ধ্রুবজ্যোতি নন্দী: রূপপুর কালচারাল আর পার্বণ সম্মিলনী, দুই প্রতিবেশী দুর্গাপুজোর মধ্যে রেষারেষিটা বেশ পুরনো। বছর তিরিশের কম তো নয়ই। শুরুতে পুজো ছিল একটাই, সেটা রূপপুরে। সর্বজনীন পুজো হলেও তার প্রতিমা থেকে প্যান্ডেল, ভোগ, পুরোহিত, ঢাকি, আলো, মাইক, মায় সুভেনির পর্যন্ত যাবতীয় দায়িত্বের বেশির ভাগটাই সামলাতেন উদ্যমী তরুণ সম্ভ্রম গুহ, যাকে মেজদা হিসেবেই সবাই চেনে-জানে। শুধু ঝক্কি সামলানোই নয়, পুজোর খরচের একটা বড় অংশ এখনকার মতো তখনও আসত গুহবাড়ি থেকে। কিন্তু গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা এই অঞ্চলের উদীয়মান শিল্পী দেবপ্রতিম বসাক যে বছর রূপপুরের পুজোয় থিম চালু করতে চাইলেন, সে বছর থেকেই লড়াই শুরু। মেজদা গলা তুলে চোখ বড় বড় করে বললেন, রূপপুরের দুগ্গা প্রথম দিন থেকে ডাকের সাজে সেজে এসেছে, কারওর খামখেয়ালে তার সাজ বদল হবে না।
কথাটা নরম করে বললে কী হত কে জানে, কিন্তু মেজদার বলার ঢঙেই বিগড়ে গিয়েছিলেন সজ্জন যুবক দেবপ্রতিম। তাঁর আঁকা ছবি তখন ঝুলতে শুরু করেছে কলকাতা-দিল্লি-বোম্বাই-বরোদা-পন্ডিচেরির প্রদর্শনীতে, খবরের কাগজে লেখালেখি হচ্ছে তাঁর ছবি নিয়ে। তাঁরই ভাবনাকে খামখেয়াল বলে এক কথায় উড়িয়ে দেওয়া! রাগে অপমানে লাল হয়ে দেবপ্রতিম মিটিংয়ের মাঝখানেই চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, সোমু গুহর একগুঁয়েমির সঙ্গে তাল মেলানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি চললাম।
সেই মিটিংয়ে যারা ছিল তারা জানে, পাঁচজনের মধ্যে বসে তাঁকে একগুঁয়ে বলায় মেজদার নাক-মুখ দিয়ে ড্রাগনের মতো আগুন বেরিয়েছিল। তাতে আর কী হবে! সেই আগুন দেখে ঘাবড়ে যাওয়ার জন্যে তো আর তখন সেখানে বসে নেই দেবু বসাক। গটমট করে হাঁটতে হাঁটতে তিনি চলে এসেছিলেন রথতলা মোড়ে নৃপেন নাগদাসের শাড়ির দোকান বিলাসিনী-র উল্টোদিকে বীরেনের চায়ের দোকানে।
রূপপুরের পুজোয় মোটা টাকা চাঁদা দিয়েও উপযুক্ত খাতির হয় না বলে যাঁরা মনে মনে একটা রাগ পুষতেন, নৃপেন নাগদাস তাঁদের সব্বার দাদা। যেই দেখলেন হাতে চায়ের গেলাস নিয়ে তাঁর দেবুভাই সকাল সাড়ে ১০টায় গোমড়া মুখে একা বসে আছে বীরেনের দোকানে, তিনি ছুটে গেলেন তাঁর অতিপ্রিয় শিল্পী ভাইটির কাছে।
তারপর কি আর দুয়ে দুয়ে চার হতে সময় লাগে? দেবুভাইয়ের মনে যখন দুগ্গোপুজোর অন্যরকম ভাবনা এয়েছে, নাগদাস মশাই কথা দিলেন, সে পুজো হবেই। তিনি নিজে আছেন, তাঁর ব্যবসায়ী বন্ধুরা আছেন, শিল্পের কদর করা বহু লোক আছেন এলাকায়, ইনকাম ট্যাক্সো থেকে পুলিশ – কত কর্তাব্যক্তি তাঁর খাতিরের খদ্দের, কীসের অভাব? ব্যস, সেই বছরেই অরবিন্দ পার্কের প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে গোলাভরা ধান, মাছ ধরার জাল, মাটিলেপা বাড়ি সাজিয়ে ঝিঁঝি ডাকা পাড়াগাঁ-র পুজো মণ্ডপে চালু হয়ে গেল পার্বণ সম্মিলনীর পুজো। লোকে ধন্যি ধন্যি করল, খবরের কাগজে ছবি বেরোল, অষ্টমী-নবমীতে লাইন পড়ে গেল পার্কের সামনে। দর্শক টানায় প্রথম বছর থেকেই পার্বণ সম্মিলনী পাল্লা দিতে শুরু করল রূপপুর কালচারালের ডাকের সাজের প্রতিমা আর ভক্তিতে ভরপুর পুজোর সঙ্গে।
