কেউ বলে তরুণ প্রজন্ম মানেই মোবাইলে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা। তরুণ প্রজন্ম মানেই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টুইটারে মাতোয়ারা হয়ে থাকা। তরুণ প্রজন্ম মানেই চলতি পথে নিজের কেরিয়ার গোছাতে ইঁদুর দৌড়ে যোগ দেওয়া। তরুণ প্রজন্ম মানেই নেশা। তরুণ প্রজন্ম মানেই অগভীর উল্লাস। তরুণ প্রজন্ম মানেই গাড়ি, মোটরবাইক চালিয়ে বিশৃঙ্খল উন্মাদনা। একেবারেই ঠিক নয়। তরুণ প্রজন্ম লেখাপড়া, সংস্কৃতি, সাহিত্য, খেলাধুলো, রাজনীতিতে চিরকালই উজ্জ্বল। উজ্জ্বল আজও। এমনই গুণী তরুণ, তরুণীর কথা এবার এই পাতায়। কেউ সেতার–‌সরোদ বাজায়, কেউ হাতে তুলে নিয়েছে গিটার। এদের অনেকেই নিরলস পরিশ্রম, প্রতিভায় প্রতিষ্ঠিত। বাকিদের লড়াই চলছে। সেতার সরোদের তরুণ প্রতিভাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন মৌসুমি ঘোষ। গিটার শিল্পীদের কথা বললেন লোপামুদ্রা ভৌমিক‌।‌‌

 

শৌনক রায় শিশু সরোদ শিল্পী। বয়স নয় কী দশ। ছোটবেলা থেকেই পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কাছে সরোদের তালিম নিচ্ছে। বাবা-মা দুজনেই সরোদ বাজান। তাঁরাও শিখেছেন পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর কাছে। বাবা পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। আর মা সংসারের সব ভার নিয়ে, সন্তানের দেখাশোনা করেন। ছোট শৌনক বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছে সঙ্গীত প্রতিযোগিতায়। ‘ভিস্তার’ থেকে পেয়েছে সর্বভারতীয় সাফল্যের পুরস্কার।   
কলকাতারই ছেলে স্বর্ণেন্দু। জিওলজিতে বিএসসি অনার্স পড়ছে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে। ডাক্তারি না ইঞ্জিনিয়ারিং কোন স্ট্রিমে পড়লে ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত হবে, এ নিয়ে যখন ঘরময় তোলপাড়, স্বর্ণেন্দুর মা তখন ওকে ভর্তি করে দিলেন সরোদের ক্লাসে। গান শেখানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় মায়ের এই সিদ্ধান্ত। দশ বছর বয়সে স্বর্ণেন্দুর হাতেখড়ি গুরু প্রণব নাহার কাছে। তারপর পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কাছে তালিম। এখন স্বর্ণেন্দুর গুরু আবির হোসেন। পরম স্নেহে গুরু আবির হোসেনের কাছে অহরহ তালিম পায় সে। সেই ছোটবেলা থেকেই যন্ত্র নিয়ে বসার জন্য কোনও দিন তিরস্কার করতে হয়নি স্বর্ণেন্দুকে। বরং অঙ্ক, ফিজিক্সের মতো কঠিন পরীক্ষার আগের দিনেও রুদ্ধদ্বারে স্বর্ণেন্দু এক দু ঘণ্টা সরোদ নিয়ে বসে। মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকে দারুণ রেজাল্ট। স্বর্ণেন্দুর সঙ্গীতের দিকে ঝোঁক পারিবারিক সূত্রেই। মা-বাবা দুজনেই অধ্যাপক। স্বর্ণেন্দু এখন সঙ্গীত রিসার্চ আকাদেমির স্কলার। রেডিওতে যুববাণীর প্যানেল আর্টিস্ট। আর বাংলাদেশকে যদি বিদেশ বলি, তবে সেই বিদেশের মাটিতেও সরোদ বাজিয়ে এসেছে কয়েকবার। 
