অানে ফ্রাঙ্ক। ফুটফুটে এই কিশোরীর দুনিয়া–কাঁপানো ডায়েরি নিয়ে আবার জগৎ তোলপাড়। কেন অানে ঢেকে রেখেছিল তার ডায়েরির দুটি পাতা?‌ কী লিখেছিল সে?‌ কিশোরী মনের কোন সে কথা?‌ ডায়েরির‌ সেই গোপন পাতার খোঁজ করেছেন পীতম সেনগুপ্ত

বছর দেড়েক আগের কথা। আমস্টারডামে সেদিন সকাল–সকাল পৌঁছে গিয়েছি। আকাশ ছিল একেবারে ঝলমলে। ঠিক করলাম, ভ্যান গখ মিউজিয়ামে আগে ঢুঁ মারব। সে এক অভিজ্ঞতা বটে!‌ প্রায় প্রতিটি ছবির সামনে পৌঁছে হাঁ হয়ে যাচ্ছি। আর অদৃষ্টকে সাধুবাদ দিচ্ছি। এদিকে বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে, সূর্যদেব ঝুঁকছেন পশ্চিমাকাশে। আমাদের হাতে সময় বড় কম। পৃথিবীবিখ্যাত ছবিগুলির মায়া কাটিয়ে বেরিয়ে পড়তেই হল একসময়ে। 
এবার গেলাম এক ঐতিহাসিক বাড়ি দেখতে। সে বাড়ির দোরগোড়ায় এসে দেখি দীর্ঘ লাইন। অধিকাংশই অল্পবয়সি। ধীরে ধীরে লাইন এগোতে থাকে, আর আমার আগ্রহের পারদও চড়তে থাকে ধাপে ধাপে। কী দেখব?‌ যা কল্পনা করে এসেছি, তার থেকেও বেশি?‌ যা জেনেছি এতদিন তার থেকেও বেশি?
একসময়ে বাড়ির দোরে এসে দাঁড়ালাম। অলিভ গ্রিন রঙের সাবেকি ফটকের সামনে ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়ালাম। নত হয়ে দেখতে ইচ্ছে করল দোরগোড়ায় তাঁর কোনও পদচিহ্ন রয়ে গেছে কিনা। কাঠের দরজাটিতে ডান হাতের তালুর স্পর্শে বুঝতে চাইলাম তঁার ছোঁয়া। একসময়ে ঢুকলাম ভিতরে। 
১৯৪৪ সাল। আজ থেকে ঠিক ৭৪ বছর আগের একটি দিন। আগস্ট মাসের ৪ তারিখ। এক গুপ্তচরের সহযোগিতায় সেদিন জার্মানির কুখ্যাত নাৎসিদের হাতে ধরা পড়েছিল এই বাড়ির সব সদস্যরা। তারপর বের্গেন-বেলসন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে আরও কয়েকটি দিন ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্য অত্যাচারের কবলে দিন কাটাতে হয়েছিল। পরিবারের অন্যদের মতো তেরো বছরের একটি ফুটফুটে মেয়েও ছিল সেই হলোকস্টে। শোনা যায় দুরারোগ্য টাইফয়েডে কিশোরীকে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। সেবার নাৎসি অত্যাচারে সেই পরিবারের সকলকেই প্রাণ দিতে হয়েছিল। শুধু প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন মেয়েটির বাবা, ওটো ফ্রাঙ্ক। এই মানুষটি বেঁচে না ফিরলে ইতিহাসের পাতায় তাঁদের কোনও স্থানই হত না। মনে হতে পারে বেঁচে ফিরে কী এমন কাজ করেছিলেন ওটো ফ্রাঙ্ক, যে কারণে তাঁর বাড়ির সামনে এত মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে?
