমিত ভঞ্জ, অনিল চট্টোপাধ্যায়, কালী ব্যানার্জি, রঞ্জিত মল্লিক, তাপস পাল.‌.‌.‌। এটা হেমন্তদার বিচক্ষণতা বলেই আমার মনে হয়। তিনি সবার লিপে গান গেয়ে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, তিনি কেবল উত্তমকুমারের লিপে বাঁধা থাকার জন্য নন। তিনি সর্বজনীন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর, তাঁর কণ্ঠ খোলা হাওয়ার মতো। যে কোনও শূন্যস্থানে নির্দ্বিধায় খেলে বেড়াতে পারে। এই সময়টাতেও কিন্তু প্রযোজক–পরিচালকরা তাঁদের পছন্দের তালিকায় সুরকার, গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে এক নম্বরেই রেখেছিলেন। তাই কোনও ষড়যন্ত্র বা অপচেষ্টা তাঁকে ছুঁতেও পারেনি। 
অথচ অর্থের টানাটানিতে কখনও ঠিকঠাক গানটাও শিখে উঠতে পারেননি। ওঁর যেটুকু শেখা সবটাই ছিল কানে শুনে। প্রথাগত তালিম নেওয়ার সুযোগ পেলেন কই!‌ রেওয়াজ যে করবেন সময় কই?‌ তখন তো তাঁকে পয়সার পেছনে ছুটতে হচ্ছে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তো নাড়া বেঁধে কোনওকালেই শেখেননি। তবু কোনও কোনও সুরে এমন সব শস্ত্রীয় সুর, লয় দিয়ে গেছেন যা আচ্ছা আচ্ছা শাস্ত্রীয় শিল্পীকেও তাজ্জব করে দেয়। এ কি মানুষ?‌ নাকি সিদ্ধপুরুষ?‌ হেমন্তদাই একমাত্র সুরকার, যিনি শুধুমাত্র গান দিয়েই ছবি হিট করে দিতে পারতেন। এরকম অজস্র প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে। যেমন নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের ‘‌অদ্বিতীয়া’‌। ছবিটা সেভাবে চলেনি। কিন্তু ছবির গানগুলো সুপার ডুপার হিট। ‘‌যাবার বেলায় পিছু থেকে ডাক দিয়ে’‌ বা ‘‌চঞ্চল মন আনমনা হয়’‌–এর মতো ‘‌অদ্বিতীয়া’‌র গানগুলো তো এখনও হিট!‌ 
ঠিক ওই সময়টায় উত্তমবাবুর ছবি–জীবনেও একটা বড় পরিবর্তন হল। হেমন্তদা সরে যাওয়ার পর উত্তমকুমারের ছবির সেই রোম্যান্টিসিজম কমে গেল। সেই জায়গায় এল অভিনয়ের এক অন্য ধারা। যার ফলে উত্তমের লিপে তখন ধরা দিলেন মান্না দে, শ্যামল মিত্র, কিশোরকুমাররা। বড্ড বেশি ভাগ্যবিশ্বাসী ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। প্রায়ই বলতেন কপালে থাকলে হবে। না হলে হবে না। যে ছবিগুলো শুধু গান দিয়ে হিট করে দিতেন, সে প্রসঙ্গে একবারও নিজের কৃতিত্ব দাবি করতে শুনিনি। বলতেন, ভাগ্যে ছিল তাই হিট করে গেছে। আর এই ভাগ্যই বোধহয় ওঁকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। 
চরম সত্যি এটাই যে, কখনও কোনওদিন হেমন্তকুমার হওয়ার ইচ্ছে তাঁর ছিল না। পরিচালক হেমেন গুপ্ত বঙ্কিমচন্দ্রের ‘‌আনন্দমঠ’‌ ছবির মিউজিক করার জন্য হেমন্তদাকে প্রথম মুম্বই নিয়ে যান। অভিনয়ে পৃথ্বীরাজ কাপুর, গীতা বালি, প্রদীপকুমার, ভারতভূষণ। জন্ম নিল ‘‌বন্দেমাতরম্‌’‌–এর সেই বিখ্যাত সুর। যা আজও ইতিহাস। ‘‌আনন্দমঠ’‌ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫২–তে।  ‌‌ওই একটি ছবিতেই নিজের জাত চিনিয়ে দিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। এরপরই প্রযোজক শশধর মুখার্জির নজরে পড়লেন। শশধর মুখার্জি  মুম্বইতেই তাঁর কোম্পানিতে হেমন্তদাকে চাকরি দিলেন। শর্ত হল, কেবলমাত্র ওঁর কোম্পানির হয়েই কাজ করতে হবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে। এরপর বেশ ক‌য়েক বছর শশধর মুখার্জির কোম্পানির হয়ে সুরকার হিসেবে কাজ করেন হেমন্তদা। কিন্তু যে ক’‌টা ছবি করেছিলেন তাতে গানগুলো জনপ্রিয়তা পেলেও ছবি চলেনি। সুতরাং সাফল্য বলতে যা বোঝায় তা পাওয়া হল না। বেশ কিছু ছবি এরকম হওয়ার পর হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ঠিক করলেন, তিনি কলকাতায় ফিরে আসবেন। ভাবলেন মুম্বই তাঁর জায়গা নয়। সে কথা জানিয়েও দিলেন শশধরবাবুকে। কিন্তু শশধর মুখার্জি সায় দিলেন না। তাঁর জেদ, একটা সাফল্য না দিয়ে তিনি কিছুতেই হেমন্ত মুখার্জিকে কলকাতায় ফিরে যেতে দেবেন না। কিন্তু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মন কিছুতেই সায় দেয় না। তবু জেদ ধরে বসলেন শশধর মুখার্জি। ভাগ্যিস জেদ ধরেছিলেন। তাই তো আর এক ইতিহাস তৈরি হল। সালটা ১৯৫৩–৫৪। তৈরি হল ‘‌নাগিন’‌। প্রযোজক মহেন্দ্র শাহ। পরিচালক নন্দলাল জসবন্তলাল। সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে হেমন্তকুমার। 
‘‌নাগিন’‌–এর একটা নেপথ্য কাহিনি আছে। মুক্তি পাওয়ার পর বেশ কিছুদিন কিন্তু ছবিটা মোটেই চলেনি। প্রেক্ষাগৃহগুলো মাছি তাড়াচ্ছিল। কিন্তু যত দিন যেতে লাগল ততই যেন ধীরে ধীরে পারদ উঠতে লাগল। একসময় ‘‌নাগিন’‌ যেন সুনামি হয়ে দেখা দিল। এক একটা হলের সামনে ছবি দেখার জন্য জনস্রোত। শয়ে শয়ে মানুষ রাত–দিন জেগে টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। মিছিলের মতো লোক ছবি দেখতে যাচ্ছে। হল ভাঙলে ভিড়ে ভিড়। রাস্তা প্রায় বন্ধ। এ আমার নিজের চোখে দেখা। আর তার থেকেও বড় কথা হল এ ছবির গান। লোকের মুখে মুখে ফিরছে তখন। ওই মন কেমন করা বীণ। তার ওপর লতা মঙ্গেশকরের গলায় ‘‌মন ডোলে মেরা তন ডোলে’‌, ‘‌শুন রসিয়া মন বসিয়া’‌ বা হেমন্তকুমারের গলায় ‘‌তেরা দ্বার খাড়া এক যোগী’‌, অথবা হেমন্ত–আশার ডুয়েট ‘‌ইয়াদ রাখনা প্যার কি নিশানি’‌ যেন আলোড়ন ফেলে দিল। এক লহমায় হেমন্তদা মুম্বইয়ের জনপ্রিয় হেমন্তকুমার হয়ে গেলেন। 
যত দিন গেল ক্রেজ বাড়তে লাগল। কাজের চাপ বাড়ল হাজারগুণ। একের পর এক কাজ আসতে লাগল। কিন্তু কলকাতাও তখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে ছাড়া প্রায় অচল। কী করা যায়?