তন্ময় চক্রবর্তী:  অমাবস্যার নিশুতি রাত। মফস্‌সলের এই গ্রাম শহর এলাকায় তখনও স্ট্রিট লাইট আসেনি। হেমন্তের হালকা ঠান্ডা। বেরিয়েছি পাড়ার এক দাদার সঙ্গে অনিশ্চিত নিরুদ্দেশ যাত্রায়। উদ্দেশ্য, ডাকাত কালী দেখা। পাড়ার সীমানা পেরোতেই ঝুপ করে আরও গাঢ় অন্ধকার নেমে এল। ভাঙাচোরা পথঘাট। ঝোপজঙ্গল, ডোবা, বাঁশঝাড় পেরিয়ে হঠাৎ এক প্রদীপ–জ্বলা মন্দিরের চাতালের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মন্দির প্রায় ভাঙা। ইট খসে পড়ছে। চারপাশ আগাছায় ঘেরা। মন্দিরের ঠিক বাঁদিকেই একটা প্রকাণ্ড হাড়িকাট আর মন্দিরের ভিতরে এক ভয়াল কালীমূর্তি। গা ছমছম করে উঠল। ভেঙে গেল ঘুম...
ইতিহাসের শেষ নেই। ইয়োরোপে জিপসিরা নাকি এক কৃষ্ণবর্ণা দেবীর পুজো করতেন। যার পোশাকি নাম ‘ক্যালিয়াস’। এশিয়াতেও প্রাচীনকালে এক কালো দেবী বিরাজ করতেন। যার নাম ছিল কাইবেল। একটি শহরও ছিল তাঁর নামে, ‘কালিপোলিস’। পরবর্তীকালে এই শহরই হয়তো নাম পাল্টে হয়েছিল ‘ক্যালিপোলি’। শোনা যায়, ফিনল্যান্ডেও এক কৃষ্ণাঙ্গ দেবীর পুজো চালু ছিল। যার নাম ‘কালমা’। মিশরীয় সভ্যতায় ফারাওরা নানা দেবদেবী পুজো করতেন। তার মধ্যে কালো রঙের এক নারীমূর্তির পুজোও প্রচলিত ছিল। নাম, ‘কালিম্রাতস’। রোমে যুদ্ধের দেবী ছিলেন ‘বেলোনা’। অনেকটা মা কালীর মতো। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতায় চতুর্ভুজা কালো পাথরের এক দেবীমূর্তি পাওয়া যায়। রামায়ণে মহীরাবণ বধের মুহূর্ত। নিকষ কালো এক ভয়ঙ্কর দর্শনা দেবীর আবির্ভাব। যিনি বর্তমানে শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ ভারতে কৃষ্ণাম্মাকলি নামে কোথাও কোথাও পুজো পান। মহাভারত, সেখানেও অন্য রূপে কালী। শবর, যাদব এই সব আদি ভারতীয় প্রজাতির মধ্যে এক কৃষ্ণবর্ণা দেবীর ইতিহাস পাওয়া যায়। বাইবেলের বুক অফ হিব্রুতে এক কালো দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। বাণভট্টের নাটক ‘কাদম্বরী’তে চণ্ডীর উপাখ্যান রয়েছে। বাকপতির প্রাকৃত ভাষায় লেখা গৌড়বহ বইটিতেও আছে ‘বিন্ধ্যবাসিনী’ নামে এক দেবীর কথা। যিনি শবরদের আরাধ্যা। মূল বর্ণনা অনুযায়ী তিনি অনেকটা কালীর মতো। স্বামী অভেদানন্দের মতে, বৈদিক দেবী ‘রাত্রি’ পরবর্তীতে দেবী কালিকা। কালীপুজো সাধারণত নিম্নবর্ণ বা অবৈদিক সমাজেই জনপ্রিয় ছিল। পরে এটি সনাতন হিন্দুধর্মের মূল স্রোতে এসে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার পায়।     