কারণ তার কন্যা। আনে ফ্রাঙ্ক। 
ওটো ফ্রাঙ্ক যখন নাৎসি বাহিনীর ক্যাম্প থেকে অত্যাচারিত হয়ে, প্রিয়জনদের হারিয়ে তন্নতন্ন করে স্মৃতিচিহ্ন খুঁজছিলেন, তখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পেয়েছিলেন একটি পুরোনো ডায়েরি। জঞ্জালের মধ্যে পাওয়া ডায়েরিটিকে বুকে আগলে তিনি নিয়ে এসেছিলেন ক্যাম্প থেকে বেরোবার সময়। ফিরে এসেছিলেন নিজের বাড়িতে। প্রকাশ করেছিলেন। দুনিয়া চিনেছিল ‘‌আনে ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’‌। আজ যা ইতিহাসের দলিল। 
ছোট্ট আনে সবার চেনা। সবার প্রিয়। তার ডায়েরির কথাও কমবেশি জানা সবার। সবাই জানে, আনে তার ডায়েরির দুটো পাতা রেখেছে আড়ালে, ঢেকে। এসবের পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু এবার একটু না বলে যে উপায় নেই!‌ দুনিয়া জুড়ে বড় খবর হয়েছে। হইচইও হচ্ছে খুব। শুরু হয়েছে আলোচনা, গবেষণা। আনে ফ্রাঙ্কের ঢেকে রাখা ডায়েরির দুটো পাতা পড়া গেছে। জানা গেছে তার কিশোরী মনের কথা। কী সেই কথা?‌
তার আগে একটু ইতিহাস। 
সালটা ১৯২৯। জার্মানির বিখ্যাত শহর ফ্রাঙ্কফুট। এই মহানগরের বুকে ছোট পাড়াটির নাম অামমাইন। জুন মাসের তেরো তারিখে এক মধ্যবিত্ত বর্ধিষ্ণু ব্যবসায়ীর ঘর আলো করে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল এক ফুটফুটে শিশুকন্যা। শিশুকন্যার বাপ ওটো এবং মা এডিথ ফ্রাঙ্ক তাঁদের এই দ্বিতীয় কন্যাটির নাম রাখলেন, অানেলিস মাির ‘আনে’ ফ্রাঙ্ক। শিশুটি তখন এই বর্ধিষ্ণু পরিবারে দিব্যি বেড়ে উঠছে... তিনটি বছর চলল এমন করেই। তারপর হঠাৎ একদিন ওটো ফ্রাঙ্ক তাঁর স্ত্রী এডিথকে বললেন, ‘জানো, জার্মানিতে আমাদের থাকাটা মনে হচ্ছে নিরাপদ নয়। আমরা অন্যত্র চলে গেলেই প্রাণে বেঁচে যাব।’ 
এর কিছুদিন পর ওটো, স্ত্রী এবং দুই কন্যাকে শাশুড়ির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, জার্মানিরই অন্য একটি শহরে। সেখানেও বেশিদিন থাকা সম্ভব হয়নি।
ইউরোপ জুড়ে তখন চরম বিশৃঙ্খল, যুদ্ধের দামামা, আর চারদিকে মৃত্যুর মিছিল। এরই মধ্যে কয়েকজন বন্ধুর পরামর্শে ওটো ঠিক করে ফেললেন, নিরাপদ নেদারল্যান্ডসে চলে যাবেন সপরিবার। উদ্বাস্তু হয়েই বাকি জীবনটা কাটাবেন সেখানে। ফ্রাঙ্কফুটের বাড়ির তল্পিতল্পা গুটিয়ে দুটি শিশুকন্যার হাত ধরে ওটো রাতের অন্ধকারে জার্মানির সীমান্ত পেরিয়ে পাড়ি দিলেন সুদূর নেদারল্যান্ডসে। আমস্টারডাম। এই শহরে এসে প্রথমে একটি বাসায় উঠেছিলেন ওটো তাঁর স্ত্রী–কন্যাদের নিয়ে। পরে অল্পদিনের মধ্যেই বাসাবদল করে উঠে চলে এলেন যে বাড়িটিতে, সেই বাড়িটিই আজ ভুবনবিখ্যাত ‘আনে ফ্রাঙ্ক হাউস মিউজিয়াম’‌। কিছুদিনের