দেবাশিস পাঠক
এক বিদেশিনীর ডায়েরি
‘‌ও লক্ষ্মী! চেস্টনাটের ঘোড়াটা আমাকে পাইয়ে দাও, যাতে সে আমার আস্তাবলে বাধ্য হয়ে থাকে। আমাকে সৌভাগ্যের আনন্দে ভরিয়ে দাও।’‌
এ কথাগুলো যিনি লিখছেন, তিনি ভারতীয়ই নন। একজন ইংরেজ মহিলা। নাম ফ্যানি পার্কস। এ দেশে এসেছিলেন ১৮২২ সাল নাগাদ। ওয়েলস থেকে একেবারে কলকাতায়। এ দেশে কাটিয়েছেন প্রায় ২৪ বছর। লিখেছেন রোজনামচা। তা প্রকাশিত হয়েছে লন্ডন থেকে, ১৮৫০–এ। নাম ‘ওয়ান্ডারিংস অফ আ পিলগ্রিম ইন সার্চ অফ দ্য পিকচারেস্ক’। শুধু কলকাতায় নয়। স্বামী চাকরিতে বদলি হয়ে এলাহাবাদে গেছেন। সঙ্গে গেছেন ফ্যানিও। সেখানেও কাটিয়েছেন দীর্ঘ সময়। সেই এলাহাবাদে থাকার সময়ই রোজনামচাতে লিখেছিলেন ওপরের কথাগুলো।
এলাহাবাদে একটা লটারির আয়োজন। বিজয়ী পাবে একটা ঘোড়া। যে সে ঘোড়া নয়। খাস বিলেত থেকে আমদানি করা চেস্টনাট। সেই লটারির টিকিট কেটেছেন ফ্যানি। রীতিমতো লক্ষ্মীদেবীকে স্মরণ করে। ‘শ্রী ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মী’। সে কথা ভালমতোই জানেন। জানেন, দেবীর গায়ের রং হলুদ। জলপদ্মে তাঁর অধিষ্ঠান। হাতে থাকে তাঁর পদ্মফুল। হরিপ্রিয়া তিনি। এ সব কথাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লিখেছেন। সে লেখায় অবশ্য দেবীর আসন হল ‘ওয়াটার–লিলি’ আর লক্ষ্মীপতি হরির বানান হল ‘Huree’।
অহিন্দু, অভারতীয় এক মহিলার এমন কম্ম যদি আপনাকে বিস্মিত করে, তবে জানবেন, অবাক করা কাণ্ডকারখানার এখানেই শেষ নয়।
লক্ষ্মীর সঙ্গে ভারতীয় সমাজ জীবনের সম্পর্কের কথা পুরোদস্তুর ওয়াকিবহাল ফ্যান্সি। এদেশের আমজনতার লক্ষ্মী বিষয়ক ধ্যানধারণা তাঁর কাছে পরিষ্কার। লোকের হাতে পয়সা এলে তারা মনে করে, ঘরে লক্ষ্মী এসেছেন। আর দারিদ্র্য মানে লক্ষ্মীছাড়া দশা।
এহ বাহ্য! পুরাণে দেবীর আবির্ভাব নিয়ে যা বলা আছে, সে বিষয়ও ফ্যানির অজানা নয়। তিনি লিখছেন, ‘‌বিষ্ণু এই সৌন্দর্যের দেবীকে তুলে আনেন সাগর থেকে। সেই তখন, যখন শুভ অশুভ আত্মারা অমৃতের জন্য সমুদ্র মন্থন করছিলেন। ভেনাসের মতো সৌন্দর্যময়ী এই নারী সফেন সাগর থেকে উঠে চলে যান স্বর্গের পথে।’‌
ফ্যানির কলমে লক্ষ্মীর বর্ণনা শাস্ত্রে বর্ণিত ধ্যানমন্ত্রকেও হার মানায়:‌ ‘‌এই দেবী অমিত সৌন্দর্যের অধিকারী। সদ্যসমাগত যৌবন তাঁকে মোহময়ী করেছে। নানা অলংকারে সেজেছেন তিনি। সব রকমের শুভচিহ্ন তাঁর শরীরজুড়ে। তাঁর মাথায় শোভা পাচ্ছে মুকুট, হাতে ব্রেসলেট। কালো চুলের ঢেউয়ের বলয় তাঁর ভাসছে বাতাসে। গায়ের রং যেন গলানো সোনা, মুক্তোর গয়না তাঁর সর্বাঙ্গে। মুখে তাঁর অপরূপ বিভা।’‌
