লিখলেন শান্তা শ্রীমানী

‘‌হীরক রাজার দেশ’‌–‌‌এর রাজার জঁাকজমক দেখে গুপী গেয়ে উঠেছিল ‘‌দেখে রাজার জমক মোদের মন ভরে গেছে খুশিতে।’‌ সত্যিই সেকালের রাজাদের জঁাকজমক দেখে তাক লেগে যেত। 
ব্যাবিলনের রাজা সলোমনেরও জঁাকজমক কম ছিল না। হিব্রু বাইবেলে লেখা আছে, তিনি এক নতুন ধরনের সিংহাসন বানিয়েছিলেন। হাতির দঁাতের সিংহাসনকে মুড়ে দিয়েছিলেন সোনা দিয়ে। সে সিংহাসনে ছটি ধাপ দিয়ে উঠতে হত। প্রতিটি ধাপের দুধারে ছিল একটা একটা করে মোট ১২টি সিংহমূর্তি;‌ দুধারে হাতলের পাশেও একটি করে সিংহমূর্তি ছিল;‌ পাদানি ছিল খঁাটি সোনার।
রাজা সলোমনের মতোই সোনা–‌রুপোর সিংহাসনে বসতেন মিশরের রাজারাও। পিরামিডের মধ্যেও দেওয়া হত সোনা–‌রুপোর সিংহাসন। বালকরাজা তুতেনখামেনের সমাধি থেকে একটি সোনার সিংহাসন ও মণিমাণিক্য, রঙিন কাচ বসানো সোনা–‌রুপোর পাতে মোড়া একটি কাঠের সিংহাসন পাওয়া যায়। সে সিংহাসনের পিঠ হেলান দেওয়ার অংশে কারুকাজ করে ফুটিয়ে তোলা চিত্রে দেখা যায়, রানি আনেখেসেনামুন ফারাও তুতেনখামেনকে সুগন্ধী লাগিয়ে দিচ্ছেন। সূর্যদেবতা ওপর থেকে জীবনরশ্মি বর্ষণ করছেন সম্রাজ্ঞীর উপর।
সিংহাসন নিয়ে অজস্র গল্প ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন দেশের প্রাচীন কাহিনিগুলিতে। সিংহাসন বানাবার সময় নানারকম কারিকুরি করতেন কারিগরেরা। গ্রিক পুরাণের অগ্নিদেবতা এবং দেব কারিগর হেফিস্টাফ একবার কারিকুরি করা এক সিংহাসন তৈরি করেছিলেন। সিংহাসনটি দেখতে ছিল ভারি সুন্দর। দেখলেই বসতে ইচ্ছা করে। তবে একবার বসলে আর ওঠা যায় না। সূক্ষ্ম জালে জড়িয়ে পড়তে হয়। ওই জাল সরাবার কৌশল জানতেন একমাত্র হেফিস্টাফ।
কারিকুরি করা ছিল বত্রিশ সিংহাসনেও। কথিত আছে, ৩২টি পুতুল দিয়ে ঘেরা মণিমাণিক্যখচিত সোনার বত্রিশ সিংহাসনে বসতেন মহারাজা বিক্রমাদিত্য। উজ্জয়িনীতে এক ঢিপি খুঁড়ে সিংহাসনটি পেয়েছিলেন রাজা ভোজ। কিন্তু বত্রিশ পুতুলের কারসাজিতে সে সিংহাসনে ভোজরাজার বসা হয় না। তবে সেই সোনার সিংহাসন ছিল কিংবদন্তীর সিংহাসন।
ভোজরাজার সোনার সিংহাসনে বসা না হলেও ভারতের মুঘলসম্রাট ও কিছু দেশীয় রাজাদের ছিল সোনার সিংহাসন। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষ ছিল ‘‌সোনার পাখির দেশ’। ভারতের শাসকদের রাজকোষে থাকত প্রচুর সোনা। ধন‌সম্পদের গৌরব দেখাতে সিংহাসনগুলিও সাজাতেন সোনা দিয়ে। সিংহাসন নিয়ে বিলাসিতা করার প্রথা বেশ প্রাচীন। মুঘল রাজাদের মধ্যে আড়ম্বরের প্রতি সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল শাহজাহানের। তঁার নির্দেশেই মুখ্য স্বর্ণকারিগর সাইদ গিলানি সাত বছর ধরে তৈরি করেছিলেন তখ্‌ত মুরাসা বা রত্নসজ্জিত সিংহাসন। সিংহাসনে ময়ূর থাকার জন্য পরে ফার্সি শব্দে নাম দেওয়া