পদ্মভূষণ, সাহিত্য অকাদেমি, বিশ্বের এগারোটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডক্টরেট— 
আজকের বিশ্বে অন্যতম অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবী গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের মুখোমুখি সৌমেন দত্ত। 

ভগিনীপতি প্রদীপের (‌পি কে ব্যানার্জি)‌ বাড়িতে লাঞ্চ খেয়ে ফিরলেন। ঘরে ঢুকে সলজ্জ ভঙ্গিতে পরনের তুঁতরঙের শাড়িটা দেখিয়ে কন্যাসম মেয়েদের বললেন, ‘শঙ্খর (‌শঙ্খ ঘোষ)‌ স্ত্রী প্রতিমাদি সব সময় সেজে থাকতে বলে। ওর ভয়ে তাঁঁতের শাড়িটা পরেছি। ভাল লাগছে না?’ হাত থেকে ছিটকে পড়া মার্বেলগুলির মতো হাসিটা আটলান্টিক দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে ‘প্রফেসর জিসিএস’ মুহূর্তে হয়ে উঠলেন অস্মিতা–মুক্ত গায়ত্রীদি, ‘বলুন, কী জানতে চান—।’
দু’‌জন অসাধারণ মানুষের সাহচর্যে গায়ত্রীর বড় হওয়া। ‘এক ভাই, তিন বোনের মধ্যে আমি সেজ। বাবার ছোটবেলা কেটেছিল দশহাল আন্দাতিয়া গ্রামে। তখন নেত্রকোণা জেলায়, এখন ময়মনসিংহে অবস্থান। ঠাকুরদা গৌরীপুরের জমিদারের নায়েব ছিলেন। পরীক্ষায় ভাল ফল করায় ছেলেকে বললেন, ‘বড় হয়ে সদরে পোস্টমাস্টার হবি।’ বাবা আরও বড় কিছু হতে চান। ঠাকুরদার মুখের ওপর কথা বলার সাহস ছিল না। ১৯১৭ সালে বিনা টিকিটে কলকাতায় পালিয়ে এলেন। বড় হয়ে তিনি চিকিৎসক, ডাঃ পরেশচন্দ্র চক্রবর্তী। মা শিবানীদেবীও অত্যন্ত বিদূষী মহিলা ছিলেন। ১৪ বছর বয়সে বিয়ে। পরের বছর আমার ভাইয়ের জন্ম। তা সত্ত্বেও ১৯৩৭ সালে এমএ পাশ করেন। আমার জন্মের সময় জাপানি বোমার ভয়ে সবাই কলকাতা ছাড়ছে। মা নারাজ। সে–কারণেই বালিগঞ্জে আমার জন্ম। আমি খুব খুশি। কারণ, ‘খুকু–মা যদি থাকে...’ বলে দিদিমাও নড়েননি। ভীষণ আদর করতেন। দুর্ভিক্ষের বছর বিয়াল্লিশের ২৪ ফেব্রুয়ারি গায়ত্রীর জন্ম। শিবানীদেবী তখন রীতিমতো সমাজসেবী। ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে সোজা স্টেশনে গিয়ে বুভুক্ষুদের সেবায় নেমে পড়েন। চার বছর পরে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’। ওইটুকু বয়সে দাঙ্গা না ছুঁলেও পরে জেনেছেন, বাবা ঝুঁকি নিয়ে প্রতি রাতে কিছু মুসলিম পরিবারকে বাড়িতে আশ্রয় দিতেন।
সেন্ট জন’স ডায়াসেশন গার্লস স্কুলের পাঠ শেষে লেডি ব্রেবোর্নে দু’বছর কাটিয়ে প্রেসিডেন্সির ছাত্রী। ১৯৬০ সালে কলেজ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন, ‘আমাদের কলেজের স্নাতকেরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করেন, তখন কিছুকালের মধ্যেই তাঁদের শিক্ষার আগ্রহ ও উদ্যম বিক্ষিপ্ত হয়, প্রেসিডেন্সি কলেজের নিবিড় অধ্যাপক–ছাত্র সম্পর্কের পরিবর্তে তাঁরা একটা ভয়াবহ ব্যক্তিনিরপেক্ষতার সম্মুখীন হন, এ কথা কোন অংশেই অতিশয়োক্তি নয়। গত ‘প্রতিষ্ঠাতৃদিবস সভায়’ এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্য কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যাপকভাবে দায়ী করা হয়। কিন্তু বোধ করি, এ বিষয়ে সরকার আপন অধিকার দাবি করলে, বিশ্ববিদ্যালয় সে দাবি নিশ্চয়ই মেনে নেবে।’‌ স্নাতক হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি নিয়ে এমএ পড়তে গেলেন। অধ্যাপক তারকনাথ সেন লেখাটা পড়েছিলেন। ছাত্রীকে আগাম জানিয়ে দিলেন, ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার আশা নেই। ‘আমার কল্পনায় মন্তব্য আরও বিস্তৃত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আপনার প্রশ্নে আবার পড়তে গিয়ে চমকে উঠলাম। মাত্র তিনটি বাক্যে আঠারো বছরের মেয়ের স্পর্ধা!
বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু টাকা? তখন পাঁচটা টিউশনি করি। মেট্রোপলিটন ইনসিওরেন্স কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য প্রথম বছর পড়ার টাকাটা ধার দিলেন।’ হাতে বিমানের টিকিট আর ১৮ ডলার। তাই নিয়ে ১৯৬১–তে আমেরিকায় কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলেন। দ্বিতীয় বছরে আর্থিক সঙ্কটের মুখে। ডিপার্টমেন্ট আর্থিক সাহায্য দেবে না। ‌‘পূর্ব ভারত থেকে আসা একটা মেয়ে, যতই ইংরেজি জানি, টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে ওদেশের ছাত্রদের কম্পোজিশন ইত্যাদি পড়াব, মানতে পারল না। কাজটা হল না। কি করি? টাকা নেই, ওয়ার্ক পারমিট নেই, ভিসা নেই। আমায় তো তাড়িয়ে দেবে! তখন অধ্যাপক পল দ্য মাঁ ‘তুলনামূলক সাহিত্য’ পড়ার প্রস্তাব দিলেন। ভাবলাম, আহা আমি কী ভাল ছাত্রী! ডেকে পড়ার প্রস্তাব দিচ্ছে। পল জানতে চাইলেন, কোন কোন বিদেশি ভাষা জানো? বললাম, ইংরেজি। কলকাতায় আলিয়ঁস ফ্রাঁসেজে ফরাসি ভাষা নিয়ে তিন মাসের কোর্স করেছি। আর প্রতিবেশী এক জর্মন মহিলা তিন মাস জর্মন পড়িয়েছেন। পেপারগুলো যদি ফরাসি বা জর্মনে লিখতে না হয়, পড়া–টড়া চালিয়ে নিতে পারব।’‌ ইংরেজি চর্চা ছেড়ে রাতারাতি তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্রী। ১৯৬৫–তে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদে যোগ দিলেন। দু’বছর পরে তুলনামূলক সাহিত্যে পিএইচডি। ১৯৭৪ সালে তাঁর উদ্যোগে আইওয়াতে ‘অনুবাদ কর্মশালা’ চালু হল। আমেরিকায় প্রথম। তারপর টেক্সাস, এমরি, পিট্‌সবার্গ— নানা বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে ১৯৯১ সালে কলম্বিয়ায় থিতু হলেন।
কফি হাউসের আড্ডায় শুনেছিলাম, লাবণ্য মেধার জন্য কলেজ স্ট্রিটের শিক্ষাঙ্গনে গায়ত্রী বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। কৌতূহল নিরসন করতে বলেই ফেললাম, আপনার কলকাতা ত্যাগ তো অনেকের মনোব্যথার কারণ হয়েছিল? জোর দিয়ে বললেন, ‘একেবারেই সত্যি নয়। আর আমি যে খুব জনপ্রিয় ছিলাম, তা–ও নয়। মনে হয়, সে–সময় বাঙালি যুবকদের মধ্যে, যতই বিপ্লবী হোক, প্রেম এত চাপা ছিল, সেটা হাস্যকরভাবে প্রকাশ পেত। প্রচারটা বিনয়কে নিয়ে (‌কবি বিনয় মজুমদার)‌। ওকে আমি চিনতামও না। শঙ্খর কাছে শোনা, আসলে কবির প্রেমাস্পদ ছিলেন যে গায়ত্রী, তিনি হিন্দু হস্টেলের সুপার অধ্যাপক জনার্দন চক্রবর্তীর মেয়ে। তাঁর প্রতি হস্টেলের আবাসিক বিনয়ের দূর থেকে অনুরাগ ছিল। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর বিনয়কে হস্টেল ছাড়তে হল। গায়ত্রী চোখের আড়ালে চলে গেলেন।’ 
