চিত্রনিভা চৌধুরী

আমার ধ্যানের ঋষি রবীন্দ্রনাথ ও
আমার ধ্যানের আশ্রম শান্তিনিকেতন
বিয়ের পর সবে নতুন সংসারে প্রবেশ করেছি। আমার ছবি আঁকার ঝোঁক দেখে, শ্বশুরালয় থেকে আমাকে শান্তিনিকেতন পাঠাবার কথা চলছিল। এ কথা শোনা অবধি আমার মনের মধ্যে শান্তিনিকেতন আশ্রমের কত যে রূপ অঙ্কিত হতে লাগল। মনের কোণে ভেসে উঠতে লাগল সেই প্রাচীন ভারতের তপোবনের রূপ। কারণ ছোটবেলা থেকে রামায়ণ, মহাভারত পড়ে, সেই প্রাচীন যুগের রূপটিই আমার মনকে বেশি আকৃষ্ট করেছিল। আমি যেন সেই প্রাচীন ভারতের তপোবনের যুগেই এসে পড়লাম এবং কবি রবীন্দ্রনাথকে সে যুগের ঋষি বলেই কল্পনা করতে লাগলাম। তখন কেবলই মনে হতে লাগল, আমার ধ্যানের ঋষি রবীন্দ্রনাথ এবং আমার ধ্যানের আশ্রম শান্তিনিকেতন কবে দেখতে পাব!‌ এই চিন্তায় এতই নিমগ্ন হয়ে পড়লাম, আমি যে কোথায় আছি এবং কী করছি মাঝে মাঝে তাও ভুলে যেতাম। একদিন তো আশ্রমের কথা ভাবতে ভাবতে চালে–‌ডালে মিশিয়ে ফেলে, এক কেলেঙ্কারি বাধিয়ে ফেলেছিলাম। যা হোক, একদিন অলীক কল্পনার রাজত্ব ছেড়ে, শিক্ষার জন্য আমি বাস্তবিকই শান্তিনিকেতনে এসে পড়লাম।
এসে যা দেখলাম, আমার কল্পনার অতীত।
তখন ছিল শরৎকাল। প্রকৃতিদেবী তাঁর অফুরন্ত ভাণ্ডার ছড়িয়ে রেখেছিলেন সারা আশ্রমে!‌ সমস্ত মাঠঘাট অপূর্ব রূপে সজ্জিত হয়েছিল। শিউলি ফুলের গন্ধে সারা আশ্রম মধুময় হয়ে উঠেছিল।
সন্ধের সময় আমি আশ্রমে এসে পৌঁছলাম। তখন গুরুপল্লীর কুটিরে কুটিরে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে উঠল, দিনান্তের ক্লান্ত রবি তার শেষ আলোয় রাঙিয়ে দিয়ে গেল সমস্ত ধরণীকে। গোয়ালপাড়ার রাঙাপথ সিন্দুরের মতো রঞ্জিত হয়ে উঠল। তারপর ঋষি রবীন্দ্রনাথকে দর্শন করে আমার জীবন ধন্য হল!‌
তখন ছিল পূজার ছুটি। আশ্রমের স্কুল, বোর্ডিং সবই ছিল বন্ধ। তাই আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল উত্তরায়ণে ‘‌কোণার্কে’‌ কবির বাড়িতে একটি ছোট্ট ঘরে। এই কারণেই কবিগুরুর স্নেহের সংস্পর্শে আসবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তখন প্রতিদিন দেখেছি তাঁকে শরতের শুভ্র প্রভাতে তাঁর ফুলের বাগানে পায়চারি করে বেড়াতে। তাঁর ঘরে ফিরবার পথে রোজই একবার করে তিনি আমার খোঁজ নিয়ে যেতেন।
অচেনা দেশে পথঘাট, লোকজন সবই ছিল অপরিচিত। কাজেই রোজ প্রভাতে উঠে চুপচাপ বসে থাকতাম সিঁড়িতে একাকী। আমার এই নিঃসঙ্গ ভাব কবিমনকে ব্যথিত করে তুলত, তাই তিনি স্নেহভরে রোজ একবার আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করে যেতেন। কাজেই প্রভাতে উঠেই ঋষি রবীন্দ্রনাথকে দর্শন করবার এবং প্রণাম করবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এ কথা মনে হলে আজও আমার আনন্দাশ্রুতে দু’‌‌চোখ ভরে ওঠে।