পুরাণের তথ্য রোমাঞ্চকর। স্বর্গরাজ্যে অসুরদের ভয়ঙ্কর অত্যাচার। দেবতাদের তাড়িয়ে দিয়ে স্বর্গরাজ্য দখলের চেষ্টা করছে অসুরেরা। মহাসুর রক্তবীজ ব্রহ্মার বরে প্রবল পরাক্রমশালী। তার শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়লেই জন্ম নিচ্ছে অজস্র অসুর। এই কঠিন পরিস্থিতিতে দেবতাদের রক্ষায় এগিয়ে এলেন দেবী দুর্গা। সব অসুর মারলেন। কিন্তু রক্তবীজকে কিছুতেই মারতে পারছেন না। দেবী দুর্গার রক্তিম ভুরু যুগলের মাঝখান থেকে জন্ম নিলেন কালী। রক্তবর্ণ লকলকে জিভ, রুদ্রমূর্তি নগ্নিকা। রক্তবীজকে হত্যা করলেন। শূন্যে তুলে শরীর থেকে শুষে নিলেন সব রক্ত। তারপর যুদ্ধজয়ের আনন্দে বিজয়নৃত্য শুরু করলেন উন্মাদিনী কালী। তার নৃত্যে স্বর্গে ত্রাহি ত্রাহি রব। সৃষ্টি প্রায় রসাতলে যায় যায়। মহাদেব স্বয়ং শুয়ে পড়লেন কালীর পায়ের তলায়। এই দৃশ্যে লজ্জায় জিভ কাটলেন কালী। কোমরবন্ধনীতে ধড়হীন মুণ্ড। গলায় মুণ্ডমালা। পায়ের তলায় শিব... ইনিই কালী।      
বাংলাদেশে কালীপুজো এল কেমন করে? এখানেও অস্পষ্ট ইতিহাসের কথা। বহুকাল আগে এই বাংলার নাম ছিল গৌড় বা বঙ্গ। সেই দেশের নদিয়ার ফুলিয়ায় মতান্তরে নবদ্বীপে থাকতেন তন্ত্র মহাযোগী কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। তৎকালীন বাংলার এই বিশুদ্ধ সাধক সারাদিন পুজোপাঠেই মগ্ন থাকতেন। একদিন রাত্রে গভীর ঘুমে এই সাধক স্বপ্নাদেশ পান। সেখানে দৈববাণীতে নির্দেশ ছিল, কাল সকালে ঘুম ভাঙার পরে তিনি প্রথম যাকে দেখতে পাবেন, তিনিই দেবীর জাগতিক রূপ। কাকভোরে ঘুম থেকে উঠলেন সাধক কৃষ্ণানন্দ। দেখলেন, ঘরের দাওয়ায় বসে আছেন এক এলোকেশী কৃষ্ণবর্ণা অর্ধবসনা। সকালের অস্পষ্ট আলোয় যোগীপুরুষ কৃষ্ণানন্দকে দেখে এই অপরিচিতা নারী তৎকালীন সামাজিক লজ্জারীতি অনুযায়ী জিভ কাটলেন। চকিতে অদৃশ্য হলেন। সাধক কৃষ্ণানন্দ তাঁকে প্রণাম জানালেন। মাটি দিয়ে গড়লেন ভয়ঙ্কর কালো এক দেবীর মূর্তি।  আশ্চর্যের বিষয় হল, বাংলার সাধক সমাজ অনেকেই একে আগমবাগীশি কাণ্ড বলে উপেক্ষা করত। পরবর্তীকালে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় কালীপুজোকে জনপ্রিয় করেন। ইতিহাসের পক্ষে–বিপক্ষে নানান যুক্তি থাকলেও ১৬৯৯ শকাব্দে (১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে, মতান্তরে ১৭৬৮ সালে) কাশীনাথের ‘কালী সপার্যস বিধি’ গ্রন্থে দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালীপুজোর উল্লেখ পাওয়া যায়। সপ্তদশ শতাব্দীতে বলরাম লিখিত ‘কালিকামঙ্গল’ কাব্যে বাৎসরিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কালীর উল্লেখ আছে। মধ্যযুগের শেষ দিকে বাংলার ভক্তিমূলক সাহিত্যে সাধক রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য এবং অন্যান্য কালীভক্ত উপাসকেরা লিখলেন ভক্তিমূলক গান, যার পোশাকি নাম শ্যামাসঙ্গীত। শ্রীম লিখিত বই ‘রামকৃষ্ণ কথামৃত’তে আছে কালীমায়ের কথা। স্বামী বিবেকানন্দের দীর্ঘ কবিতা ‘মৃত্যুরূপা মাতা’ এবং ভগিনী নিবেদিতার ‘KALI- THE MOTHER’ বইটিও কালীঠাকুরকে নিয়ে লেখা। যে কথা না বললেই নয়, পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে কালীর উপাসনা শক্তি আরাধনা হিসেবে ধরা হত।         
