‘‌আরোগ্য নিকেতন’‌ থেকে ‘‌শুকসারী–‌কথা’— তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভিন্ন লেখায় ঘুরেফিরে এসেছেন চিকিৎসকেরা— আশু ডাক্তার, ধ্রুব ডাক্তার, প্রদ্যোত সেন, কবিরাজ জীবনমশাই। এই চিকিৎসকেরা কল্পনা‌সৃষ্ট নয়, তাঁদের অনেকের সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর সৌহার্দ্য। তেমনই এক চিকিৎসক ডাঃ সুকুমার চন্দ। নবতিপর এই চিকিৎসক আজও রোগী দেখে চলেছেন। লাভপুরে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলে এলেন, ছবিও তুললেন সুদীপ মাইতি।

‌১৯৫৫ সালে আর জি কর থেকে স্ত্রীরোগ–‌বিশেষজ্ঞ হিসাবে ডাক্তারি পাশ। তারপর যেমন হয়, বছরদুয়েক সরকারি–‌বেসরকারি বেশ কয়েকটি জায়গায় চাকরি। কোথাও এক মাস, কোথাও মাসদুয়েক। আসলে ঠিকঠাক পোষাচ্ছিল না।  শেষমেশ, ১৯৫৭ সালে রেলের একটি চাকরি পেয়ে ওডিশার গোপালপুরে যাওয়া মনস্থির করলেন ডাক্তারবাবু। যাওয়ার আগে বাক্সপেঁটরা গুছিয়ে  প্রণাম করতে গেলেন কলকাতায় থাকা গ্রামের এক শুভানুধ্যায়ী কাকুর বাড়িতে। যিনি তাঁকে অপত্য স্নেহে চিরদিনই ভালবেসে এসেছেন। কাকু সব শুনে বললেন, ‘‌বিশু, বাহিরে গিয়ে কী করবি? বাড়ি ফিরে যা। গ্রামের রোগী দেখ গে। তোরও ভাল হবে। গ্রামেরও ভাল হবে।’‌  কথাটা মনে ধরল। গোছানো বাক্সপেঁটরা নিয়ে কলকাতা থেকে উল্টোপথ ধরলেন ডাক্তার। ফিরলেন জন্মভিটেয়— বীরভূমের লাভপুরে। সেই শুরু হল রোগী দেখা। ক্রমশ ভালবেসে ফেললেন নিজের চারপাশকে। ২৮ বছর বয়সে শুরু করে প্রায় ৬০ বছর একই রুটিনে চলেছেন। এখন বয়স ৯১। তবু সকাল আটটা থেকে সন্ধে আটটা— খাওয়া ও সামান্য বিশ্রামের সময়টুকু বাদ দিলে সমানে রোগী দেখে যাচ্ছেন। ২ টাকা ফি দিয়ে শুরু করেন, এখন ১১০। গরিবগুর্বোরা অত টাকা কোথায় পাবে!‌ তারা যা দেয়, তাই তখন ফিজ। প্রতিদিন দিনের প্রথম রোগী থেকে যে ফিজটুকু পান, তা আলাদা করে রেখে দেন। এইভাবে প্রতিমাসে জমানো টাকা পরের মাসের প্রথম দিনেই তুলে দেন তাঁর সেই প্রিয় কাকুর স্মৃতিরক্ষা তহবিলে।
এতক্ষণ শুধু কাকু বলে যাঁর কথা উল্লেখ করা হয়েছে  তিনি অমর কথা–‌সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সেই কাকুর ‌‘‌শুকসারী–‌কথা’‌ উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র হয়ে থেকে গিয়েছেন যে আশু ডাক্তার, তাঁর পোশাকি নাম ডাঃ সুকুমার চন্দ। এলাকায় তিনি ‘‌‌বিশু ডাক্তার’‌ নামেই পরিচিত। অনেকেই মনে করেন, এই উপন্যাসে চন্দনপুর নামের আড়ালে লেখক তাঁর নিজের গ্রাম লাভপুরের ঘটনা ও প্রকৃতির বর্ণনা করেছেন। উপন্যাসে ফটিকদাসের জবানিতে আশু ডাক্তারের ডাক্তারখানার অবস্থান এবং গ্রামের পরিস্থিতিও জানা যায়— ‘‌ইদিকে আশু ডাক্তারের ডাক্তারখানা— উদিকে থানা। ডাক্তার বেঁধেছেঁদে দিচ্ছে— আর উদিকে থানায় নালিশ হচ্ছে।’