কলকাতার মেয়ে শ্রুতি ফিজিক্স নিয়ে এমএসসি পড়ছে। খুব ভাল সরোদ বাজায়। শ্রুতির সাত বছর বয়সে সরোদে হাতেখড়ি পণ্ডিত অনিল রায়চৌধুরির নাতি ইন্দ্রজিৎ রায়চৌধুরির কাছে। বাবা সুবীর দে একজন সেতার শিল্পী। তিনি সেতারের নাড়া বাঁধেন উস্তাদ আমজাদ আলি খাঁয়ের কাছে। পিতৃসূত্রে পাওয়া সেতারে না গিয়ে সরোদ শেখার পরামর্শ দেন উস্তাদ আমজাদ আলি খাঁ। তাঁর কথাকেই ধ্রুবতারা মেনেছে শ্রুতি ও ওর মা-বাবা। এখন শ্রুতির সঙ্গীত গুরু পণ্ডিত সমরেন্দ্রনাথ সিকদার। ফিজিক্সের মতো কঠিন বিষয়ের পাশাপাশি সরোদের চর্চা করতে একটুও সমস্যা হয়নি শ্রুতির। এই ইন্টারনেট আর মোবাইলের যুগেও আরও কত কিছুর চর্চা চালিয়ে যায় শ্রুতি। কবিতা লেখার শখও আছে। পরম্পরা প্রকাশনী থেকে ওর কবিতার বই বেরিয়েছে। এ বছর অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস–এ ফটোগ্রাফি প্রদর্শনীতে শ্রুতির ফটো প্রথম স্থান অধিকার করেছে। শ্রুতির সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় প্রাপ্ত শিরোপার সংখ্যাও কম নয়। 
ছোট্ট বন্ধন বেশ তবলা বাজায়। মাঝে মাঝে দিদির সঙ্গে সেতারে ঠেকাও দেয় চমৎকার। হলে কী হবে। সরোদের সুর যে টানে বন্ধনকে। তবলার সঙ্গে সরোদও শিখতে চায় বন্ধন আদক। এ কথা একদিন গুরুকে জানাল বন্ধন। গুরু পণ্ডিত সিদ্ধার্থ রায়চৌধুরিই সরোদের পাশাপাশি তবলার তালিম দিতে শুরু করলেন। অবশ্য তবলা আর সরোদ পাশাপাশি বেশ দুটোই চলছিল। কিন্তু উঁচু ক্লাসে উঠতেই দুটোই সামাল দেওয়া বেশ ঝক্কির। পাল্লাটা ভারী সরোদের দিকেই। বন্ধনের সঙ্গীতে হাতেখড়ি ন বছর বয়সে। এখনও পণ্ডিত সিদ্ধার্থ রায়চৌধুরিই তার গুরু। বন্ধন এখন স্কুলের ছাত্র। কমার্স নিয়ে টুয়েলভ ক্লাসে পড়ে। পড়ার ভীষণ চাপ। তাতে কী? সরোদ নিয়ে বসতে কোনওদিন ভুল হয় না। মায়ের গাওয়া গানই বন্ধনের সুরের জগতের অনুপ্রেরণা। ২০১৭ সালে সুতানুটি মিউজিক কম্পিটিশনে যন্ত্রসঙ্গীত প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে বন্ধন। রেডিওর যুববাণীতে সরোদ বাজায়। কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক থেকে জুনিয়র স্কলারশিপও পেয়ে চলেছে।   
সৌভাগ্যর অবশ্য কলকাতায় থাকার সৌভাগ্য এখনও হয়নি। সৌভাগ্যর মা কাঁধে করে সেতার বয়ে সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে চলেছেন কলকাতায় গুরুর কাছে। তাই মায়ের সঙ্গে ভিড় ট্রেনে সেতার নিয়ে উঠলেই সৌভাগ্য আর ওর মাকে শুনতে হয়— উঃ এত ভিড় ট্রেনে এরকম একটা গামবাট যন্ত্র নিয়ে কেউ ওঠে নাকি? এসব যন্ত্র নিয়ে তো বিকেলের ট্রেনে গেলেই পারেন! 
সৌভাগ্যর মা তখন কাঁচুমাচু মুখে বলেন, কী করা যায় ছেলের ক্লাস যে সকালে ১১টা থেকে। 
তা আপনার ছেলে স্কুলে যায় না? 
নিশ্চয়ই যায়! স্কুলের অনুমতি নিয়েই সেতারের ক্লাসে যায় ও।
কী জানি বাবা! কেমন স্কুল! আর কেমন সব বাবা–মা! স্কুল কামাই করে বাজনা শেখানো!