কালীপুজো মানেই যেহেতু ভয়, বলি, ডাকাত জড়িয়ে আছে, সেজন্য কালীপুজো নিয়ে প্রচলিত গল্পেরও শেষ নেই। মহিষ–পাঁঠা– ভেড়া বলির সঙ্গে নরবলির কথাও শোনা যায়। সেইসঙ্গে শোনা যায় বিপুল অর্থব্যয়ের কথা। যেমন, খিদিরপুরের ন্যায়নারায়ণ ঘোষাল। তিনি নাকি ১৭৯৫ সালে কালীপুজোয় পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয় করে পঁচিশটি মহিষ, একশো আটটি পাঁঠা ও পাঁচটি ভেড়া বলি দিয়েছিলেন। শোভাবাজারের কালীকিঙ্কর ঘোষের কালীপুজো ছিল ভয়ঙ্কর সুন্দর। বলি এবং মদ্যপান ছিল এই পুজোর বিশেষত্ব। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নাতি ঈশানচন্দ্রের কালীপুজো নিয়েও অনেক কথা শোনা যায়। এক হাজার মন মিষ্টান্ন, পরিমাণমতো সেই ওজনের চিনি, এক হাজার শাড়ি, এমনকী ভোগ নিবেদনের জন্য হাজারখানেক মহিষ–পাঁঠা–ভেড়া বলি দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন নাকি এই রাজা। একইভাবে বরানগরে এক রাজা দেবী কালীর পাথরের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে এবং শয়ে শয়ে লোক খাইয়ে নিঃশেষিত হন।  
মুর্শিদাবাদের ডাহাপাড়ার দেবী কিরীটেশ্বরী। শোনা যায়, বাংলার নবাব মিরজাফর অসুস্থ অবস্থায় এই দেবীর চরণামৃত পান করতেন। তখন পলাশির যুদ্ধের দামামা বেজে গেছে। কলকাতা জঙ্গলে ভরা। জঙ্গলের ভিতর ডাকাতে কালীমন্দির। তেমনই এক কালীমন্দির চিতু ডাকাতের প্রতিষ্ঠিত চিত্তেশ্বরী কালীমন্দির। গ্রীষ্মের এক অমাবস্যায় এখানেই নাকি নরবলি হয়েছিল।        
ছোটবেলায় কালীপুজো নিয়ে যে ধন্দ ছিল, সে গোলমাল এখনও আছে। কালী কয় প্রকার ও কী, কী? তন্ত্রে এবং পুরাণে অনেক রকম কালীঠাকুর। তোড়ল তন্ত্র অনুসারে, কালী আট প্রকার। শ্রী কালিকা, মহাকালী, ভদ্রকালী, সিদ্ধ কালিকা, গুহ্য কালিকা, চামুণ্ডা কালিকা, দক্ষিণ কালিকা। মহাকাল সংহিতা মতে, কালী নয় প্রকার। শ্মশানকালী, দক্ষিণা কালী, কালো কালী, গুহ্য কালী, কামকলা কালী, ধন কালিকা, সিদ্ধি কালী, চণ্ডী কালিকা, ভদ্র কালী। জয়দ্রথ যামল গ্রন্থে কালী দশ প্রকার। সপ্তার্ণ কালী, প্রজ্ঞা কালী, বীর্য কালী, জীব কালী, ঈশান কালিকা, রমণী কালিকা, ইন্দিবর কালিকা, ধনদ কালিকা, রক্ষাকালী, ডম্বর কালী। আর অভিনব গুপ্তের তন্ত্রসার ও তন্ত্রালোক বইয়ে কালী তেরো প্রকার। চণ্ড কালী, মহা ভৈরব ঘোর, কালাগ্নি রুদ্র কালী, মহাকালী, মার্তণ্ড কালী, পরমার্থ কালী, রুদ্র কালী, মৃত্যু কালী, যম কালী, সংহার কালী, রক্ত কালী, স্থিতি কালী, সৃষ্টি কালী। সে রূপ যত প্রকারই হোক না কেন, আমরা কালীঠাকুর বলতে বুঝি, মুণ্ডমালিনী, গলায় পঞ্চাশটি মুণ্ডের মালা, মুণ্ডগুলি