মধ্যেই ওটো এবং তাঁর পরিবার বুঝতে পারলেন শহরটি তাঁদের সমাদর করছে। ফ্রাঙ্ক পরিবার হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন যেন। দুই মেয়ে, ম্যারগট ও আনে ভর্তি হল ডাচ স্কুলে। ওদের জন্য ঘরেই একটি ছোট লাইব্রেরি তৈরি করে দেওয়া হল। ধীরে ধীরে ম্যারগটের প্রিয় বিষয় হয়ে উঠল অঙ্ক আর আনের লেখা, আঁকা, ইত্যাদি বিষয়ে। ছোট্ট আনের জীবন জুড়ে বন্ধুবান্ধব, লেখাপড়া, মা-বাপকে নিয়ে দিব্যি চলতে লাগল। স্কুলের খাতার পাতায় ডাচ ভাষায় সে চুপিচুপি নানা কথা লিখতে শুরু করল স্কুলের ক্লাসঘরের কোণে বসে। কাঁপা কাঁপা ছেলেমানুষী হাতের লেখায় নিত্যদিনের কিছু না কিছু লিখে রাখা তাঁর নেশা হয়ে উঠল। আনে সে লেখা কাউকেই দেখাত না। লাজুক মেয়েটি ভাবত বুঝি, তাঁর লেখা পড়ে কেউ যদি হাসিঠাট্টা করে। 
এই সময়ে ইউরোপের আকাশে বারুদের পোড়া গন্ধ আর মাটিতে মৃতদেহের মিছিল। আমস্টারডামের আকাশেও তখন স্বৈরাচারের কালো মেঘ ছেয়ে গেল প্রায় রাতারাতি। দু’‌বছর আগে অর্থাৎ আনের বয়স যখন ১১ ছুঁই–ছুঁই, তখন জার্মানিরা নেদারল্যান্ডসের মসনদ দখল করল। ইহুদিদেরও কোণঠাসা করা শুরু হল। ওটো ভাবলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাবেন। তাও হল না। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হল যে ইহুদি হওয়ার সুবাদে আনে এবং ম্যারগটকে স্কুল দিল তাড়িয়ে। দুই বোন ভর্তি হল ইহুদি লিসেয়ামে। ওটোর ব্যবসা ততদিনে মন্দার দিকে বইতে শুরু করেছে। চিন্তায় চিন্তায় তাঁর ঘুম চলে যাওয়ার অবস্থা। সেই সময়ে আনের তেরোতম জন্মদিন এসে হাজির। আনের জন্য কী উপহার দেওয়া যায় ভাবতে বসেছেন ওটো। হঠাৎই তাঁর মনে পড়ে গেল, ক’‌দিন আগেই আনেকে নিয়ে দোকানে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানকার একটা অটোগ্রাফ খাতা দেখে খুব পছন্দ হয়েছিল মেয়ের। সোজা ছুটলেন সেই দোকানে। দোকানিকে গিয়ে বললেন, ‘‌ওই অটোগ্রাফ খাতাটি দিন।’‌‌
লাল এবং সাদা চেকের কাপড়ে বাঁধানো সুদৃশ্য অটোগ্রাফ খাতা। ভারি সুন্দর। তখন কে জানত এই খাতাই একদিন ‘আনে ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’‌ হয়ে দুনিয়া কঁাপাবে?‌ 
খাতা পেয়ে খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠেছিল আনে। ওর বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে ওর পছন্দের অটোগ্রাফ খাতা সে একদিন পাবে। সেদিন সারাটা রাত খাতাটিকে বুকে আগলে নিয়ে ঘুমিয়েছিল আনে। 
তারপর সেই দিনটি এল। রবিবার, ১৪ জুন। ১৯৪২। খাতার প্রথম পাতার ওপর তারিখ লেখা হল। শুরু হল আনের দিনলিপির পথচলা। সবাই জানে আনে সেদিনের কথা লিখেছিলেন এমন করে,
