অংশুমান কর

 ‘‌বোলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা
তোমার ছিন্নভিন্ন শরীর
তোমার খোলা বুকের মধ্যখান দিয়ে
নেমে গেছে 
শুকনো রক্তের রেখা
চোখ দুটি চেয়ে আছে
সেই দৃষ্টি এক গোলার্ধ থেকে ছুটে আসে অন্য গোলার্ধে
চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়।’‌

— লিখেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সেই কতদিন আগে। তারপর সময় যত গেছে, বনে–বনে চে-এর ছায়া ঘনাইছে। দুই গোলার্ধে ক্রমশ গাঢ় হয়েছে তাঁর উপস্থিতি। এমনকী তাঁর মৃত্যুর জন্য নিজেদের অপরাধী মনে না করা যুবক-যুবতীদের কাছেও তিনি হয়ে উঠেছেন আইকন, ফ্যাশনের। কোন জাদুমন্ত্রবলে রচিত হল এক বামপন্থী যোদ্ধাকে নিয়ে এই আধুনিক রূপকথা? কীভাবে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন এক কিংবদন্তি, এক মিথ? সত্যি বলতে কী, তা নিয়েও তো গবেষণা হয়েছে, লেখা হয়েছে গ্রন্থ, নির্মিত হয়েছে ডকুমেন্টারি। উঠে এসেছে নানা কারণ, পাওয়া গেছে নানা দৃষ্টিকোণ— চে-কে দেখার। মত পাল্টে পাল্টে গেছে, কিন্তু পাল্টায়নি একটি জিনিস। তা চে-এর জনপ্রিয়তা। পৃথিবীর নানা প্রান্তে বামপন্থা জনপ্রিয়তা হারিয়েছে, পতন হয়েছে বামপন্থী সরকারের, কবিরাজের মতো নিদান হেঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বামপন্থা শেষ, কিন্তু চে-কে মুছে ফেলা যায়নি। দিন যত গেছে, লাফিয়ে লাফিয়ে বরং বেড়েছে তাঁর ভক্তের সংখ্যা।
#
চে-এর এই বিপুল জনপ্রিয়তার পেছনে অন্যতম কারণ তাঁর বহুবর্ণময় জীবনের প্রতি সাধারণ মানুষের এক বিপুল কৌতূহল। সত্যিই তো কী জীবনই না যাপন করেছে লোকটা! আর্নেস্টো চে গুয়েভারার জন্ম ১৯২৮-এর ১৪ জুন, আর্জেন্টিনার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। বুয়েনস এয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তারি পাশ করেন তিনি। কিন্তু গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে ডাক্তার হওয়া তাঁর ভবিতব্য ছিল না। ডাক্তারি পড়তে পড়তেই দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলিতে ঘোরাঘুরি শুরু করেন চে।  দেখেন নিঃসীম দারিদ্র্য আর মর্মান্তিক অত্যাচার। আকর্ষিত হতে থাকেন মাকর্সবাদের প্রতিও। ধীরে ধীরে জন্মাতে থাকে এই বিশ্বাস যে, সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া মানবের মুক্তি নেই। ১৯৫৪ সালে সিআইএ পরিচালিত এক সামরিক অভিযানে পতন হয় গুয়াতেমালার জাকাবো আরবেনজের নির্বাচিত সরকারের। চে তখন গুয়াতেমালায়। ওই ঘটনার তিনি প্রত্যক্ষদর্শী। ক্রুদ্ধ চে কিছুদিনের মধ্যেই জড়িয়ে পড়েন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। তাঁর বিরুদ্ধে জারি হয় মৃত্যু পরোয়ানা। তিনি বাধ্য হন গুয়াতেমালা পরিত্যাগ করতে। পৌঁছে যান মেক্সিকো। চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন হসপিটাল সেন্ট্রাল-এ। পরের বছরই মেক্সিকোতেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় কিউবার কিংবদন্তি ফিদেল কাস্ত্রোর। এই সাক্ষাৎ চে-এর জীবন পাল্টে দেয়। বিপ্লবী কার্যকলাপের জন্য মেক্সিকোতেই জেলে যেতে হয় তাঁকে। ছাড়া পেয়ে চে চলে যান কিউবা। যুক্ত হন কাস্ত্রোর ২৬ জুলাই আন্দোলনে। কিউবার একনায়ক বাতিস্তার বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন চে। ১৯৫৯-এ বাতিস্তার পতন হয়। কাস্ত্রোর নেতৃত্বে যে নতুন সরকার তৈরি হয়, সেই সরকারের শিল্পমন্ত্রী হন চে। দায়িত্ব নেন জাতীয় ব্যাঙ্কের সভাপতির। কিউবার পুনর্গঠনে, সে দেশে সাক্ষরতার প্রসারে,  স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি। কিউবায় কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অগ্রণী। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে, রাষ্ট্রপুঞ্জে ছিলেন কিউবার প্রধান বক্তা। 

#
তবে কেবল কিউবার সংগ্রামই চে-কে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। কিউবা ছেড়ে, ক্ষমতা ছেড়ে, চে আবার নামেন পথে। বেছে নেন সংগ্রামের জীবন। কিছুদিন আফ্রিকার কঙ্গোয় কাটানোর পর চে আবার ফিরে আসেন কিউবায়। তারপর ছদ্মবেশে বলিভিয়ায় প্রবেশ। শুরু হয় কিউবান বিপ্লবী আর বলিভিয়ার সাধারণ মানুষদের নিয়ে গেরিলাবাহিনী গঠন করে বলিভিয়ার অর্তুনো সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা লড়াই। এই সময়ের লড়াইয়ের কথা লিপিবদ্ধ আছে যে ডায়েরিতে সেই ‘চে গুয়েভারার ডায়েরি’ বিশ্বের বেস্ট সেলার বইগুলোর একটি। অনূদিত হয়েছে নানা ভাষায়। আমেরিকার সাহায্যে বলিভিয়ার সামরিকবাহিনী ১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর পাকড়াও করে চে-কে। ধরা পড়ার মাত্র তিনদিন আগে চে তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন:‌ ‘‌আবার চলা শুরু হল, খুব কষ্টে সৃষ্টে সোয়া পাঁচটা অব্দি হাঁটলাম। পশুদের চলার পথ ছেড়ে একটা অগভীর জঙ্গলে প্রবেশ করা গেল, গাছগুলি বেশ দীর্ঘ— সতর্ক পথচারীদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রাখল আমাদের। বেনিগনো আর প্যাচো বার কয়েক জলের জন্য খোঁজাখুঁজি করল, কাছাকাছি একটা বাড়ির সব জায়গায় খুঁজে দেখল, কিন্তু জল পেল না। ওটার পাশেই সম্ভবত একটা ছোট কুয়ো আছে। অনুসন্ধান শেষ করে আসার সময় ওরা দেখতে পেল ছ’জন সেপাই আসছে বাড়িটার দিকে, মনে হল ফেরার পথে। ভোরে আমরা বেরোলাম, জলের অভাবে লোকগুলো নিস্তেজ, ইউস্টাকিও এক ঢোঁক জলের জন্য কেঁদে কেটে এক নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা করল। কষ্টেসৃষ্টে খুব থেমে থেমে হেঁটে খুব ভোরের দিকে একটা বনের মধ্যে গিয়ে পৌঁছলাম, কাছাকাছি কোথায় যেন কুকুরের ডাক শোনা গেল। কাছেই পাহাড়ের ওপরে একটা উঁচু ন্যাড়া সমতল জায়গা আছে।’‌ এই বর্ণনা পড়লে বোঝা যায় যে, কী অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করে মাত্র ১৭ জনের একটা দল নিয়ে গেরিলা লড়াই চালিয়েছিলেন চে। উল্টোদিকে ছিল আমেরিকার স্পেশ্যাল ফোর্সের কাছ থেকে বিশেষ ট্রেনিং নেওয়া তেরোশো বলিভিয়ান সৈন্য। 