যে অধ্যায়ে এসব লিখছেন ফ্যানি, সেটার শিরোনামটাও সরাসরি লক্ষ্মী মাহাত্ম্য প্রচার করছে। ‘লছমি, দ্য গডেস অফ বিউটি’। অর্থাৎ, ‘সৌন্দর্যের দেবী লক্ষ্মী’।
লক্ষ্মী এলেন কোথা থেকে  
সাগর পেরিয়ে আসা বিদেশিনী তাঁর রোজনামচায় কেবল সমুদ্র–সম্ভূত লক্ষ্মীর কথাই লিখেছেন। কিন্তু পুরাণকথা থেকে পরানগাথা, বৈদিক সাহিত্য থেকে রামায়ণ–মহাভারতের পাতা ওল্টালে লক্ষ্মীর আরও অনেক আবির্ভাব তত্ত্বের হদিশ মেলে।  
যেমন, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ। সেখানে বলা হয়েছে, রাধা আর লক্ষ্মীর উৎস অভিন্ন। কৃষ্ণ। রাসমণ্ডলে কৃষ্ণের বাঁদিক থেকে আবির্ভূত হলেন এক নারী। ভগবানের হ্লাদিনী শক্তি। তাঁর লীলাসঙ্গিনী। আবির্ভাবের পর পরই কৃষ্ণের ইচ্ছেতে তিনি দু‌ভাগ হলেন। যে দুজন তার ফলে সৃষ্টি হল তাঁরা দুজনেই রূপে গুণে বসনে বচনে একইরকম। পরস্পরের ক্লোন আর কী। একজন রাধা, অন্যজন লক্ষ্মী। দুজনেই চাইলেন কৃষ্ণকে। স্রষ্টাকে চাইল সৃষ্টিরা। দুজনকেই তুষ্ট করলেন শ্রীকৃষ্ণ। দ্বিভুজ রূপে কৃষ্ণ আরাধিকা রাধিকাকে গ্রহণ করলেন। চতুর্ভুজ বিষ্ণু রূপে গ্রহণ করলেন শ্রীময়ী লক্ষ্মীদেবীকে। প্রেম আর সম্পদ, মন আর ধন, দুইই রয়ে গেল তাঁর। তাই–ই যদি হবে, তবে লক্ষ্মী সাগরসম্ভূতা, সিন্ধু–তনয়া হলেন কীভাবে?
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ সে প্রশ্নের উত্তরও অমীমাংসিত রাখেনি।
দুর্বাসা ছিলেন মহারাগী এক মুনি। কথায় কথায়, পান থেকে চুন খসলেই তাঁর অভিশাপ। একবার সে অভিশাপের হাত থেকে রেহাই পায়নি কেউ। দ্যুলোকে দেবতার দল থেকে শুরু করে মর্ত্যের মানুষজন। সকলকেই সেবার শ্রীভ্রষ্ট হতে হয়েছিল। আসলে, সেবার কামে উন্মত্ত দেবরাজ ইন্দ্র দুর্বাসার কথা মন দিয়ে শোনেননি। অপ্সরা রম্ভাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। কোনওরকমে মুনিকে প্রণাম করেন। মুনি তাঁকে পারিজাত ফুল দেন আশীর্বাদ হিসেবে। সেই সঙ্গে বলেন, ফুলটা প্রথমে শ্রীহরির পায়ে দিতে হবে, তারপর নিজের মাথায় ঠেকাতে হবে। না হলে স্বর্গ–মর্ত্য সব শ্রীভ্রষ্ট হবে। ইন্দ্র তখন নিজের মধ্যে ছিলেন না। অত কথা কানে নেননি। পারিজাত ফুল রাখলেন ঐরাবতের মাথায়। ব্যস! যা হওয়ার তাই হল। শ্রী অর্থাৎ লক্ষ্মীদেবী স্বর্গত্যাগ করলেন। চলে গেলেন বৈকুণ্ঠে। ঐরাবতও ইন্দ্রকে ছেড়ে চলে গেল। অবস্থা বেগতিক বুঝে রম্ভাও ইন্দ্রকে ত্যাগ করলেন। এবার ইন্দ্রের চমক ভাঙল। শ্রীহীন অমরাবতী দেখে তাঁর মনটা হু হু করে উঠল। তখন তিনি  ছুটলেন ব্রহ্মার কাছে। সেখানে গিয়ে দেখেন, পিতামহ ব্রহ্মাও তাঁর ওপর বেজায় খাপ্পা।
