রূপা মজুমদার: বাংলা ১৩৩৮ (‌ইং ১৯৩১)‌ সালের কথা। শ্রাবণ মাস শেষ হতে চলেছে। আকাশ জুড়ে চলেছে রৌদ্র মেঘের খেলা। এমনি একটি দিনে বৈকালিক আড্ডা বসেছে ২১ ঝামাপুকুর লেনে। সুবোধচন্দ্র মজুমদারের ঘরে। ওই আড্ডায় চা–‌পানের ফাঁকে গৃহীত এক তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বাংলা শিশুসাহিত্যে এক সুদূরপ্রসারী ছাপ ফেলেছিল। এই আড্ডার সিদ্ধান্তে যে বার্ষিকী গ্রন্থমালার জন্ম হল তা বাংলা শিশুসাহিত্যের ভাণ্ডার ভরে দিল নানা  বিচিত্র ফসলে এবং প্রকাশনা সৌকর্যে যা ছিল অতুলনীয়।
ইতিপূর্বে বাংলায় ছোটদের জন্য বার্ষিকী প্রথম বের করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ জামাতা নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। ১৯১৮–‌য় তিনি ‘‌পার্বণী’‌ নামে একখানি বার্ষিকী প্রকাশ করে তাক লাগিয়ে ছিলেন। নগেন্দ্রনাথের লেখা থেকে জানা যায়, বিদেশে যাওয়ার ফলেই বার্ষিকী প্রকাশের পরিকল্পনা তাঁর মনে জেগেছিল। ‘‌পার্বণী’‌–‌র সম্পাদকীয়তে তিনি জানিয়েছেন, ‘‌সকল দেশে দেশেই পূজা–‌পার্বণ প্রভৃতি আনন্দোৎসবে ছেলেমেয়েদের জন্য অনেক আয়োজন করা হয়.‌.‌.‌। ইউরোপ ও আমেরিকায় নানা ধরনের বই ছাপানো হয়। সে–‌দেশে বড়োদিনের সময় বইয়ের দোকানে ছেলেমেয়েরা এসে ভিড় করে, আর টেবিলের উপর সাজানো রং–‌বেরং–‌এর বই বেছে নেয়।.‌.‌.‌ বিদেশে ছেলেমেয়েদের জন্য এত আয়োজন দেখে মনে মনে সঙ্কল্প করেছিলুম, বাংলাদেশের নামজাদা লেখক–‌লেখিকা ও চিত্রশিল্পীদের কাছ থেকে নানা বিষয়ে লেখা ও ছবি সংগ্রহ করে প্রতি বছর শারদীয় পূজার সময় তোমাদের জন্য একখানি বই বের করব।’‌ এক বছর বাদ দিয়ে ১৯২০–‌তে ‘‌পার্বণী’‌র দ্বিতীয় বা শেষ সংখ্যা বের হয়। ওই সময়ে এম সি সরকার অ্যান্ড সন্‌স্‌ থেকে ‘‌রংমশাল’‌ নামে একটি বার্ষিকী বেরিয়েছিল অল্পকালের জন্য। ১৯২৬ বা ১৩৩৩ সন থেকে ‘‌বার্ষিকী শিশুসাথী’‌ বেরুতে থাকে।
‘‌বার্ষিকী শিশুসাথী’‌ হঠাৎ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়নি। ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি। ‘‌বার্ষিক শিশুসাথী’‌ প্রকাশের চার বছর আগে আশুতোষ লাইব্রেরির উদ্যোগেই প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক ‘‌শিশুসাথী’‌। আশুতোষ লাইব্রেরির সঙ্গে ছোটদের লেখকদের নিবিড় যোগাযোগ ছিল। খগেন্দ্রনাথ মিত্রের মতো ক্ষমতাবান লেখক তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। ছিলেন ‘‌বাংলার ডাকাত’‌–‌এর যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত। মাসিক ‘‌শিশুসাথী’‌–‌র সূচনা‌বর্ষে খানিক আত্মকথার ভঙ্গিতে লেখা হয়েছিল, ‘‌তোমরা অনেকদিন হইতে আমার প্রতীক্ষায় আছো, তাহা আমি জানি। আমারও আসিবার আগ্রহ কম ছিল না, তবু আসিতে পারি নাই। সময় না হইলে ফলগাছে ফল ধরে না, ফুলের গাছে ফুলের পাপড়ি খোলে না। তোমাদের পায়ের নীচে ওই যে ঘাসগুলি, তাদের গায়েও নতুন পাতার শ্যামল শোভার বিকাশ হয় না।’‌
মাসিকপত্র হিসাবে ‘‌শিশুসাথী’‌ প্রকাশের পর যথেষ্ট সমাদৃত হয়। এমন জনপ্রিয় ছোটদের মাসিকপত্রের প্রকাশক যদি ছোটদের জন্য বার্ষিকী প্রকাশের উদ্যোগী হন, তাহলে তিনি তো কিছু বাড়তি সুবিধা পাবেনই। পেয়েছিলেন আশুতোষ লাইব্রেরির আশুতোষ ধরও। প্রকাশমাত্র মাসিকটির মতো বার্ষিকীটিও জনপ্রিয় হয়। রবীন্দ্রনাথের কবিতা শিরোধার্য করে ‘‌বার্ষিক শিশুসাথী’‌–‌র যে যাত্রা শুরু, ছেদ–‌যতিহীনভাবে একটানা বেরিয়েছে প্রায় সাড়ে চার দশকেরও বেশি।
জগদানন্দ রায় প্রথম বর্ষের ‘‌বার্ষিক শিশুসাথী’‌কে সামনে রেখেই যেন সম্পাদনায় ব্রতী হয়েছিলেন। তৃতীয় বর্ষে সম্পাদনা করেছিলেন বিজয়চন্দ্র মজুমদার। রবীন্দ্রনাথ সেন সম্পাদনা করেছিলেন চতুর্থ বর্ষের ‘‌বার্ষিক শিশুসাথী’‌। কার্তিকচন্দ্র দাশগুপ্ত (‌১৩৩৭)‌, নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (‌১৩৪০)‌, সুবিনয় রায়চৌধুরী (‌১৩৪১)‌ ও খগেন্দ্রনাথ মিত্রও (‌১৩৪৬)‌ সম্পাদনায় ব্রতী হয়েছিলেন।
বছর বছর সম্পাদক পাল্টালেও বার্ষিকীর ধরন পাল্টায়নি। ‘‌বার্ষিক শিশুসাথী’‌–‌র একটি ঘরানা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কখনও ঘরানাচ্যুত হয়নি। মেজাজমর্জিতে শুধু এক নয়, অঙ্গসজ্জা, এমনকি লেখক–‌সূচিও প্রায় একইরকম। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, কালিদাস রায়, বিশু মুখোপাধ্যায়, সুনির্মল বসু, স্বপনবুড়ো, ফটিক বন্দ্যোপাধ্যায়, এস.‌ ওয়াজেদ আলি, গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, হেমেন্দ্রকুমার রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শিবরাম চক্রবর্তী, আশাপূর্ণা দেবী, নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, নরেন্দ্র দেব, ধীরেন্দ্রলাল ধর, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, জসীমউদ্দীন— ‘‌বার্ষিক শিশুসাথী’‌র দীর্ঘ পথ–‌পরিক্রমা এমন কতজনেরই না উপস্থিতিতে বর্ণময় হয়ে উঠেছে।