#
এই বিশাল ফোর্স নিয়েও চে-কে ধরাটা কিন্তু সহজ হয়নি। একাধিক দলে বিভক্ত হয়ে গিয়ে চুড়ো রাভিনে বলিভিয়ান সৈন্যরা চালিয়েছিল অপারেশন। চে-এর গেরিলাবাহিনীও ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করতে থাকে। সেই লড়াইয়ে চে-এর সঙ্গী ছিলেন সারাবিয়া। বীরের মতো লড়াই করতে করতে মেশিনগানবাহিনীর গুলিতে আহত হন চে। গুলি এসে লেগেছিল পায়ে। শোনা যায় যে, তাঁর এম-২ রাইফেলের ব্যারেল গুলি লেগে অকেজো হয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি লড়াই করেছিলেন। আহত অবস্থাতেও চে  সারাবিয়ার সাহায্যে অনেকখানি হেঁটে গিয়ে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নেন টাস্কার রাভিনে। তার পর তাঁরা উত্তরের দিকে হাঁটতে শুরু করলে মুখোমুখি পড়ে যান ক্যাপ্টেন প্রাদোর নেতৃত্বে থাকা সেনাদের। তারাই প্রাদোর নির্দেশে পাকড়াও করে চে-কে। সেই দিনই বিকেলে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় হিগুয়েরস নামে ছোট্ট একটি শহরে। সামরিকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পরেও চে বেঁচেছিলেন প্রায় ২৪ ঘণ্টা।   ৯ অক্টোবর গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁকে। ক্যাপ্টেন ফ্রাদো লেফটেন্যান্ট পেরেজকে চে-কে হত্যা করার আদেশ দেন। কিন্তু পেরেজ গুলি চালাতে পারেননি চে-এর শরীরে। শোনা যায় যে, পেরেজ চে-কে মৃত্যুর আগে তাঁর অন্তিম ইচ্ছের কথা জিজ্ঞেস করলে, তিনি বলেছিলেন যে, ভরা পেট নিয়ে তিনি মরতে চান, অভুক্ত অবস্থায় মরতে চান না। চে-এর এই অন্তিম ইচ্ছে থেকে বেশ বোঝা যায় যে, বীরের মতো মৃত্যুবরণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন তিনি। মৃত্যুর মুহূর্তেও তিনি একজন প্রকৃত বীরের মতোই সস্তা সেন্টিমেন্টালিটি পরিহার করতে পেরেছিলেন। পেরেজ চে-কে হত্যা করতে অসমর্থ হলে, তিনি সার্জেন্ট তেরানকে চে-কে হত্যার হুকুম দেন। বিবেকের দংশন ভোলার চেষ্টায় আকণ্ঠ মদ্যপান করে এসেও মারিও তেরান তাঁকে গুলি করতে ইতস্তত করেছিলেন। চে তাঁকে বলেছিলেন, ‘‌তুমি কেন এসেছো আমি জানি। আমি প্রস্তুত। গুলি করো, ভয় পেও না।’‌  তেরান এরপর চে-কে বসে পড়তে আদেশ দেন। কিন্তু চে সেই আদেশ মানেননি। তিনি চেয়েছিলেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বীরের মতো মৃত্যুবরণ করতে। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই প্রথমে তাঁকে গুলি করা হয়েছিল কোমর থেকে পায়ের নীচ পর্যন্ত মেশিনগান চালিয়ে। এতে জীবনের অন্তিম প্রহরগুলিতে অবর্ণনীয় কষ্ট পেয়েছিলেন চে। শেষে এক মদ্যপ অফিসার এসে বুকের বাঁদিকে গুলি করে তাঁকে হত্যা করে। খোলা বুকের মধ্যখান দিয়ে গড়িয়ে আসা রক্তের ধারা এক সময় শুকিয়ে যায় কিন্তু সময় যত গড়ায় ততই বোঝা যায় যে বীরের ওই রক্তস্রোতের মূল্য ধরার ধুলায় হারিয়ে যায়নি। 
