কাবেরী চক্রবর্তী: রেলের চাকরির সুবাদে পাস নিয়ে গোটা দুনিয়া ঘুরে বেড়ানো চারণের বাবার নেশা। সেদিন অবশ্য ওরা লোকাল ট্রেনে চেপে ফিরছিল বজবজ থেকে, শ্রাদ্ধবাড়ির নেমন্তন্ন সেরে। ওরা মানে চারণ আর ওর বাবা–মা ছাড়াও ওর কাকা–কাকিমা আর কাকার ছেলে কবি। ভাল নাম কাব্য। অনেকটাই ছোট চারণের চেয়ে, সবে ক্লাস ইলেভেন। চারণের কিন্তু একটাই নাম। সেটাকেই ভেঙেচুরে চারু, কখনও চরি বলে ডাকে বাড়ির লোক। ওদের ভাই–বোনের নাম রেখেছে চারণের বাবা। যাই হোক, বিকেল চারটের পর ওরা ট্রেনে উঠেছে। রবিবার বলে ট্রেন বেশ ফাঁকা। মুখোমুখি দুটো লম্বা সিটে জমাটি হয়ে বসেছে ছ-জন। সৌরভ গাঙ্গুলির বাড়ি তৈরি হচ্ছে, চলন্ত ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখাল বাবা। কবি তো আসার সময়তেও নুঙ্গি নুঙ্গি করে নেচেছে, এখনও তাই। আগামী কালীপুজোতে এখান থেকেই বাজি নিয়ে যাবে বলে জ্যাঠা অর্থাৎ চারণের বাবাকে জপানোর চেষ্টা চলছে। চারণের ভাল লাগে গ্রামের দৃশ্য। বজবজটা গ্রাম নয়, কিন্তু রেলপথের দুপাশে টানাই গ্রাম। গ্রীষ্মের রোদ গিলে খাচ্ছে পৃথিবী, তবু এই ছায়ামাখা গাছেরা, গৃহপালিত হাঁস–মুরগি, নিভে যাওয়া মাটির উনোন ঘেরা দুপুরের অবসর, চোখের আরাম, মনেরও। লোকাল ট্রেন, একটু চলে আর দাঁড়ায়। লোক ওঠে। তিনজনের একটা গানের দল উঠল। একটা সাউন্ড বক্স ট্রেনের তাকে তুলে মিউজিক বাজিয়ে দিল। তারপর মুখে মাউথপিস নিয়ে গান গাইছে মান্নাকণ্ঠী। বছরে দুটো করে বড় ট্যুর করলেও, লোকাল ট্রেনে বিশেষ চাপা হয় না চারণদের। তাই এই দৃশ্য ওদের কাছে নতুন। তারপর গান ধরল কিশোরকণ্ঠী। শুনে চমকেছে ওরা সবাই। কিন্তু রসভঙ্গ করে কাকা বলে উঠল, ‘পুরোটাই ঢপ। গান চালিয়ে লিপসিঙ্ক করছে।’‌ অ্যাপ্রিশিয়েট করল চারণের বাবা। অমনি ওর মা আর কাকিমাও হুঁ হুঁ করে মাথা নাড়াতে শুরু করল। চারণও অবাক। সত্যিই হয়তো তাই। নইলে এত সুন্দর কখনও গাইতে পারে! কিন্তু ওদের এইসব কথা শুনে ফেলেছে গানের দলের অল্পবয়সি ছেলেটা। হাসছে মিটিমিটি। সেটা নজর করে অস্বস্তিই হচ্ছে চারণের। হঠাৎ কিশোরকণ্ঠী গায়কের হাত থেকে মাইক্রোফোনটা নিয়ে নিজেই লা লা লা করে সুর ধরল সেই ছেলে, তারপর ফোনটা বাড়িয়ে দিল চারণের কাকার মুখের কাছে। গাইতে বলল। রাজি হল না কাকা। তখন কবির মুখের কাছে নিল। খানিক বেসুরো টান দিয়ে এক মুখ হাসল কবি। কাকিমাও আহ্লাদিত। কিন্তু বাকিরা চুপ। ছেলেটা বলল, ‘যন্ত্রে কেবল বাজনাটাই বাজে, দাদা। গানটা আমরা গাই। উনি পঁচিশ বছর ধরে কিশোরের গান গাইছেন, শুনে কেউ ধরতে পারে না। যথেষ্ট পরিচিত। আমরা ফাংশনও করি।’
‘অ্যাঁ! এই গান ফাংশনেও চলে? লোকে শুনে টাকা দেয়?’ বিস্ময় কাটতে চাইছে না চারণের কাকার। 
‘দেয়। ট্রেনে ঘুরে যা পাই, তার চেয়ে বেশিই দেয়। আটটা গান গাইলে দুই থেকে তিন হাজার পাওয়া যায়। টাকা বেশি হলে গলাও বেশি খোলে’, বলে হাসল ছেলেটা। 