কিন্তু পূজাবার্ষিকী মানেই আমরা যে প্রকাশনা সংস্থার কথা মনে করি, তা হল দেব সাহিত্য কুটীর। বাঙালির ঘরে ঘরে স্থান করে নিয়েছে, এদের পূজাবার্ষিকী। প্রথম বছর মাত্র এক মাসের প্রস্তুতিতে প্রকাশিত হল ‘‌ছোটদের চয়নিকা’‌। এটি বাংলা ভাষায় ছোটদের কবিতার প্রথম সঙ্কলন। সম্পাদনা করেছিলেন সুনির্মল বসু ও গিরিজাকুমার বসু। দুজনেই সুকবি। এই বার্ষিকীর পরিকল্পনাটি করেছিলেন বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যসেবী ক্ষিতীশচন্দ্র ভট্টাচার্য। শ্রীহট্ট থেকে আগত এই মানুষটির মাথায় অনেক পরিকল্পনা ঘুরপাক খেত। তিনি ‘‌মাসপয়লা’‌ নামে এক অভিনব পত্রিকা বের করেছিলেন। ‘‌রবিবার’‌ নামেও আরেকটি। নিজে একটি প্রকাশনালয়ও স্থাপন করেছিলেন। বাংলা শিশুসাহিত্যে এঁর অনেক অবদান আছে।
মাত্র এক মাসের প্রস্তুতিতেই ‘‌ছোটদের চয়নিকা’‌ প্রকাশিত হল। বাংলার বিশিষ্ট কবিদের আনুকূল্যে একটি চমৎকার সঙ্কলন এই ছোটদের চয়নিকা।
আর একে চিত্রিত করলেন বিশিষ্ট শিল্পী পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী, প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়, ফণিভূষণ গুপ্ত। এই অভিনব প্রকাশনাটি প্রকাশের অল্পকালের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে গেল।
রবীন্দ্রনাথ লিখলেন:‌ লিখতে যখন বলো আমায়/‌ তোমার খাতার প্রথম পাতে।/‌ তখন জানি কাঁচা কলম/‌ নাচবে আজো আমার হাতে।
‘‌ছোটদের চয়নিকা’‌ যেসব কবিতায় সমৃদ্ধ ছিল সেগুলির মধ্যে ছিল রবীন্দ্রনাথের তিনটি কবিতা। আরও প্রায় ত্রিশ কবির কবিতা ছোটদের চয়নিকায় ছাপা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, হেমেন্দ্রকুমার রায়, নরেন্দ্র দেব, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, গিরিজাকুমার বসু, কামিনী রায়, গিরিবালা দাসী, সুনির্মল বসু, গোলাম মোস্তাফা, বন্দে আলি মিঁয়া, জসীমউদ্দীন, বুদ্ধদেব বসু, সুবিনয় রায়, অখিল নিয়োগী প্রমুখ।
এরপর থেকে দেব সাহিত্য কুটীর দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে (‌দুবার ব্যতিক্রম)‌ পুজোর সময় আর হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। প্রতি বছর মহালয়ার দিন একটি করে বই অর্থাৎ বার্ষিকী বের করে যাচ্ছিল। বোর্ড বাঁধাই, নির্ভুল ছাপা, ভাল কাগজ, ভাল লেখা, ভাল ছবিতে ঠাসা এই বার্ষিকী মাত্র ৩/‌৪ টাকায় পাঠকের হাতে তুলে দিত এই প্রতিষ্ঠান। ক বছর পর থেকে বার্ষিকীর একটি অংশ রঙিন ছাপা হয়। বেশ কয়েকটি রঙিন ছবি ছাপা থাকত। রঙিন ছবি দেখে কবিতা লিখতেন সুনির্মল বসু। তাঁর মৃত্যুর পর এ কাজের দায়িত্ব আসে কবি বিমলচন্দ্র ঘোষের কাঁধে। সে দায়িত্ব তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে পালন করতেন। অচিরেই শারদোৎসবের আনন্দযজ্ঞে অপরিহার্য হয়ে ওঠে দেব সাহিত্য কুটীরের পূজাবার্ষিকী। নতুন নতুন নামে প্রকাশিত পূজাবার্ষিকী সম্পাদনা করতেন ভিন্ন ভিন্ন কবি–‌লেখক। ১৯৪৭ থেকে সম্পাদক হিসাবে আর কারও নাম ছাপা হয়নি। সে বছর ‘‌অঞ্জলি’‌ প্রথম সম্পাদকের নাম ছাড়া প্রকাশিত হয়। সম্পাদনার কাজ কাউকে না কাউকে করতেই হত, কিন্তু তিনি পর্দার আড়ালেই থেকে গেছেন। শুধু স্মরণীয় নয়, অবিস্মরণীয় লেখাও ছড়িয়ে রয়েছে এই বার্ষিকীগুলোতে। ১৯৮১–‌তে ‘‌আরাধনা’‌ প্রকাশের পর আর বার্ষিকী প্রকাশ করা হয়নি।
এবার একে একে বার্ষিকীগুলোর বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়া যাক। দ্বিতীয় বছরের পূজাবার্ষিকীর নাম ছিল ‘‌ছোটোদের গল্প সঞ্চয়ন’‌। সম্পাদনা করেছিলেন গিরিজাকুমার বসু ও সুনির্মল বসু। এরও দ্বিতীয় সংস্করণ হয়েছিল এই সালেই শ্রীপঞ্চমীতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘‌ইচ্ছাপূরণ’‌ গল্পটি এই সঙ্কলনে প্রকাশিত হয়েছিল। সুকুমার রায় (‌চৌধুরী)‌র ‘‌পাগলাদাশু’‌ গল্পটিও পাওয়া যায় এই সঙ্কলনে। এ ছাড়া আছেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নরেন্দ্র দেব, জলধর সেন, শিবনাথ শাস্ত্রী, হেমেন রায় প্রমুখ। বেশিরভাগ গল্পেরই চিত্রায়ণ করেছিলেন পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী।