সে বছরেই ‘নক্ষত্রের আলোয়’র পর বিনয়ের দ্বিতীয় কবিতার বই ‘ফিরে এসো চাকা’ প্রকাশ পেয়েছে। উৎসর্গ করেছেন ‘গায়ত্রী চক্রবর্তী’কে। একটি কবিতার ছত্র, ‘... সতত বিশ্বাস হয়, প্রায় সব আয়োজনই হ’য়ে গেছে, তবু / কেবল নির্ভুলভাবে সম্পর্কস্থাপন করা যায় না এখনো।’ বিনয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলেন বিই কলেজে। মাঝেমধ্যে প্রেসিডেন্সিতে বন্ধুবান্ধবের কাছে আসেন। ‘প্রেসিডেন্সিতে বিনয় দেখল, বাঃ, সুন্দর দেখতে আর একটি মেয়ে আছে। তার নামও গায়ত্রী চক্রবর্তী।’ গায়ত্রী ব্যাখ্যা করলেন, ‌‘কবির তো শব্দগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক। কাজেই আমি তখন সেই প্রথম ‘গায়ত্রী চক্রবর্তী’র জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। দূর থেকে তার প্রেমাস্পদ। ওটা আমি নয়, কে বোঝাবে! শঙ্খ এই রহস্যভেদ করে আমাকে মুক্তি দিয়েছেন। বিনয়ের কবিতা তো অসাধারণ। এইটুকু বলতে পারি, আমার নামটা তার কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বলে...।’‌ মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, গর্বিত? একটু থমকে বললেন, ‘গর্বিত নয়, অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। নামের জন্য আমি গর্ব করি না। তা ছাড়া, গায়ত্রী নামটাও ভাল নয়।’ হাসি থামলে পরের জিজ্ঞাসা, আর কখনও এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন? ‘হ্যাঁ। দেরিদা অথবা বিমলকৃষ্ণ মতিলাল— এঁদের সঙ্গে আমার যে নিষ্পাপ অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব, তা নিয়েও, ওই যে মহিলা হলেই...এটা যে কত দুঃখের, আর অন্য কোনও চিন্তা এদের মাথায় ঢোকে না। বরের কাগজও লিখেছে। প্রশ্নটা করে ভালই করেছেন।’ 
Deconstruction বিষয়টা বেশ জটিল। তর্জমায় ‘অবিনির্মাণ’ গায়ত্রীর অবদান। যতটুকু বুঝি, অবিনির্মাণ সাধারণভাবে সমালোচনার একটি দার্শনিক তত্ত্ব যা একটি রচনার গভীরতর দ্বন্দ্ব অনুসন্ধান করে। এই তত্ত্ব নিয়ে জাক দেরিদার ‘Of Grammatology’। দুঃসাহস বলব। মার্কিন বিদ্বজ্জন গায়ত্রী তো দূরের কথা, তখন দেরিদার নামও শোনেননি। ইংরেজি বা ফরাসি মাতৃভাষা নয়। দর্শন নিয়ে তেমন পড়াশুনো করেননি। বইটা ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বসলেন। সেইসঙ্গে দেরিদার সবিস্তার মূল্যায়ন। ভাষান্তরের কল্যাণে রাতারাতি আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী মহলে লেখক এবং অনুবাদক, দু’‌জনেই স্টার মর্যাদা পেলেন। 
সহমত হয়ে গায়ত্রী বললেন, ‘দুঃসাহসই বটে! এখন ভাবলে তাই মনে হয়। আইওয়াতে যোগ দেওয়ার পর জগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য নানা ধরনের বই পড়তাম। তার মধ্যে দেরিদার বইটাও ছিল। পড়ে ভাল লাগল। এমনও হতে পারত ওই বইটা কিনতাম না। তা হলে জীবনটা হয়ত অন্যরকম হত। কতটা বুঝতে পেরেছিলাম জানি না। ভাবলাম, ওঁর পরিচয় জানি না। আমিও অপরিচিতা। তাঁর ভাবনা নিয়ে কে আমায় লিখতে দেবে? তো, ঠিক করলাম বইটা অনুবাদ করব। তবে একটা শর্তে। লেখককে নিয়ে একটা বড় মুখবন্ধ লিখতে দিতে হবে। (‌ম্যাসাচুসেট্‌স ইউনিভার্সিটির কাছে)‌ এমনভাবে দাবিটা পেশ করলাম, যেন ওঁরাই আমাকে লিখতে অনুরোধ করছে। আমার দাবিতে ওঁরা মজা পেয়ে অনুমতি দিল। অধ্যাপক হিলিস মিলারের উদ্যোগে প্রকাশনা স্থানান্তরিত হয়ে জনস হপকিনস থেকে ১৯৭৬ সালে প্রকাশ পেল। ১৯৬৭ সালে অনুবাদ শুরু করেছিলাম। চার বছর পরে হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সম্মেলনে allegory–র ওপর বক্তৃতা দিতে গেছি। দর্শকদের মধ্যে দেরিদাও আছেন জানতাম না। বক্তৃতা শেষে তিনি এগিয়ে এসে আলাপ করলেন। ততদিনে অবশ্য বুঝে গেছি, আমি একজন পারদর্শী অনুবাদক এবং বিষয়টার মধ্যে ঢুকতে পেরেছি।’
মূলত আজ্ঞাবহ সিপাহিদের বোঝাতে সামরিক সংগঠনে Subaltern শব্দটার চল। বাংলায় এখন ‘নিম্নবর্গ’। তিরিশের দশকে ইতালির মার্কসবাদী দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামশি ‘কারাগারের নোটবই’ লিখতে বসে শব্দটা ব্যবহার করেন। তখন থেকে তার ব্যবহার বহুমুখী। দেরিদা অনুবাদের পর ১৯৮৮ সালে গায়ত্রীর প্রবন্ধ ‘Can the Subaltern Speak?’ আর একটা বিস্ফোরণ! প্রায় তিরিশ বছর কেটে গেছে। আজও লেখাটা নিয়ে আলোচনা হয়। কেন? গায়ত্রীর অকপট স্বীকারোক্তি, ‘‌এইটা কিন্তু আমাকেও অবাক করে। নিজের লেখা সম্পর্কে খুব উচ্চ ধারণা নেই। ভুল করে, শিখতে শিখতে এগোই। সম্প্রতি লেখাটা নিয়ে ছাত্রদের প্রশ্নের উত্তর দিতে কলম্বিয়ায় ডেকেছিল। অনেকদিন পরে পড়লাম। মন্দ নয়, চেষ্টা করে একটা কিছু লিখেছি। ওটা তো কোনও উত্তর–ঔপনিবেশিক লেখা নয়, হিন্দু ধর্মের সমালোচনা।’
রচনায় মা–র কাছে শোনা এক মর্মস্পর্শী ঘটনা উল্লেখ করেছেন গায়ত্রী। ১৯২৬ সালের কথা। ১৭ বছরের এক কিশোরী বিপ্লবী দলে নাম লিখিয়েছিল। একজন ইংরেজকে গুলি করে মারার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছে। যত বড় শত্রুই হোক, হত্যা করায় মন সায় দিল না। মেয়ে বাড়ি ফিরে এল। দিন যায়। ব্যর্থতার দায় নিয়ে মুখ বুজে কীসের জন্য যেন উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করে। হঠাৎ চতুর্থ দিনে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ল। মৃত্যুর আগে লিখে গেছে, ‘দিদি, ভুল বুঝো না। আমি গর্ভবতী নই। আজই ঋতুস্রাব শুরু হয়েছে। তার জন্য এতদিন ...।’ তখন (‌এবং আজও)‌ মধ্যবিত্ত পরিবারের অবিবাহিত মেয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়লে লোকলজ্জার ভয়ে আত্মঘাতী হত। পাছে লোকে সেই অপবাদ দেয়, কিশোরী দাঁতে দাঁত চেপে রজঃস্রাবের জন্য অপেক্ষা করেছে। দেহ দিয়ে সে জানিয়ে গেল, মেয়ে মাত্রই পুরুষের সম্পত্তি নয়। ওইটুকু একটা মেয়ের পক্ষে টানা চারদিন মনের সঙ্গে লড়াই করে স্বেচ্ছামৃত্যুকে চৌকাঠের ওপারে দাঁড় করিয়ে রাখা, অভাবনীয়! আশ্চর্য, ওই অকপট বিবৃতির পরেও পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের এক উচ্চশিক্ষিত মহিলা গায়ত্রীকে বললেন, কলঙ্কিনীকে নিয়ে লিখছ কেন? তখনই গায়ত্রী তীব্র রোষে আক্ষেপ করলেন, ‘S‌ubaltern পেশ করতে পারে না’‌।