পূজার ছুটি। কবির বাড়িতে ঝি–‌চাকর ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি আমায় বিনা কাজে নিঃসঙ্গভাবে থাকতে দেখে, তাঁর একজন পরিচারিকার সঙ্গে চিঠি লিখে আমায় পাঠিয়ে দিলেন শ্রদ্ধেয় নন্দলাল বসু এবং শ্রদ্ধেয় দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে শিক্ষার জন্য। কাজেই ছুটিতেই আমার শিক্ষা শুরু হয়ে গেল। তাঁর অসীম স্নেহের জন্য নতুন জায়গায় এসেও আমাকে কোনওপ্রকার অসুবিধে ভোগ করতে হয়নি। সেই সুন্দর দিনগুলোর কথা আজও ভুলতে পারিনি।
তারপর ছুটি শেষ হয়ে গেলে আমি হস্টেলে চলে আসি। সেখানে সঙ্গী–‌সাথির অভাব হয়নি। তখন গুরুদেব আমাদের সব সময়ই বলতেন, ‘‌তোমাদের যখন যা বুঝতে ইচ্ছে হয়, আমার কাছে এসে বুঝে নিও।’‌ সেই থেকে আমার একজন মুসলমান বন্ধু ফিরোজা বারিকে সঙ্গে নিয়ে, চয়নিকা বইখানি হাতে করে, রোজ নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নে গুরুদেবের বিশ্রামের সময় গিয়ে হাজির হতাম।
তখন দেখেছি তাঁকে ধ্যানমগ্ন ঋষি রূপে। পাছে তাঁর ধ্যানভঙ্গ হয় তাই আমরা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকতাম দরজার আড়ালে। তারপর আমাদের প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়ামাত্র তিনি মৃদু হেসে, স্নেহভরে কাছে ডেকে নিতেন। তারপর চয়নিকা বইখানা খুলে একটার পর একটা কবিতা আবৃত্তি করেই যেতেন তিনি। কী অপূর্ব তাঁর কণ্ঠস্বর ও নিজের মুখের আবৃত্তি। আজও আমার অন্তরে সেই সুর ঝঙ্কৃত হয়ে ওঠে।
আমাদের জন্য খোলা ছিল তাঁর হৃদয়ের দ্বার। তাই আমাদের যখন ইচ্ছে তাঁর কাছে গিয়ে হাজির হয়েছি। তাই তাঁর ধ্যানের রূপ কতবার কত রূপে দেখেছি। তিনি কাজের মধ্যে বৈচিত্র‌্য ভালবাসতেন। সৃষ্টির খেয়ালে, এক ঘরে বসে, একনাগাড়ে কাজ করতে তিনি বেশি ভালবাসতেন না। কিছুদিন পরপরই তিনি ঘর বদলাতেন, তাই তাঁকে খুঁজে পেতে মাঝে মাঝে আমাদের বড় বেগ পেতে হত। তিনি খুব ছোট্ট ঘরে বসেই কাজ করতে বেশি ভালবাসতেন। কত সময় দেখেছি তাঁকে সন্ধের অন্ধকারেই কাজ করে চলেছেন। তাঁর লেখনী কখনও বন্ধ হতে দেখিনি।
গুরুদেবের ছবি আঁকা
আমরা প্রায়ই গুরুদেবের ছবি আঁকা দেখতে যেতাম। একদিন বন্ধু ফিরোজা বারিকে নিয়ে তাঁর ছবি আঁকা দেখতে যাই;‌ দেখি তিনি রং দিয়ে দুটো পাখির ছবি আঁকছেন। আমাদের দুই বন্ধুকে দেখে, হেসে তিনি রসিকতা করে বলে উঠলেন— ‘‌এই পাখি দুটি যেন ঠিক তোমরাই দুই বন্ধু।’‌ কাজের ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ পেলে, তিনি রসিকতা করতে ছাড়তেন না।