পুজোর পর গুহবাড়িতে গিয়েছেন রূপপুরের খানদানি পুরোহিত দীনমণি চাটু্জ্জে। সন্ধিপুজোয় ঢাকের বোলের তালে তালে সারা শরীর ভেঙেচুরে তাঁর বিখ্যাত আরতি-নাচ দেখতে লোক আসে দূর-দূরান্ত থেকে। আরতির শেষে দীনু চাটুজ্জে যখন প্রতিমার পায়ের দিকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকেন, মণ্ডপের বাতাস ভারী করা ধুপ-ধুনোর ধোঁয়ার মাহাত্ম্যে অনেকেই ভাবেন তাঁর বুঝি সমাধি হয়েছে। পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে তাঁর পায়ে মাথা ঠেকান। সে দৃশ্যের কল্যাণে বছর বছর বাড়ে তাঁর ভক্ত আর যজমানের সংখ্যা। দীনু চাটুজ্জে সেটা ভালই জানেন, তাই প্রণাম না-করা পর্যন্ত সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকেও তিনি দেখতেই পান না। গুহবাড়ির মেজবউ প্রতিবারের মতোই গলবস্ত্র হয়ে প্রণাম করে জানতে চাইলেন, এবার কটা শাড়ি প্রণামি পেলেন ঠাকুরমশাই? লম্বা আশীর্বাদি বচন শেষ করে মাটিতে পাতা রেশমি আসনে আয়েস করে বসলেন দীনমণি চাটুজ্জে। মেজবউয়ের হাত থেকে ফল-সন্দেশের রেকাবিটা নিয়ে বিরস বদনে বললেন, কমে গেছে গো মেজ-মা। ধুতি-শাড়ি মিলিয়ে এবার এসেছে আটতিরিশ। আর, দু-দিনের পুরুত আশু ভটচাজের মেয়ে বাড়ি বয়ে এসে আমার মেয়েকে বলে গেল, পাব্বোন সম্মিলনীর পুজো করে ওর বাবা নাকি এনেছে বেয়াল্লিশটা!
পার্বণ সম্মিলনীর থিমের জাঁকের সঙ্গে পাল্লা দিতে রূপপুরকেও তাই উদ্ভাবনী হতে হল। গানবাজনার সমঝদার লোক মেজদা পরের বছর মণ্ডপের মাইকে টানা পাঁচ দিন বাজালেন আগমনি গান। ক্যাসেট-সিডিতে যে অত আগমনি গান পাওয়া যায়, তা-ই কারও জানা ছিল না। মেজদা মুচকি হেসে বললেন, পাওয়া অত সহজ নাকি? আমি সব শিল্পীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে নিজের যন্ত্রে গান রেকর্ড করে এনেছি।
তারপর থেকে রূপপুর কোনও বছর লোকগান শোনায়, তো পার্বণ থিম সাজায় বস্তারের লোকশিল্প দিয়ে। পার্বণ করে নেপালের প্রাচীন মন্দির, তো রূপপুর সারাদিন শোনায় বৌদ্ধ মন্দিরের প্রার্থনা। এ বছরের পুজো শেষ হতে না হতেই পরের বছরের পুজোর ভাবনা শুরু করে দেন দেবু বসাক। নিজের তদারকিতে সে ভাবনা রূপায়ণ করেন তিনি। অন্য পুজো থেকে ডাক এসেছে বহুবার, কখনও সাড়া দেননি। একটা পুজো ঘিরেই তাঁর সমস্ত ভাবনা, সেটা পার্বণ সম্মিলনী। অন্যদিকে সোমু গুহও বছরভর গানবাজনার আসরে আসরে ঘুরে বেড়ান রূপপুরের পুজো উদ্বোধনের দিন তাঁর সেই বছরের আবিষ্কারের লাইভ পারফরমেন্স শোনাবেন বলে। দু-বছর আগে পার্বতী বাউলকে হাজির করে রীতিমতো হুলুস্থুল ফেলে দিয়েছিলেন তিনি।
এই করতে করতে তিরিশ বছর পার। সেদিনের তরুণ সোমু গুহর আজ মাথা-ভরা চকচকে টাক, নাকের নীচে পুরুষ্টু সাদা গোঁফ। দেবু বসাকের চাপ দাড়িতেও কালোর ছিটেফোঁটা নেই আর, চোখ থেকে চশমা খুললে কিছুই প্রায় দেখতে পান না। কিন্তু রেষারেষিটা সেই আগের মতোই আছে।
গুহবাড়িতে ডাকা রূপপুরের পুজো মিটিংয়ে মেজদা জানালেন, আমাদের ডাকের সাজের দুগ্গা মা এবার সারাক্ষণ ঝলমল করবেন অপরূপ আলোয়। বাতিল করা লোহার জিনিস থেকে নলহাটির নারায়ণ সিংহ যা একখানা ঝাড়বাতি বানিয়ে দিচ্ছে, দেখলে কেউ চোখ ফেরাতে পারবে না। সিলিংয়ের দিকে তাকালে মনে হবে, মায়ের লাল পাড় সাদা শাড়ির শোভা বাড়াচ্ছে একখানা জরোয়ার গয়না। কোথায় লাগে পাব্বোনী আর্ট!