#
সত্যিই দিন যত গিয়েছে, চে ক্রমশ জনপ্রিয় থেকে জনপ্রিয়তর হয়ে উঠেছেন বিশ্বজুড়ে। এই জনপ্রিয়তা কি শুধু তাঁর রোমান্টিক ইমেজ আর নায়কোচিত চেহারার জন্য? তাঁর কন্যা আলেইডা গুয়েভারা তো বলেছেন, ‘‌মোটর সাইকেল ডায়েরিজ’‌ সিনেমায় চে-এর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন যে সুপুরুষ যে মেক্সিকান অভিনেতা, সেই বার্নেলের চেয়েও হ্যান্ডসাম ছিলেন তাঁর বাবা। কিন্তু কমবয়সিদের কাছে চে-এর জনপ্রিয়তার একটি কারণ যদি বা তাঁর নায়কোচিত চেহারা আর ক্যারিশমাটিক ইমেজ হয়ও, এটি কিছুতেই তাঁর জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ নয়। সে কারণ অন্যত্র লুকোনো। তাঁর নিজের সন্তানদের লিখে যাওয়া শেষ চিঠিতে চে লিখেছিলেন:‌ ‘‌এই পৃথিবীর যে কোনও অংশে যে কোনও মানুষের বিরুদ্ধে যে কোনও অন্যায় অবিচার সঙ্ঘটিত হলে তা গভীর ভাবে অনুভব করার চেষ্টা করবে। এটাই একজন বিপ্লবীর সবচেয়ে বড় গুণ।’‌ বড় করে ভাবলে, এটিই ছিল চে-এর জীবনদর্শন, যা শুষ্ক তত্ত্বের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়েছিল জীবনের স্পন্দনের। তাই প্রয়াণের পরে পরেই, মাত্র দু’বছরের মাথায়, কার্ল মার্কসের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর ছবি ব্যবহৃত হতে শুরু করে পৃথিবী-জোড়া বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে। সেই ধারা আজও প্রবহমান। কত কত আন্দোলনের তিনিই হয়ে উঠেছেন মুখ। প্রতিবাদী মানুষের দেহ আঁকড়ে গোটা পৃথিবীময় আজও তাঁর গৌরবোজ্জ্বল উপস্থিতি। এই বিশ্ব-ব্যাপী গ্রহণযোগ্যতার পেছনে তাঁর ভাবনার আন্তর্জাতিকতাও প্রবল ভাবে ক্রিয়াশীল থেকেছে। ত্রি-মহাদেশীয় সম্মেলনে তাঁর বাণীতে তিনি লিখেছিলেন, ‘‌আমাদের সত্যিকারের সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদ গড়ে তুলতে হবে। যে পতাকার নীচে আমরা সংগ্রাম করি, সে পতাকা হবে মানবতাকে মুক্ত করবার পবিত্র আদর্শের। ভিয়েতনাম, ভেনেজুয়েলা, গুয়াতেমালা, লাওস, গিনি, কলম্বিয়া, বলিভিয়া প্রভৃতি আরও অনেক দেশে আজ সশস্ত্র সংগ্রাম চলছে— সে সব দেশের মুক্তি সংগ্রামের পতাকার নীচে প্রাণদান করা সকলের পক্ষে সমান বরণীয় ও গৌরবের...এক একটি দেশের মুক্তিলাভের অর্থ— তার নিজের দেশের মুক্তি-যুদ্ধে এক একটি পর্যায় অতিক্রম করা।’‌ সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদে যাঁর এই নিবিড় বিশ্বাস, তিনি যে সর্বস্তরে গৃহীত হবেন— সে বিষয়ে কি কোনও সংশয় থাকতে পারে?