ইন্দ্র কেঁদেকেটে ক্ষমা প্রার্থনা করলে, ব্রহ্মা একটু নরম হলেন। বললেন, যাও বিষ্ণুর কাছে। উনিই এ যাত্রায় তোমাকে বাঁচাতে পারেন।
ইন্দ্র আর কী করেন? বিষ্ণুর করুণা পেতে শুরু করলেন কঠোর তপস্যা। বিষ্ণু সন্তুষ্ট হয়ে লক্ষ্মীকে বললেন, সিন্ধুর কন্যা হয়ে জন্ম নিতে। সেই কথা মেনে লক্ষ্মী সাগরে গিয়ে সমুদ্র–কন্যা রূপে জন্ম নিলেন। সমুদ্রমন্থনের সময় কামধেনু থেকে ঐরাবত, রম্ভা থেকে মেনকা, সবাইকে ফিরে পেলেন ইন্দ্র, সমুদ্রগর্ভ থেকে। উঠে এলেন লক্ষ্মীও। তিনি পুনরায় বিষ্ণুর বক্ষলগ্না হলেন। শ্রী ফিরে পেল স্বর্গ। মর্ত্যও।  
অর্থাৎ ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রী আর লক্ষ্মী অভিন্ন। এই জায়গাটাতেই রামায়ণ–মহাভারত অন্য কথা বলছে। শ্রী নাকি লক্ষ্মী নন। আলাদা দেবী। তিনি সাদা কাপড় পরে সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলেন। তাঁকে পাওয়া নিয়ে দেবতা আর অসুরদের মধ্যে যুদ্ধও হয়েছিল। এই শ্রী সুখ–সমৃদ্ধির দেবী। মহাভারত এক ধাপ এগিয়ে বলছে, এই শ্রী শ্রীকৃষ্ণর সহধর্মিণী রুক্মিণী, তিনিই প্রদ্যুম্নের মা।
সত্যি কথা বলতে কী, বৈদিক সাহিত্যে লক্ষ্মীকে সৌভাগ্য কিংবা ঋদ্ধিদায়িনী দেবী হিসেবে পাওয়া যায় না। ঋগ্বেদে শ্রীর উল্লেখ কম করে ৮১ বার আছে। কিন্তু সেখানে কোথাও শ্রী ধনদাত্রী সৌভাগ্যদায়িনী নন। তিনি স্রেফ সৌন্দর্যময়ী। লক্ষ্মী শব্দের উল্লেখও এই বেদে আছে। তবে এখানে ‘লক্ষ্মী’র মানে, পণ্ডিতরা বলেন, ‘অন্য রূপ’। ‘তাঁদের রচিত বাক্যটিতে অন্যরকম অর্থ নিহিত আছে’ বোঝাতে ঋকবেদে বলা হয়েছে, ‘ভদ্রৈষাং লক্ষ্মীর্নিহিতাদি বাচি’।
এসব পণ্ডিতি কচকচানি থেকে রিলিফ মিলবে শতপথ ব্রাহ্মণের একটি কাহিনিতে। সেখানে শ্রীর উদ্ভবের কথা বর্ণিত হয়েছে।
প্রজাপতি সৃষ্টির জন্য তপস্যা করছিলেন। তপস্যা করতে করতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তখন তাঁর মুখ থেকে জন্ম নিলেন শ্রী। শ্রীর জ্যোতির্ময় রূপ দেখে দেবতাদের মধ্যে লোভ হল। তাঁরা চাইলেন, শ্রীকে মেরে তাঁর সম্পদ নিজেরা নিয়ে নেবেন। বাদ সাধলেন প্রজাপতি। তিনি বললেন, পুরুষরা কখনও স্ত্রী হত্যা করে না। সুতরাং শ্রীকে না মেরে দেবতারা বরং তাঁর সম্পদগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিক। সেই মতো অগ্নি নিলেন অন্ন, সোম পেলেন রাজ্য, বরুণের ভাগে পড়ল সাম্রাজ্য, মিত্র পেলেন ক্ষত্র, ইন্দ্র বল, সরস্বতী পুষ্টি, ত্বষ্টা রূপ, ইত্যাদি। সব দেওয়া–থোওয়া হয়ে গেলে শ্রী প্রজাপতিকে বললেন, আমার তবে রইলটা কী? প্রজাপতি বললেন, চিন্তা কোরো না, যজ্ঞের সময় তুমি সব ফেরত পাবে। শ্রী আশ্বস্ত হলেন।
