অরিন্দম সাহা সরদার: রবীন্দ্রনাথের গান কোথায় না গাওয়া হতো।  সভাসমিতি, নাটকের মঞ্চ, উপাসনাগৃহ। গানগুলি জনপ্রিয়ও হয়েছিল খুব। বিশ শতকের গোড়ায় রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্তের জন্য বাংলা গানে এসেছিল স্বর্ণযুগ। রেকর্ডের গানেও এল জোয়ার। 
বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় (‌১৯০৫–‌১৯০৬)‌ প্রথম ‘‌এইচ.‌ বোসেজ রেকর্ড’‌ নামে বাংলায় সিলিন্ডার রেকর্ডের বিক্রি শুরু হল। রবীন্দ্রনাথের গান সেই রেকর্ডে মুদ্রিত হল। গাইলেন রবীন্দ্রনাথ নিজেই। হেমেন্দ্রমোহন বসুর ফোনোগ্রাফ যন্ত্রে এই গান মুদ্রিত হল। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘‌খামখেয়ালি সভার প্রত্যেক অধিবেশনের জন্যই বাবা নতুন গান বেঁধে রাখতেন। যৌবন বয়সে বাবা কী মিষ্টি অথচ জোরালো গাইতে পারতেন, লোকে তাঁর গান শোনার জন্য কিরকম পাগল হয়ে যেত, যারা না শুনেছে তারা কল্পনা করতে পারবে না। গ্রামোফোন তখন আবিষ্কার হয়নি, তাঁর গলার রেকর্ড কয়েকটি মাত্র আছে, কিন্তু তাও বৃদ্ধবয়সে নেওয়া, তখন গলা পড়ে গেছে। তখনকার দিনে ফোনোগ্রাফ নামে মেশিন ছিল, মোমের সিলিন্ডারের উপর রেকর্ড উঠত। তার নকল নেওয়া যেত না। ‘‌কুন্তলীন’‌–‌এর এইচ.‌ বোস এই মেশিন এ দেশে আমদানি করেন। তিনি বাবার গলার বিস্তর রেকর্ড নিয়েছিলেন। কয়েক বছর পূর্বে তাঁর ছেলে নীতীনকে এই রেকর্ডগুলির খোঁজ নিতে বলি। দুঃখের বিষয় বহু অনুসন্ধানের পর কয়েকটি মাত্র সিলিন্ডার পাওয়া গেল— সেগুলিও তখন নষ্ট হয়ে গেছে।’‌ (‌‘‌পিতৃস্মৃতি’— রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৩৮৭, পৃঃ ২১–‌২২)‌
‌পরে সিলিন্ডার রেকর্ডের দিন ফুরিয়ে এল। হেমেন্দ্রমোহন বুঝতে পারলেন, নতুন পথে যেতে হবে। ফ্রান্সের প্যাথে কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ‘‌ডিস্ক’‌ রেকর্ডের ব্যবসা শুরু করলেন তিনি। সময়টা ১৯০৮ সাল।  সম্ভবত স্বদেশি আন্দোলনের সময়ে একটি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ফরাসি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করা হেমেন্দ্রমোহন শ্রেয় মনে করেছিলেন। 
দেশে গ্রামোফোন কোম্পানির শাখা অফিস খোলা হয় ১৯০১ সালে অক্টোবর মাসে চৌরঙ্গিতে। এই কোম্পানির দপ্তর ১৯০২ সালের ১ মে নিয়ে যাওয়া হয় ডালহৌসী স্কোয়্যারে। গ্রামোফোন কোম্পানির কলকাতার কারখানায় সালে অনুকূলচন্দ্র দাসের কণ্ঠে ‘‌বাঁশিতে ডেকেছে কে’‌ কবির এই গানটি প্রথম রেকর্ডে মুদ্রিত হয়। সময়টা সম্ভবত ১৯০৮–‌১৯০৯ সাল।  এই তথ্য ‘‌দি বেঙ্গলি’‌ পত্রিকার একটি বিজ্ঞাপন (‌১.‌৯.‌১৯০৯)‌ থেকে নেওয়া। ১৯১১ সালে জেনোফোনের রেকর্ড তালিকায় দেখা যায় বলাইদাস শীল, মানদাসুন্দরী দাসী ও পূর্ণকুমারী রবীন্দ্রনাথের একাধিক গান রেকর্ড করেছেন। ১৯১১ সালে বলাইদাস শীলের গাওয়া কবির গান ‘‌ব্রহ্মসঙ্গীত’‌ নামে প্রচারিত হয়। মনে রাখতে হবে, তখনও রবীন্দ্রনাথের গান ‘‌রবীন্দ্রসঙ্গীত’‌ হয়ে ওঠেনি। রেকর্ড–‌লেবেলে তখন গীতিকার–‌সুরকারের নাম উল্লেখ হত না। গানের পাশে রাগরাগিণীর নাম লেখা হত। রবীন্দ্রনাথের নাম রেকর্ড লেবেলে ছাপা হয় ১৯২৫ সাল নাগাদ। সে সময় বাইজি, বাবু ও ওস্তাদদের ঘরে ঢুকে পড়েছিল কবির গান। তাঁদের কণ্ঠে কবির গানে ও ভঙ্গিতে দেখা গেল কালোয়াতি ঢং, সরগম, তান কর্তব, পুকার দম ইত্যাদির ব্যবহার। ফলে রবীন্দ্রনাথের গানের বাণী ও সুরের নিজস্ব চেহারা গেল বদলে। বলাইদাস শীল, পূর্ণকুমারী, মানদাসুন্দরী, বেদানা দাসী, রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী, কে মল্লিকের যে কোনও রেকর্ড বাজলেই সহজে বোঝা যায় যে, গায়ক–‌গায়িকারা তখন নিজস্ব গায়নরীতিকে প্রাধান্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান পরিবেশন করতেন। ওই সময় কবির গানকে বলা হত ‘‌রবিবাবুর গান’‌। 