‌ কলকাতা ও মুম্বইতে একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করলেন। যাতায়াতটা প্রায় ডেইলি প্যাসেঞ্জারির জায়গায় চলে গেল। সেই সময়টায় দম ফেলার সময় ছিল না হেমন্তদার। একের পর এক দুর্দান্ত সব কাজ করে গেছেন। মঙ্গেশকর পরিবারের সঙ্গেও বিপুল দহরম মহরম ছিল। এই পরিবারের সদস্যরা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে প্রায় নিজেদের বাড়ির লোক বলেই মনে করতেন। আশা ভোসলে বা লতা মঙ্গেশকর তো নিজের দাদার জায়গায় বসিয়েছিলেন। আসলে লতা মঙ্গেশকরের জীবনের এক ঘোর সঙ্কটের দিনে দাদার মতোই পাশে দাঁড়িয়েছিলেন হেমন্ত। সেই ঋণ লতা ভুলতে পারেননি। সেটা ‘‌বিশ সাল বাদ’‌–এর সময়কার ঘটনা। তখন লতার গলায় একটা ভয়ানক সমস্যা চলছিল। সেটা এতটা মারাত্মক ছিল যে, লতা ভাবতে শুরু করেছিলেন, তিনি হয়তো আর কখনও গানই গাইতে পারবেন না। ভেঙে পড়ছিলেন দিন দিন। তখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় একপ্রকার জোর করেই লতাকে দিয়ে ‘‌বিশ সাল বাদ’‌–এ ‘‌কহিঁ দীপ জ্বলে কহিঁ দিল’‌ গানটা গাওয়ালেন। ছবি রিলিজ হতেই গান সুপার ডুপার হিট। লোকের মুখে মুখে ফিরতে লাগল। আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেন লতা। শুরু হল তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়। এভাবে যে কত শিল্পীর পাশে দাঁড়িয়েছেন, কতজনকে শিল্পী তৈরি করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। তার প্রমাণ তো আমি নিজেই। চলছিল ভালই। কিন্তু ১৯৭০–এ ‘‌খামোশি’‌ করতে গিয়ে ঋণের বোঝায় প্রায় ডুবে গেলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ছবিটা ছিল ‘‌দীপ জ্বেলে যাই’‌–এর হিন্দি ভার্সান। ধারদেনা এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছোল যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে গেলেন। 
এই সময়টায় খুব কাছ থেকে দেখেছি ওঁকে। কী পরিশ্রমটাই না করতেন!‌ এমনও হয়েছে দিনে ৭/‌৮টা পর্যন্ত ফাংশন করেছেন। তাও নামমাত্র পারিশ্রমিকে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এক একটা ফাংশন করছেন ৫০০/‌৬০০ টাকায়। ভাবা যায়?‌ নাওয়া–খাওয়া ছিল না ওই সময়টায়। কী করেই বা থাকবে?‌ কত দায়িত্ব, কত কর্তব্য তাঁর কাঁধে। কীভাবে তাঁর বিশাল পরিবারের লোকগুলোকে ভাল রাখবেন, সুখে রাখবেন সে সব ভেবেই রাতদিন খেটে যেতেন। একদিকে অসম্ভব মানসিক চাপ অন্যদিকে অমানসিক শারীরিক পরিশ্রম— এই দুইয়ের জোড়া ফলায় তখন ক্ষতবিক্ষত এক মহীরুহ। তাঁকে যেন ভেতরে কুরে কুরে খাচ্ছে প্রবল চাপের ঘুণপোকা। আর এই চাপই হয়তো তাঁকে সময়ের অনেক আগে সুরের জলসা থেকে টেনে নিয়ে চলে গেল। অথচ এই ছোট্ট জীবনে কত কী–ই না করেছেন!‌ গান গেয়েছেন, সুর করেছেন, ছবি প্রযোজনা করেছেন, অর্থের জন্য লড়াই করেছেন, নতুনদের শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। 