শেষ বয়সে বেশিরভাগ সময়ই তিনি ছবির মধ্যে ডুবে থাকতেন। সব সময় তাঁকে দেখেছি একটি কলম অথবা তুলি দিয়ে ছবি এঁকেই চলেছেন। কাগজের কোনও বাছবিচার ছিল না তাঁর। হাতের কাছে যা পেতেন, ছবি আঁকার নেশায় তার মধ্যেই এঁকে ফেলতেন তিনি। কত সময় দেখেছি তাঁকে ফেলে দেওয়া খবরের কাগজের ওপরেই ছবি আঁকছেন।
মাঝে মধ্যে আমরা তাঁর রঙের বাটি এবং তুলি ইত্যাদি ছবি আঁকার সরঞ্জাম পরিষ্কার করে দিয়ে আসতাম। তখন তিনি আমাদের কয়েকটি রঙের বাটি দিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি রঙের বাটি আজও তাঁর চিহ্নস্বরূপ আমার কাছে সযত্নে রয়েছে।
একবার ৭ পৌষে তিনি আমাকে রং দিয়ে একখানা ছবি এঁকে দিয়েছিলেন। ছবিটির বিষয়, ‘‌একজন বৃদ্ধ লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন’‌। ছবিখানা বোধহয় নিজেকেই কল্পনা করে তিনি এঁকেছিলেন, কিন্তু ছবিখানার রূপ তাঁর মতো মোটেই হয়নি, তাই আমার বেশি পছন্দ হয়নি সেদিন, সেটা বুঝতে পেরে তিনি আমায় বলেছিলেন পরে একখানা বড় করে ছবি এঁকে দেবেন, কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, সেবার হঠাৎ আমি বাড়ি চলে গেলাম, কাজেই ছবিখানা আমার আর নেওয়া হল না। সেজন্য আজও আমার মনে দুঃখ রয়ে গেছে।
দেখা হলেই তিনি আমায় বলতেন, ‘‌তুমি কী কী ছবি আঁকলে?‌ আমায় এনে দেখিও।’‌ তাই আমি যখন যা ছবি আঁকতাম তাঁকে দেখাতাম। তিনি দেখে খুব খুশি হয়ে, আমার মাথায় হাত দিয়ে বলতেন, ‘‌তোমার শক্তি আছে, তুমি পারবে, আমি আশীর্বাদ করলুম।’‌ এ কথাগুলো থেকে আজও আমার সমস্ত কাজে প্রেরণা লাভ করি।
একবার তাঁকে আমার আঁকা কতগুলো ডিজাইন দেখাতে গিয়েছিলাম। তার একটি ডিজাইনের মাঝখানে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা ছিল, ওই ফাঁকা জায়গাটি দেখে কিছু লেখার জন্য কবির হাত সুড়সুড় করছিল, তিনি বারবার আমায় বলেছিলেন, ‘‌তুমি এর মধ্যে একটা কবিতা লিখেই ফেলো না?‌’‌ আমি বললাম, ‘‌আমি তো কবিতা লিখতে পারি না।’‌ তখন তিনি হেসে বলে উঠলেন, ‘‌তবে কি আমাকেই লিখে দিতে হবে?‌’‌ উত্তরে আমি বললাম, ‘‌আপনি লিখে দিলে তো ভালই হয়।’‌ তারপর তিনি বললেন, ‘‌তা হলে ডিজাইনটি টেবিলের ওপর রেখে যাও।’‌ পরদিন গিয়ে দেখি আমার ডিজাইনের ফাঁকা জায়গায় তিনি লিখে দিয়েছেন একটি নতুন কবিতা—
‘‌যখন ছিলেম অন্ধ,
সুখের খেলায় বেলা গেছে পাইনি তো আনন্দ।
খোলাঘরের দেয়াল গেঁথে খেয়াল নিয়ে ছিলেম মেতে,
ভিত ভেঙে যেই এলে ঘরে ঘুচল আমার বন্ধ;‌
সুখের খেলায় আর রোচে না, পেয়েছি আনন্দ।।
ভীষণ আমার, রুদ্র আমার, নিদ্রা গেল ক্ষুদ্র আমার
উগ্র ব্যথায় নূতন কথায় বাঁধলে আমার ছন্দ।
যেদিন তুমি অগ্নিবেশে সব কিছু মোর নিলে হেসে
সেদিন আমি পূর্ণ হলেম, ঘুচল আমার দ্বন্দ্ব।
দুঃখ সুখের পারে তোমায় পেয়েছি আনন্দ।।
শান্তিনিকেতন, ৭ই বৈশাখ, ১৩৩৮