‘‌আশু’‌ নামের আড়ালে–‌থাকা ‘‌বিশু ডাক্তার’‌ মানে সুকুমার চন্দ এই ৯১ বছর বয়সেও অক্লান্ত। কাকুর উপদেশ এখনও ভোলেননি। গ্রামের গরিবমানুষগুলোকে দেখতে হবে। শুধু রোগী দেখাই নয়, পাশাপাশি এলাকার প্রায় সব সামাজিক অনুষ্ঠানেও তিনি শরিক। ডাক্তার হিসাবে কোনও অহমিকা নেই, থাকেন অতি সাধারণের মতো, আড়ম্বরহীন।
সেই ‘‌আশু ডাক্তার’‌ মানে বিশু ডাক্তারকে লাভপুরের চেম্বারেই পেয়ে গেলাম। নবতিপর চিকিৎসকের মনে এখনও তাজা তাঁর প্রিয় কাকুর স্মৃতি। বললেন, ‘‌এ গ্রামের বহু মানুষই তারাশঙ্করবাবুর গল্প–‌উপন্যাসের চরিত্র। তার মধ্যে ঢুকে পড়েছি আমিও। আমি তখন আর জি কর মেডিকেল কলেজের ছাত্র। কলেজের হোস্টেলের পাঁচিলের একটা ভাঙা অংশ দিয়ে বেরিয়ে কাকুর বাড়িতে প্রায়ই যেতাম। তিনি তখন ‘আরোগ্য নিকেতন’‌ লিখছেন। সেই সময় তিনি আমার ও তাঁর ছোটজামাই বিশ্বনাথ রায়ের কাছ থেকে উপন্যাসের প্রয়োজনে বিভিন্ন ডাক্তারি পরিভাষা বুঝে নিতেন। তারপর আমার অজান্তেই তিনি আমার আদলে গড়ে তোলেন এক ডাক্তার–‌চরিত্র। ‘‌শুকসারী–‌কথা’‌ উপন্যাসে আমার ছবিও ছিল। কাহিনীতে আমার চেম্বারের সামনের রাস্তার বর্ণনা রয়েছে। রয়েছে সেই রাস্তায় গ্রাম্যবিবাদ, মারামারির চিত্রও। তিনি  আশেপাশের প্রায় সবাইকেই কোনও না কোনও চরিত্র হিসাবে তাঁর লেখায় শরিক করে নিয়েছেন। এতজনকে চরিত্র বানাতে গিয়ে তিনি বাড়ি এসে ‘‌বিপদেও’‌ পড়তেন। কলকাতা থেকে আসতেন পূর্ণ হয়ে, ফিরতেন নিঃস্ব হয়ে। তারাশঙ্কর কলকাতা থেকে লাভপুরে এলেই  গ্রামীণ ভাষায়  নিচুজাতের মানুষেরা, যাঁরা তাঁর গল্প–‌উপন্যাসের চরিত্র, তাঁকে ঘিরে ধরত। তিনি যে কদিন থাকতেন, এঁদের ভিড় লেগেই থাকত। পরের দিকে শুধু এঁরা নন এঁদের উত্তরসূরিরাও ভিড় জমাতেন। তাঁদের দাবি যেন এমনই— বাপু তুমি আমাদের চিত্রায়িত করেই বিখ্যাত হয়েছ। তাই তার দক্ষিণা তো আমাদের প্রাপ্যই। এ নিয়ে তারাশঙ্করবাবু বিন্দুমাত্র বিচলিত হতেনই না বরং প্রশ্রয় দিতেন। তাই কলকাতা থেকে যা কিছু নিয়ে আসতেন, তাঁদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন অকাতরে। বহুবার তিনি কলকাতা ফেরার দিন আমার চেম্বারের সামনে এসে চিৎকার করে বলতেন, ‘‌ওরে বিশু, পঞ্চাশ–‌একশো যা হোক দে। কলকাতা ফেরার টাকা নেই।’‌ রাস্তার লোকে কে শুনল, কে শুনল না, তা তিনি তাঁর মাথাব্যথা ছিল না। এসব তিনি তাঁর খ্যাতির মধ্যগগনেও করেছেন।
‘‌গরিবগুর্বোদের আবদার–‌অত্যাচার অত্যাচার নাকি শুরু হত, তিনি কলকাতা থেকে লাভপুর স্টেশনে নামার সঙ্গে সঙ্গেই।’‌ জানালেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো, বিশিষ্ট চলচিত্র পরিচালক পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। বললেন,  ‘‌একটা–‌দুটো বাক্স বয়ে আনতে হাজির হত তিন–‌চারজন। যেখানে দরকার একজনের, তা করত তিনজনে মিলে। একবার জেঠুকে বলেছিলাম, ‘‌দেখো, তোমাকে ঠকিয়ে ওরা বেশি টাকা নিয়ে যায়।’‌ শুনে জেঠু মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘‌বরং উল্টোটাই ঠিক। কারণ এদের বেচেই তো আমি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।’‌ তারপর থেকে এ বিষয়ে কেউ কোনওদিন কথা বাড়াননি।