ওদিকে পার্বণ সম্মিলনীর মিটিংয়ে দেবু বসাক বললেন, সোমু গুহ আগের বছর কী শুনিয়েছিল? একদিন বাঁশি, একদিন সেতার, একদিন বেহালা, একদিন সন্তুর, এই সব তো? আমরা এবার কি শোনাব বলে ঠিক করেছি জানো? পঞ্চমীতে ফিফটিজের গান, ষষ্ঠীতে সিক্সটিজ, এই করতে করতে নবমীতে নাইন্টিজ তো হল, তারপর দশমীতে? নাঃ, সেটা আর বলছি না। আপাতত সারপ্রাইজ হয়েই থাকুক তোমাদের কাছে। কিন্তু শুনলে বুঝবে গানেও আমরা রূপপুরের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারি।
- কিন্তু তার চেয়েও বড় একটা সারপ্রাইজ যে আমাকে একেবারে ফ্ল্যাট করে দিয়েছে দেবুদা! সর্বজয়াদির সঙ্গে নাকি সোমদত্তদার বিয়ে। একমুখ হাসি নিয়ে বলল রথতলার চৌখস ছেলে কনকাভ।
মাস্টার্সের পর অর্থনীতিতে এমফিল করছে সে যাদবপুর থেকে, যেখানে গত কয়েক বছর ধরে ইতিহাসে পিএইচডি করছে দেবু বসাকের একমাত্র মেয়ে সর্বজয়া। দিনের শেষে তাকে তুলে নিতে প্রায়ই গাড়ি চালিয়ে ক্যাম্পাসে চলে আসে মেজদার একমাত্র ছেলে সোমদত্ত। দু-জনকে ভালই চেনে কনকাভ, কিন্তু কারও সঙ্গেই সম্পর্কটা এত গাঢ় নয় যে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করা যায়। পাড়ায় খোঁজ নিয়ে দেখেছে, লোকে হয় অবাক হয়ে তাকায়, নয় মুখ টিপে হাসে। রোমিও-জুলিয়েটের এরকম একটা জ্যান্ত গল্প, কিন্তু কেউ মুখ খুলতে চায় না! কেন? কৌতূহলটা চেপে না রাখতে পেরে পুজো মিটিংয়ে আজ ফিচলেমিই করবে বলে ঠিক করে রেখেছিল কলরব করে বিখ্যাত কনকাভ। তাই ওদের ভাব-ভালবাসার কথা না বলে একেবারে বিয়ের কথা দিয়েই শুরু করল সে।
- এসব ব্যক্তিগত কথাবার্তা পুজো মিটিংয়ে কেন, কনকাভ? গলা ঝেড়ে বলে উঠলেন পার্বণ সম্মিলনীর বৃদ্ধ প্রেসিডেন্ট নৃপেন নাগদাস। বিষয়টা এর আগেও তাঁর কানে এসেছে। কিন্তু প্রিয় দেবুভাই নিজে যখন মুখ ফুটে কিছু বলেনি, নাগদাস মশাইও আর জানার দরকার মনে করেননি।
- আচ্ছা জেঠু, আপনিই বলুন, দেবুদার মেয়ে আর মেজদার ছেলের বিয়ে হলে আমাদের প্রেস্টিজ ফাইটটা কি আর টিকে থাকবে? নাছোড় কনকাভ টিপ্পনী কাটে।
- প্রেস্টিজ নিয়ে, ফাইট নিয়ে ভাবার অনেক লোক আছে, কনকাভ। তুমি বরং বিয়ে হলে ভোজ কেমন খাবে সেই ভাবনা ভাবো। দাবড়ানি দেন নাগদাস মশাই।

- দাঁড়ান দাদা। কথাটা যখন কনকাভ তুলেই ফেলেছে, তখন আমার যা বলার আছে বলি। কনকাভর পেট ফুলছিল, তাই না বলে পারেনি। কিন্তু আরও অনেকে হয়তো এদিক-ওদিক থেকে কিছু শুনেছেন, ভদ্রতা করে আমার সামনে কিছু বলছেন না। বললেন দেবু বসাক, কনকাভর ফাজলামির প্রাথমিক ধাক্কাটা ততক্ষণে সামলে নিয়েছেন তিনি।

