দেবাশিস চন্দ: উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর অনেক দিকের খোঁজ জানা থাকলেও তিনি যে ভাঙা মূর্তি জোড়ায় পারদর্শী ছিলেন সেই খবর ক’‌জনই বা জানেন! রামমোহন লাইব্রেরিতে রামমোহনের যে আবক্ষ মূর্তিটি রয়েছে, ব্রিটেন থেকে সেটি নিয়ে আসেন আনন্দমোহন বসু। কিন্তু কলকাতায় বাক্স খুললে দেখা যায় মূতিটি ভেঙে গেছে। সেই সময় ‘আনন্দমোহনের অনুরোধে মূর্তির সংস্কার করেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী’। রামমোহনেরই আরেকটি মূর্তি গড়ার সময় ভাস্কর প্রমোদগোপাল চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মতবিরোধ হলে পূর্তমন্ত্রী যতীন চক্রবর্তী প্রায় শেষ হ‌য়ে যাওয়া রামমোহন–মূর্তির ব্রোঞ্জের টুকরোগুলি জোড়ার জন্য দিয়ে আসেন ভাস্কর সুনীল পালকে। আবার লর্ড ওয়েলেসলির মূর্তি গড়ার জন্য তহবিল তছরুপের ঘটনাও ঘটেছিল!‌ কলকাতায় ছড়িয়ে থাকা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মূর্তির এ–রকম অনেক নেপথ্য তথ্যে ভরা কমল সরকারের (১৯২৮–১৯৯৭) ‘কলকাতার স্ট্যাচু’। 
১৯৯০–এর জানুয়ারিতে প্রথম প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া ফেলেছিল আকর গ্রন্থটি। বইটি দীর্ঘদিন বাদে আবার ফিরে এল আগের প্রকাশক পুস্তক বিপণির হাত ধরেই। হ্যাঁ, দু’একজন নিন্দুক (বাঙালিদের মধ্যে নিন্দুকের অভাব কোনকালেই বা কম ছিল!‌) অবশ্য বলেছিলেন, ‘চুলচেরা বিশ্লেষণ ছাড়া শুধু স্ট্যাচুর বিবরণ ছাপা অর্থহীন’ জানাচ্ছেন প্রকাশক কুমকুম মাহিন্দার নতুন সংস্করণের ভূমিকায়। নিন্দুকেরা যে ভুল তা এত বছরে বারে বারে প্রমাণিত। মূর্তিনগরীর প্রতিটি স্ট্যাচু তৈরির নেপথ্যকাহিনী, কারা কোন স্ট্যাচু গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যাঁর স্ট্যাচু তাঁর পরিচয়, কোথায় কীভাবে তৈরি হল, যে ভাস্কর তৈরি করলেন তাঁর পরিচয়, আবরণ উন্মোচনের বর্ণনা, পাদপীঠ শুদ্ধ মূর্তির পুরো বিবরণ রয়েছে বইটিতে। এক দু লাইনে মূর্তিটির ভাল–মন্দ নিয়ে নিজের মত ব্যক্ত করেছেন লেখক।
১৮০৩–এ মারকুইস কর্নওয়ালিশের মূর্তি দিয়েই শুরু মূর্তিমান মহানগরীর অন্য এক শৈল্পিক ইতিহাস। কর্নওয়ালিশ থেকে ১৯৮৯–তে জওহরলাল নেহরু— ‘প্রাক–স্বাধীনতা যুগের মূর্তি’ থেকে ‘স্বাধীনোত্তরকালের মূর্তি’র পর্যন্ত বিস্তৃত লেখকের মূর্তি–পরিক্রমা। বইটি এই সময়ে আরও দরকারি, যখন ইংরেজ প্রশাসক ও সৈনিকদের মূর্তিগুলি দেখার আর উপায় নেই। ১৯৬৯–এ যুক্তফ্রন্ট সরকার শহর থেকে নির্বাসন দেয়। কমল সরকার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ‘ইংরেজ শিল্পীদের তুলনায় একালের ভারতীয় শিল্পীদের গড়া মূর্তিগুলি নিম্নমানের’ বলে যাঁরা সমালোচনা করেছিলেন তাঁদের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘এ দেশের শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষণার মাধ্যমে বিকশিত হবার সুযোগ করে দিতে হবে।’ মজার ব্যাপার হল, তিনি নিজেও কিন্তু ইংরেজ আমলের মূর্তিকলার প্রশংসায় পঞ্চমুখ এবং প্রদোষ দাশগুপ্ত, চিন্তামণি কর, হৃষীকেশ দাশগুপ্ত, নাগেশ যবলকরদের মতো ভারতীয় ভাস্করদের কিছু কিছু মূর্তিতে দেখেছেন ‘শৈথিল্যের ছাপ’, ‘মুখাকৃতিতে অসঙ্গতি’, ‘কাঁধ অস্বাভাবিক করায় বেমানান’, ‘সৌষ্ঠব সংক্রান্ত সামঞ্জস্য ও সমানুপাতের অভাব’ এবং আরও অনেক অন্ধকার দিক। উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ১৯৭০–এ বসানো লেনিন মূর্তিটির, যার রূপকার রাশিয়ান ভাস্কর নিকোলাই ভ্যাসিলিয়েভিচ তমসকি। অতএব এবার পুতুলের মতো নিষ্প্রাণ মূর্তি দিয়ে ভরানো মহানগরে ফিরিয়ে আনা হোক নান্দনিক স্ফূর্তিতে উজ্জ্বল লাটবাগানে নির্বাসিত মূর্তিগুলো। সাজিয়ে রাখা হোক কলকাতার মোহরকুঞ্জে বা অন্য কোথাও। শিল্পকে শিল্প হিসেবেই দেখা ভাল নয় কী। ■

জনপ্রিয়

Back To Top