চেম্বারে আলাপচারিতার মাঝেই ডাক্তারবাবুর সহকারী দরজায় উঁকি দিয়ে জানালেন, দূর থেকে রোগী এসেছেন। ডাক্তারবাবু ইশারায় বললেন, একটু বসতে বলুন। আমায় বললেন, দেখেছেন তো। সেই সকাল আটটায় শুরু করি, থামি রাত আটটায়। বোলপুর, রামপুরহাট, কাটোয়া, কান্দি, সালার— কোথা কোথা থেকে রোগী আসে। ভীড় লেগেই আছে। এখন বেলা সাড়ে তিনটে। সকালবেলা দূর থেকে আসা রোগীদের দেখি। বিকালে স্থানীয়দের।  তারপরেই বললেন, ‘‌আসবে নাই বা কেন! এক–‌একজন রোগীকে  দশ–‌বারো মিনিট ধরে কোন ডাক্তার দেখবে!‌ আমি আজও বিশ্বাস করি  দু মিনিটে একটা রোগীকে দেখে দেওয়া সম্ভব নয়। রোগীর রক্তচাপ নিজের হাতে না মাপলে তৃপ্তি হয় না। যে রোগী দেখে মনে হয়, এর রোগ সারানো আমার কম্মো নয়, তাকে বিন্দুমাত্র ধরে রাখার চেষ্টা করি না।
এত রোগী দেখে মনে হতে পারে, বিশু ডাক্তারের বুঝি বিপুল আয়। বললেন, চার–‌পাঁচদিন চেম্বার না করলে খেতেই পাব না। অনেক কষ্টে গাড়ি কিনেছি, কারণ নিজেই অসুস্থ। মাঝে–‌মধ্যেই কলকাতায় ছুটতে হয় নিজের চিকিৎসার জন্য। আর এখানে এমন সমস্ত রোগী আসে, যারা ফিজ দেবে কি, ওষুধ কেনারও সামর্থ্য নেই। ওদের স্যাম্পেল ওষুধ দিলে খেয়ে বাঁচে। ওদের দিয়ে যে ওষুধ বাঁচে ভারত সেবাশ্রম ও দু–‌একটা আশ্রমে পাঠিয়ে দিই। ফিজ চাইলেড় বাড়ানো যায়। কিন্তু আমার মা বলতেন, ‘‌বিশু ফিজ বেশি বাড়াবি না। ভগবান ঠিক চালিয়ে দেবে।’‌ তাই আজও  ফিজ বাড়ানোর সময় মাকে মনে পড়ে যায়। ভাবি, মা বুঝি রাগ করবেন।  প্রতিদিন প্রথম রোগীর দেওয়া ফিজের টাকা যেমন তারাশঙ্করের ধাত্রীদেবতা তহবিলে দিয়ে আসি, তেমনই কিছুটা পাঠাই স্থানীয় সংস্কৃতি ভবনে, স্থানীয় ফুল্লরা মন্দিরে। যেটি ৫১ পীঠের অন্যতম। এরপর যা থাকে তাতে চলে যায়। বাড়িতে আমরা দুটি প্রাণী, কিন্তু পাত পড়ে সাত–‌আট জনের। সব মিলিয়ে দিব্যি চলে যায়। আমি বেশ খুশি।’‌
কথা বলছিলাম স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষক–‌নাট্যকর্মী উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।  তিনি তো ডাক্তারবাবু সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত। বললেন উনি ধন্বন্তরি। রোগী ওঁর কাছে দেবতা। কোথা থেকে এসেছেন, কোন শ্রেণীর, ধনী না গরিব— কিছুই ওঁর কাছে বিচার্য নয়। তাঁর এক বন্ধু নাট্যকর্মী দীর্ঘদিন পেটের  এক সমস্যায় ভুগছিলেন, এই ডাক্তারবাবুকে  একবার দেখানোর পরে দিব্যি আছেন। অথচ ডাক্তারবাবু নিজে স্ত্রীরোগ–‌বিশেষজ্ঞ। স্থানীয় লোকেরা তাঁকে দেবতা মানেন।  কীভাবে অন্য রোগের চিকিৎসা করেন?‌ বিশু ডাক্তার জানালেন, ‘‌ সবাই দু–‌বছরের ইন্টার্নশিপ করেন। আমার ক্ষেত্রে সেটা তিন বছর হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালের এমন কোনও বিভাগ ছিল না, যেখানে আমি কাজ করিনি। সেটাই আমার সারা জীবনের সম্বল হয়ে রয়েছে। আমি হয়ে উঠেছি ‘‌জ্যাক অফ অল ট্রেডস বাট মাস্টার অফ নান’‌–‌এর মতো।