১০ মার্চ ১৯১৫। কবির সলিসিটর খগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় কবির রচিত গানের  ‌রয়্যালটি দাবি করে গ্রামোফোন কোম্পানিকে চিঠি দেন। গ্রামোফোন কোম্পানি কবিকে গীতিকারের ‌রয়্যালটি দিতে রাজি হলেন। ভারতবর্ষে রবীন্দ্রনাথই সর্বপ্রথম গীতিকার হিসেবে ‌রয়্যালটি পান। 
এরপরে হয় নতুন বিপত্তি। রেকর্ডে গানের পরিবেশনায় ইচ্ছেমতো প্রয়োগ ব্যবহার শুরু হল। আপত্তিজনক মাত্রায় পৌঁছোয়। কবি ১৯২৬ সালে আইনের সাহায্য নিতে বাধ্য হলেন। এই বছরই দিলীপকুমার রায়কে তিনি বলেছিলেন, ‘‌রচনা যে করে রচিত পদার্থের দায়িত্ব একমাত্র তারই, তার সংশোধন বা উৎকর্ষসাধনের দায়িত্ব যদি আর কেউ নেয় তা হলে কলাজগতে অরাজকতা ঘটে। ললিতকলাতে ধর্মনীতির অনুশাসন এই যে, যার যেটি কীর্তি তার সম্পূর্ণ ফলভোগ তার একলারই। আজকালকার দিনে ছাপাখানা ও স্বরলিপি প্রভৃতি উপায় নিজের রচনায় রচয়িতার দায়িত্ব পাকা করে রাখা সম্ভব, তাই রচনাবিভাগে সরকারি যথেচ্ছাচার নিবারণ করা সহজ এবং করা উচিত।’‌
সেই সময়ের নানা ধরনের সামাজিক অনুশাসনের তোয়াক্কা না করে শিল্পী অমলা দাশ (‌মিস দাশ)‌ প্রথম রেকর্ডে কবির গান গাইতে ঘরের বাইরে পা রাখলেন। ১৯৩১ সালের ২৫ ডিসেম্বরের একটি পত্রিকায় ‘‌রবীন্দ্র–‌সঙ্গীত প্রতিযোগিতা’‌ শিরোনামে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে ‘‌রবীন্দ্রসঙ্গীত’‌ শব্দটির প্রথম প্রকাশ্য ও মুদ্রিতাকারে ব্যবহার দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথের সত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘‌রবীন্দ্রপরিচয়সভা’‌–‌র উদ্যোগে ‘‌জয়ন্তী–‌উৎসর্গ’‌ নামে একটি সঙ্কলন গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়। এই সঙ্কলনে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ‘‌রবীন্দ্রনাথের সংগীত’‌ নিবন্ধে লেখেন, ‘‌হিন্দুস্থানী সংগীতে ‌রবীন্দ্রসংগীতের স্থান এবং ব্যক্তিগত মৌলিকত্ব জানতে হলে আমাদের দেশের, বিশেষ করে বাংলাদেশের গত শতাব্দীর মানসিক ইতিহাসের পাতা উলটে দেখা উচিত।’‌ ১৯৩১ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত এই সঙ্কলনটির নিবন্ধগুলি আগেই সংগৃহীত হয়েছিল। সেই মুদ্রিত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই ‘‌রবীন্দ্রসংগীত’‌ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। অন্যদিকে বলা হয় গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমেই ‘‌রবীন্দ্রসংগীত’‌ আখ্যাটি সর্বজনগ্রাহ্য হয়েছে। জানুয়ারি, ১৯৩৫ (‌রেকর্ড নং পি ১১৭৯২–‌ ‘‌মনে রবে কিনা রবে আমারে’‌/‘‌কাছে যবে ছিল পাশে হল না যাওয়া’‌)‌ কনক দাসের এই রেকর্ড পরিচিতিতে সম্ভবত প্রথম ‘‌‌রবীন্দ্রসংগীত’‌ কথাটি লেখা হয়। (‌‘কনক দাস আধুনিক সঙ্গীতে মহিলা শিল্পীদের মধ্যে রাণীর মহিমায় প্রতিষ্ঠিতা। রবীন্দ্র–সংগীতে ইনি অতুলনীয়া।’‌)‌ হিন্দুস্থান কোম্পানির একটি অপ্রকাশিত রেকর্ডে (‌টেস্ট রেকর্ড)‌ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং রমা মজুমদারের দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া ‘‌তোমার সুরের ধারা’‌ গানটি আবিষ্কার করেছেন রেকর্ড সংগ্রাহক শুভেন্দুশেখর পাত্র এবং সুরজলাল মুখোপাধ্যায় (‌হারুবাবু)‌। রেকর্ডটি তাঁরা‌ বাতিল রেকর্ডের স্তূপ থেকে উদ্ধার করেন। জানা যায় এই রেকর্ডটি ১৯৩২–‌এ রেকর্ড করা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া এই একটি রেকর্ডের সন্ধানই পাওয়া গেছে আজ পর্যন্ত। ■
তথ্যসূত্র:‌ 
এইচ এম ভি–‌র শ্রদ্ধাঞ্জলি (‌রবীন্দ্রনাথের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত)‌ 
রেকর্ডে রবীন্দ্রসঙ্গীত— সিদ্ধার্থ ঘোষ 
কবিকণ্ঠ ও কলের গান— সন্তোষকুমার দে
দিনেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের খতিয়ান—
শোভন সোম  ‌   ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top