‘‌প্রথমে অনেকে ধিক্কার দিয়েছিল। ভেবেছিল, আমি বলছি— নিম্নবর্গের লোকরা কথাবার্তা বলতে পারে না। আমি তো তা বলিনি। প্রশ্ন তুলেছি, উত্তর তো দিইনি। পরবর্তীতে subaltern studies সম্পর্কে বলেছিলাম, নিম্নবর্গ চেতনা নিয়ে ওঁদের কাজ ওঁদের strategic essentialism। কথাটা খ্যাতি পেল দেশে বিদেশে। এ কথাটা ফিরিয়ে নিয়েছি ‘Outside in the Teaching Machine’ বইয়ের প্রথম কথোপকথনে। পরে বহু জায়গায়। আমার বক্তব্য ছিল, নিম্নবর্গ বিদ্রোহ ধরতে পারার ক্ষমতা অর্জনের পরিকাঠামো তৈরি নেই। এখনও এ নিয়ে পড়ে আছি।’‌ ‌আরও অনেক প্রশ্ন উঠেছে। ‌‘হ্যাঁ, মায়ের মৃত্যু নিয়ে বিনয়ের একটা কবিতা আছে, ‘এর নাম মৃত্যু’। অনেকটা ওই ধাঁচে এক একটা বাক্য লিখে তার ব্যাখ্যা করতে করতে এগিয়েছি। সে সময় ভারতের ইতিহাস গবেষণায় অজ্ঞতার কারণে এক জায়গায় লিখেছিলাম, white men are sowing brown women from brown men.‌ জানিয়েও ছিলাম কেন লিখছি। অনেকে ওটাই আমার মূল বক্তব্য ভেবেছেন। জানি না, হয়ত সেইজন্য আজও জনপ্রিয়!’ 
পরে গায়ত্রী আরও বই লিখেছেন। প্রতিটি রচনায় আলোচনা, বিতর্কের বারুদ যেন ঠাসা। সাধে কি নিউ ইয়র্ক টাইমসের শিরোনাম ছিল ‘‌Creating a Stir, wherever She Goes’‌। যেখানেই যান, আলোড়ন তোলেন! প্রসঙ্গটা তুলতে মুখাবয়বে বিরক্তির মেঘ। ‘যখন লিখতে শুরু করেছিলাম, মহিলা হয়ে এমন কাজ করি বলে এসব বলা হত। এখন বয়স হয়েছে। একটু–আধটু নাম হয়েছে। এসব বানিয়ে তোলা—। যেমন, দেরিদার সুবাদে ফ্রান্সের সঙ্গে ভালরকম জড়িয়ে পড়েছি। সেখানকার মিডিয়ার ইচ্ছে, আমাকে একজন নিম্নবর্গের প্রায় অজানা মানুষ হিসেবে তুলে ধরে। বলুন, আমি সাব–অলটার্ন?’ 
ব্যস্ত অধ্যাপিকা সুযোগ পেলেই দেশে ফেরেন। গাছতলায় যথার্থ নিম্নবর্গের মানুষদের মাঝে বসে পড়েন। ১৯৮৬ সাল থেকে বাংলা–ঝাড়খণ্ড সীমান্তের এই সবহারাদের শিক্ষায় সচেষ্ট। বেতনের অর্থ দিয়ে কাজটা করেন। কোন কোন গ্রামে কাজ করেন? জানতে চাইলে ঘাড় নাড়েন, ‘বলব না। আমি চাই না, লোকে হামলে পড়ুক। তবে এটা বলতে পারি, আমার অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী কখনও ট্রেন দেখেনি। নিজের রাজ্য সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই।’ গ্রামের চৌহদ্দির বাইরে ‘অচ্ছে দিন’–এর গোলকধাঁধায় বন্দি যে স্বদেশ, সোনে দলিত নির্যাতন–তালাক কাজিয়া–পদ্মাবতী বিতর্ক, যাকে বলে, ঘটনার ঘনঘটা। এসবেও তাঁর উদ্বেগ। ‘তবে দূর থেকে একা তো কিছু করা সম্ভব নয়। অন্যদের সঙ্গে আছি। ক’দিন আগে কেরলের আরিকোডে সুল্লামুসল্লম সায়েন্স কলেজে গিয়েছিলাম। দর্শকাসনের মুসলিম ছেলেমেয়েদের বললাম, তালাকের ব্যাপারটা চালু রেখে বা তুলে দিয়ে কার লাভ হচ্ছে, এটা আগে ভাবা দরকার। আমি কাউকে জোর করার পক্ষপাতী নই। মনের গড়ন যদি না বদলায়, জোর করে কিছু হয় না।’ পদ্মভূষণ, সাহিত্য অকাদেমি, বিশ্বের এগারোটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডক্টরেট— তাঁর মুকুটে অগুন্তি পালক। কিয়োটো পুরস্কারের মানপত্রে তিনি ‘বৌদ্ধিক উপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে মানবিকতার জন্য সতত সোচ্চার।’