ট্রেনে-বাসে এরকম একরাশ বিরক্তির কথা প্রায়শই শুনতে হয় সৌভাগ্যর মাকে। 
সৌভাগ্যর এবার ক্লাস সেভেন। পাঁচ বছর বয়স থেকে কয়েক বছর সৌভাগ্য সেতার শিখেছে অসীম চৌধুরির কাছে। এখন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সুভাষগ্রাম থেকে সেতারের তালিম নিতে আসে কলকাতায় পণ্ডিত পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। 
সেতারের প্রতি সৌভাগ্যর ভালবাসা বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। বাবা সুমন কর্মকার একসময় সেতার বাজাতেন। বর্তমানে একজন সুদক্ষ সেতার কারিগর।
অনুষ্টুপ অবশ্য সৌভাগ্যর মতো ট্রেনে–বাসে যন্ত্র বয়ে আনার করুণ দিনগুলো পার করে এসেছে। একসময় দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ভাটপাড়া থেকে সেতার কাঁধে নিয়ে কলকাতা আসা ছিল নিত্যদিনের ছবি। নিরিবিলিতে সাধনা করার জন্য আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ আকাদেমি-র ছাত্রনিবাসে একটি ঘর পেয়েছে অনুষ্টুপ। এখান থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এমএ ক্লাসে পড়েন অনুষ্টুপ ভট্টাচার্য। সাত কী আট বছর বয়সে অনুষ্টুপ সেতার শিখতে শুরু করে রবি চক্রবর্তীর কাছে। এখন গুরু পণ্ডিত পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে তালিম নেন। 
অনুষ্টুপের সেতার শেখার অনুপ্রেরণা তাঁর মা। অনুষ্টুপের মা সেতার বাজান। ঘরোয়া অনুষ্ঠানে মা ও ছেলের যুগলবন্দি পরিবারে ফুরফুরে আমেজ এনে দেয়। গেলবার ডোভার লেন সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় যন্ত্রসঙ্গীতে প্রথম হয় অনুষ্টুপ। কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক থেকে পেয়েছে সিনিয়র স্কলারশিপ। খেলাধুলোতেও অনুষ্টুপের বেজায় ঝোঁক। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরেই হোক বা ছুটির দিন। বিকেলে মাঠে ব্যাডমিন্টন খেলা চাই-ই চাই।
সৃজনী ইতিহাস নিয়ে এমএ ক্লাসে পড়ছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে একটু বিশ্রাম। সন্ধের পর ক্লাসের পড়াগুলো একটু উল্টেপাল্টে দেখা। তারপর সেতার নিয়ে বসা। সৃজনীর বাড়ি দমদমে। ভোরবেলা সৃজনীর সেতারে ভৈরবীর সুরে ঘুম ভাঙে পাড়াপড়শির। সৃজনীর সেতারে হাতেখড়ি ছ-সাত বছর বয়সে বাবা চন্দন ব্যানার্জির কাছে। চন্দন ব্যানার্জি সেতারে তালিম নিয়েছেন পণ্ডিত দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। তারপর রবি সেনের পুত্র নীলাদ্রি সেনের কাছে। এখন গুরু পণ্ডিত পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে তালিম নেয় সৃজনী। 
এর মধ্যে সৃজনী পেয়েছে ‘সঙ্গীত পিয়াসি’ পুরস্কার। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত পরপর তিন বছরই ‘মুরারিমোহন স্মৃতি পুরস্কার’–এ প্রথম। এছাড়াও কেন্দ্রীয় জুনিয়র স্কলারশিপ–সহ বেশ কিছু পুরস্কারও পেয়েছে এর মধ্যে।