আমার মেয়ে সর্বজয়া যাদবপুর থেকে গবেষণা শেষ করেছে, এখন আমেরিকা বা কানাডায় পোস্ট ডক, মানে আরও পড়াশোনার চেষ্টা করছে। ওর মাস্টারমশাইরা মনে করছেন, পড়ার সুযোগ তো পাবেই, ওখানে থাকা খাওয়ার খরচ-টরচও পেয়ে যাবে। পেয়ে গেলে সে বিদেশে যাবে। আর, সোমু গুহর ছেলেও খুবই করিৎকর্মা, যাদবপুরেরই ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার। এর মধ্যেই সে আমেরিকায় তিন বছর কাটিয়ে এসেছে, চাইলেই নাকি আবার যেতে পারে। আমার মেয়ের পিছুপিছু সেও নাকি বিদেশে যাবে। কিন্তু আমার মেয়ে বিদেশে গেলে যাবে তার নিজের যোগ্যতায়, কারওর বউ হিসেবে নয়। তারপর বিয়েও করবে একদিন। যাকেই করুক, তোমরা সবাই নেমন্তন্ন পাবে, ভোজ খাবে। যদি সোমু গুহর ছেলেকে বিয়ে করে, আমি না-হয় পার্বণ সম্মিলনী থেকে সরে যাব। তোমরা প্রেস্টিজ ফাইট চালিয়ে যেও।সেদিনের মিটিং আর এরপর বেশিক্ষণ চলেনি। সমস্বরে শুরু হয়ে যায়, আরে কী বলছেন, এটা কী বলছ! দেবুকে ছাড়া, দেবুদাকে ছাড়া পার্বণ সম্মিলনীর পুজো কখনও হতে পারে, ইত্যাদি, ইত্যাদি।ওদিকে একই দিন, একই সময়ে গুহবাড়ির লম্বা-চওড়া বসার ঘরে রূপপুরের পুজো মিটিংয়েও উঠেছে একই প্রসঙ্গ। আর যথারীতি, চোখ পাকিয়ে বাজখাঁই গলায় মুখ খুলেছেন সম্ভ্রম গুহ ওরফে মেজদা। বলছেন, শোনো হে, তোমরা শুনেছ, আমিও শুনেছি। ছেলের কাছে নয়। সে থাকে কতক্ষণ, আর থাকলেও তো দিনরাত তার যন্ত্রে মুখ ডুবিয়ে বসে থাকে। পাঁচটা কথা জিজ্ঞেস করলে একটা হুঁ বলে উত্তর দেয়। আমি শুনেছি তার মায়ের কাছে। শুনে ইস্তক মনে হচ্ছে, থিম পুজো করে পেলটা কী পাব্বোনের মস্ত আর্টিস্ট? তিরিশ বছরে একবারও যে রূপপুরে এসে মায়ের সামনে দাঁড়াল না, মায়ের এমন বিধান যে তার ঘরের দুগ্গা আমার ঘরের বউ হয়ে বছর বছর পুজো করবে সেই ডাকের সাজের মায়ের। মাকে তাই বারবার বলছি, মা তাড়াতাড়ি করো। সব দুগ্গতি নাশ করো, মঙ্গল করো, তাড়াতাড়ি করো।পাশের ঘরে বসে প্রত্যেকটা কথাই খুব মন দিয়ে শুনছিলেন মেজ-বউ। মেজদা থামতেই তিনি চোখ বন্ধ করে জোড় হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন, আহা, কী নাম রেখেছিল মা-বাবা। এমন দুরন্ত শত্তুরকেও অনায়াসে হার মানালে! সার্থক নাম তোমার, সর্বজয়া।

[শেষ]

‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top