তিনি ঠাকুরবাড়ির সদস্য। বিনা প্রচারে ভারতীয় চিত্রকলায় ঘটিয়েছিলেন নিঃশব্দ বিপ্লব। সঞ্জয় ঘোষ। 

ঠাকুরবাড়ির যে তিনজন চিত্রকরের হাতে ভারতীয় চিত্রকলার নবজন্ম ঘটেছিল তঁারা হলেন রবীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ। অবনীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রভাবে চিত্রকলার ‘‌ভারতীয় মুখ’‌ খুঁজতে চাইলেন। তাতে ভারতীয় চিত্রকলার সনাতন পদ্ধতি ও রূপ বারবার উঁকি মারতে লাগল। অবনীন্দ্রনাথ নিজস্ব প্রতিভা ও শিল্পবোধে তার মধ্যেও চারিয়ে নিলেন ব্যক্তিগত তুলির স্বাক্ষর। এবং পরবর্তী অধ্যায়ে অবনীন্দ্রনাথ এই ‘‌জাতীয়তাবাদী’‌ তকমার বাইরে গিয়ে অঁাকতে লাগলেন বিস্ময়কর সব ছবি, যা বজায় থাকল তঁার শেষ দিন পর্যন্ত বরানগরে নির্বাসিত জীবনের ‘‌কাটুম–কুটুম’‌–এর ভাস্কর্য অবধি। অবনীন্দ্রনাথের অক্ষম অনুকারকেরা এই ‘‌জাতীয়তাবাদী’‌ ঘেরাটোপের বাইরে বেরোতে পারেননি এবং ভারতীয় চিত্রশৈলীর পৌনপুনিক চর্চায় আজীবন নিমজ্জিত থাকলেন। রবীন্দ্রনাথ তঁার অপটু হাতে আর আকাশ–চওড়া ও সমুদ্র–গভীর শিল্পবোধে যে সব চিত্রসৃষ্টি করে গেলেন, ভারতীয় শিল্পী ও দর্শকেরা তা কোনওদিন ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেননি। প্রথম জীবনে রবি বর্মার মতো দ্বিতীয় শ্রেণীর শিল্পীর ভক্ত হওয়া সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ–‌পরবর্তী যুগে বিশ্বচিত্রকলার ছোঁয়াচ পেয়ে নিজের শিল্পজিজ্ঞাসাকে আমূল পরিবর্তন করে ফেলেন। ষাটোর্ধ্ব বয়সে তঁার হাত দিয়ে বেরোতে থাকে কল্পনির্ঝরের মতো অজস্র হৃৎপিণ্ড–বেঁধানো ছবি, যা ভারতীয় চিত্রভাষাকে চুরমার করে দেয়। রবীন্দ্রনাথের হাতে তুলি–কলম তুলে নেওয়ার অনেক আগে, অবনীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে বুঁদ হয়ে চিত্রসৃষ্টির মুহূর্তে ঠাকুরবাড়ির একজন বিনা প্রচারে, বিনা ধামাকায় ভারতীয় চিত্রকলার যে নিঃশব্দ বিপ্লবটা সারছিলেন, তিনি গগনেন্দ্রনাথ।
জোড়াসঁাকোর ‘‌দক্ষিণের বারান্দা’‌য়‌ দুই ভাই অবনীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথ পাশাপাশি ছবি অঁাকতেন। রবীন্দ্রনাথের উদাত্ত আহ্বান তঁাদের ঘরকুনো স্বভাব ছাড়িয়ে ‘‌দক্ষিণের বারান্দা’‌ থেকে বের করে বিদেশে বা শিলাইদহের খোলা প্রান্তরে এনে ফেলতে পারেনি, কখনওই। রবীন্দ্রনাথের ডাকে তঁারা নিজেদের ছাত্র নন্দলাল বা সুরেন্দ্রনাথকে দূর প্রবাসে পাঠিয়েছেন, নিজেরা যাননি। একই সঙ্গে পাশের চেয়ারে বসে ছবি অঁাকলেও অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে গগনেন্দ্রনাথের শিল্পসত্তার কিছু মূল পার্থক্য থেকেই যাচ্ছিল। স্বভাবগত ও চরিত্রগত এই প্রভেদ প্রতিফলিত হচ্ছিল তঁাদের শিল্প প্রকরণে ও শিল্পভাষায়।