এই গল্পের একটা প্রতীকী তাৎপর্য আছে। একটু তলিয়ে দেখলেই তা বোঝা যায়।
মানুষের যা যা চাই, তা সব আছে শ্রী–র। আর সেগুলোই ভাগাভাগি করে নিয়েছেন দেবতারা নিজ নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী। খাবার তৈরিতে আগুন লাগে, তাই অগ্নি পেল অন্ন। সোম চাঁদ। তার রইল পৃথিবী রাজ্য। শুধু জ্যোৎস্না ছড়াবার জন্য নয়। সে পৃথিবীর উপগ্রহও বটে। সাম্রাজ্য রাজ্যের চেয়ে বড়। জলভাগ ভূভাগের চেয়ে বেশি। সেই হিসেবে সাম্রাজ্য পেলেন জলের দেবতা বরুণ। সরস্বতী মানে বিদ্যাবুদ্ধি, যা থাকা মানে প্রাণের পুষ্টি। ত্বষ্টা হলেন কারিগর, তাই তাঁর রূপের দরকার, ওই নিয়েই তো তাঁর কারবার। মিত্র আর ইন্দ্রের শাসন ক্ষমতা সামলাতে প্রয়োজন ক্ষাত্রতেজ আর শক্তি, ওঁরা সেটাই পেয়েছেন। পরিশেষে, আর একটি কথা। যজ্ঞের আহুতিতে সবার শ্রেষ্ঠ সামগ্রী দানের প্রথা আছে। তা ছাড়া যজ্ঞ করলে ঈপ্সিত বস্তু মিলবে এরকম বিশ্বাসও আছে। এই দুয়ের ইঙ্গিতপুর্ণ সমর্থন মেলে প্রজাপতির আশ্বাসে।
বাজসনীয় সংহিতা আর তৈত্তিরীয় সংহিতা মোতাবেক, শ্রী আর লক্ষ্মী আদিত্যের দুই পত্নী।
এর দীর্ঘকাল পর, শ্রী সূক্তের সময় লক্ষ্মী আর শ্রী মিলে গেল। একে অপরের গুণাবলি গ্রহণ করে এক হয়ে গেলেন।
কিন্তু বাংলা ও বাঙালি লক্ষ্মীকে যেভাবে চিনেছে, মেনেছে, পুজো করেছে ও করছে, তার সঙ্গে এসব বেদ–পুরাণ–মহাকাব্যের যোগ সামান্যই। আমাদের লক্ষ্মী হলেন ঘরের মেয়ে। তিনি যতটা না ধনলক্ষ্মী, তার চেয়ে ঢের বেশি ধান্যলক্ষ্মী। তাঁর কথা তাই আমাদের পরান–কথা বৃহস্পতিবারের পাঁচালিতে।
সেখানে দেবী ধরাধামে নেমে আসেন ভাঙা সংসারকে জোড়া দেওয়ার জন্য। ফিরিয়ে আনেন বাড়বাড়ন্ত সংসার থেকে হারিয়ে যাওয়া শান্তি–সুখ–সমৃদ্ধি। নির্দেশ দেন, ‘‌যাও তুমি ঘরে গিয়া কর লক্ষ্মী ব্রত/ সুখ শান্তি ফিরে পাবে পুনঃ পূর্ব মতো/ গুরুবারে সন্ধ্যাবেলা মিলি বামাগণে/ লক্ষ্মী পুজো কর সবে ভক্তিচিত মনে।’‌
এতে সন্তুষ্ট না হয়ে যাঁরা বঙ্গলক্ষ্মীর সঙ্গে বেদ–পুরাণের যোগ খুঁজতে ব্যাকুল হবেন, তাঁদের জন্য একটি বিশেষ তথ্য। লক্ষ্মীদেবীর ছেলেপিলেদের সুলুকসন্ধান।