আর একদিন আমার সব ছবি দেখে খুশি হয়ে, তিনি আমার নাম রেখে দিলেন— ‘‌চিত্রনিভা’‌। সেই থেকে তিনি আমায় ‘‌চিত্রনিভা’‌ বলে ডাকতেন। এবং প্রায়ই তিনি রসিকতা করে আমায় বলতেন, ‘‌তোমার নামকরণ করলুম, এখন আমাদের বেশ ঘটা করে খাইয়ে দাও।’‌ কথাগুলো আজও আমার কানে গেঁথে আছে। তখন রান্না করতে জানতাম না। তাই আফসোস হয়। এখন হলে কত কিছু খাওয়াতে পারতাম।
তখন দেশ–‌বিদেশ থেকে কোনও নতুন মেয়ে শ্রীসদনে এলেই আমি তাদের নিয়ে গুরুদেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতাম। তাই গুরুদেব সবাইকে বলতেন ‘‌চিত্রনিভা হচ্ছে নূতনের সঙ্গী।’‌ তিনি বেশ খুশি হতেন, কারণ তিনি সব সময়ই বলতেন— ‘‌বিদেশিরা আমাদের অতিথি, তাদের যেন কোনও অযত্ন না হয়।’‌
আমি যখন প্রথম শান্তিনিকেতনে আসি তখন আমাদের ছাত্রীনিবাস ছিল ‘‌দ্বারিক’‌–‌এ। সেখানে এখন বোধহয় নতুন হস্টেল উঠেছে ছেলেদের জন্য। তখন সেখানেই আমাদের থাকা–‌খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল।
ছোট শিশুরাও আমাদের সঙ্গে খাওয়া–‌দাওয়া করত।
তখন ছেলেরা যার যার থালাবাসন নিজেরাই ধুয়ে নিত। গুরুদেবের ইচ্ছানুসারে তখন বড় মেয়েরা পালা করে ছোট্ট শিশুদের দেখাশোনা করতেন। তারপর গুরুদেব আমাদের জন্য একটি নতুন ছাত্রীনিবাস তৈরি করলেন। সেটি এখন শ্রীসদন নামে পরিচিত। গুরুদেবের ইচ্ছানুসারে ওই বাড়িটির জানালায় তখন শিক দেওয়া হয়নি। কিন্তু আমাদের গৃহাধ্যক্ষা গরাদহীন এক একটা বিরাট বিরাট জানালা যুক্ত ঘরে এতজন মেয়ের দায়িত্ব নিয়ে ওই বাড়িতে থাকতে সাহস পেলেন না। গুরুদেব এ কথা শুনে বিরক্ত হয়ে বললেন— ‘‌মেয়েদের যদি এতটুকু সাহস না থাকে, তা হলে এ বাড়ি আমি ছেলেদের দিয়ে দেব’‌ আর মেয়েদের বললেন— ‘‌যা তোদের জন্য বাঘের খাঁচা তৈরি করাব, তখনই তোরা নূতন বাড়িতে যাবি।’‌ এ কথা শুনে মেয়েরা সমস্বরে বলে উঠল, ‘‌এ বাড়ি আমাদের দিতে হবে, আমরা চোরের ভয় করব না’‌ ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে গুরুদেবের রাগ কোথায় মিলিয়ে গেল। তিনি মৃদু হেসে, পিতৃস্নেহে মেয়েদের গৃহপ্রবেশের অনুমতি দিলেন। তারপর আমরা মহাউল্লাসে গৃহপ্রবেশ করলাম।
সেই থেকে আমরা শ্রীসদনে নীচের তলায় (‌তখন একতলা ছিল)‌ বিরাট বিরাট একেকটা জানালা খুলে তার পাশেই রাত্রিতে নির্ভয়ে ঘুমিয়েছি, তাতে আমাদের কোনও বিপদ হয়নি। কিন্তু যত বিপদ হয়েছে আমাদের দিনের বেলাতেই। বিরাট বিরাট একেকটা জানালা খুলে তো আমরা ক্লাসে চলে যেতাম, কিন্তু ক্লাস থেকে ফিরে এসে যা দেখতাম— আমাদের চক্ষু স্থির হয়ে যেত!‌ এসে দেখি, আমাদের এক একটা খাট দখল করে মহাদাম্ভিকের মতো বসে আছেন, নবাগত অতিথিবৃন্দ!‌ তাঁদের গায়ের রং কারও বা মিশমিশে কালো কারও বা খয়েরি। তারা আর কেউ নয়, আমাদের অতিপিরিচিত এক একটা বিরাটকার কুকুর। তারপর আমাদের মনের যা অবস্থা হত সেটি আর না বললেও চলে। যা হোক, এ কথা আর গুরুদেবের কানে ওঠাইনি— পাছে এত কষ্টে ফিরে পাওয়া বাড়িটি হাতছাড়া হয়ে যায়। মোটের ওপর গুরুদেব সব সময় চাইতেন মেয়েরা যেন নির্ভীক হয়ে চলতে শেখে। ভীরুতাকে তিনি কোনও সময়ই প্রশ্রয় দিতেন না।