গগনেন্দ্রনাথ শিল্পশিক্ষার পাঠ নেননি সেভাবে কোথাও। চিত্রকলাকে তিনি তেমন গুরুত্ব দেননি প্রথম জীবনে। তবু তঁার প্রথম জীবনের বিভিন্ন কার্যকলাপ— যেমন পুত্রের বিবাহের সাজসজ্জা,নিজেদের পোশাক, আসবাবের ডিজাইন নিয়ে ভাবনাচিন্তা (‌প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী জীবনের যে পোশাকটি ভুবন বিখ্যাত, তা গগনেন্দ্রনাথেরই ডিজাইন করা)‌ বুঝিয়ে দেয় যে তঁার শিল্পীমনটি তঁার অন্তরে সর্বদা সজীব হয়ে লুকিয়ে থাকত। বিচিত্র সব শখে— যেমন ফোটোগ্রাফি, ঘুড়ি ওড়ানো, খেলনা সংগ্রহ ইত্যাদিতে তিনি মশগুল হয়ে থাকতেন। এই স্বভাব বোধহয় তিনি অর্জন করেছিলেন পিতা গুণেন্দ্রনাথের শিল্পীসত্তা থেকে, যিনি অল্প বয়সেই মারা যান। গুণেন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথের নিজের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথই ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রথম আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন প্রথা অনুযায়ী ছবি অঁাকা শিখতে।
পুত্রের আকস্মিক মৃত্যু গগনেন্দ্রনাথকে চিত্রশিল্পের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে দেয় মানসিক আশ্রয়ের খোঁজে। শোক ভুলতে তিনি কথকতার আসরে বসেন কিংবা কীর্তন শোনেন। কিন্তু সে সবের মধ্যেও তিনি কথক ঠাকুর বা কীর্তনিয়ার স্কেচ করতে থাকেন পেনসিলে। পরে যখন কোর্টে বিচারের সময়ে জুরি হয়ে বসতেন, আদালতের বিভিন্ন মানুষের স্কেচ অঁাকতে থাকেন অবিরত। নিবিড় দুঃখে নিয়তি যেন তঁাকে ক্রমেই চিত্রশিল্পের মধ্যে সেঁধিয়ে নিচ্ছিল। অবনীন্দ্রনাথের স্বভাব ছিল এর উল্টো, তীব্র মানসিক আঘাতে তঁার তুলি থেমে যেত।
অবনীন্দ্রনাথ যে সময়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নির্যাসকে তুলে নিচ্ছেন তঁার তুলির ডগায়, গগনেন্দ্রনাথ সেই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেও সরাসরি চিত্রপটকে নিযুক্ত করছেন না কখনও জাতীয় ভাবধারার বাণী বহন করার কাজে, শুধু কয়েকটি ব্যঙ্গচিত্রের বিদ্রূপ কশাঘাত ছাড়া। ব্যঙ্গচিত্রের গগনেন্দ্রনাথের মূল লক্ষ্য নব্য বাবু সম্প্রদায়, যঁারা ইংরেজিয়ানার নকলে ক্লান্তিহীন। গগনেন্দ্রনাথের ছবি রাজনীতিকে হাতিয়ার না করলেও, তিনি নিজে থেকে যাচ্ছেন আপাদমস্তক রাজনৈতিক। স্বদেশি যুগের আন্ডারগ্রাউন্ডের বিপ্লবীদের সঙ্গে থাকছে তঁার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। অরবিন্দ ঘোষের ভাই বারীন ঘোষ আন্দামান থেকে ছাড়া পেয়ে গগনেন্দ্রনাথের কাছে আলাপ করতে আসতেন রোজ। এমনকি ইংরেজরাও গগনেন্দ্রনাথের কাছ থেকে বারীন ঘোষের মতিগতি জানতে চেষ্টা করেছে সে সময়ে। গোপনে স্বদেশি আন্দোলনকে টাকা দিয়ে সাহায্য করছেন গগনেন্দ্রনাথ। সে যুগের লাটসাহেবরা গগনেন্দ্রনাথের সান্নিধ্য পেতে চাইছেন তঁার বিচিত্র প্রতিভার নাগাল পেতে। গগনেন্দ্রনাথ তঁাদের সঙ্গে মিশেও শেষ পর্যন্ত নিজের স্বাধীন সত্তাকে বজায় রাখছেন পুরোপুরি। সে যুগের ‘‌ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’‌ ক্লাবের মেম্বার হয়েও আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ক্লাবের এই আপত্তিকর নাম পরিবর্তন করার জন্যে। শেষ পর্যন্ত ক্লাব কর্তৃপক্ষ সে আন্দোলনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন এবং পরিবর্তন করে নাম রাখা হচ্ছে ‘‌ক্যালকাটা ক্লাব’‌।
গগনেন্দ্রনাথ যে শিল্পসৃষ্টি করে যাচ্ছিলেন, তার কোনও পূর্বসূরি ছিল না, ছিল না কোনও উত্তরসূরিও। তঁার চিত্রকলার বিস্ময়কর স্বাতন্ত্র‌্য, অপূর্ব বৈচিত্র চিত্রচর্চার যে ভূমি ছুঁয়েছিল, তা শিল্পের ভারতীয়তা বা আন্তর্জাতিকতা পেরিয়ে অনেক দূর বিস্তৃত। সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য মন্তব্য— ‘‌শিল্পের কোনো ঘরানার শাকরেদ ছিলেন না গগনেন্দ্রনাথ— না পুরাণপন্থীদের, বা ভাঙাঘাট ও পোড়ো মন্দিরের ছবিমুগ্ধদের, না পটের তারিফদারদের।’‌ এই ব্যাপারে তঁার আর রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা কিছুটা সমধর্মী। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কখনও চকিতে জার্মান এক্সপ্রেসিনিজমের ছায়া পড়ে। রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার জেল্লায় সেই বিদেশি প্রভাব ক্ষীণতর হয়ে লুকিয়ে যায়। গগনেন্দ্রনাথও কিউবিজমের মূল তত্ত্বের উপাদান বৃত্ত, ঘনক, শঙ্কু নিয়ে ঘঁাটাঘাটি করে যে ছবি অঁাকেন, তা কিউবিজমের নৈর্ব্যক্তিক সত্তাকে কাটিয়ে উঠে প্রাণচঞ্চল শিল্প–আত্মাকে খুঁজে নেয়। বিদেশি শিল্পীরা ছবির ফর্ম নিয়ে বেশি হইচই করতে থাকেন, যেখানে গগনেন্দ্রনাথ ছবির ফর্মের ভঁাজে ভঁাজে বিষয়কে অসাধারণ কুশলতায় গুঁজে দেন। রবীন্দ্রনাথের মতো গগনেন্দ্রনাথ স্বশিক্ষিত শিল্পী হয়েও নিবিড় চর্চায় নিজেকে প্রস্তুত করেন পেশাদার শিল্পীর মতোই। তঁার সেই অনুশীলনের মধ্যে কোথাও ফঁাক ছিল না,‌ রবীন্দ্রনাথের হয়ত সে প্রয়াস বা অবসর ছিল না।
গগনেন্দ্রনাথের ছবিকে অনুসরণ করতে গেলে তঁার শিল্পীমনের বিশাল পরিসরকে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। কোনও সঙ্কীর্ণ চিত্র আন্দোলনের নির্দিষ্ট ছকে তিনি বঁাধা পড়তে চাননি কখনওই। এবং নিজেকে তুমুল ভাঙচুর তিনি অহরহ করে গেছেন। অবনীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, একটি বয়সের পর শিল্পীরা রেশম পোকার মতো নিজের সৃষ্টির চারদিকে একটা গুটি বেঁধে ফেলেন, সেই গুটি কেটে আর উড়তে পারেন না। এবং পিকাসোও বলেছিলেন, শিল্পীর পক্ষে নিজেকে নকল করে যাওয়া অপরাধ। অবনীন্দ্রনাথ প্রথম যুগে হ্যাভেল সাহেবের প্রভাবে জাতীয়তাবাদী ছবি অঁাকায় মগ্ন হলেও পরে নিজেকে বারবার পাল্টে ফেলেছেন। গগনেন্দ্রনাথের এই উপলব্ধি অনেক আগেই হয়েছিল, তিনি ছবি এঁকে গেছেন ছবির জন্যেই। নিজের কলাকৌশলকে নতুন রূপে ভরিয়ে তুলতে কখনওই দ্বিধা বোধ করেননি। কোনও শিল্পবাজার, কোনও শিল্প সমালোচকের মুখ চেয়ে, কোনও সস্তা জনপ্রিয়তার জন্যে তিনি কখনওই ছবি অঁাকেননি।