পঞ্চাশটি বর্ণ (তার মধ্যে ছত্রিশটি ব্যঞ্জনবর্ণ ও চোদ্দোটি স্বরবর্ণ)। মতান্তরে, একান্নটি যেহেতু দেবনাগরী বর্ণমালায় একান্নটি বর্ণ। অনেকের মতে, নৃমুণ্ডমালায় নরমুণ্ড একশো আটটি। দেবী চতুর্ভুজা, এক হাতে বরাভয়, এক হাতে আশীর্বাদ, এক হাতে কাটা মুণ্ড আর এক হাতে আমাদের অতি পরিচিত খাঁড়া। দেবী নগ্নিকা, দিগম্বরী। তাঁর শক্তিকে ঢেকে রাখে এমন বস্ত্র কই? পায়ের তলায় শুয়ে আছেন স্বয়ং শিব। দেবী গতি, শিব স্থিতি। মাথায় কালো চুল। তাই তিনি চির বৈরাগ্যময়ী। গায়ের রং নিকষ কালো। তাই তিনি বর্ণের অতীত। তিনি ত্রিনয়নী। সূর্য, চন্দ্র, অগ্নির মতো অন্ধকার বিনাশকারী। দাঁত দিয়ে লাল জিভ কেটেছেন। ত্যাগ দিয়ে ভোগ দমন করেছেন। এই তো আমাদের কালো মা... মা কালী।
মা কালীর এত রূপের মধ্যে যে রূপগুলি আমাদের পরিচিত, তার নাম অষ্টধা কালীরূপ। এর মধ্যে অতি আশ্চর্য রূপ আকালী। একে অনেকে গুহ্যকালীও বলেন। সংসারী এবং গৃহীরা এর পুজো করেন না। কেবলমাত্র সাধকরাই করেন। দেখতে ভয়ঙ্কর। শরীরের রং গাঢ় মেঘের মতো। হাত দুটি। কোমরে ছোট কালো কাপড়। মাথায় জটা ও অর্ধচন্দ্র। চারদিকে সাপের ফণা বেষ্টিত। নাগাসনে বসে থাকেন। এঁর খাদ্য মড়া মানুষের মাংস। শোনা যায়, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ সীমানাতে আকালীপুর গ্রামে মহারাজা নন্দকুমার এই গুহ্যকালীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পুরাণের গল্পে আছে, দারুক নামে এক অসুরকে বধ করেছিলেন এক দেবতা। তারপর তিনি মহেশ্বরের শরীরে প্রবেশ করেন এবং নীলকণ্ঠ মহেশ্বরের গলার বিষের রঙে তিনি কালো রং ধারণ করেন। ইনি সর্পযুক্তা দেবী। ত্রিশূলধারিণী। ইনি শ্রীকালী। আর এক আশ্চর্য দেবীরূপ মহাকালী। প্রাচীন তন্ত্রমতে, এঁর পনেরোটি চোখ। দশ হাত। ইনিও ভয়ের। চামুণ্ডা কালী সাধক পূজিত। গায়ের রং নীল পদ্মের মতো। বাঘছাল পরে থাকেন। রুগ্ণ শরীরে দাঁতগুলি ভয়ঙ্কর। আরও ভয়ঙ্কর শ্মশানকালী। চোখ লাল। আলুলায়িত চুল। বাঁ হাতে মাংস–মদ। ডান হাতে সদ্য কাটা মানুষের মাথা। তিনি উলঙ্গ। গায়ের রং কাজলকালো। ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে নরবলি দিতেন, শ্মশানঘাটে শ্মশানকালীর পুজো করতেন। কী আশ্চর্য। দক্ষিণেশ্বরে এই শ্মশানকালীর পুজো করেছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবী স্বয়ং। এঁদের তুলনায় কল্যাণময়ী রূপ ভদ্রকালী। অতসীপুষ্পের মতো শরীর। মতান্তরে, গায়ের রং কালো। মাথায় জটা। কপালে অর্ধচন্দ্র। ইনি গৃহস্থ বাড়িতে পূজিত হন। সিদ্ধকালী রূপটি অবশ্য ততটা প্রচলিত নয়। তিনি সিদ্ধ সাধকদের দ্বারা পূজিত। তাঁর সারা গায়ে অলংকার। বাঁ পা শিবের বুকের ওপর অধিষ্ঠিত। সাধারণত, মণ্ডপে মণ্ডপে যে কালীর পূজা হয়, তিনি দক্ষিণা কালী। আমরা অনেক সময় তাকে শ্যামাকালী বলে ডাকি। তিনি ত্রিনয়নী। তাঁর ডান পা শিবের বুকের ওপর স্থাপিত।         