জানতে চাইলাম, তারাশঙ্করবাবুর চিকিৎসা কি আপনি করেছেন?  মুচকি হেসে বললেন, ‘‌তিনি এখানে থাকলে প্রতিদিন নিয়ম করে, তাঁর বাড়ি সকাল–‌বিকাল যেতে হত। প্রেসার মেপে আসতে হত। তিনি খুবই স্বাস্থ্যসচেতন ছিলেন। সেই সঙ্গে অনেক গল্প হত। আর পাঁচজনের খবরাখবর নিতেন। আমাদের বাড়িতেও বহুবার এসেছেন। মায়ের সঙ্গে বসে গল্প করতেন। আর প্রায় প্রতিদিন আমার কাছে আসত ছোট ছোট চিরকুট। তাতে লেখা ‘‌বিশু, একে দেখে দিস। এর ইঞ্জেকশনটা দিয়ে দিস। আমি পরে তোকে তোর আর তোর কম্পাউন্ডারের ফিজ দিয়ে দেব।’‌ আমি ওঁর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতাম।
তবে বিল আর পাঠানো হত না। সেদিন বুঝিনি, সেই চিরকুটগুলোর কি মূল্য। তাই সেগুলি যত্ন করে রাখিনি। এ নিয়ে আমার আফসোসের অন্ত নেই।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় যে বিশু ডাক্তারকে কতটা ভালবাসতেন এবং কতটা নির্ভর করতেন, তা একটি চিঠি পড়লেই বোঝা যায়।  সেটা ১৯৬৯। তখন তারাশঙ্করের মা বহুদিন শয্যাশায়ী। একবার কলকাতা ফিরে যাওয়ার সময় স্টেশনে দাঁড়িয়ে একটি চিঠি লিখে দিয়ে যান তাঁর আদরের  বিশুকে।
প্রিয় বিশু
কাল রাত্রে লোকজনের সামনে যা বলবার ছিল, তা বলতে পারি নি। যাবার মুহূর্তে স্টেশনে মনে হ’‌ল লিখে দিয়ে যাওয়াই ভাল। মা’‌র হঠাৎ কিছু ঘটলে ১০০/১৫০ যা লাগে তুমি দিয়ো। বাবাকে উদ্ধারণপুরের ঘাটে দাহ করা হয়েছিল—। মার ইচ্ছে সেই চিতাতে দাহ হবার। আমি এসে তোমাকে দেব।
আর একটি কথা— চাষের সময় ৫ বিশ ধান প্রয়োজন হবে এখানে। তুমি যদি দাও তো ভাল হয়। পরে নেবে— এ কথা বলাই বাহুল্য।
                                       শুভার্থী
                                         ইতি
                            তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
১৭।০৬।৬৯
চিঠিটা পড়লেই বোঝা যায় এঁদের সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল। এরকম বহু চিঠি আজ হারিয়ে গেলেও দু–‌একটি রয়ে গিয়েছে ডাক্তারবাবুর কাছে। আর শ্মশানটি ছিল কাটোয়ায়। ভাগীরথীর ধারে।
আবার একটি দু লাইনের চিঠিতে এক রোগীর জন্য তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন,
বিশু,
তোমার কম্পউন্ডারের ফি আমি দেব।
এর স্বামীর Injection  দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে।
তারাশঙ্কর
১৮।০৫।৬৩
bisu doctor
 
কথাপ্রসঙ্গে  ডাক্তারবাবু জানালেন, তারাশঙ্করবাবু  একবার তাঁর নাম  পাল্টে দিয়েছিলেন। সেবার পুজোর সময় এসেছেন। আমিও নিয়মমতো তাঁর বাড়ি গিয়েছি। আমাকে দেখে বললেন, ‘‌এসো আশু, এসো।’‌ দুঃখ হল। কারণ, এতদিনের নামটা তিনি ভুলে গেলেন ? আদরের বিশুকে ‘‌আশু’‌ বানিয়ে দিলেন! অভিমান হলেও  মুখে কিছু বলতে পারলাম না। তিনিও কিছু বললেন না। তবে চমক তখনও বাকি ছিল। উনি ফিরে গেলেন কলকাতায়। তারপরেই আমার হাতে এলো তাঁর লেখা  ‘‌শুকসারী–‌কথা’‌। আশ্চর্যের কথা এই যে, সেটা পড়েই বুঝলাম সেখানের আশু ডাক্তার আমিই! আর তখন খুব লজ্জা পেয়েছিলাম। এমনই বুঁদ হয়ে থাকতেন তারাশঙ্করবাবু তাঁর গল্পের চরিত্রের মধ্যে।’‌