তিনি সব সময়ই আমাদের বলতেন— ‘‌এই আশ্রম আমি বিশেষ করে মেয়েদের জন্যই তৈরি করেছি, যাতে মেয়েরা মুক্তভাবে শিক্ষালাভ করতে পারে।’‌ এবং আমাদের বলতেন, ‘‌তোমাদের যখন যা কিছু বুঝবার থাকে আমার কাছে এসে বুঝে নিও।’‌ এর দ্বারাই বোঝা যায় তিনি মেয়েদের কতখানি ওপরে স্থান দিয়েছিলেন। মেয়েদের এত বড় করে, এবং এমন শ্রদ্ধার চোখে আর কেউ দেখেছেন কিনা আমার জানা নেই।
মনে আছে একবার আমাদের গৃহাধ্যক্ষা নিয়ম করে দিয়েছিলেন— দুপুরবেলা কোনও মেয়ে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া শ্রীসদনের বাইরে যেতে পারবে না। আর বিকেলে বেড়াবার সীমানা নির্দিষ্ট করে দিলেন— পশ্চিম দিকে সাঁওতাল গ্রাম পর্যন্ত এবং উত্তর দিকে— গুরুদেবের বাড়ির শেষ সীমানায়— একটি তালগাছ পর্যন্ত, আমরা বেড়াতে যেতে পারব। বোধহয় এখনও ওই তালগাছটি আমাদের বেড়াবার চিহ্নস্বরূপ দণ্ডায়মান আছে।
যা হোক, একে কোনও মেয়েই আপত্তি জানাতে সাহস পেল না। অবশ্য তখনকার দিনে অন্য জায়গায় মেয়েদের ওপর যা কড়াকড়ি নিয়ম ছিল, সেই তুলনায় শান্তিনিকেতনের মেয়েরা অনেক স্বাধীন ছিল। কাজেই আমাদের গৃহাধ্যক্ষাকে কোনও দোষ দেওয়া চলে না। বাইরে তিনি কঠোরতা প্রকাশ করলেও তাঁর অন্তরটি ছিল স্নেহপ্রবণ, তাই তাঁকে মাতৃরূপে শ্রদ্ধা করে এসেছি। কিন্তু তবুও আমারই হল বেশি মুশকিল— এই নিয়মের গণ্ডির ভেতরে থাকা। কারণ আমি নিস্তব্ধ দুপুরবেলাতেই গুরুদেবের কাছে কবিতা বুঝতে যেতাম এবং কলাভবনে ছবি আঁকতেও যেতাম দুপুরবেলায়, নিরিবিলির জন্য। আর বিকেলবেলায় একখানা স্কেচ বুক হাতে করে ছবি আঁকতে বেরিয়ে পড়তাম সবুজ মাঠে এবং গ্রাম–‌গ্রামান্তরে। তাই মনে হতে লাগল, এই নিয়মের মধ্যে থাকতে হলে তো আমার কোনওটাই হবে না, আমি মহা ভাবনায় পড়ে গেলাম!‌ হঠাৎ মনে পড়ে গেল গুরুদেবের কথা, তিনি তো আমাদের সব সময়ই বলতেন— ‘‌তোমাদের যখন যা অসুবিধে হয়, আমায় জানিও।’‌ তাই ভাবলাম একমাত্র তাঁর কাছে গেলেই মুক্তি পেতে পারি। তখন ছুটে গেলাম তাঁর কাছে। তাঁকে প্রণাম করতেই তিনি বলে উঠলেন— ‘‌‌কী খবর বলো?‌’‌ কিন্তু তাঁর কাছে গিয়ে কেমন জানি হল, আমার মুখ থেকে আর কথাই যেন বেরোতে চায় না। তখন কী যে বলব ভেবেই পাই না, সব যেন গুলিয়ে গেল। কেবল ‘‌ওই তালগাছ পর্যন্ত’‌, বলেই থেমে গেলাম। কিন্তু কী আশ্চর্য, তিনি বেশ বুঝতে পারলেন— আমি তাঁর কাছে কী বলতে এসেছি। তাই তিনি আমার মাথা চাপড়িয়ে বারবার বলতে লাগলেন— ‘‌তুমি কী বলতে এসেছ, বলো বলো।’