ফুলবাগানের ছেলে কল্যাণ মজুমদারের যখন সবে তিন বছর বয়স, সুর শুনেই বলে দিতে পারত তার নোটেশন। চার বছর বয়সে বাবা সেতারশিল্পী পণ্ডিত শুভজিৎ মজুমদারের কাছে সেতারে হাতেখড়ি কল্যাণের। ছ-বছর বয়স থেকেই অনুষ্ঠানে তার সেতারবাদন দর্শকের মন কেড়ে নেয়। এরপর ২০১৫  সালে অল ইন্ডিয়া রেডিওর যন্ত্রসঙ্গীত প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে পায় রাষ্ট্রপতি পুরস্কার। কল্যাণের পুরস্কারের ঝুলিটি একটু ভারীই বটে। পেয়েছে যন্ত্রসঙ্গীতে ন্যাশনাল স্কলারশিপ, রবি কোপিকর মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড, দ্য টেলিগ্রাফ অ্যাওয়ার্ড–এর মতো আরও অনেক নামীদামি পুরস্কার। শুধু ভারতেই নয়, বিদেশেও সম্মোহিত করেছে অসংখ্য দর্শককে। ছাত্র হিসেবেও কল্যাণ মেধাবী। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে অনার্স পাশ করে মাস্টার্স অফ কম্পিউটার সায়েন্স পড়ছেন  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।  
এবার গিটারের কথা
পশ্চিমি ঝঞ্ঝায় ওলটপালট পুবের চেনা হাওয়া। সব কিছুতেই বদলের ছোঁয়া। স্বাদ থেকে সুর। সর্বত্র ‘‌ওয়েস্টার্ন টাচ’‌। তবু ‘‌মেলাবেন তিনি মেলাবেন’‌। তাই পুব–পশ্চিম মিলেমিশে আজ এক অদ্ভুত ফিউশন। যার দাপট সবথেকে বেশি বোধহয় বাংলা গান ও সুরের জগতেই। যন্ত্রসঙ্গীতের দুনিয়ায় আজ হইহই অবস্থান পশ্চিমি যন্ত্রের। অ্যাকোর্ডিয়ান, ড্রাম, গিটার.‌.‌.‌। তবে গিটারের সঙ্গে আমাদের ঘর–গেরস্থালি অবশ্য বহু যুগের। সেক্ষেত্রে আমাদের অস্তিত্বে মিশেছিল হাওয়াইয়ান গিটার। সে যুগ এখন অতীত। দাপটে দাপাচ্ছে স্প্যানিশ। নেপথ্যে ব্যান্ড কালচার। এ ব্যাপারে অভিমানী প্রখ্যাত হাওয়াইয়ান গিটার শিল্পী কাজি অরিন্দম। মনে করেন, স্প্যানিশে পরিশ্রম কম। শেখার দীর্ঘসূত্রতা কম। নতুন প্রজন্ম তাই ঝুঁকছে স্প্যানিশের দিকেই। 
সুরকার জয় সরকারের মত অবশ্য ভিন্ন। মনে করেন, যত দিন যাচ্ছে গিটারের ধারার উন্নতি হচ্ছে তরতরিয়ে। বাড়ছে শেখার প্রবণতাও। এই প্রবণতার পেছনে সবথেকে বড় কারণ ব্যান্ডের জনপ্রিয়তা। 
প্রখ্যাত গিটার শিল্পী বুদ্ধ সেন। তাঁর মতে, একজন যন্ত্রশিল্পীর সার্থকতা তখনই যখন তিনি সমস্ত ধারার গানের সঙ্গে বাজানোর ক্ষমতা রাখবেন। কীর্তন থেকে রক— সবেতেই সাবলীল থাকবেন। গিটার ছড়িয়ে যাক। কিন্তু তা যেন অপাত্রে না যায়। 
একই মতে বিশ্বাসী প্রখ্যাত গিটার শিল্পী সমীর খাসনবিশ। সারা ভারতে ছড়িয়ে রয়েছেন তাঁর ছাত্রছাত্রী। মনে করেন, শিক্ষার বিকল্প কিছু নেই। ঠিকমতো শিখে সঠিক বাজানো গেলে হাওয়াইয়ান বা স্প্যানিশ সবেতেই মানুষের মন ভরানো সম্ভব। বাজনাটাই আসল। বাজনার ধরন নয়। সুরের সাগরে পাড়ি দেওয়ার মন, জ্ঞান আর ভালবাসা থাকলে বিশ্বজয় করা যায়। নতুন প্রজন্মের মধ্যে গিটার শেখার প্রবণতা বাড়ছে। এটা অবশ্যই আশার দিক। সুর বাঁচুক, বাঁচুক গিটার।
কিছু তরুণ গিটার বাজিয়ের কথা বলি। 
রাজদীপ বসু। ছোট থেকেই পপসঙ্গীত মনে ঝড় তুলত। মাইকেল জ্যাকসন, বনি অ্যাম, বিটলস শুনে কান গড়ে ওঠা। সেই ভালবাসা থেকেই গিটার হাতে তুলে নেওয়া। হয়ে ওঠা বেস গিটারিস্ট। শিক্ষা শুরু সন্দীপ বোসের হাত ধরে। সালটা ২০০৭। এরপর ২০১১–তে ‘‌দ্য মঙ্কবেরিস’‌ ব্যান্ডের সঙ্গে পথ চলা শুরু। ২০১৩ থেকে লোকগানের দল সহজিয়ার সঙ্গে বসবাস। লোকগানের সঙ্গে গিটারের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তোলার প্রয়াস। সালটা ২০১৬। সোমদীপ বুচা সেনগুপ্তর সঙ্গে যৌথভাবে গড়ে তোলা ‘‌দ্য আরবান মিউজিক’‌। একদিকে মাটির সুরে তারের ঝঙ্কার, অন্যদিকে রক, জ্যাজ বা ফিউশনের টানে তারে তুফান তোলা— এভাবেই গিটার হাতে দিনবদলের স্বপ্নে মশগুল এই নবীন গিটারিস্ট। 