তারাশঙ্করবাবু আর আমার বাবা শরৎ চন্দ একেবারে ছেলেবেলার বন্ধু। উনি আমাদের বাড়িতে প্রায়ই আসতেন। কলকাতা চলে গেলেও সেই সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। তাঁর ‘‌আরোগ্য নিকেতন’‌ উপন্যাসের মূল কাহিনী আমার বাবার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। সেটা বাবাকে চিঠি লিখে জানিয়েওছিলেন। সেই চিঠিতে তাঁর নতুন উপন্যাস লেখা শুরুর কথাও জানান। শুধু তাই নয়, বলেছিলেন, লাভপুর  স্কুলের পটভূমি নিয়ে একটি নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন। সেখানে ওই স্কুলের প্রধানশিক্ষক শশীবাবুর ছায়া নিয়ে তৈরি চন্দ্রভূষণ হচ্ছেন উপন্যাসের নায়ক। তাই  বাবার স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতা, স্কুলের খাতায় কী ধরনের রেজলিউশন নেওয়া হত, তা দ্রুত লিখে পাঠাতে বলেন। এভাবেই লাভপুরের বহু মানুষ তাঁর গল্প–‌উপন্যাসে ঢুকে পড়েছেন। চরিত্রগুলো মাটির কাছাকাছি ছিল বলেই এত জনপ্রিয় হয়েছে। আমি যখন ডাক্তারি পড়ি তখন বাবা দুরারোগ্য কর্কট রোগে আক্রান্ত হন। কলকাতায় চিকিৎসা চলার সময় তারাশঙ্করবাবু সপ্তাহে তিন–‌চারদিন বাবাকে দেখতে আসতেন। এমনই ছিল বন্ধুত্ব। বাবার মৃত্যুর পর আমায় কোনও চিঠি না লিখে দাদা দেবুকে তাঁর দুঃখের কথা জানিয়েছিলেন। শরীর অসুস্থ থাকায় আসতে পারবেন না বলে জানিয়েছিলেন।
জিজ্ঞাসা করলাম এত বছর ধরে মানুষ দেখে আসছেন। কোনো পরিবর্তন দেখতে পান? বললেন, ‘‌অবশ্যই পাই। আগে মানুষের মন কম্পাউন্ড ছিল। এখন কমপ্লেক্স হয়ে গেছে। তবে আমার কোনও শত্রু নেই। আসলে যদি কেউ শত্রুতা করবে বলে আসেও কিছুদিন পরে সে মিত্র হয়ে যায়। আর একহাতে তো তালি বাজে না!‌’‌
প্রথম দিন থেকে এখানেই আপনার চেম্বার ছিল? উত্তরে জানালেন, ‘‌তা ছিল। একদম শুরুতে কিছুটা দূরে আমাদের গ্রামের বাড়িতে রোগী দেখা শুরু করি। কিছুদিন পরে এখানে উঠে আসি। তবে আমি বেশি রোগী দেখেছি সাইকেল করে। এই ব্লকের এমন কোনও গ্রাম নেই, পাড়া নেই যে, আমার সাইকেলের চাকার ছাপ পড়েনি। ব্লকের বাইরেও বহু দূরে চলে গেছি সাইকেল করে রোগী দেখতে। তখন তো যানবাহনের অবস্থা ভাল ছিল না। আর ওই অবস্থায় রোগীকে তার বাড়ির লোকেরা আনবেই বা কীভাবে!‌ তাই খবর পেলে আমাকে সাইকেলে যেতেই হত।’‌
তারাশঙ্করের সৃষ্ট চরিত্রের সান্নিধ্যে কিছুক্ষণ কাটিয়ে মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে ফিরলাম। এই আধুনিক সময়ে এই ‘‌আশু ডাক্তার’দের‌ যে আর দেখা মেলে না, অথচ এঁদেরই যে সমাজের বেশি দরকার । ■

জনপ্রিয়

Back To Top