‘সকালে পান্তাভাত খেয়ে বেরিয়েছি দাদা। অনেকক্ষণ পেটে কিছু পড়েনি, গলাটা বসে গেছে।’ বলল কিশোরকণ্ঠী গায়ক। ‘আমরা ছোট মানুষ, ধাপ্পাবাজি করার সাহসই পাব না। ওটা তো বড়সড় ব্যাপার। বোম্বেতে হল, খবরের কাগজে পড়েছি।’ 
জাস্টিন বিবারের ঘটনাটা তখন টাটকা। চোর দায়ে ধরা পড়েছে চারণরা। মুখ তুলে তাকাতে পারছে না। বিড়ম্বনা এড়াতে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বসে আছে ওর কাকা। মা আর কাকিমা যেন ট্রেনেই নেই। গম্ভীর মুখে দশ টাকার একটা নোট ওদের দিকে বাড়িয়ে দিল চারণের বাবা। ছ-জনে মাত্র দশ টাকা! আঁতকে উঠেছে চারণ। ওরা অবশ্য কিছুই বলল না। যে যা দিল, নিয়ে নেমে গেল পরের স্টেশনে। শুরু থেকেই এই গায়ককে দেখে কেমন অন্যরকম লাগছিল চারণের। পরাজিত নায়ক যেন। কালো ছিপছিপে শরীর, কামানো গালে টোল। দেখতে সুন্দর। কিন্তু অভাবের ছাপ স্পষ্ট, সেইসঙ্গে অশিক্ষার মলিনতা। গানগুলোও গাইছিল দুঃখের। লোকটা জাত-শিল্পী। কেবল গলা নয়, গাওয়াটাও অপূর্ব। দশ টাকা ভিক্ষে দিয়ে শিল্পীর অপমান হল। কিন্তু ওদের বাড়ির এটাই নিয়ম। বাবাকে ডিঙিয়ে কাকারও কিছু করার সাহস নেই। নইলে চারণ এখন বড় হয়েছে। পিএইচডি শুরু করার পর প্রথম কিস্তির স্টাইপেন্ডও পেয়ে গেছে। বাবার বকুনি অগ্রাহ্য করেও একশো টাকা দিয়ে দিতেই পারত। কিন্তু ওদের সম্মান দেখাতে গিয়ে বাবার অসম্মানের কারণ হয়ে উঠবে? তা হয় না। তাই হজমই করল সবটা। 
‘মাচা আর্টিস্ট। ট্রেনে খেপ কাটছে।’ ওরা নেমে যেতেই সান্ত্বনার সুরে বলল কাকা। 
‘আরে, গ্রামেগঞ্জে এদের নিয়েই এখন জলসা বসে।’ বলল চারণের বাবা। আড্ডা আবার জমে উঠল। কিন্তু চারণ অন্যমনস্ক। বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু দেখছে না কিছুই। ভাললাগাটা উধাও। অথচ, ছোটবেলা থেকে তো এরকমই দেখে আসছে বাবাকে। উপর-নীচে দুটো ফ্ল্যাটে ওরা আর কাকারা থাকে। দুজনেরই রেলের চাকরি। চারণের বাবা সদ্য রিটায়ার করেছে। ওদের বাড়ি থেকে হাঁটাপথে ট্রেন, মেট্রো রেল। মেট্রোতে যদিও পাসের সুবিধে নেই। তবু রেল তো, বাবার পছন্দের। পাস পাবে বলে রেলের চাকরির জন্য একটা সময় এবেলা–ওবেলা কালীঘাটে হত্যে দিয়েছে বাবা। গর্ব করে নিজেই বলে সেই গল্প। ওদের বাড়িতে সব গল্পেই বক্তা চারণের বাবা, বাকিরা শ্রোতা। ছোটবেলায় চারণও তো তাই ছিল। বাবার চ্যালা। মায়ের দিকে তেমন ঘেঁসেনি কোনওদিন। মা যে গান জানে, সেটাও বাবার মুখেই শোনা। নিজের কানে মাকে গুনগুন করতেও শোনেনি কখনও। ডোভার লেন সঙ্গীত সম্মেলনে প্রতি বছর বাবা–মা গান শুনতে যায়, এখনও। পাস দেয় মামা। এমন নানারকম পাসই আসে বাবার কাছে। ছোট থাকতে পাস–এ ম্যাজিক দেখতে গেছে ওরা। নাটক দেখেছে। ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও বাবা যায় পাস-এ। সংখ্যায় কটা পেল, তাই দিয়ে ঠিক হয় কে কে চান্স পাবে সঙ্গে যাওয়ার। ওদের বাড়িতে নিয়মিত সন্ধেবেলা সপারিষদ সভা বসায় বাবা। কাকা–কাকিমা–মা সবাই একসঙ্গে বসে টিভি দেখে। কাকিমা চা বানায়। ছুটির দিনে নানারকম খাবার বানায় কাকা। চারণ আর কবি খাবারের সময়টুকু কেবল বসে। টিভিতে অবশ্য খবর ছাড়া বিশেষ কিছু চলে না। টিভি বন্ধ হলে বাবার ভাষণ শোনে সবাই। নয়তো পরিকল্পনা চলে পরবর্তী বেড়ানোর। 
একদিন চারটে পাস পাওয়া গেছে, কোনও দামি হলে ব্যান্ডের গান। বাবা–মা–কাকা– কাকিমা যাবে, সেটাই ঠিক ছিল। কিন্তু কবির হঠাৎ জ্বর এসেছে, কাকিমা যাবে না। অগত্যা চারণ। কারণ, পাস নষ্ট করা চলবে না কিছুতেই। শনিবার, চারণের ছুটি। সেজন্য আপত্তি বা অসুবিধেরও কিছু ছিল না। হল পর্যন্ত মেট্রোতে যাওয়া যাবে না। আবার হাঁটাপথও নয়। ভাল শাড়ি পরে ভিড় বাসে উঠতে পারবে না মা। মেট্রো থেকে নেমে বাকি রাস্তাটুকুর জন্যে তাই অটো। কিন্তু ব্যান্ডের গান শুনতে বাবা–মা কেন যাচ্ছে, এটাই মাথায় ঢুকল না চারণের। গাইতে না পারলেও গান শুনতে ভালবাসে ও। সবরকম গানই শোনে। টিভিতে শনি–রবি দু’‌দিন সারেগামাপা শোনা চাই ওর। কিন্তু এদিনের অনুষ্ঠানে মাথা ধরে গেল। একজনই গায়ক চিৎকার করছেন, বাজনা ছাপিয়ে সেই চিৎকার মাথার ভেতর ধাক্কা মারলেও কথা কিছুই তেমন বোঝা যাচ্ছে না। বাংলা শব্দ, কিন্তু কোনও শ্রুতি–মাধুর্য নেই। উপরন্তু এখানে সবাই আমন্ত্রিত। কেউই টিকিট কেটে আসেনি। দুঃস্থ ক্যান্সার আক্রান্তদের সাহায্যার্থে একটা চ্যারিটি–শো এটা। কিন্তু চারণ কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না, অনুষ্ঠানের আয়োজনে এত খরচ, আবার সাহায্য..., কীভাবে হতে পারে? স্কুল ড্রেস পরা অনেকগুলো বাচ্চা মেয়ে বসেছে একপাশে। গান শুরু হলেই হাততালি দিচ্ছে। চিৎকার করছে। সবটাই কেমন নাটকীয়। ‘সাহায্যের টাকাটা কে দেবে?’ পাশে বসা বাবাকেই প্রশ্নটা করল চারণ। ‘আরে, এসবের পেছনে ধনকুবেররা থাকে। আমাদের মতো লোকদের ডাকা কেবল হল ভরাতে।’ ‘তোমাদের ভাল লাগছে এইসব গান?’ জিজ্ঞেস করল চারণ। ‘না লাগলেও কিছু করার নেই। শুরুতেই উঠে গেলে তো অভদ্রতা। পাসটা যে দিয়েছে, সে–ই বা কী মনে করবে? হাফ টাইমে বেরিয়ে যাব।’ বলল বাবা।  
হাফ টাইমের আগেই ঘোষণাটা করলেন গায়ক। ‘একটা মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের এই অনুষ্ঠান। ক্যান্সারে আক্রান্ত বাচ্চারা যাতে একটু সেবা–শুশ্রূষা পেতে পারে, তার জন্য আসুন, আমরা সবাই সহযোগিতা করি। অ্যামাউন্ট ফ্যাক্টর নয়, যে যা পারেন, দিন।’ ‘কাম টু দ্য পয়েন্ট’, অডিয়েন্সের মধ্যে থেকে চাপা গলায় কেউ বলে উঠল। ঘোষণার পরেই অডিটোরিয়ামের ভেতর ছোট্ট ছোট্ট বটুয়া হাতে কয়েকটা মেয়েকে ঘুরতে দেখা গেল। বাবা আর কাকার দুটো মাথা এক হল, পরামর্শ নয়, কিছু নির্দেশ দিল বাবা। সেই নির্দেশ এল চারণ আর ওর মায়ের কাছেও। ‘ফাঁদে পড়েছি, কিছু তো করার নেই। এসব ফ্যাশনের জায়গা। না বুঝে এসে পড়েছি। একশো টাকার কমে দেওয়াও যায় না’ বলে, চারণ আর ওর মায়ের হাতেও টাকা গুঁজে দিল বাবা। ওদের সামনে মেয়েটা এল, বটুয়া নিয়ে। ফটাফট তিনশো টাকা ঢুকে গেল তাতে। মাঝে মুঠো শক্ত করে বসে আছে চারণ। প্রথমবার, বাবার বিরুদ্ধে ও। হল থেকে বেরিয়ে বাবাকে ফিরিয়ে দিল টাকাটা। ‘দিলি না কেন!’ বিস্মিত বাবা। ‘একজন ক্যান্সার পেশেন্টের চিকিৎসায় কত খরচ হয় বলো তো? কটাই বা লোক ছিল হলে? স্কুলের বাচ্চাগুলো তো আর টাকা দেবে না, মেয়েগুলো যায়ওনি ওদের কাছে। ওই কটা টাকায় কারও কোনও উপকার হতে পারে বলে, মনে হয়নি আমার। তাই দিইনি।’ 
‘ও। কিন্তু ..., যাক, একশো টাকা বাঁচল।’ টাকাটা ব্যাগে ভরে নিল চারণের বাবা। কিন্তু দুঃখ দুঃখ ভাবটা চাপা থাকল না। সেটা তিনশো টাকার শোকে, নাকি অন্য কোনও কারণে, চারণ জানে না। দিন কয়েক পরে রানাঘাট প্ল্যাটফর্মের রাণু মণ্ডলকে নিয়ে হইচই চলছে চারণদের বাড়িতে। খবরের কাগজ পড়ে ফোনে ইউটিউব ঘেঁটে রাণু মণ্ডলের গান বাজিয়ে সবাইকে শোনাচ্ছে বাবা। রোববার, তাই চারণ আর কবিও রয়েছে সেখানে। বাইরে বৃষ্টি। আলুর চপ আর বেগুনি বানিয়েছে কাকা। মুড়ি–কাঁচালঙ্কা দিয়ে জমিয়ে খাওয়া চলছে। সঙ্গে রাণু মণ্ডলের গান। ‘এর চেয়ে অনেক ভাল গান জানে বউদি। দাদা, তুমি বউদির গান রেকর্ড করে পোস্ট করে দাও।’ বলল, চারণের কাকা। বাবার আগে কাকা কথা বলছে দেখে বেশ অবাক চারণ। 
‘কাল থেকে একটু রেওয়াজে বোসো তো, তোতা’, মিটিমিটি হাসি বাবার মুখে। ‘সবাই এমন সেলিব্রিটি হয়ে যাচ্ছে..., তুমিই বা বাদ থাকবে কেন?’ 
‘রাণুর মতো একটু মেকআপ করে নিতে হবে দিদিকে।’ বলল চারণের কাকিমা।
‘ওরে বাবা, সেজন্যে তো টানা ছ’‌ঘণ্টা বিউটি-পার্লারে বসে থাকতে হবে!’ কপট আতঙ্কে বলল চারণের মা তোতা। 
‘সেটা তো সেলিব্রিটি হওয়ার পর। আগে রাণুকে যেমন দেখতে ছিল, সেটা আমিই তোমায় সাজিয়ে দিতে পারব।’ আশ্বস্ত করল কাকিমা। হাসছে বাকিরা। তখনই গালে কামড় পড়েছে চারণের। কাঁচালঙ্কার ঝাল, চায়ের গরম সব মিলিয়ে হেঁচেকেশে অস্থির চারণ। চোখ থেকে জলের ধারা দুই গালে।  
‘এহ! মায়ের যেমন কথা’, বলে উঠল কবি। ‘একটুও ব্রেন অ্যাপ্লাই করবে না। আরে বাবা, জেঠির গানের কথা হচ্ছে, রাণু মণ্ডল সেজে গো–অ্যাজ–ইউ–লাইকে নাম দেবে না জেঠি!’ ওর মায়ের মুখের কাছে হাত নাড়াতে নাড়াতে কথাগুলো বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। এদিকে চারণের মা ওকে বলছে জল খেতে। আর ভাজার পরে জল খেতে নিষেধ করছে বাবা। ক্যাডবেরি বার হাতে ফিরে এল কবি। ‘এটা খা দিদি, ঝাল কমে যাবে।’‌ ‌‌‌‌■

জনপ্রিয়

Back To Top