বেদ–পুরাণ ঘাঁটলে শ্রী–লক্ষ্মীর দুই ছেলের সন্ধান মেলে। চিক্লীত ও কর্দম। ‘চিক্লীত’ মানে ‘আর্দ্রতা’ আর ‘কর্দম’ হল ‘কাদা’। দুটোই কৃষি সভ্যতার বিকাশের জন্য দরকার। তার ওপর খেতের ধানের শত্রু ইঁদুর। অন্ধকারে ইঁদুর মারে প্যাঁচা। সে লক্ষ্মীদেবীর বাহন। লক্ষ্মীর সঙ্গে তার যোগাযোগ এতটাই ঘনিষ্ঠ যে দেবীর পুজো আমরা দিনের বেলায় করি না। রাতপাখির জন্যই দেবী আমাদের কাছে সান্ধ্যকালে বন্দিতা। এর পর নিশ্চয় বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না যে লক্ষ্মী আর কৃষি এ বঙ্গে একাকার। তাই তিনি এখানে পট–মূর্তির পাশাপাশি ধানেও পূজিতা।
এই যে ব্রতকথা, তার সুতো ধরে লক্ষ্মীর উৎস সন্ধান, এটার একটা আলাদা তাৎপর্য আছে। এবং সেই তাৎপর্য কোনও এক অজানা কারণে এ বঙ্গের গবেষণার ধারায় উপেক্ষিত। চারিদিকে যখন হিন্দি বলয়ের হিন্দুত্ব দিয়ে আমাদের মনন ও আচরণ ঘিরে ফেলার চেষ্টা চলছে, তখন এই গবেষণা সূত্রটি বিশেষভাবে সাধারণ হওয়ার দাবি রাখে।
পণ্ডিতরা বলেন, মুখ্যত নারী দেবতাকে কেন্দ্র করে তাবৎ ব্রতকথা ও পাঁচালির সূত্রপাত এই ভারতে। পুরুষ দেবতারা আগেভাগেই সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাওয়ায় তাঁদের  মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য আর পাঁচালির দরকার পড়েনি। এই পাঁচালিগুলোর একটা চেনা ছক আছে। কার পুজো, কেন পুজো, কীভাবে করতে হবে সেই পুজো, না করলে কী, কী বিপত্তি দেখা দেবে, ইত্যাদি নিয়ে গঠিত চেনা বিন্যাসেই এগুলো রচিত। মঙ্গলকাব্য থেকে লক্ষ্মীর পাঁচালি, সর্বত্র এই পরিচিত বুনোট। এই পাঁচালিগুলোর কাহিনির বীজ লুকিয়ে থাকে লোকসমাজের প্রয়োজনগুলোর ওপর।
এবার চোখ ফেরানো যাক বাংলার ইতিহাসে। ভারতবর্ষে অস্ট্রিক জাতির প্রধান আশ্রয়ভূমি ছিল বঙ্গদেশ। আর্যরা যতদিন না এখানে পা রেখেছে, ততদিন অস্ট্রিক সভ্যতা বাংলার সভ্যতাকে পোষ্টাই দিয়েছে। এই অস্ট্রিক জনগোষ্ঠী ভারতের কৃষি সভ্যতার বিকাশে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছিল। এরা আর্যদের মতো মানুষের মূর্তিতে দেবপুজোয় বিশ্বাস করত না। সেজন্য তারা প্রাকৃতিক বস্তুকে পুজো করত। ধান বা ধানের ছরা বা ধানের শিষ পুজো সেরকমই একটা বিষয়। বাংলার মাটি ও জলবায়ু কৃষির উপযোগী। সেজন্য বঙ্গনারী ঐহিক প্রাপ্তির আশায় লক্ষ্মীপুজো করে। কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে বাঙালির পরিবারের সুখশান্তি নির্ভর করে। তাই বৃহস্পতিবার তার কাছে হয়ে ওঠে লক্ষ্মীবার। মূলত, অব্রাহ্মণ্য প্রণোদনায় গার্হস্থ্য সুখের জন্য মেয়েদের এই ব্রত। তাই এ পুজোয় সধবা নারী স্নান সেরে ধূপ–ধুনো–প্রদীপ জ্বালিয়ে, পান-সুপারি-সিঁদুর গোলা- আতপ চাল- ফল-মিষ্টি দিয়ে শুদ্ধাচারে পূজা করলেই দেবী সন্তুষ্ট। ওই যে দেখছেন পান-সুপারি-সিঁদুর গোলা- আতপ চাল, এ ধরনের সাদামাঠা উপচার, এসবই,  সমাজতত্ত্ববিদ ও নৃতত্ত্ববিদরা বলেন, অস্ট্রিক সভ্যতার চিহ্ন।