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, গগনেন্দ্রনাথের ছবির মূল অন্বেষণ ছিল সৌন্দর্য। এ কথা আপাতদৃষ্টিতে মেনে নিয়েও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তর্ক জোড়া যায় যে এই সৌন্দর্যের সংজ্ঞা গগনেন্দ্রনাথ অনেক ব্যাপক অর্থে ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। না হলে প্রথম প্রথম তঁার অঁাকা কাকেদের অসাধারণ কালিকলমের ছবি বোধহয় প্রথম ভারতবর্ষের চিত্রের সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বদলে দেয়। কাকের মতো কুৎসিত ও নোংরা পাখিও যে চিত্রকলার বিষয়বস্তু হতে পারে— গগনেন্দ্রনাথ প্রথম চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন। রবীন্দ্রনাথের ‘‌অন্ধকারের ছবি’‌র সৃষ্টি এর অনেক পরে। এবং মনে রাখতে হবে, বিদেশে মার্শাল ড্যুকাম্পের ‘‌প্রস্রাবদানি’‌ নামের যুগান্তকারী চিত্রবিষয়কে প্রদর্শন করার অনেক আগে গগনেন্দ্রনাথের এই দুঃসাহস। চিত্রকলার বিষয়কে প্রসারিত করে তোলার এই বৈপ্লবিক প্রয়াস গগনেন্দ্রনাথের ‘‌কাকের’‌ ক্ষেত্রে অনেক বেশি মানবিক, যেখানে বিদেশি ওই প্রচেষ্টা অনেকটা গিমিক ও হঠকারিতার নামান্তর।
নীরদচন্দ্র চৌধুরি গগনেন্দ্রনাথের চিত্রকলায় ছবির উপাদানের চেয়েও ‘‌সাইকোলজিক্যাল’‌ মুহূর্ত বেশি পেয়েছিলেন। বিভিন্ন মানসিক স্তরের অনবদ্য উন্মোচন গগনেন্দ্রনাথের ছবিতে ঘটে যাচ্ছিল ঠিকই, তবু তঁার ছবি শেষ পর্যন্ত ছবির পদ্ধতিকে নিষ্কাশন করা এক বিশুদ্ধ শিল্প, যেখানে রেখা–রঙের চরম ‘‌এক্সপ্লয়টেশন’‌ ছবিকে এক গূঢ় প্রদেশে পৌঁছে দেয়। সেখানে ছবিই শেষ কথা বলে। গগনেন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত ছবিই অঁাকতে চেয়েছেন। তঁার বিচিত্র অনুসন্ধানী মন হয়ত চারপাশের জীবন ও জগৎকে ক্রমাগত খনন করে অর্জন করে নিচ্ছিল দুষ্প্রাপ্য মণিমাণিক্য, তা তিনি হয়ত তঁার ছবিতে পরতে পরতে মিশিয়ে দিচ্ছিলেন পরম মমতা ও প্রগাঢ় কৌশলে। সেখানে গগনেন্দ্রনাথের ছবিকে শুধু ‘‌সাইকোলজিক্যাল উপাদান নির্ভর’‌ তকমা দিলে তা হয়ত তঁার সৃষ্টির ব্যাপকতাকে ক্ষুণ্ণ করবে।
প্রথম জীবনে নিবিড়ভাবে ফোটোগ্রাফিক চর্চা করেন গগনেন্দ্রনাথ। তারই প্রভাব হয়ত তঁার পরবর্তী জীবনে কালো কালিতে অঁাকা ‘‌সিল্যুড’‌–‌এর মতো ছবিতে। এর আশ্চর্য উদাহরণ এই পদ্ধতিতে করা তঁার আত্মপ্রতিকৃতি। অতীতের ফোটোগ্রাফিক অনুশীলনের থেকে হয়ত তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন তঁার ছবির কম্পোজিশন, আলো–ছায়া বা রঙের টোনের কিছু অনন্য প্রয়োগ। তবু বিস্ময় এই যে, তঁার ছবি ‘‌ফোটোগ্রাফিক বাস্তবতা’‌ থেকে বহু যোজন দূরে। ফোটোগ্রাফিক কলাকৌশল আত্মীকরণ করেও তঁার ছবি শুধু ছবির ভাষার ওপরেই দঁাড়িয়ে, ছবি কোথাও অন্য মাধ্যমের ভারে নুয়ে পড়েনি।