কোনও অনিবার্য কারণে ১৯৩৩–‌এ বার্ষিকীর প্রকাশ বন্ধ ছিল। ১৯৩৪–‌এ সুনির্মল বসুর সম্পাদনায় প্রকাশিত হল ‘‌ঝলমল’‌। খুব সঙ্গত কারণেই ‘‌ঝলমল’‌–‌এর শুরু হয়েছে রবীন্দ্ররচনা দিয়ে। তারপর ছিল কালিদাস রায়ের একটি গল্প। কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতাও রয়েছে, অগ্নিদীপ্ত কোনও কবিতা নয়, মজার কবিতা ‘‌ফ্যাসাদ’‌। হাস্যরসে ভরপুর সে কবিতায় রয়েছে এক বালকের মনোযন্ত্রণার কথা। নজরুলের এই কবিতায় বালক ও কিশোররা নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবে—‘‌তারপরে যাও পাঠশালাতে,/‌ সেথায় আবার থাকে,/‌ এক যে জুজু, গুরুমশাই/‌ সবাই বলে তাকে।/‌ দুয়ে দুয়ে চার না হয়ে/‌ তিনই যদি হ’‌ল,
তোমার আমার কার কি গেল,/‌ কে বুঝাবে বল!‌’‌
‘‌ঝলমলে’‌ আরও অনেক কবিতা আছে। যতীন্দ্রমোহন বাগচীর সাত পাতা দীর্ঘ একটি কবিতা আছে ‘‌রাজার ছেলে’‌, সঙ্গে রয়েছে রঙিন আর্টপ্লেট। একটি গানও আছে ‘‌ঝলমলে’‌, অসিতকুমার হালদারের লেখা। অসিতকুমার ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অগ্রজা শরৎকুমারীর কন্যা সুপ্রভার পুত্র। গানের সঙ্গে ‘‌সঙ্গীত বিশারদ’‌ কৃত একটি স্বরলিপিও ছিল। আর ছিল মন্মথ রায়ের নাটক। ও রকমারি স্বাদের গল্প, যদিও হাসির লেখারই প্রাধান্য ছিল। লিখেছেন সুবিনয় রায়চৌধুরী, প্রবোধকুমার সান্যাল, বুদ্ধদেব বসু, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, নরেন্দ্র দেব, রাধারাণী দেবী, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, মণীন্দ্রলাল বসু, সুখলতা রাও, প্রেমেন্দ্র মিত্র, মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়, জলধর সেন, সীতা দেবী, ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর গল্প ‘‌অকৃতজ্ঞ’‌ ভয় জাগানো ভূতের গল্প। অনেক অনেক ভাল লেখা নিয়ে ‘‌ঝলমল’‌ যেন সত্যি ঝলমলিয়ে উঠেছিল।
১৯৩৫–‌এ দেব সাহিত্য কুটীরের পূজাবার্ষিকী সম্পাদনা করেছিলেন ‘‌সন্দেশ’‌–‌এর সম্পাদক এবং রায় পরিবারের সন্তান সুবিনয় রায়চৌধুরী। মজার লেখায় সিদ্ধহস্ত সম্পাদক মহাশয় এক মজাদার নামকরণ করেছিলেন সে–‌বার্ষিকী ‘‌আজব বই’‌। এই বার্ষিকীতে রায়চৌধুরী পরিবারের অনেকেরই লেখা ছিল। অবশ্য এইটা কোনও পক্ষপাতিত্ব বা পরিবারের প্রতি আনুগত্য নয়, রায়চৌধুরী পরিবারের উপস্থিতি খুবই স্বাভাবিক। শিশুসাহিত্য অঙ্গনে এই পরিবারের অবদান অবিস্মরণীয়। হাস্যরসময় মজাদার লেখার পাশাপাশি ছিল কৌতূহলোদ্দীপক বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা। সুখলতা রাওয়ের নাটক ও উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর লেখা ‘‌যখন বড়ো হব’‌ নামের একটি গান স্বরলিপিও ছিল সঙ্গে। এছাড়াও ছিল যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, মণীন্দ্রলাল বসু, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, সুনির্মল বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অখিল নিয়োগী, শৈলনারায়ণ চক্রবর্তী প্রমুখ বিখ্যাত সাহিত্যিকের লেখা বিচিত্র স্বাদের গল্প। লীলা মজুমদারের (‌তিনি তখনও মজুমদার হননি, তাই গল্পের পাশে ছিল শ্রীমতী লীলাদেবী, এমএ)‌ একটি মন ভাল করা চমৎকার গল্প ছিল ‘‌বাচ্চা’‌। আর সম্পাদক সুবিনয় রায়ের ঘরনি প্রবাসী বাঙালি পুষ্পলতাও একটি মজার নাটিকা লেখেন। ‘‌আজব বই’‌ থেকে পাঠকরা অবগত হয়েছেন যে সেই সময় ছোটদের সাহিত্য কী সমৃদ্ধ ছিল ও এই সমৃদ্ধির পিছনে রায়চৌধুরী পরিবারের ভূমিকা কতটা গভীর।
সাহিত্যের পরিমণ্ডল তখনকার দিনে অন্যরকম ছিল। তা না হলে একটি প্রকাশন সংস্থার কর্ণধার কখনও অন্য একটি প্রকাশন সংস্থার কর্ণধারকে তাঁর পূজাবার্ষিকী সম্পাদনার দায়িত্ব দেন?‌ সুবোধ মজুমদারের ডাকে সাড়া দিয়ে ‘‌মৌচাক’‌ পত্রিকার সম্পাদক সুধীরচন্দ্র সরকার সম্পাদনা করেছিলেন দেব সাহিত্য কুটীরের পূজাবার্ষিকী ‘‌শিশু গল্পিকা’‌। প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৭–‌এ। সেই সময় লোকেদের মনের ব্যাপ্তি ছিল অনেক। যোগ্যজনকে ‌স্বীকৃতি দেওয়া হত এইভাবেই। সুবোধ মজুমদার দায়িত্বভার গ্রহণ করে সেই স্বীকৃতির মর্যাদা রেখেছিলেন। সফল সম্পাদক সুধীরচন্দ্রের হাতের ছোঁয়ায় বৈচিত্রে ভরে উঠেছিল ‘‌শিশু গল্পিকা’‌। গল্পগুলি সাজানো হয়েছিল ক্রমান্বয়ে, এলোমেলোভাবে নয়। প্রথমে রয়েছে ‘‌অ্যাডভেঞ্চারের গল্প’‌, ‘‌পুরাণের গল্প’‌, ‘‌ভূতের গল্প’‌, ‘‌বিজ্ঞানের গল্প’‌, ‘‌রূপকথা’‌ ও ‘‌হাসির গল্প’‌। এই বিভাগের বাইরে যে গল্পগুলি ছিল, সেইগুলি মুদ্রিত হয়েছিল ‘‌বিবিধ গল্প’‌ বিভাগে। এই পূজাবার্ষিকীতেও যথারীতি বিখ্যাত সব লেখকদের রচনা ছিল, আর ছিল প্যারীমোহন সেনগুপ্ত ও প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প। এখন তো তাঁরা প্রায় বিস্মৃত।