এ জন্যই বাংলার লক্ষ্মী বাদবাকি ভারতের লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে খাপ খান না। তিনি স্বতন্ত্র।
প্যাঁচা এল কোথা থেকে  
ইতিহাসের পাতায় মুদ্রা আর মূর্তি খুঁজতে বসলে গোড়ায় লক্ষ্মীদেবীর পেচক বাহন কিন্তু মিলবে না।
খ্রিস্টপূর্ব ১৫০ থেকে ১০০ অব্দ। কুনিন্দরাজ ছিলেন অমোঘভূতি। হিমালয়ের বুকেছিল তাঁর রাজ্য। সে সময়ের যে মুদ্রা পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্মীদেবী বসে আছেন। সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা হরিণ। লক্ষ্মী চঞ্চলা। হরিণও বড়ই ছটফটে। সে কথা মাথায় রাখলে হরিণকেই ওঁর উপযুক্ত বাহন বলে মনে হয়।
৪১৪ থেকে ৪৫৫ খিস্টাব্দ। রাজ করছেন গুপ্ত বংশীয় সম্রাট কুমারগুপ্ত। তাঁর আমলের যেসব মুদ্রা পাওয়া গেছে, তাতে আবার লক্ষ্মীদেবী একটা ময়ূরকে খাওয়াচ্ছেন। হতেই পারে। সৌন্দর্যের বিচারে দুজনেই অপরূপ সুন্দর। অন্য দুই গুপ্ত রাজা, প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মুদ্রায়, এমনকী কুমারগুপ্তের কিছু কিছু মুদ্রাতে দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্মীদেবী সিংহের পিঠে চেপে বসেছেন। বসতেই পারেন। অনেকে বলেন, দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী আদতে  একই। সূর্যের তিনটি রূপের প্রকাশ। প্রাতঃ সূর্য ঊষা। সরস্বতী তারই প্রকাশ। মধ্যাহ্ন সূর্যর রং অতসী ফুলের মতো। ওই রং দুর্গার। তাই চালচিত্রের মধ্যিখানে তিনি। আর সায়ং সূর্য লক্ষ্মী। তা যদি মেনে নিই তবে দুর্গার বাহন লক্ষ্মীর হতেই পারে। বিশেষ করে যখন সিংহের কেশরের চেহারায় বেশ একটা সূর্যের ছটার মতো ব্যাপার আছে।
গুপ্তদের পর বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন শশাঙ্ক। তাঁর আমলের মুদ্রায় লক্ষ্মীর বাহন হাঁস। দুর্গা–লক্ষ্মী–সরস্বতী একই শক্তির প্রকাশ হলে এতেও কোনও আপত্তির কারণ থাকতে পারে না।
কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাঁর বাহন হিসেবে কচ্ছপকে দেখা গেছে। বিষ্ণুর দ্বিতীয় অবতার। সেই হিসেবে চলতে পারে। আবার কোনও সময় দেখা গেছে বিষ্ণু বাহন গরুড় লক্ষ্মীদেবীরও বাহন। এটাও ওই বিষ্ণুর সঙ্গে সম্পর্কিত বলেই স্বাভাবিক পছন্দ।
কিন্তু শেষমেশ তাঁর বাহন হল প্যাঁচা।
গ্রিক দেবী এথেনা আর রোমানদের দেবী মিনার্ভা, এঁদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ছিল প্যাঁচার। ওঁরা ছিলেন জ্ঞানের দেবী। ধনের নন। জ্ঞান না থাকলে ধন অর্জিত হলেও রক্ষা করা মুশকিল। সেই বিচারেই প্যাঁচা লক্ষ্মীর পায়ের তলায় উড়ে বসল কিনা, সেটা জোর দিয়ে বলা সম্ভব নয়।