সে যুগের ফিল্মের হামাগুড়ি অবস্থায় গগনেন্দ্রনাথ যেন ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মতো দেখতে পাচ্ছিলেন ভবিষ্যৎ সিনেমার দৃশ্যপট। কংগ্রেসের উন্মুক্ত বৈঠকে স্টেজের ওপরে বসে পিছন থেকে তিনি অবলোকন করছেন বক্তা রবীন্দ্রনাথের পশ্চাৎ পটভূমিকা। দণ্ডায়মান রবীন্দ্রনাথের মাথার ওপরে এসে পড়েছে ফোকাস করা উৎস থেকে উজ্জ্বল আলোর ধারা, স্টেজের আলোর অনেক নীচে শ্রোতাবৃন্দের সজীব অস্তিত্ব। গগনেন্দ্রনাথের তুলি যেন ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্র নির্দেশকের জন্য এঁকে রাখছে এক চমৎকার ভিস্যুয়াল। এবং এখানে গগনেন্দ্রনাথের কল্পনায় রবীন্দ্রনাথ যেন কোনও রাজনৈতিক সভার বক্তা নন, তিনি যেন এক জ্যোতির্ময় পুরুষ, মানবমুক্তির বাণী তঁার কণ্ঠে। এ ছবি অঁাকার সময়ে রবীন্দ্রনাথ ততটা বিখ্যাত নন, ততটা বিশ্ববাণীর প্রচারকও হয়ে ওঠেননি। গগনেন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে দর্শক পাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথের আগাম সম্ভাবনার বীজ।
কালো কালি বা তুলির স্কেচে তিনি যে চিত্রচর্চা প্রথম দিকে করে যাচ্ছিলেন, তাতে অবশ্যই থেকে যাচ্ছিল জাপানি বা চৈনিক ছবির প্রভাব। জাপানের বিখ্যাত সংস্কৃতির ব্যক্তিত্ব ওকাকুরা জোড়াসঁাকোয় যাতায়াত শুরু করেন এবং তার পরে তঁার দুই প্রিয় শিষ্য হিসিকান ও টাইকান গগনেন্দ্রনাথেরই আতিথ্য গ্রহণ করেন। গগনেন্দ্রনাথের তুলি–‌কলমের বন্ধ ঝরনাধারার আগল তখনই যেন পুরোপুরি খুলে যায়। এর আগে গগনেন্দ্রনাথ ছবি এঁকেছেন, কিন্তু সেভাবে মগ্ন হয়ে আঁকেননি। জাপানি ও চৈনিক প্রভাব তঁাকে অভিভূত করে নিলেও অন্ধ করতে পারেনি। টেকনিক অনুসরণ করলেও বিষয়বস্তু বা ছবির ফর্মেও তিনি অর্জন করেছিলেন নিজস্ব শিল্পভাষা।
এইভাবে বিদেশি শিল্প আন্দোলনের ‘‌কিউবিজম’‌ তঁাকে অনুপ্রাণিত করলেও, তিনি সেই পদ্ধতিতে ছবি অঁাকলেও, তিনি তঁার কিউবিজম ছবির প্রদেশকে অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত করে দেন। গগনেন্দ্রনাথের কিউবিজমকে প্রখ্যাত শিল্পী পরিতোষ সেন ‘‌সারফেস কিউবিজম’‌ নামে অভিহিত করতেন। এই ধর্মে গগনেন্দ্রনাথের ছবি পাশ্চাত্যের চেয়ে অনেক বেশি প্রাচ্যচিত্রের সহধর্মী। ‘‌কিউবিজমে’‌ গগনেন্দ্রনাথ আকৃষ্ট হওয়ার পেছনে সেই আন্দোলনের সে সময়ের কলরবের চেয়েও গগনেন্দ্রনাথের দিনের পর দিন চোখে দেখা জোড়াসঁাকো বাড়িতে খিলান, বারান্দা, সিঁড়ি, আলোছায়ার জ্যামিতি বেশি কাজ করেছিল কিনা, তা গবেষণার বিষয়। রাজস্থানের হাভেলিতে, প্রাসাদে এই ধরনের জ্যামিতিক অনুরণন হয়ত গগনেন্দ্রনাথ রাজস্থান ভ্রমণের সময়ে মানসিক চক্ষুতে রেকর্ড করে নিচ্ছিলেন। তঁার নিজস্ব অভিজ্ঞতা, উপলব্ধিতে হয়ত জাপানি বা ইউরোপের চিত্রমুহূর্তের কিছুটা কাছে এনে দিচ্ছিল। একালের কিছু শিল্পীর মতো শুধু বিদেশি চিত্রের নকলনবিশি বা বিদেশি স্লোগানের পিছু ধাওয়া করার মানসিকতা তঁার এতটুকুও ছিল না।