‌ তখন আমার যা বক্তব্য ছিল বলেই ফেললাম। আমার সব কথা শুনে তিনি হেসে অভয় দিয়ে বললেন— ‘‌তোমার কোনও চিন্তা নেই, আমিই তোমায় পারমিশন দিলুম, তুমি ওই তালগাছ ছাড়িয়ে— যতদূর ইচ্ছে স্কেচ করতে যেতে পারো।’‌ সেই থেকে আমি একখানা স্কেচ বুক হাতে করে— নির্ভয়ে এবং একেবারে নিশ্চিন্ত মনে বেরিয়ে পড়তাম ছবি আঁকার জন্য দূর–‌দূরান্তে। আজ মনে হয় তিনি আমাদের কতখানি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। কোনও বাঁধনের মধ্যেই তিনি আমাদের রাখেননি। তাই এতকাল শান্তিনিকেতনে মুক্তবিহঙ্গের মতো— নীল আকাশে, সবুজ মাঠে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পেরেছিলাম। আজ শান্তিনিকেতনের স্মৃতিতেই আমার এই ক্ষুদ্র ছবির ভাণ্ডার পূর্ণ হয়ে আছে। তাই তো শান্তিনিকেতন— আমার কাছে কত সু্ন্দর!‌ কত মধুর!‌
শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের প্রতি গুরুদেবের অসীম স্নেহ ছিল। কীসে তাদের স্বাস্থ্য ভাল থাকবে এবং কী করলে তাদের সুব্যবস্থা হতে পারে, গুরুদেবের এই চিন্তাই প্রধান ছিল। আমি যে সময়কার কথা বলছি, তখন আমাদের রান্নাঘরে এতজন ছাত্রছাত্রীর ভাত রান্না হত কুকারে, কারণ ভাতের মাড় ফেলে দেওয়া হলে তার সঙ্গে অনেক পুষ্টিকর জিনিস বেরিয়ে যায়। তখন আমাদের ঢেঁকিছাঁটা আতপ চালের ভাত দেওয়া হত এবং খাঁটি দুধ–‌ঘি দেওয়া হত। রান্নাঘরের খাবার ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্যের উপযোগী হচ্ছে কিনা সেই খবর গুরুদেব সর্বদা নিতেন। তখন গুরুদেবের আদেশে শ্রীসদনে বোতলে বোতলে পঞ্চ তিতা আসত মেয়েদের জন্য। কাজেই ভোরবেলা উপাসনা করে উঠতেই সরোজিনীদি (‌শ্রীসদনের ম্যানেজার)‌ আমাদের ওপর কড়া নজর রাখতেন, যাতে আমরা এই তিতা ওষুধটি না খেয়ে পালাতে না পারি। তখন সব চেয়ে মুশকিল হয়েছে আমারই, কারণ ওই তিতা পদার্থটির ওপর আমার সব চেয়ে বেশি ভয় ছিল। সে যা হোক, ওষুধটি না খেলে আবার গুরুদেবের কানে নালিশ উঠবে। তাই কষ্ট করে হলেও তিতা খাওয়াটা অভ্যাস করে ফেললাম। তবে ওই ওষুধটি খাওয়ার জন্যই বোধহয়, তখনকার দিনে কারও অসুখ–‌বিসুখ হতে দেখিনি কখনও। অবশ্য তখনকার দিনে অসুখ হওয়াটাও বেশ আনন্দের ছিল। কারণ কারও একটু অসুখ হলেই আশ্রমের সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। রবীন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথ এবং মাস্টার মহাশয়রা সবাই ছুটে আসতেন রোগীর পাশে। আর ছাত্রছাত্রীরা তো প্রস্তুত হয়েই থাকত রোগীর সেবা করার জন্য। এই ছিল তখনকার শান্তিনিকেতন আশ্রমের রূপ।‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top