‘‌... দিনটি ছিল শুক্রবার, জুন মাসের বারো তারিখ। আমি ভোর ছ’টাতেই উঠে পড়েছিলাম। সেদিন ছিল আমার জন্মদিন.‌.‌.‌।

’‌‌ 
এমন করেই সভ্যতার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী দিনলিপির পাতা ভরা শুরু হয়েছিল। পরপর তিনটি পাতা আনে ভরল খুবই সাদামাঠাভাবে। তৃতীয় দিন অর্থাৎ ২০ জুন সে স্বীকার করল এই ডায়েরিই হল তার একতম বন্ধু। তার মনের কথা সে এখানেই বলে যাবে। সে লিখতে শুরু করল, সম্বোধন করল,
‘‌প্রিয় কিটি’‌ বলে। বোঝা গেল এই কিটির কাছেই সে ধরা দেবে। বলে যাবে জীবনের না-বলা কথার স্বপ্নগুলি। সে লিখেছিল—
‘‌... জানো, এই ডায়েরি হাতে পেয়ে মনে হল আমি পেয়ে গেছি আমার প্রকৃত বন্ধুটিকে। যাকে আমি বহুদিন খুঁজে বেড়িয়েছি। সকলের মতো মোটা মোটা অক্ষর দিয়ে গোদা গোদা বিষয় নিয়ে ডায়েরির পাতা আমি ভরাতে পারব না। নিভৃতে বসে ডায়েরির কাছে প্রিয় বন্ধুর মতো সবটুকু বলে যাব, একেবারে অনর্গল এবং অকপটে। আমি বান্ধবীর নাম রেখেছি কিটি।’ 
শুরু হল আনের জীবনের নানা কথার মালা গাঁথা। কিটিও চুপটি করে দিনের পর দিন শুনে গেল তার প্রিয় বান্ধবীর রোজকার সুখ–দুঃখের কাহিনী। 
এখন বিশ্বের কাছে আনের ডায়েরি নিজেই একটি ইতিহাস। ইতিমধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ৭০টি ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে। তিন কোটিরও বেশি মানুষ গ্রোগ্রাসে গিলেছেন প্রতিটি পাতার প্রতিটি অক্ষর। ডায়েরি উপহার পাওয়ার এক মাসের মধ্যেই অর্থাৎ ১৯৪২ সালের ৫ জুলাই আনে ও তার পরিবারের সকলকে নাৎসিদের হাত থেকে বাঁচতে গোপন সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল।
প্রায় দু’‌দুটি বছর সেই গোপন সুড়ঙ্গে তাদের কঠিন জীবনযাপন করতে হয়েছিল। আনে সেই সময়ে কিটিকে যেন আরও আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিল। ১৯৪২–এর ৫ জুলাই কিটিকে ডায়েরির পাতায় সে জানিয়েছিল এই বলে,
‘‌প্রিয় কিটি,
জানো, বাবা এসে আমাদের সকলকে বললেন, আমাদের এবারে আত্মগোপন করতে হবে।... বাবা এও বললেন, যেখানে যাব, সেখানে আমাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার, জামাকাপড়, আসবাবপত্র সবই আগামী বছরখানেকের জন্য মজুত থাকবে। আমরা চাই না জার্মানরা আমাদের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। তাছাড়া আমরা আত্মসমর্পণও করব না। তাই আমরা এখানে আমাদের মতো করে সকলেই আত্মগোপন করব যতদিন না তারা আসে আর আমাদের সন্ধান পায়...’‌