গগনেন্দ্রনাথের ‘‌ওয়ান্ডার ল্যান্ড’‌ সিরিজের ছবি শুধু কিউবিজমের ওপর আশ্রয় করে নির্মিত নয়। একটা ‘‌প্রিজম’‌–এর মধ্যে দিয়ে বিচ্ছুরিত আলোর বিচিত্র বর্ণের সমাহারে অঁাকা এক বিস্ময়কর চিত্রকলা। সারা পৃথিবীতে এই ধরনের ছবির কোনও দ্বিতীয় উদাহরণ নেই। বিজ্ঞান, শিল্প, রূপকথা, জাদুজগৎ এখানে এক সঙ্গে হাত ধরাধরি করে অবস্থান করছে। গগনেন্দ্রনাথের কল্পনাশক্তির চূড়ান্ত রূপ এই সব ছবি, যা ভারতীয় চিত্রকলাকে রবীন্দ্রনাথের অনেক আগে এক ‘‌সতেজ শিরদঁাড়া’র‌ (‌যামিনী রায়ের ভাষায় এই শিরদঁাড়া রবীন্দ্রনাথই প্রথম নির্মাণ করেন)‌ ওপরে দঁাড় করিয়ে দিচ্ছিল।
দৃশ্যচিত্রেও গগনেন্দ্রনাথ রেখে যান অনবদ্য সব স্বাক্ষর। তিনি রবীন্দ্রনাথের মতো খুব বেশি জায়গায় ভ্রমণ করেননি। তবু হিমালয়, পুরী বা গ্রামবাংলার বিভিন্ন রূপ অসাধারণ নৈপুণ্যে সজীব করে তুলেছেন তঁার সংবেদনশীল মন ও তুলি দিয়ে। কাঞ্চনজঙ্ঘার শীর্ষে তিনি যেন আভাস পাচ্ছেন শিবের শায়িত মুখের রূপক। চৈতন্যের জীবন ও বাণী তঁাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল, এর থেকেই এঁকেছিলেন চৈতন্য সিরিজ। জলরঙের মৃদু ছোপ ও রেখায় তিনি চৈতন্যের জগৎকে ধরতে চেয়েছিলেন সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতায়।
প্রিয় পুত্রের মৃত্যু তঁার হাতে ধরিয়েছিল তুলি–কলম, পরবর্তী জীবনে মৃত্যুর অপার রহস্য তঁার ছবিতে রূপ পাচ্ছিল ‘‌মৃত্যু’‌ সিরিজে। মৃত্যু–‌পরবর্তী প্রদেশের তীব্র সংশয়, উত্তেজনা, বিষাদ চিত্রভাষায় অনূদিত হয়ে এক অনাস্বাদিত জগতের সন্ধান দেয় ছবিকে।
ব্যঙ্গচিত্রের পরিশীলিত ও বুদ্ধিদীপ্ত রূপ ভারতীয় শিল্পকলায় প্রথম গগনেন্দ্রনাথের হাতে। রেখা অঙ্কনের মুনশিয়ানায় এই সব চিত্র বিশুদ্ধ চিত্রের মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ শাসনে ভারতীয় জীবনের বিভিন্ন অসাম্য ও নব্যবাবুদের জীবনযাত্রায় অসংগত রূপ এই সব চিত্রে ধরা পড়ে। সেই সময়ে কলকাতায় কালীঘাট চিত্রকলাতেও কিছু এই ধরনের বিষয় উঠে আসছিল নিজস্ব আঙ্গিক ও চিত্রভাষায়, তবু পরিণত রাজনৈতিক ধারণায় ও সমাজ–সচেতনতায় গগনেন্দ্রনাথের ব্যঙ্গচিত্র অনেক বেশি ধারালো ও অন্তর্ভেদী হয়ে ওঠে।