প্রীতম দলুই। বাড়ির পরিবেশ থেকেই সুরের টানে বের হওয়া। হাতে তুলে নেওয়া গিটার। প্রাথমিক পাঠ নিতে নিতেই স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে গড়ে তোলা ওয়েস্টার্ন মিউজিকের ব্যান্ড ‘‌নিউক্লিয়াস’‌। সঙ্গে প্রীতমের গিটার। এরপর তরতরিয়ে এগিয়ে যাওয়া। গিটারিস্ট হিসেবে জায়গা করে নেওয়া ‘‌মঙ্কবেরিস’‌, ‘‌আরবান মঙ্কস’‌, ‘‌সহজিয়া’‌, ‘‌ক্যানভাস’‌, ‘‌দেশি থাম্ব’‌, ‘‌ইনফার্নো’‌, ‘‌ইউএমএল’–এর মতো ব্যান্ডগুলিতে। ভারতীয় ও পাশ্চাত্য ধারার মেলবন্ধনে এক আলাদা ফিউশন টিউন গড়ে তোলার প্রয়াসে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি গিটারে প্রচলিত ও নতুন গানের সুরকে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে প্রীতমের একটি পরিবেশন। 
দেবায়ন মণি। কাজি অরিন্দমের গিটারে আকৃষ্ট হয়েই এই পথে পা বাড়ান। ইচ্ছে ছিল স্প্যানিশ গিটার শেখার। কিন্তু ভালবাসা গড়ে ওঠে হাওয়াইয়ান গিটারের সঙ্গে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাজানোর পাশাপাশি ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল গিটার ফেস্টিভ্যালের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকেও এসেছে সেরার শিরোপা। স্প্যানিশ গিটারের রমরমার যুগে হাওয়াইয়ান দিয়ে মানুষের মন মাতানো খুব কম কথা নয়। সেই কষ্টকর চেষ্টাটাই করে চলেছে দেবায়ন। 
বিভাস চক্রবর্তী। কথাই ছিল না গিটার হাতে নেওয়ার। তার বদলে তালবাদ্যে মন জড়ানোর সম্ভাবনা ছিল প্রবল। ছোট থেকে তবলাই ছিল সর্বক্ষণের সঙ্গী। কিন্তু একটি হিন্দি সিনেমা সব কিছু ওলটপালট করে দিল। নায়কের হাতে গিটার দেখে আগ্রহ গড়ে ওঠা। বাড়ির পুরনো ভাঙা গিটারে হাতেখড়ি। পরে বাণীচক্রে পাঠ নেওয়া পরিমল দাশগুপ্তের কাছে। তারপর একে একে নেপাল সাউ, অমিত দত্তের শিষ্যত্ব নেওয়া। কিন্তু অর্থের অভাব। কীভাবে চলবে শেখা?‌ শেখার তাগিদে বাড়িতে লুকিয়ে একটি ব্যান্ডে গিটারিস্ট হিসেবে যোগ দেওয়া। গিটারের টানে টাকা জোগাড়ের জন্য কলেজে কলেজে ব্যান্ডের হয়ে গিটার বাজানো। এভাবেই লড়াই করতে করতে সুযোগ পাওয়া কুমার শানু, অভিজিৎ, মিতা চ্যাটার্জি, শম্পা কুণ্ডু, প্রতীক চৌধুরির মতো প্রথিতযশাদের সঙ্গে বাজানোর। এখন শিল্পী রূপঙ্কর বাগচীর দলের অন্যতম গিটার শিল্পী। রূপঙ্করের বিভিন্ন জনপ্রিয় গানে বিভাসের গিটার অন্যতম ভূমিকা নিয়েছে। 
‌আকাশ ব্যানার্জি। পারিবারিক সূত্রেই সুরের আবহাওয়ার মধ্যে বসবাস। দাদু ছিলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিল্পী। তাঁকে দেখেই সুরের টান আকাশের মনে। বাবা ছোটন ব্যানার্জি মুম্বইয়ের নামী শিল্পীদের সঙ্গে গিটারে সঙ্গত করেছেন। এই মুহূর্তে অন্যতম সেরা গিটার শিক্ষকও। একদম ছোট থেকেই আকাশের ঝোঁক যন্ত্রসঙ্গীতের দিকে। তবে আগ্রহের বিষয় ছিল কি বোর্ড। কি বোর্ড সঙ্গী করে প্রথম মঞ্চে ওঠা ক্লাস টু–তে। ক্রমে আগ্রহে বদল।

জনপ্রিয়

Back To Top