গিরিবালা দেবীর ‘রায়বাড়ি’ উপন্যাসে একটা ভূত তাড়ানোর মন্ত্র আছে।
‘‌প্যাঁচায় চড়ে লক্ষ্মী আসেন ঘরে, ভূত পালায় ডরে।
লক্ষ্মীর হাতে ধানের বালা, মাথায় সোনার ছাতি,
ভূত পালাল, জ্বালা তোরা হাজার সোনার বাতি।’‌
ভূত মানে যদি দারিদ্র্য হয়, ইঁদুর হয়, খেতের শস্য নষ্টকারী পোকামাকড় হয়, তবে প্যাঁচায় চড়ে লক্ষ্মীর আগমনের তাৎপর্য স্পষ্ট বোঝা যায়। 
আমরা স্থির বিশ্বাসে বলতে পারি, বলতেই পারি, ধানের শত্রু ইঁদুরদের মেরে যে শস্যরক্ষার ব্রত পালন করেছে, আবার যাকে অন্য সভ্যতাও পরমার্থ চিন্তার প্রতীক হিসেবে মেনেছে, সে ছাড়া অন্য কেউ আমাদের ধন অর্জন ও রক্ষার দায়িত্ব পেতে পারত না। তাই লক্ষ্মীদেবী শেষ পর্যন্ত দুর্গাকে সিংহ, সরস্বতীকে হাঁস, কার্তিককে ময়ূর দিয়ে, কূর্মকে বিষ্ণুর অবতার আর গরুড়কে বিষ্ণুর বাহন হিসেবে ছেড়ে দিয়ে, প্যাঁচাকে নিজের কাছে রেখে ভালই করেছেন। ও অন্ধকারেও দেখতে পায়। এমনিতে চুপচাপ। কিন্তু লুঠেরা ইঁদুর এলে ঠোঁট আর নখ নিয়ে মারাত্মক। হিংস্র রাতগুলোতে জীবনের সম্পদ বাঁচাবার জন্য আমাদের এরকম একটা বিচক্ষণ পাহারাদার দরকার। 

কোজাগরী ও দীপান্বিতা
একটা পুজো পূর্ণিমায়। আর একটা অমাবস্যায়। লক্ষণীয়, লক্ষ্মীদেবীর দুটো পুজোই রাতের বেলায়।
পূর্ণিমায় জ্যোৎস্নাভরা রাতে লক্ষ্মীপুজো হলে কোনও জিজ্ঞাসা জাগে না। কারণ ওটা স্বাভাবিক। লক্ষ্মীমন্ত রূপের সঙ্গে পূর্ণিমার স্নিগ্ধতা, এ দুয়ের ভেতর একটা নিবিড় যোগাযোগ আছে। বেদ–পুরাণের কালেও এই সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্কটা আড়াল হয়নি।
ঋক সূক্তে রয়েছে রাকার কথা। পূর্ণিমার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। যেমন সুন্দর তেমনই ঐশ্বর্যশালিনী। এমন দেবীর সঙ্গে পূর্ণ সঙ্গতি আছে যাঁর, তিনি অবশ্যই লক্ষ্মী। সুতরাং কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীর পুজো করা যেতেই পারে।
কিন্তু দীপান্বিতা অমানিশায় কেন? কার্তিক মাস ছাড়া অন্য কোনও মাসের অমাবস্যায় তো লক্ষ্মীপুজোর বিধান নেই। ব্রতকথা বলছে, রাজাদেশে সারা দেশে কার্তিকি অমাবস্যায় গোটা রাজ্য ছিল অন্ধকার। মা লক্ষ্মী প্যাঁচার পিঠে চড়ে রাজ্য পরিক্রমায় বেরিয়ে দেখেন, চরাচরে কেবল মিশমিশে আঁধার। শুধু এক দুঃখিনী রাজকন্যা বনের ভেতর তার কুটিরে প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিল। মা