হয় তখ্‌ত–‌ই–‌তাউস। তখ্‌ত মানে সিংহাসন, তাউস ময়ূর। অনেক পরে নাম দেওয়া হয় ময়ূর সিংহাসন। নিরেট সোনা দিয়ে তৈরি ময়ূর সিংহাসনে রত্ন ছিল ছিয়াশি লক্ষ টাকার। সোনা ছিল সে সময়ের ভারতীয় মূল্যে ৯০ লক্ষ টাকার। পর্যটক ট্যাভারনিয়েরের মতে, ময়ূর সিংহাসনে ময়ূরের গলায় ভারতের সবচেয়ে বড় এবং উজ্জ্বল মুক্তো লাগানো হয়েছিল। ময়ূর সিংহাসন ছাড়াও আরও সাতটি সিংহাসন ছিল শাহজাহানের। 
রাজা বসেন সিংহাসনে কিন্তু সে সিংহাসন গড়ে ওঠে কারিগরদের হাতের ছোঁয়ায়। কখনও কখনও সিংহাসন খ্যাত হয় রাজাদের নামে, আর কারিগরদের কপালে জোটে বখশিস ও উপাধি। যেমন, ফরাসি স্বর্ণশিল্পী এগুস্তুঁ দ্য বোর্দোর করা নতুন সিংহাসন দেখে জাহাঙ্গির তঁাকে ‘‌হোমরমন্দ’‌ উপাধি দিয়েছিলেন। আর ময়ূর সিংহাসন বানিয়ে সাইদ গিলানি পেলেন বিবাদাল খান (‌অতুলনীয় পণ্ডিত)‌ উপাধি। তার সঙ্গে পুরস্কার ও সম্রাটের সমান ওজনের স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছিল তাঁকে। 
ভারতের রাজাদের সোনার সিংহাসনের মধ্যে আর একটি বিখ্যাত হল মহীশূরের ওয়াদিয়র রাজবংশের সিংহাসন। কথিত আছে, এটি নাকি হস্তিনাপুরের পাণ্ডবদের সিংহাসন। প্রচুর সোনা, মূল্যবান ধাতু দিয়ে সাজানো সিংহাসনটিতে ত্রয়ী দেবতা, হাতি, ঘোড়া এবং নারীমূর্তির কারুকার্য করা। চিন্নাড়া সিংহাসন বা রত্ন সিংহাসন (‌কন্নড় ভাষায় সোনার সিংহাসন)‌ নামে পরিচিত এই সিংহাসনটি দশেরার দিন জনসাধারণ দেখার সুযোগ পেত। মহীশূরের মহারাজারাও দশেরা উৎসবের সময় হাতির পিঠে সোনার সিংহাসনে বসে যেতেন। লন্ডনের জাদুঘরে রাখা আছে মহারাজা রণজিৎ সিংহের সোনার পাত দিয়ে মোড়া, পদ্মফুলের আকৃতির সিংহাসন। আবার টিপু সুলতান বসতেন মূল্যবান রত্ন দিয়ে কারুকার্য করা বাঘের আকৃতির সোনার সিংহাসনে। প্রায় ৮ ফুট লম্বা ও ১১ ফুট চওড়া এই অপরূপ সিংহাসনটি ব্রিটিশ আক্রমণকারীরা নষ্ট করে দেয়।
শুধু প্রাচীনকালে নয়, বর্তমান যুগেও ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এখনও বসেন সোনার সিংহাসনে। এছাড়াও তঁার হাতির দঁাতের সিংহাসন আছে। সেটি ভারতবর্ষ থেকে রানি তঁার আবাসস্থল বাকিংহাম প্যালেসে নিয়ে গিয়েছিলেন। রাজা না হয়েও সোনার সিংহাসনে বসার সুযোগ পান কেউ কেউ। আফগানিস্থানে নির্বাচনী প্রচারের এক অনুষ্ঠানে সোনার সিংহাসনে বসেছিলেন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। বিবিসি সূত্রে পাওয়া গেছে সে ছবি।
এবার শোনা যাক, রুপোর সিংহাসনের কথা। জয়পুরের রাজার ছিল রুপোর সিংহাসন। আবার ব্রিটিশসম্রাজ্ঞী মহারানী ভিক্টোরিয়ার কাছ থেকে রুপোর সিংহাসন উপহার পেয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাব নাজিম হুমায়ুন জঁা। হাজারদুয়ারি প্রাসাদের দোতলায় আছে সিংহাসনটি। দরবার হলে রানী ভিক্টোরিয়ার উপহার দেওয়া ১৬১ ঝাড়যুক্ত বিশাল ঝাড়বাতির নিচে এই সিংহাসনে বসে নবাব দরবার পরিচালনা করতেন। দোতলায় আর্ট গ্যালারিতে মুর্শিদকুলি খঁায়ের মার্বেল পাথরের একটি সিংহাসনও আছে। 