তারপরে ধরা পড়ে গোটা পরিবার। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ যখন শেষের মুখে, সেই বের্গেন-বেলসন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের অন্ধকূপে টাইফয়েডে ভুগে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছিল এই কিশোরী। তারপর তো সবটুকুই ইতিহাস। আশ্চর্যের বিষয়, ওই পরিবারটিতে একমাত্র ওটো ফ্রাঙ্কই বেঁচে গিয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত। ক্যাম্প থেকে ফিরে আসার সময় তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর কনিষ্ঠা কন্যার সেই সাধের ডায়েরিটিকে। ধূলিধূসরিত হয়ে জঞ্জালের স্তূপের মধ্যে সে পড়েছিল নিতান্তই অবহেলায়। 
আনের সেই বিখ্যাত ডায়েরি ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথমে জার্মান ভাষায় তারপর একে একে ছড়িয়ে পড়ে নানা জায়গায় নানা ভাষায়। সে খবরও কিন্তু ইতিহাস হয়ে আছে। 
সম্প্রতি সেই ডায়েরি আবার সংবাদের শিরোনামে এসেছে। সারা বিশ্বে সেই নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। আসলে এই ঐতিহাসিক ডায়েরিটি যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন ডায়েরির দুটি পাতা বাদামি রঙের কাগজে আঠা দিয়ে সাঁটা ছিল। আনে নিজেই তা করেছিলেন। সেই পাতা দুটির মধ্যে আনে কী লিখেছিল সে কৌতূহল ছিল সকলের মধ্যেই। কিন্তু কোনও উপায় ছিল না জানার। আমস্টারডামের আনে ফ্রাঙ্ক হাউস মিউজিয়ামের কর্তাব্যক্তিদের এই নিয়ে খুবই সংশয় ছিল। তাঁদের ধারণায় ছিল এটি উদ্ধার করা আদৌ সম্ভব নয়। কিন্তু উন্নত প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে এই ধরনের পাঠ যে উদ্ধারের সুযোগ আছে তা তাঁরা জানতে পারেন ২০১৬ সাল নাগাদ। এই ধরনের পাঠোদ্ধারে প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণাকে ‘নিউ ইমেজিং টেকনিকস’ বলা হয়ে থাকে। সেই দুটি পাতা পাঠোদ্ধারের জন্য এই আধুনিক পদ্ধতিকেই কাজে লাগানোর কথা মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ ভাবতে লাগলেন। 
তাঁদের পরীক্ষাতেই জানা গেছে, আনের বয়স যখন তেরো বছর, অর্থাৎ ১৯৪২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সেদিন আনে এমন কিছু লিখেছিল যা কিনা সে কিটির কাছে বলেও পরে আড়াল করে দিয়েছিল। কী সেই কথা?‌
তখন আনের বয়ঃসন্ধির সন্ধিক্ষণ। এইসময় থেকে ছেলেমেয়েদের দেহমন জুড়ে চলতে থাকে পরিবর্তনের ঝড়। নিশ্চয়ই তার এমন কিছু বলার ছিল, যা সে ব্যক্ত করে নিজেকে স্বস্তি দিতে চেয়েছিল কিন্তু অস্বস্তি বাড়িয়েছিল যদি কেউ দেখে ফেলে বা পড়ে ফেলে সেই তাড়নায়। প্রযুক্তি বন্ধ পাতায় চোখ রেখে পড়ে ফেলেছে আনের ‘‌গোপন কথাটি’‌। 
প্রযুক্তি বলছে, আনে সেই অবগুণ্ঠিত পাতায় লিখেছে,
‘‌আমি এই নষ্ট পাতাটি ব্যবহার করব প্রাপ্তবয়স্ক জোকস লিখে।‌’‌ 