যুগ্মভাবে কবি দম্পতি রাধারাণী দেবী ও নরেন্দ্র দেব সম্পাদনা করেছিলেন ‘‌সোনার কাঠি’‌। ক্ষিতীশচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদনা করেছিলেন ‘‌যাদুঘর’‌–‌এর। ক্ষিতীশবাবু সম্পাদনা করতেন ‘‌মাসপয়লা’‌ পত্রিকা ও ছোটদের আরেকটি পত্রিকা ‘‌রবিবার’‌। ‘‌যাদুঘর’‌–‌এর প্রথম লেখাটি প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায় চিত্রিত ছয় পৃষ্ঠাব্যাপী সুনির্মল বসুর লেখা এক দীর্ঘ কবিতা— ‘‌নিঝুম নিশীথে ঘুমের মাঝারে কে/‌ যেন রে যাদু করে/‌ গোপনে আমায় নিয়ে চলে যায়/‌ আকাশের যাদুঘরে।’‌
এই বার্ষিকীতে প্রথম প্রকাশিত হয় ম্যাজিক নিয়ে লেখা। লিখেছিলেন পি সি সরকার ও অমিতকৃষ্ণ বসু। একদম শেষে ছাপা হয়েছিল কয়েকটি বিজ্ঞানভিত্তিক মজাদার খেলা। ‘‌ছুটির খেলা’‌ নামক এই লেখায় রচনাকারের নাম নেই। এইরকম ব্যতিক্রমী লেখার নিদর্শন আর কখনও পাওয়া যায়নি।
‘‌চিত্রদীপ’‌ সম্পাদনা করেছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক হেমেন্দ্রকুমার রায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘‌ছেলেবেলার স্মৃতি’‌। এটি ‘‌জীবনস্মৃতি’‌ বা ‘‌ছেলেবেলা’‌ বইয়ের কোনও অংশের পুনর্মুদ্রণ নয়, রচনাটিতে বাল্যস্মৃতির চমৎকার চিত্র এঁকেছিলেন যা থেকে পাঠকরা অবগত হন যে কবির ছেলেবেলা বৈভবে নয়, একেবারে সাধারণভাবেই কেটেছিল। ‘‌চিত্রদীপ’‌–‌এ গল্পই প্রাধান্য পেয়েছে, প্রবন্ধ রয়েছে প্রায় ছ’‌খানা। লিখেছিলেন সুবিনয় রায়চৌধুরী, সজনীকান্ত দাস, বিশু মুখোপাধ্যায়, নরেন্দ্র দেব, ক্ষিতিমোহন সেন ও ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য। এ ছাড়াও ছিল প্রথম ভ্রমণ সংক্রান্ত লেখা, মণীন্দ্রলাল বসুর সুইজারল্যান্ড ভ্রমণ।
১৯৪১–‌এ প্রকাশিত হয় প্রেমেন্দ্র মিত্র সম্পাদিত ‘‌মায়া–‌মুকুর’‌। সম্পাদকীয়তে প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছিলেন— ‘‌তোমরা কবে বড়ো হবে,/‌ সত্যি বড়ো,/‌ বসুন্ধরায় বা’‌ ফলাবে সবুজতর,/‌ মুক্ত প্রাণের আকাশ হবে/‌ আরো উদার,/‌ গ্লানি কোথায় রাখবে না’‌ক/‌ কোনো সুধার/‌ সেই আশাতে বানিয়ে দিলাম/‌ মায়ামুকুর,/‌ ভাবীকালের ভরসা যত/‌ খোকা–‌খুকুর!‌
সাহিত্যের সব শাখাতেই প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন সমান স্বচ্ছন্দ। ছোটগল্পে তো অতুলনীয়। শিশু–‌কিশোর সাহিত্যেও ছিল প্রশ্নাতীত পারদর্শিতা। ছোটদের ছড়া–‌কবিতায়, গল্পে, বিশেষত কল্পবিজ্ঞানের কাহিনিতে তিনি অনবদ্য। তাঁর ‘‌ঘনাদা’‌ চরিত্রটি খুবই সমাদৃত একটি অমর সৃষ্টি।
প্রেমেন্দ্র মিত্র ‘‌মায়া–‌মুকুর’‌–‌এ লিখেছেন এক ভয়–‌ছমছম অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস নাম ‘‌উপত্যকার অভিশাপ’‌। অনেক অনেক ভাল লেখা ছড়িয়ে আছে দেব সাহিত্য কুটীরের এই পূজাবার্ষিকীতে। কবিতা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, সুনির্মল বসু, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, জসীমউদ্দীন, হুমায়ুন কবীর, কালিদাস রায়।‌
এই বার্ষিকীতেই প্রথম ছাপা হয়েছিল কাহিনিপ্রধান কবিতা। নিবন্ধ লিখেছিলেন নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, ধীরেন্দ্রলাল ধর, বিজনবিহারী ভট্টাচার্য, বিমল ঘোষ, ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য ও সুবিনয় রায়চৌধুরী। গল্পগুলি অধিকাংশই ছিল মানবিক। লিখেছিলেন তখনকার প্রায় সব সেরা সাহিত্যিক। বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন মজার নাটিকা— ‘‌ধারে বিক্রি নেই’‌। 
এইভাবে সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘‌সোনালী ফসল’‌, বুদ্ধদেব বসুর সম্পাদনায় ‘‌মধুমেলা’‌, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘‌রূপরেখা’‌ এবং শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘‌বর্ষামঙ্গল’‌ প্রকাশিত হয়। এঁদের মতো সুসাহিত্যিক এবং সম্পাদকের হাতে পড়ে বার্ষিকীগুলোর উৎকর্ষ কোন পর্যায় পৌঁছেছিল তা সেগুলির পাতায় নজর রাখলেই বোঝা যাবে। 