রুপোর সিংহাসনটি ছাড়াও শাহজাহানের আমলে ১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে তৈরি আর একটি সুদৃশ্য সিংহাসনেও বসতেন নবাব নাজিম হুমায়ুন খঁা। মুর্শিদকুলি খঁায়ের সময় থেকে মুর্শিদাবাদের নবাবরা এই সিংহাসনে বসতেন। সিংহাসনটি বানানো হয়েছিল ৬ ফুট বেড়ের ১৮ ইঞ্চি উচু একটি কালো মার্বেল পাথর কেটে। হুমায়ুন জঁা সিংহাসনটি এনে রেখেছিলেন হাজারদুয়ারি প্রাসাদ থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণ–‌পূর্বে রৌশনবাগে তঁার গ্রীষ্মাবাস হুমায়ুন মঞ্জিলে। পলাশীর যুদ্ধের পর এই সিংহাসনে ক্লাইভ মীরজাফরকে বসিয়েছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পুণ্যাহতে মতিঝিলে এই সিংহাসনের বসেছিলেন নজমউদ্দৌল্লা। লর্ড কার্জনও বসেছিলেন। এই সিংহাসনে। বর্তমানে সিংহাসনটি আছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে।
আর একটি বিখ্যাত মার্বেল পাথরের রাজসিংহাসন হল ‘‌তখ্‌ত–‌ই নিশান’‌। হায়দরাবাদের চৌমহল্লা রাজপ্রাসাদে আছে আসফ জাহি বা নিজাম যুগের এই অপূর্ব নিদর্শনটি।
সিংহাসনে বসার সুখ যেমন আছে, তেমনি রাজা হওয়ার ঝকমারিও কম নয়!‌ কতই না সন্তর্পণে থাকতে হয় তঁাদের। সিংহাসনে নিশ্চিন্তে টিকে থাকার জন্য কত রকম অদ্ভুত কুসংস্কারই না জন্মায় তঁাদের মনে। সুকুমার রায়ের ‘‌বোম্বাগড়ের রাজা’‌ কবিতাটির কথা মনে আছে?‌ রাজা যে কেন সভায় এসে ‘‌হুক্কা হুয়া’‌ বলে চেঁচান বা সিংহাসনে ভাঙা বোতাল শিশি ঝোলান, তা যেমন কেউই বুঝতে পারত না। রাজস্থানের মেবারের বত্রিশটি দুর্গাধিপতি রণনিপুণ রানা কুম্ভের অদ্ভুত আচরণেও অবাক হয়েছিল সবাই। রানা এক শত্রুকে পরাস্ত করে আসার পর থেকেই সিংহাসনে বসার আগে নিজের তলোয়ারটি খাপ থেকে বের করে মাথার ওপর তিনবার ঘুরিয়ে নিয়ে তবে বসতেন। সবার মনে প্রশ্নে জাগলেও জিজ্ঞাসা করার সাহস হত না কারও। একদিন রাজার বড় ছেলে রায়মল্ল প্রশ্ন করতেই রেগে গেলেন রানা। রাজ্য থেকে তাড়িয়েই দিলেন তাকে। কিন্তু সেটাই কাল হল। ওই সিংহাসনের জন্যই মেজো ছেলে উদয় সিংহের হাতে বেঘোরে প্রাণ গেল তঁার। তবে বছরপাঁচেক পরে সে সিংহাসন এল বড় ছেলের হাতেই। প্রকৃতপক্ষে সিংহাসনে বসাটা বড় কথা নয়, তাকে হাতের মুঠোয় রাখাটাই আসল কথা।
তবে যে যাই বলুক, ‘‌গুপী গাইন বাঘা বাইন’‌ সিনেমার ভূতের রাজার সিংহাসনের কোনও তুলনা নেই। মণিমাণিক্য নয়, অদ্ভুত আলো লাগানো সিংহাসনে জীবিতকালে কোনও মানুষের বসার সম্ভাবনা যে নেই, এ কথা ভালই জানতেন ভূতের রাজা। ■

ছবি দেবব্রত ঘোষের।

জনপ্রিয়

Back To Top