উনি ছিলেন বলেই তো আমি আমি। নইলে আমি কোথায়?‌ আমি সঙ্গীত পরিচালক অনুপম মুখার্জির সহকারী হিসেবে কাজ করতাম। উনি ক্যাসেটে গান দিতেন। সুরকারের হয়ে আমি শিল্পীদের তুলিয়ে দিতাম। কিন্তু আমার একটা অন্য ব্যাপারও ছিল। আমি এর বহু আগে থেকেই মঞ্চে মঞ্চে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান গেয়ে বেড়াতাম। যেখানে হেমন্তদা গাইতেন, আয়োজকরা আমাকেও গাইতে বলতেন। সে সময়টায় তরুণ মজুমদার–হেমন্ত মুখোপাধ্যায় জুটি হিট। বহু জায়গায় আমি ‘‌ফুলেশ্বরী’‌র গান গাইতাম। আমার একটা ব্যাপার ছিল। হেমন্তদা অনুষ্ঠানে ছবির কোন কোন গান গাইতে পারেন আমি জানতাম। আমি সেগুলো ছেড়ে অন্যগুলো গাইতাম। এভাবেই হেমন্তদা আমার নাম জানতেন। কিন্তু হৃদ্যতা এমন কিছু ছিল না। পরিচয়টা গড়ে উঠল ‘‌ভালবাসা ভালবাসা’‌ ছবির সময় থেকে। ১৯৮৪–৮৫ সাল। পরিচালক তরুণ মজুমদার। সে সময় হেমন্তদার গলায় সমস্যা চলছিল। কিছুতেই নিজে গান গেয়ে সন্তুষ্ট হচ্ছিলেন না। কিন্তু হেমন্তদার কণ্ঠ ছাড়া পরিচালকও সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। অগত্যা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গায়কির একটি ছেলের প্রয়োজন পড়ল। সঙ্গীত পরিচালক সমীর শীল আমার কথা বললেন পরিচালককে। এইচএমভি–র মুখার্জিদাও আমার নাম অনুমোদন করলেন। ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল। রবীন্দ্রনাথের গান গাইলাম— ‘‌এবার নীরব করে দাও’‌, ‘‌হার মানা হার’‌। সঙ্গে ‘‌খোঁপার ওই গোলাপ দিয়ে’, ‘‌এই ছন্দ কী আনন্দ’‌। হেমন্তদার অনবদ্য সুর। হেমন্তদা নিজে বসে গান তোলালেন। এক স্বর্গীয় অনুভূতি। ছবি যখন মুক্তি পেল হেমন্তদা তখন মুম্বইতে। ফিরে এসে বললেন, তোমার গান তো হিট করে গেল হে। লোকে তোমাকে ‘‌ছোট হেমন্ত’‌ বলছে তো?‌ আমাকে তো লোকে ‘‌ছোট পঙ্কজ’‌ বলত। তারপর থেকে হেমন্তদার প্রতিটি ছবিতেই আমার একটা অলিখিত উপস্থিতি হয়ে গিয়েছিল। 
১৯৮৫–৮৯ আমি ছিলাম হেমন্তদার ছায়াসঙ্গী। তখনই দেখেছি কীভাবে নীলকণ্ঠের মতো জীবনের যাবতীয় জ্বালা, দুঃখ, যন্ত্রণাকে হাসি দিয়ে আড়াল করে রাখতেন। কোনও দিন কোনও কিছু নিয়ে আফসোস করতে দেখিনি। একটা দুঃখ ছিল বরাবর। সেটা হল, ওঁর ছেলে–মেয়ের প্রতিষ্ঠাটা ওঁর চাহিদা মতো হয়নি। আর কষ্ট পেয়েছিলেন উত্তমবাবুর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিতে। আর হ্যাঁ। রবীন্দ্রনাথের গান তো বড় ভালবাসতেন। তাই ওঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়াকে কেন্দ্র করে বিশ্বভারতীর একটা দল যেভাবে ওঁকে অপদস্থ করতে শুরু করেছিল এবং তুমুল সমালোচনায় বিদ্ধ করা আরম্ভ হয়েছিল তাতেও কষ্ট পেয়েছিলেন। এই ব্যাপারটা মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। তখন খবরের কাগজগুলো পর্যন্ত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেছিল। এটা তো অস্বীকারের উপায় নেই যে, সে সময়কার কিছু শিল্পীরও ভয়ানক রাগ ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ওপর। তাঁদের বক্তব্য ছিল, পরিচালকরা কেন তাঁদের বাদ দিয়ে কেবল হেমন্তকেই কাজ দেন। হেমন্ত–বিরোধিতায় এই রাগও অনেকটাই ইন্ধন জুগিয়েছিল। তবু হিমালয়ের মতো সব ঝড়ঝঞ্ঝাকে কেমন শান্তভাবে সয়ে যেতে দেখেছি। ভেতরে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বাইরে তার প্রতিফলন নেই। 