স্বনামী সম্পাদকের শেষ অধিকারী নীরদচন্দ্র মজুমদার। তিনি ছিলেন সুলেখক এবং দেব সাহিত্য কুটীর পরিবারের সদস্য। তাঁর সম্পাদনায় ১৯৪৬–‌এ প্রকাশিত হয় ‘‌আলপনা’‌। ১৯৪৭–‌এ প্রকাশিত হয় ‘‌অঞ্জলি’‌। এই পূজাবার্ষিকীটির একটি স্বতন্ত্র গুরুত্ব আছে। সম্পাদকের নামহীন বার্ষিকী প্রকাশের সূচনা হল এই ‘‌অঞ্জলি’‌ থেকেই। শুরুতেই মুদ্রিত হয়েছে একটি নামহীন রচনা, সহজেই অনুমান করা যায় যে সেটি সম্পাদকীয়— ‘‌বাংলার ভাই–‌বোনেরা, বাংলার ঘরে ঘরে সাত ভাই চম্পা আর পারুল বোনেরা। সারা বছর ধরে তোমাদের আনন্দের জন্য, এ–‌বন সে–‌বন সাত–‌বন ঘুরে একটি একটি করে কুড়িয়ে, নিয়ে এসেছি এবার ফুলের অঞ্জলি, আলোর অঞ্জলি, আনন্দের অঞ্জলি.‌.‌.।‌’‌
‘‌অঞ্জলি’‌ ছিল অজস্র ভাল লেখার এক আশ্চর্য সমাবেশ। লেখার শেষে ছাপা হয়েছিল কৃতীজনের বাণী। ছিল শিবাজী, রানি লক্ষ্মীবাই, বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বাণী। ছাপা হয়েছিল লেনিন, নেপোলিয়নের বাণীও। ‘‌অঞ্জলি’‌তে ছিল ছোটদের উজ্জীবিত করার মতো বড় মানুষদের জীবনকথা। সেরা লেখাটি ছিল অবশ্যই, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘‌আজকের মানুষ’‌।‌ নেতাজি, গান্ধীজিকে নিয়ে লেখা হয়েছিল ‘‌আজকের মানুষ’‌। 
‘‌এসো ভাই!‌ এসো বন্ধু, ছিটাও অমৃত–‌বিন্দু,?/‌ রক্তে রাঙা রাখী দিয়ে ঘটাও মিলন;/‌ ভেঙেছে যা দাও জুড়ে, ধনুক জগত জুড়ে,/‌ স্বাধীন ভারতে হোক নিবৃত্ত ক্রন্দন।’
উদ্ধৃত কবিতাটির নাম ‘‌রাঙারাখী’‌, কবি অনুরূপা দেবী। প্রকাশিত হয়েছিল দেব সাহিত্য কুটীরের পূজাবার্ষিকীতে। বার্ষিকীর নামও ‘‌রাঙারাখী’, সাল ১৯৪৭, ‘‌রাঙারাখী’‌‌ প্রকাশিত হয়েছিল স্বাধীনতা প্রাপ্তির কয়েক মাস পরেই, তাই পাতায় পাতায়‌ ছড়িয়ে ছিল উচ্ছ্বাস, ছিল অবিস্মরণীয় কবিতা, নতুন ভারত গড়ার অঙ্গীকার। দেশভাগের বেদনাবিধুর অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘‌খুকু ও খোকা’‌ প্রথম মুদ্রিত হয়েছিল ‘‌রাঙারাখী’‌–‌তেই—‘‌তেলের শিশি ভাঙল বলে/‌ খুকুর ’‌পরে রাগ করো
তোমরা যে সব ধেড়ে খোকা/‌     বাঙলা ভেঙে ভাগ করো!/‌ তার বেলা?‌’‌
‘‌রাঙারাখী’‌তে ছাপা হয়েছিল বিপ্লবীদের জীবনকথা, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ত্যাগের কথা, সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল—এই রক্ত–‌রাঙা রাখীর রঙে মিলিয়ে আছে,/‌ ক্ষুদিরামের অন্তিম নিশ্বাস,/ কানাইলাল আর সত্যেনের আত্মদান
মিশিয়ে আছে দীপান্তরে ঘানির ধারে/‌ কত না ছেলের চোখের জল/‌ দুশো  বৎসর লেগেছে তৈরী করতে/‌ এই রাখী/‌ এক টুকরো লাল সুতো
আজকে করতে হবে পণ,/‌ আর হাত থেকে খুলবে না এই মায়ের আশীর্বাদ/ ‌রাঙারাখী।’‌
তারপর একে একে দেব সাহিত্য কুটীর থেকে পূজাবার্ষিকী প্রকাশিত হয়েছে— ‌নবারুণ‌, ‌উদয়ন (‌১৯৪৮)‌‌, ‌অভিষেক‌ (‌১৯৫১)‌, পরশমণি (‌১৯৫২)‌, বসুধারা (‌১৯৫৩)‌, ইন্দ্রধনু (‌১৯৫৪)‌, নবপত্রিকা (‌১৯৫৫)‌, অপরাজিতা (‌১৯৫৮)‌, দেবালয় (‌১৯৫৯)‌, অপরূপা (‌১৯৬০)‌, শারদীয়া (‌১৯৬১)‌, শ্যামলী (‌১৯৬৪)‌, নীহারিকা (‌১৯৬৫)‌, শুকসারী (‌১৯৬৯)‌, মণিহার (‌১৯৭০)‌, প্রভাতী (‌১৯৭১)‌, উদ্বোধন (‌১৯৭২)‌, মন্দিরা (‌১৯৭৭)‌, বলাকা (‌১৯৭৫)‌, বিভাবরী (‌১৯৭৬)‌, আরাধনা (‌১৯৩১)‌, বেণুবীণা, চন্দনা, অরুণাচল, পূরবী, বলাকা, নবারুণ, অলকনন্দা, দেবদেউল, আবাহন, শ্যামলী, ইন্দ্রনীল, উত্তরায়ণ।
কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ছোটদের পত্রিকা ‘‌‌রংমশাল’‌ সম্পাদনা করতেন। দেব সাহিত্য কুটীরের পূজাবার্ষিকী ‘‌অভিষেক’‌–‌এ ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন ‘‌লন্ডনে প্রথম দিন’‌। ভূত ও গোয়েন্দার পাশাপাশি এই বার্ষিকীতে আছে নারায়ণ  গঙ্গোপাধ্যায়ের মজার গল্প পটলডাঙার প্যালারামকে নিয়ে ও শিবরাম চক্রবর্তীর হাসির গল্প। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কনিষ্ঠ কন্যা মীরাদেবীর মেয়ে ছিলেন নন্দিতা। নন্দিতাকে নিয়ে একটি অপ্রকাশিত কবিতা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। ‘‌রঙিন সুরের ঘুড়ি’‌ নামাঙ্কিত এই কবিতাটি ছাপা হয়েছিল ‘‌পরশমণি’‌র প্রথম রচনা হিসাবে। ছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, বনফুল, সরোজকুমার রায়চৌধুরী, পরিমল গোস্বামী, প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় ও অখিল নিয়োগীর চমৎকার সব গল্প। বিধায়ক ভট্টাচার্যের মজার নাটক ছিল দেব সহিত্য কুটীর প্রকাশিত বার্ষিকীর অন্যতম আকর্ষণ। ঘনাদা, টেনিদার গল্পের মতো মনোরম কাণ্ডকারখানা নিয়ে নাটক বেশ কয়েক বছর ধরে লিখেছিলেন বিধায়ক। ‘‌পরশমণি’‌তে রয়েছে অমরার পক্ষে অমরেশ। ‘‌বসুধারা’‌য় ছাপা হয়েছিল বন্ধু প্রমথনাথ সরকারকে লেখা সুভাষচন্দ্র বসুর একটি অপ্রকাশিত চিঠি। রয়েছে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পূর্ণ উপন্যাস ‘‌জটায়ু’‌। ‘‌অপরাজিতা’‌তে প্রকাশিত হয়েছিল অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের লেখা ‌‘‌বিদ্যাসাগর ও শ্রীরামকৃষ্ণ’‌। সজনীকান্ত দাসের সঙ্গে ত্রৈলোক্যনাথের কাল্পনিক সাক্ষাৎ বিবরণ ‘‌ত্রৈলোক্যনাথের গল্প’‌ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল ‘‌দেবালয়’‌–‌এ। ‘‌শ্যামলী’–‌‌তে ‌‘‌ঘনাদা’‌র গল্প আছে, টেনিদার গল্পও আছে। বিমল মিত্র লিখেছেন পৌরাণিক গল্প। গান্ধীজিকে নিয়ে লিখেছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলি, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছিলেন ব্রাহ্মসমাজের শিবনাথ শাস্ত্রীর সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের কথোপকথনের বিবরণ। ‘‌শুকসারী’‌তে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‌নন্দনগড় রহস্য’‌ প্রকাশিত হয়েছিল। রয়েছে নীহাররঞ্জন গুপ্তর গল্প ও রাজারাও ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের শিকার কাহিনি। ‘‌বলাকা’‌তে সুধীন্দ্রনাথ রাহার অনুবাদ গল্পর পাশাপাশি ছিল শৈল চক্রবর্তীর মজার গল্প ‘‌একটা ছুটির অ্যাডভেঞ্চার’‌, লিখেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, অদ্রীশ বর্ধন ও প্রমথনাথ বিশী। ‘‌বিভাবরী’‌তে আছে কুমারেশ ঘোষ, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, শক্তিপদ রাজগুরুর হাস্যরসাত্মক গল্প, তার সঙ্গে গজেন্দ্রকুমার মিত্রর ঐতিহাসিক গল্প ও সংবাদদুনিয়ার দুই প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব দক্ষিণারঞ্জন বসু ও অমিতাভ চৌধুরীর লেখা। ময়ূখ চৌধুরীর কমিক্স স্থান পেয়েছে ‘‌বিভাবরী’‌তে। ১৯৭৮ ছিল একটি ব্যতিক্রমী বছর‌। প্রকৃতিদেবী বিরূপ হওয়াতে সারা রাজ্য চলে গিয়েছিল জলের তলায়। সে বছর বন্যায় সোনার ফসল নষ্ট হয়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল, হাজার হাজার মানুষ গবাদি পশু প্রাণ হারিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ লোক ঘরছাড়া হয়েছিল। দুর্গোৎসব নিষ্প্রভ হয়ে গিয়েছিল। দেব সাহিত্য কুটীর থেকে ১৯৭৮–‌এ পূজাবার্ষিকী প্রকাশিত হয়নি।
১৯৮১–তে ‘‌আরাধনা’‌ ছিল দেব সাহিত্য কুটীর থেকে প্রকাশিত শেষ পূজাবার্ষিকী। এই বার্ষিকীতে লিখেছিলেন বিমল মিত্র, নারায়ণ সান্যাল, প্রফুল্ল রায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু ও আরও অনেকে। প্রেমেন্দ্র মিত্রর অবিস্মরণীয় গল্প ‘‌ঘনাদা ফিরলেন’‌ প্রকাশিত হয়েছিল দেব সাহিত্য কুটীরের শেষ পূজাবার্ষিকী ‘‌আরাধনা’‌তেই।
চিত্রণ বা অঙ্গসজ্জার কথা না বললে পূজাবার্ষিকী নিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ছোটদের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে গ্রন্থগুলি চিত্রসম্পদে ভরপুর থাকত। প্রতিটি পূজাবার্ষিকীতেই শিল্প জগতের নক্ষত্র সমাবেশ ঘটেছে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়, পূর্ণ চক্রবর্তী, পূর্ণ ঘোষ, বলাই রায়, শৈল চক্রবর্তী, সমর দে, বনফুল, নারায়ণ দেবনাথ, তুষারকান্তি চট্টোপাধ্যায়— সবাই আছেন, এমনকি তেমন শিল্পী নন, শিশুসাহিত্যিক হিসাবেই সবিশেষ খ্যাত অখিল নিয়োগীও (‌স্বপনবুড়ো)‌, মন্মথ রায়ের একটি নাটিকার ইলাস্ট্রেশন করেছিলেন ‘‌শী অ’‌ বলে। বার্ষিকীগুলির প্রায় প্রতি পৃষ্ঠাতেই ছবি এবং মাঝে মাঝে পূর্ণ পৃষ্ঠার রঙিন ছবি প্রকাশিত হত। ওই সময় অর্থাৎ দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরকে আমরা দেব সাহিত্য কুটীরের স্বর্ণযুগ বলে চিহ্নিত করতে পারি। কর্ণধার ছিলেন চারজন এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ কাজে পারদর্শী ছিলেন। আশুতোষ দেবের জ্যেষ্ঠ পু্ত্র প্রবোধ মজুমদারের (‌মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়সে)‌ তিরোধানের পর প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেছিলেন সুবোধ মজুমদার। তার বেশ কয়েক বছর পর তাঁর সেজ ভাই নীরদ মজুমদার প্রতিষ্ঠানে আসেন এবং অর্থনৈতিক বিভাগের দায়িত্ব নেন। ছোটভাই ক্ষীরোদ মজুমদার বিলেত থেকে অ্যাটর্নিশিপ পাশ করে এসে প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হন। প্রবোধবাবুর একমাত্র পুত্র মধুসূদন মজুমদার মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মারাত্মক বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। অবশ্য তাতে তাঁর পড়াশোনা থেমে থাকেনি। অর্থনীতি নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পর্যন্ত পড়েছিলেন