কথোপকথনের পরদিন কলকাতা থেকে প্রায় আঠারো ঘণ্টার যাত্রা। কর্মসূচি বলছে, নিউ ইয়র্কে পা দেওয়ার দু–ঘণ্টা পরেই কনফারেন্স। জেট ল্যাগ? ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘অত ভাবলে চলে? দায়িত্ব তো ওসব শুনবে না। নিজেকে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।’ এভাবে সারা বছর পৃথিবীর নানা শহরে বক্তৃতা দেন। একই সঙ্গে উনিশ–বিশ শতকের সাহিত্য, মার্কসবাদ, নারীবাদ, বিশ্বায়ন, নিম্নবর্গ— কত কিছুর চর্চা! রামপ্রসাদের গান, মহাশ্বেতাদেবীর গল্প অনুবাদ করেন। পরিবেশ নিয়ে সোচ্চার হন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক–ছাত্রদের পড়ানোর ফাঁকে গ্রামবাংলায় হতদরিদ্রদের লেখাপড়া শেখাতে ছুটে আসেন। আগ্রহের পরিধি দেখে মনে হয়, দশভুজা। ৭৬ বছর বয়সে এত কিছু সামলান কী করে? হেসে ফেললেন। ‘আপনাকে কে বলল সামলাই? আমি একটা সম্পূর্ণ বেসামাল লোক। যদি দশটা হাত থাকত, খুব ভাল হত।’ খেই ধরাই, কাজগুলো যে আপনি করেন সবাই জানে। আক্ষেপ করেন, ‘ভাল করে কী করতে পারি! টিম তৈরি করার চেষ্টা করি। আমার মূল্যায়ন ভাবনাটা কলম্বিয়াতে যা, বীরভূম–ঝাড়খণ্ড সীমান্তেও তাই। শুধু আয় হবে, এই লক্ষ্য যাদের, তাদের দিয়ে আমার শিক্ষা–ভাবনা রূপায়িত হবে না। তবে কলম্বিয়ায় পড়ানোর ফাঁকে ওখানে যাই না। কলম্বিয়া এবং বাংলার প্রত্যন্ত, দু–জায়গার কাজ আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। কলম্বিয়া ছাড়ার আগে ছাত্রদের বলি, Donate your convenience। নিজের সুবিধেটা দান করো। আর্থিক সাহায্য চাইছি না। শুধু একটু কষ্ট করে রবিবার দুপুরে লাঞ্চের পর টানা ছ’ঘণ্টা সময় দাও আমাকে। বাংলার মানুষগুলোকে পড়াই বলে তোমাদের পড়ানোর কাজে ফাঁকি দিতে চাই না। কাজেই কোথা থেকে কী হয় বলা মুশকিল।’
অভিজ্ঞতার ভারী ঝুলিটার দিকে তাকিয়ে জানতে ইচ্ছে করে, আত্মজীবনী লিখবেন না?
‘চুক্তি হয়ে আছে।’ গায়ত্রী আশ্বস্ত করেন। ‘তবে আত্মজীবনী নয়। বিশেষ কয়েকজনকে নিয়ে লিখব। মা, ঠাকুরমা, বন্ধু লরা...। মেমোয়ারের স্টাইলে দশটা লেখা হয়ে গেলে ছাপিয়ে দেব। আর হ্যাঁ, গ্রামশিকে অসম্ভব ভালবাসি। টানা এগারো বছর মুসোলিনির জেলে কাটিয়ে স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। রক্তবমি করতে করতে শরীরটা কুঁকড়ে যাচ্ছে, মাথাব্যথার চোটে দেওয়ালে মাথা ঠুকছেন... ওঃ, কী অমানুষিক যন্ত্রণা ভোগ করেছেন ভদ্রলোক! তা–ও চিন্তা, তা–ও লেখা, যা আমাদের আজও শেখাচ্ছে। জেল থেকে স্ত্রী ও শ্যালিকাকে লেখা ওঁর চিঠিগুলো নিয়ে এখন কাজ করছি।’ ■
 

জনপ্রিয়

Back To Top