#
বিশ্বজুড়ে দিনে দিনে চে-এর প্রভাব এতখানিই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে  বিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী একশো ব্যক্তির একজন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। চে-এর ট্যাটু আছে মারাদোনা আর মাইক টাইসনের শরীরে। তাঁকে নিয়ে রচিত হয়েছে গান, অভিনীত হয়েছে নাটক, নির্মিত হয়েছে সিনেমা আর ডকুমেন্টারি; তিনি স্থান পেয়েছেন কার্টুন আর স্ট্রিট গ্রাফিত্তিতেও। গোটা পৃথিবীর নানা স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর স্ট্যাচু। সত্যি বলতে কী, পণ্যের পৃথিবীতেও কোথায় নেই তিনি? কেবল মাত্র টি শার্টেই তো নেই তিনি, তাঁর মুখ ব্যবহৃত হয়েছে টুপি, জিনস, কফি মাগ, লাইটার, তালার চেন, ওয়ালেট, অ্যাশট্রে, রেস্টুরেন্ট আর সানগ্লাসের বিজ্ঞাপনে। এমনকী, বিকিনি আর সুইম ওয়্যারেও উপস্থিত থেকেছে তাঁর নায়কোচিত, রোমান্টিক, প্রত্যয়ী মুখখানি। পণ্যের জগতে চে-এর এই বিপুল উপস্থিতি অবশ্য অনেকেরই বীতরাগের কারণ হয়েছে। অনেকেই আক্ষেপ করেছেন যে, যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম সেই পুঁজিবাদের জালেই শেষমেশ ধরা পড়েছেন চে। হয়ে উঠেছেন আদর্শহীন এক নিছক পণ্য। চে-এর মুখের যে ছবিটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় টি শার্ট থেকে পারফিউমে, সেই ছবিটি তুলেছিলেন কিউবান ফটোগ্রাফার অ্যালবার্তো কোর্দা। তাঁর কন্যা ডায়ানা ডায়াজও যত্রতত্র চে-এর ছবি ব্যবহার নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন; বলেছেন, 'We are constantly demanding that the use of this image be respected. It’s not that it shouldn’t be used; the idea isn’t that the image should not be reproduced. ... My father wasn’t opposed to the image being used. He opposed its misuse. He never wanted it to be used to sell alcohol or cigarettes or perfume.'

 #
‌‌‌‌‌‌‌তা হলে কি পুঁজিবাদ সত্যিই গ্রাস করে নিয়েছে চে-কে? মনে হয় না। জীবিত অবস্থায় যে চে ছিলেন সশস্ত্র সংগ্রামের জীবন্ত কিংবদন্তি, মৃত্যুর পরে তিনিই হয়ে উঠেছেন অন্তর্ঘাতের এক মূর্ত প্রতীক। প্রতিটি পণ্যের শরীরে তাঁর মুখটি থাকে প্রকাশ্যে আর সেই মুখের পেছনে তাঁর আদর্শ লুকিয়ে থাকে গেরিলা কায়দায়। এক একটি পণ্যের মাধ্যমে সেই আদর্শই আসলে নিঃশব্দে প্রচারিত হতে থাকে পৃথিবীর এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তার শত অস্ত্র আর নজরদারির কৌশল নিয়েও এই গেরিলা অন্তর্ঘাতকে কব্জা করতে অক্ষম। পুঁজিবাদের ফাঁদে চে পড়েননি। বরং তিনিই পুঁজিবাদকে ফাঁদে ফেলেছেন। শরীরে তিনি মৃত। কিন্তু মনে হয়, তাঁর চোখ দুটি যেন চেয়ে আছে আর অন্তর্ঘাতী সেই দৃষ্টি এক গোলার্ধ থেকে ছুটে যাচ্ছে অন্য গোলার্ধে, বিপ্লবের বার্তা বহন করে। ■

ঋণ:‌ চে গুয়েভারা ডায়েরি, প্রকাশক:‌ এনবিএ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top