এবং ইতিহাস বিষয়ে তাঁর প্রচুর পড়াশোনা ছিল। ‘‌শুকতারা’‌ ও ‘‌নবকল্লোল’‌ তাঁর দায়িত্বে ছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের স্বর্ণযুগের অবসান ঘটে এক সময়। নীরদবাবুর মৃত্যু হয় ১৯৭৪–‌এ, ক্ষীরোদবাবুর ১৯৭৬–‌এ, মধুসূদনবাবুর ১৯৮১–‌তে আর সুবোধবাবু দেহ রাখেন ১৯৮২–‌তে। ১৯৭৮ সাল থেকে পশ্চিমবাংলায় শ্রমিক–‌আন্দোলনের জোয়ার বয়েছিল। দেব সাহিত্য কুটীরে তার ছায়া এসে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭৮–‌এর পর থেকে কমবেশি শ্রমিক অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। বর্তমান এ টি দেব–‌এর অভিধান, নোটবই, ধর্মগ্রন্থ, পূজাবার্ষিকী, শুকতারা, নবকল্লোল, অনুবাদ সিরিজ, প্রহেলিকা সিরিজ ইত্যাদি সিরিজের বই নিয়ে প্রায় ৫০০০ টাইটেল–‌সহ বাংলা ও বহির্বাংলায় দেব সাহিত্য কুটীরের বিশাল ব্যবসা। সুতরাং শ্রমিকও প্রচুর। শ্রমিক আন্দোলনে প্রতিষ্ঠানের চলমানতায় ছেদ পড়ে ও ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে জুলাই ১৯৮৩ পর্যন্ত দেব সাহিত্য কুটীরের কাজকর্ম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পুরো বই ব্যবসাটিই ধাক্কা খায়। ১৯৮৩–‌র জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু হবার পর তৎকালীন কর্ণধারেরা আর বার্ষিকী প্রকাশে উদ্যোগী হননি, কারণ তাঁরা ‘‌শুকতারা’‌র পূজা সংখ্যা প্রকাশ করবেন বলে মনস্থির করেন। এর আগে দেব সাহিত্য কুটীরের ঐতিহ্যমণ্ডিত বার্ষিকী বেরুত বলে ‘‌শুকতারা’‌র পৃথক শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ করা হত না। তাই বলা যেতেই পারে, ৭০–‌এর দশকের শেষের দিক থেকে প্রতিষ্ঠানের চার কর্ণধারের পরপর মৃত্যু, শ্রমিক আন্দোলন ও পরে ‘‌শারদীয়া শুকতারা’‌ প্রকাশের উদ্যোগ হেতু ১৯৮১–‌তে দেব সাহিত্য কুটীর থেকে প্রকাশিত পূজাবার্ষিকীর দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের পথ চলার সমাপ্তি ঘটে।
সেই সময় দেব সাহিত্য কুটীরের বই–‌এর বিজ্ঞাপন কোথাও দেওয়া হত না। সুবোধ মজুমদার তাই পূজাবার্ষিকীগুলোতে প্রতিষ্ঠানের বই–‌এর বিজ্ঞাপন দিতেন, এতে বাইরের বিজ্ঞাপন থাকত না। পত্রিকার পূজা সংখ্যার মতো সাময়িক সংরক্ষণ উপযোগী না করে জ্যাকেটসুদ্ধ ভালভাবে বাঁধিয়ে কভার ও ব্যাক কভারে ছবি দিয়ে চমকপ্রদ পুস্তানি–‌সহ কখনও বা ফোল্ডার ও বোর্ডে আলাদা আলাদা ছবি দিয়ে, ছোটদের ভাললাগার মতো বই করে নামমাত্র বিনিময় মূল্যে অথচ মানসম্মত লেখা ও চোখধাঁধানো ছবি দিয়ে প্রকাশিত এই গ্রন্থগুলি এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে, আজও সেই জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।
পাঠকের চাহিদা অনুসারে বর্তমানে প্রতি বছর দুটি বা তিনটি করে পূজাবার্ষিকীর নতুন সংস্করণ বা পুনর্মুদ্রণ করে প্রকাশ করা হয় মহালয়ার দিনে এবং কলিকাতা পুস্তক মেলায় (‌জানুয়ারি–‌ফেব্রুয়ারি)‌, দ্রুত তা নিঃশেষিত হয়ে যায়। পূজাবার্ষিকী পুনর্মুদ্রণের ধারাবাহিকতা দেব সাহিত্য কুটীর বর্তমানে চালিয়ে যাওয়ার কারণ মূলত দুটি। নতুন প্রজন্মের পাঠকদের পুরনো লেখাগুলির সঙ্গে পরিচিত করানোর জন্য এবং প্রবীণেরা যাতে তাঁদের হারানো কৈশোরের স্মৃতিটুকু ফিরে পেতে পারেন।
বার্ষিকী প্রকাশের ক্ষেত্রে শরৎ সাহিত্য ভবনের ভূমিকাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়। শরৎ সাহিত্যের বার্ষিকী ১৩৫২–‌তে প্রথম বেরিয়েছিল। আশুতোষ লাইব্রেরি বা দেব সাহিত্য কুটীরের বার্ষিকীর মতো দীর্ঘায়ু হয়নি শরৎ সাহিত্য ভবনের বার্ষিকী। বেরিয়েছিল একটানা দশ বছর। সব থেকে বড় কথা, দশ বছরই সম্পাদনা করেছেন হেমেন্দ্রকুমার রায়। ছোটদের সাহিত্যের তিনি খ্যাতনামা লেখক। ছোটদের মনের খবর জানা ছিল তাঁর। শরৎ সাহিত্য ভবনের বার্ষিকীগুলি স্বকীয়তায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি বার্ষিকীই স্বতন্ত্র নামে চিহ্নিত। ‘‌কলরব’‌, ‘‌ছায়াপথ’‌, ‘‌দেশের মাটি’‌, ‘‌আকাশদীপ’‌, ‘‌সুপ্রভাত’‌, ‘‌সারথি’‌, ‘‌কল্পতরু’‌, ‘‌অরবিন্দ’‌, ‘‌তপোবন’‌ ও ‘‌মনোরথ’‌— দশ বছরে উল্লিখিত দশ নামে, হেমেন্দ্রকুমার রায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল। শরৎ সাহিত্য ভবনের বার্ষিকীতে নামী কবি–‌লেখকদের লেখার অভাব ঘটেনি।