লক্ষ্মী সেখানেই নামলেন। প্রসন্ন হয়ে বর দিলেন কন্যেকে। তার দুঃখ ঘুচল। প্রচার পেল দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজোর কথা। ওদিনই আবার অলক্ষ্মীর পুজো। ঘরের বাইরে কৃষ্ণ পুষ্প দিয়ে চালের গুঁড়ো কিংবা গোবর দিয়ে গড়া অলক্ষ্মী পুতুলের পুজো। শেষ হলে কুলোর বাদ্য বাজিয়ে বলা হয়, ‘‌অলক্ষ্মী দূর হ, মা লক্ষ্মী ঘরে এসো।’‌ তাই ওইদিন অলক্ষ্মী বিদায়ের পর লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো অনেকেই সরায় করেন। এটা বাংলার লোকসংস্কৃতির একটা বিশেষত্ব। আগে ১৩ রকমের সরা তৈরি হত। এখন তা ৬ রকমে ঠেকেছে। একলক্ষ্মী সরায় থাকে লক্ষ্মীর দুপাশে পদ্ম, নীচে প্যাঁচা। সে আবার উড়ছে। তিন পুতুল সরাতে লক্ষ্মীর দুপাশে দুজন সখী থাকে। এটাতেও নীচে থাকে প্যাঁচা। ঢাকাই সরা নানা রকমের হয়। কোনওটাতে জোড়া লক্ষ্মী থাকে, কোনওটাতে পাঁচ লক্ষ্মী, কোনওটাতে আবার লক্ষ্মীর সঙ্গে থাকেন চার সখী কিংবা রাধাকৃষ্ণ। দুর্গা সরাকে আড়াআড়ি দুভাগে ভাগ করা হয়। ওপরে সপরিবারে মা দুর্গা, তার ওপরে শিবের মুখ, নীচে প্যাঁচা–সহ লক্ষ্মী, আলাদা করে। এই দুর্গা সরার আর একটি রকম বা প্রকার হল গণকা বা আচার্যি সরা। সুরেশ্বরী সরায় আবার দুর্গার পরিবারের প্রত্যেকের ছবি আলাদা আলাদা করে আঁকা থাকে। 
এখন কথা হল, কেন এই সরায় পুজো?  
সম্ভাব্য কারণ দুটো। এক, সরা গর্ভবতী নারীর প্রতীক। এর সঙ্গে উৎপাদনশীলতা আর সমৃদ্ধির যোগ আছে। দুই, সরা হল পৃথিবীর পিঠ। বসুন্ধরার পুজোই লক্ষ্মীপুজো, সেজন্যও এই আয়োজন।
আজকের রাত কোজাগরীর রাত। এ রাতে নাকি নিদ্রা নিষিদ্ধ। দেবী নাকি ঘুরে ঘুরে জিজ্ঞেস করবেন, কো জাগর? কে জাগে? না জাগলে রুষ্ট হবেন তিনি। ‘নিশীথে বরদা লক্ষ্মীঃ কো জাগর্তীতি ভাষিণী’। স্মার্ত রঘুনন্দন আরও জানাচ্ছেন, দেবী নাকি বলবেন আজ রাতে, ‘তস্মৈ বিত্তং প্রযচ্ছামি অক্ষৈঃ ক্রীড়াং করোতি যঃ’। অর্থাৎ আজ রাতে যে পাশা খেলবে, জুয়োর দানে রাত জাগবে, দেবী নাকি তাকেই বিত্ত দেবেন।
সত্যিই কি তাই?
মহাত্মারা কিন্তু অন্য কথা বলেন। তাঁদের মতে, শ্লোকে যে অক্ষের কথা বলা আছে, সেটা মোটেই একার্থবাচী শব্দ নয়। এর অনেক অর্থ। এক, অবশ্যই পাশা খেলা; দুই, কেনাবেচার চিন্তা; তিন, রুদ্রাক্ষ।
জকের রাতে তাই জুয়াড়িরা পাশার দান দেবেন। ব্যবসায়ী ব্যবসার কথা ভেবে রাত কাটিয়ে দেবেন। আর যোগীর হাতে থাকবে জপমালা, তাঁর রাত কাটবে জপ করে।
আত্মার প্রকৃতি অনুযায়ী দেবী বর দেবেন। যে যেমন সে তেমন ফল পাবে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top