এই ভাঙচুর দেখেছিলাম সলিল চৌধুরী যখন ‘‌রাণার’‌ গানটা ফের লতা মঙ্গেশকরকে দিয়ে গাওয়ালেন সেই সময়টায়। সলিল চৌধুরী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে অভিভাবকের মতো শ্রদ্ধা করতেন। সলিলের যাবতীয় পরীক্ষা–নিরীক্ষার সঙ্গে হেমন্ত জড়িয়ে থাকতেন। আসলে লতাকে দিয়ে ‘‌রাণার’‌ গাইয়ে সলিল গানটার একটা রি–সাকসেস খুঁজছিলেন। কারণ তখন সলিল চৌধুরীর কর্মজীবনে একটা ভাঁটা চলছিল। চাইছিলেন নতুন একটা কিছু দিয়ে নতুনভাবে মানুষের মনে জায়গা করে নিতে। তখনই দেখেছি বিচলিত হেমন্তদাকে। রীতিমতো ছটফট করছেন। কী হবে?‌ যদি লতার গানটা সাফল্য পায় তাহলে হেমন্তর ‘‌রাণার’‌ কি ভুলে যাবে মানুষ?‌ এটাই ছিল চিন্তার কারণ। কিন্তু লতার ‘‌রাণার’‌ মানুষ নেয়নি। আজও মানুষের মনে হেমন্তরই গাঁয়ের বধূ, পালকির গান, অবাক পৃথিবী, ঠিকানা বা রাণার। ‌
শুধুই দিয়ে গেছেন সারা জীবন ধরে। পেলেন কই?‌ শেষ সময়টায় একদিকে ব্লাড সুগার, পেসমেকার, তার ওপর পা ভাঙা। শরীরে চূড়ান্ত অস্বস্তি। তারওপরেই একের পর এক ফাংশন করে গেছেন। শুধু পয়সার জন্য। তিনতলা বাড়িতে ওই শরীর নিয়ে হেঁটে ওঠানামা করতেন। চূড়ান্ত মানসিক চাপ। এই সব কিছুই হেমন্তদাকে বড় অসময়ে টেনে নিয়ে গেল। একটা রিক্ত মানুষ। ঈশ্বরতুল্য। দু’‌হাত ভরে কেবল দিয়েই গেছেন সারাজীবন। সংসার, সমাজ সবক্ষেত্রেই। সঠিক সময়ে যোগ্য সরকারি সম্মানটুকুও তো পাননি। কেন পাননি সেটা আজও রহস্য। আর যখন সরকারি তরফে হুঁশ ফিরেছে, সম্মান দেওয়ার কথা মনে পড়েছে, তখন হেমন্তদা আর নেননি। প্রত্যাখ্যান করেছেন। একটা চাপা অভিমান হয়তো কাজ করেছিল এই প্রত্যাখ্যানের পশ্চাতে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর অ্যাবস্‌ –এর পক্ষ থেকে ওঁর সাদার্ন অ্যাভিনিউ–এর বাড়ির পাশে মেনকা সিনেমার সামনে হেমন্তদার একটা মূর্তি বসানো হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজে ছোটদের জন্য ওঁর নামে একটা শয্যা করা হয়েছে। একটা বুকসেলফও করা হয়েছে। আর হয়েছে ওঁর নামে একটা মেট্রো স্টেশন। ব্যাস্‌। এটুকুই কি যথেষ্ট হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো একজন শিল্পীর জন্য?‌ ওঁর শততম জন্মদিন অ্যাবস্‌ পালন করবে বিশালভাবে। ২০২০–র ১৬ জুন মেনকা সিনেমার সামনে হবে সান্ধ্যকালীন অনুষ্ঠান। মূল অনুষ্ঠান হবে রবীন্দ্রসদনে। সারা বছর ধরে চলবে হেমন্ত ১০০–র অনুষ্ঠান। এটাই আমাদের গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো। নীল ধ্রুবতারার মতোই তিনি আমাদের পথ দেখাবেন চিরকাল, চিরদিন।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top