গ্রন্থচিত্রণে গগনেন্দ্রনাথ ভারতে নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। রবীন্দ্রনাথ জহুরির মতো চিনে নিয়েছিলেন তঁার এই ভ্রাতুষ্পুত্রকে ‘‌জীবনস্মৃতি’‌ বইয়ের চিত্রভাষ্য আঁকার জন্যে। গগনেন্দ্রনাথ তঁার প্রতিভার ও কল্পনার চরম সদ্ব্যবহার ঘটিয়েছিলেন সেই সুযোগে। রবীন্দ্রনাথের চেয়ে মাত্র ছয় বছরের ছোট ছিলেন তিনি এবং জোড়াসঁাকোর একই পরিবেশে বাল্য অবস্থা থেকে বড় হয়ে ওঠায় রবীন্দ্রনাথের ‘‌জীবনস্মৃতি’‌র‌ দৃশ্যকল্প যেন তঁারই তুলির অপেক্ষায় ছিল। কালো কালিতে ব্রাশের ছোপ রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলার জগৎকে বাঙ্ময় করে তুলেছে গগনেন্দ্রনাথের নিজস্ব দক্ষতায়। গগনেন্দ্রনাথ কখনও পদ্মাতীরে শিলাইদহে যাননি। অথচ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের পদ্মার বোটের ছবি এঁকে রাখেন অত্যাশ্চর্য কল্পনায়। সে ছবিতে উদার দিগন্তবিস্তৃত নদী আর এক কোণে মানবিক অস্তিত্ব নিয়ে পড়ে থাকা পদ্মার বোট নিবিড়ভাবে মিলেমিশে যায়— তৈরি হয় এক অখণ্ড চিত্রকাব্য। ‘‌রক্তকরবী’‌–র প্রচ্ছদ অঁাকেন গগনেন্দ্রনাথ জ্যামিতিক জটিলতায়। মাকড়সার জাল আর ‘‌ল্যাবিরিন্থের’‌ প্রতীকে সে ছবি ‘‌রক্তকরবী’‌র পুরো নির্মাণ যেন ছেঁকে তুলে আনে গভীর উপলব্ধি আর কল্পনায়।
রঁাচিতে গগনেন্দ্রনাথ শেষ ছবি অঁাকেন, মোমবাতির আলোয়, নিজের মুখের ‘‌সিল্যুড’‌, কালো কালিতে। এর পরই পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। বন্ধ হয়ে যায় ছবি অঁাকা।
পক্ষাঘাতগ্রস্ত গগনেন্দ্রনাথ ট্রলি চেয়ারে করে পৌঁছে যান যামিনী রায়ের নতুন রীতির ছবির প্রদর্শনীতে। যামিনী রায় তখন তঁার নতুন চিত্রপট নিয়ে ভারতীয় চিত্রের নতুন মোড়ের বঁাকে দঁাড়িয়ে। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া সে যুগের আর সব প্রখ্যাত শিল্পী যামিনী রায়ের চিত্রপট থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন। অবনীন্দ্রনাথ অবধি সে ছবির প্রদর্শনীতে গিয়ে যামিনী রায়কে টিপ্পনি কাটছেন ‘‌অতঃকিম’‌ বলে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত গগনেন্দ্রনাথ সেই সব ছবির সামনে কেঁদে ফেলছেন, যামিনী রায়ের হাত ধরে।
অনেক বড় সৃষ্টিকর্তাই তঁার পরবর্তী প্রজন্মের নতুন প্রতিভার পদধ্বনি শুনতে পান না। রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দের পাননি, অবনীন্দ্রনাথ যামিনী রায়ের পাননি। গগনেন্দ্রনাথের সংবেদনশীল মনের চওড়া র‌্যাডারে যামিনী রায়ের শিল্পের নতুন বার্তা নিখুঁতভাবে ধরা পড়েছিল।
গগনেন্দ্রনাথ নীরবে নিভৃতে ঘরের কোণে বসে এঁকে গেছেন, কোনও উচ্চ অভিলাষ ছাড়াই, কোনও স্লোগানে ভর না করে। অবনীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের ছায়া এড়িয়ে সে ছবি ভারতীয় চিত্রকলায় এক ‘‌আলোকিত স্তম্ভ’‌ হয়ে দঁাড়িয়ে থাকে।
এবং ভারতীয় চিত্রকলায় প্রথম আধুনিকতার বীজ তঁার হাতেই। অন্য কারও নয়।‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top