শরৎ সাহিত্য ভবনের প্রতিটি বার্ষিকীই সুচিন্তিত শুধু নয়, সুচিত্রিত। প্রতি বছরই ‘‌চিত্র–‌সম্পাদক’‌ হিসাবে এক শিল্পীর নাম ছাপা হত। তিনি মনোজ বসু। পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী, ফণী গুপ্ত বা শৈল চক্রবর্তীর মতো নামী শিল্পীরা ছবি আঁকতেন। সূচিপত্রের পরেই ‘‌শিল্পী সঙ্ঘ’‌ শিরোনামে ছাপা হত তাঁদের নাম–‌তালিকা। শিল্পী–‌নামের আগে থাকত কয়েক পঙ্‌ক্তিতে তাঁদের উদ্দেশে স্বীকৃতি জ্ঞাপন। ‘‌তপোবন’‌–‌এ লেখা হয়েছিল ‘‌মনের কল্পনাকে, রঙের আলপনায় সাজিয়ে ‘তপোবন’‌কে উজ্জ্বল রূপশ্রীমণ্ডিত করেছেন যাঁরা.‌.‌.‌ প্রকৃতির ভক্ত–‌পূজারী সেইসব বর্ণবিলাসী শিল্পী–‌সঙ্ঘের পরিচয়–‌লিপি’‌— এই স্বীকৃতির পরেই ছাপা হয়েছিল শিল্পী–‌নামের তালিকা। এইভাবে শিল্পীদের তো সচরাচর সম্মান জানানো হয় না, হেমেন্দ্রকুমার রায় জানিয়েছিলেন।
শরৎ সাহিত্য ভবনের বার্ষিকীতে অজস্র ভাল লেখা ছাপা হয়েছি। নামী, খুব নামী কবি–‌লেখকদের এই সমাবেশ দশ বছরের বেশি স্থায়ী হয়নি, ভাবতেও খারাপ লাগে।‌
বার্ষিকী বেরিয়েছে আরও অনেকগুলি। যতীন্দ্রমোহন বাগচী সম্পাদনা করেছিলেন ‘‌ছোটোদের বার্ষিকী’‌ (‌১৩৩৬)‌। অখিল নিয়োগীর সম্পাদনায় বেরিয়েছিল ‘‌মধুচক্র’‌ (‌১৩৪১)‌। যোগীন্দ্রনাথ সরকার সম্পাদনা করেছিলেন ‘‌গল্প–‌সঞ্চয়’‌ (‌১৩৪৩)‌।
তরুণ সাহিত্য মন্দির থেকে চমৎকৃত হওয়ার মতো একটি বার্ষিকী বেরিয়েছিল। ব্রজমোহন দাশের সম্পাদনায় প্রকাশিত সে–‌বার্ষিকীটির নাম ‘‌ছোটোদের মাধুকরী’‌ (‌১৩৪৫)‌। বেরিয়েছিল আরও বেশ কয়েকটি উল্লেখ করার মতো বার্ষিকী। যেমন, প্রেমেন্দ্র মিত্রের সম্পাদনায় ‘‌গল্পের মণিমালা’‌ (‌১৩৪৪)‌, ক্ষিতীশচন্দ্র ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় ‘‌নূতন গল্প’‌ (‌১৩৫০)‌, খগেন্দ্রনাথ মিত্রের সম্পাদনায় ‘‌সপ্তডিঙা’‌ (‌১৩৫২)‌, খগেন্দ্রনাথেরই সম্পাদনায় ‘‌মানিক মেলা’‌ (‌১৩৫৪)‌, ইন্দিরা দেবীর সম্পাদনায় ‘‌সাত সমুদ্দুর (‌১৩৬০)‌ ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘‌পাতাবাহার’‌ (‌১৩৬২)‌ বার্ষিকী হিসাবে খুবই উল্লেখযোগ্য।
শিশুসাহিত্য পরিষদ থেকে বেরিয়েছিল ‘‌আহরণ’‌ ও ‘‌আনন্দ’‌। ‘‌আনন্দ’‌ বেরিয়েছিল একটানা আঠারো বছর। পরবর্তীকালে শিশু সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘‌শঙ্খমালা’‌ নামেও একটি বার্ষিকী বেরিয়েছিল। ‘‌ঝালাপালা’‌ সগৌরবে এখনও বেরুচ্ছে। ইদানীংকালে, কয়েক বছর ধরে বের হচ্ছে ‘‌আমপাতা জামপাতা’‌।
শূন্য দশকের গোড়ার দিক বাংলা আধুনিক শিশুসাহিত্যের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। সাহিত্যের জগতে তখন দাপটে রাজত্ব করছেন মহাশ্বেতা দেবী, শংকর, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, নবনীতা দেবসেন, বাণী বসু, সুচিত্রা ভট্টাচার্য প্রমুখ। বাঙালি পাঠকের তখন অবস্থা— ‘‌কাকে ছেড়ে কাকে পড়ি’‌!‌ কিন্তু পূজাবার্ষিকী বলতে যা বোঝাত, হার্ড বাউন্ড, বিজ্ঞাপন ছাড়া, সংরক্ষণ যোগ্য বই, সেই ধরনের সঙ্কলন কিন্তু তখন প্রকাশিত হয়নি। সেই উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি জানি না। একটা কারণ হতে পারে বিভিন্ন পত্রিকার শারদ সংখ্যা প্রকাশ হওয়ার হেতু।
খেয়াল রাখতে হবে, সেই সময়কার শিশুদের মনোজগৎ আর আজকের দিনের শিশুমনোজগৎ এক নয়। আজকের শিশু–‌কিশোরদের কাছে বই–‌ই জ্ঞান আহরণ ও বিনোদনের একমাত্র সঙ্গী নয়। টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সব কিছু তাদের হাতের নাগালে। বদলে যাওয়া সময়ে প্রযুক্তিময় যে সমাজ গড়ে উঠছে সেখানে শিশু–‌কিশোরদের মনোজগতেও ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষণীয়। এখনকার ছোটদের অনুভবে জেগেছে নতুন রং। সেই নতুন রঙের ছোঁয়ায় রাঙানো, অভিনব বিষয় নিয়ে লেখা লেখকদের দৃঢ় কলমের জোরে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে করা এই নতুন পূজাবার্ষিকীগুলো কিছুটা হলেও আজকের যুগের মানুষদের বই–‌এর দিকে মুখ ফেরাতে সাহায্য করেছে।
নতুন বার্ষিকীগুলো ছাড়াও বেশ কিছু সঙ্কলন প্রকাশিত হচ্ছে যেগুলোতে থাকছে হারিয়ে যাওয়া বার্ষিকীর প্রায় হারিয়ে যাওয়া অসাধারণ সব লেখা। পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়–‌এর মতো বেশ কয়েকজন গবেষক এগিয়ে এসেছেন এইসব মণি‌মুক্তোগুলো পুনরুদ্ধারের কাজে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে নতুনই হোক বা পুরনোই (‌পুনর্মুদিত)‌ হোক, বর্তমানে আবার পূজাবার্ষিকীর প্রকাশের জোয়ার এসেছে। ছোটরা এসব মহার্ঘ্য রচনা পাঠ করে আনন্দে আপ্লুত হবে, বড়রা ফিরে পাবেন ফেলে আসা ছেলেবেলা, মনে পড়ে যাবে কত সুখস্মৃতি, এর থেকে আনন্দের আর কী হতে পারে!‌

লেখক দেব সাহিত্য কুটীরের কর্ণধার। 
‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top