তারপরই সেই পৃষ্ঠায় সে কাটাকুটি করেছে প্রচুর। চুপিচুপি তার লেখা চারটি প্রাপ্তবয়স্ক রসিকতা উদ্ধার করে ফেলল  নিউ ইমেজিং টেকনিকস। আনে ফ্রাঙ্ক হাউস মিউজিয়ামের অন্যতম অধিকর্তা রোনাল্ড লিওপোল্ড বলেছেন, 
‘‌আনে ফ্রাঙ্ক খুবই নিরীহভাবে যৌনতা সম্পর্কে তাঁর ধারণার কথা লিখেছেন। আর–পাঁচটা কিশোর–কিশোরীর মতোই তিনিও এই বিষয়ে স্বাভাবিক কারণে যে আগ্রহী ছিলেন, তা বোঝা যায়।’‌ 
‌এই অধুনা আবিষ্কৃত পাতাগুলির ছবি মিউজিয়ামের অলিন্দে তোলা হয়েছিল ২০১৬ সাল নাগাদ। সেই ছবি থেকেই লেখাগুলোর পাঠোদ্ধার করেন নিওড ইনস্টিটিউটের পরিচালক ফ্রাঙ্ক ভ্যান ড্রিয়া। আনের আবেগ তাঁর কণ্ঠেও ধরা পড়ে। তাঁর উদ্ধার করা পাতাগুলির লেখাকে তিনি ‘‌প্রাপ্তবয়স্ক রসিকতা’‌ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, উঠতি বয়সিদের কাছে এই ধরনের কৌতুক চলেই। এর থেকেই বোঝা যায় সবকিছুর ঊর্ধ্বে আনে কিন্তু নিপাট একটি সাধারণ মেয়ে ছিলেন। সেদিনে আনের উদ্ধার করা পাতায় আনে আরও লিখেছে,
‘‌কেউ কি জানে জার্মান ভেরম্যাচ মেয়ে যোদ্ধারা কেন নেদারল্যান্ডসে এসেছে? এর উত্তরে বলা হয়ে থাকে জার্মান এই মেয়েরা এতটাই স্থূল যে তাদের গদির সঙ্গে তুলনা করা যায়।’‌
মিউজিয়ামের কর্তাদের ধারণা কিশোরী আনের যৌনতা বিষয়ক লেখা কিন্তু অন্যদের থেকে শোনা, যা এই বয়সের ধর্ম। 
একটি কথা সবিনয়ে বিশেষভাবে স্মরণ করার ব্যাপার আছে। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ অতি সম্মানের সঙ্গে তা কবুলও করেছেন। ‘‌আনে ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’‌ রাষ্ট্রপুঞ্জ ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। অতএব এই দুই পৃষ্ঠার লেখাগুলো উদ্ধারের পর লোকচক্ষুর গোচরে এনে যেন আনের অসম্মান না হয়। এরপরও একে ঐতিহ্য হিসেবে সযত্নে রক্ষা করার দিকে নজর রাখা বিশেষভাবে জরুরি।
উদ্ধার করা সেই পাতায় আনের আরও একটি বাস্তব কথা, যাকে রসিকতা বলা হচ্ছে, তা সপ্রতিভ হয়ে ফুটে উঠেছে। যা বিশ্বাস করেছিল তাই অকপটে লিখেছিল সে। লিখেছিল— 
‘‌১৪ বছর বয়সের একটি মেয়ে রজস্বলা হলে বুঝতে হবে সে একটা পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের জন্য পরিপক্ব। কিন্তু এটা অবশ্যই বিয়ের আগে নয়।’‌
এ সমস্ত কথা হলোকস্টের সবথেকে আলোচিত এক কিশোরীর, যা আজ গোটা বিশ্বের দরবারে নতুন করে আলোচনা এবং গবেষণার বিষয় হয়ে উঠে এসেছে। আসলে আনে ফ্রাঙ্ক যে আমার–আপনার ঘরের সেই চিরপরিচিত ছোট্ট প্রিয় মেয়েটি। তাকে এই জানার মধ্যে দিয়েই আরও চেনা, আরও আপন করতে হবে।‌‌ ■ 

 

অানে ফ্রাঙ্ক
অানে ফ্রাঙ্কের ডায়েরির গোপন পাতা

 

জনপ্রিয়

Back To Top