আমরা যারা বাঙালি, স্কুলে পড়ার সময় মিথ্যে বলছি না প্রমাণ করতে কত বার মা কালীর দিব্যি কেটেছি। যেন বিষয়টা এমন, তাঁর নামে মিথ্যে বলা যায় না। 
সাধারণত দুর্গাপুজোর পরে কালীপুজো হয়। এটাই প্রচলিত ধারণা। শরতের আশ্বিন মাসে দুর্গাপুজোর পরে হেমন্তের কার্তিক মাসে অমাবস্যা তিথিতে যে কালীপুজো হয়, শাস্ত্রমতে তা দীপান্বিতা কালীপুজো। জ্যৈষ্ঠ মাসের কালী পূজিত হন ‘ফলহারিণী’ দেবী হিসেবে। মাঘ মাসের চতুর্দশী তিথিতে পালিত হয় রটন্তী কালীপুজো। পৌষ এবং ভাদ্র মাসেও কালীপুজো হয়। এছাড়া যাঁরা কালীসাধক, তাঁরা প্রতি অমাবস্যায় প্রতি শনি এবং মঙ্গলবারে কালীপুজো করেন।
শুধু কল্পনা, বর্ণনা নয়, কালীকে বিজ্ঞানের আলোয় দেখা যেতে পারে। সৃষ্টির আদিযুগ। অন্ধকার, আলো নেই। কালো সেই সময়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন। বিগ ব্যাং থিওরির কথা যদি ধরি, সময়কাল সৃষ্টি হল। সেই কালেরও শেষ আছে। সৃষ্টি আছে, ধ্বংসও আছে। কালের প্রভাবে যা হারিয়ে যাবে। এই সৃষ্টির বর্ণনায় যা আমরা দেখি, তার রূপও সাঙ্ঘাতিক। মনে করা যেতে পারে, এই কাল, মহাকাল, কালো রং এবং সৃষ্টি এবং ধ্বংসের এই ভয়াবহতা কাল বা কালীর প্রতীক। এখন যে কালীকে আমরা দেখি, তিনিই মহাভারতে সৌপ্তিক পর্বে কালরাত্রি। পাণ্ডব সৈন্যদের স্বপ্নে দেখা দেন। কালিকাপুরাণে তিনি আদিশক্তি এবং প্রকৃতির বাইরে পরাপ্রকৃতি। আর, দেবীমাহাত্ম্যে রক্তবীজকে হত্যা করার জন্য তিনিই নরসিংহী, বৈষ্ণবী, কুমারী, মহেশ্বরী, ব্রাহ্মী, বরাহী, ঐন্দ্রী, চামু বা কালী এই অষ্টমাতৃকা রূপে সংস্থিতা।  
কালীপুজোর সঙ্গে কয়েকটা জিনিস আশ্চর্যজনকভাবে জড়িয়ে গেছে, যা হল মধ্যরাতে মদ্যপান এবং বাজি ফাটানো। শক্তির দেবীর মধ্যে একমাত্র মদ খাওয়ার কথা জানা যায় শ্রী শ্রী চণ্ডীর দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধে। প্রবল গর্জনে দেবী বলেছিলেন, ‘গর্জ গর্জ ক্ষণংমূঢ়, মধুযাবত পিবাম্যহম’। সংস্কৃতে মদের একটি প্রতিশব্দ মধু। আর সপ্তদশ শতকের বাশোলি চিত্রে সুরাকুম্ভ হাতে এক কালো দেবী আর সুরাপানরত পদ্মাসনা এক দেবীর ছবি পাওয়া যায়। সিদ্ধ কালী আবার আঘাত হানেন চাঁদে। চাঁদ থেকে নিঃসৃত অমৃতপানে তৃপ্ত হন। চামুণ্ডা, দক্ষিণাকালী এবং অন্যান্য কালীরূপিণীরা অসুরের রক্তপান করে থাকেন তাদের দুর্বল করার জন্য। কেবলমাত্র শ্মশানকালী, যিনি গৃহস্থের উপাস্য নন, শুধুমাত্র শ্মশানেই পুজো পান, তার কথাই শোনা গেছে কারণবারি পানের ক্ষেত্রে। কাজেই, গৃহস্থের কালীপুজোর ক্ষেত্রে মদ খাওয়ার যুক্তিটা যে কী, তা অজানা। লোকনাথ বসু তাঁর ‘হিন্দুধর্ম’ গ্রন্থে লিখেছেন, পঞ্চ ‘ম’ কারের প্রথমটি, অর্থাৎ মদ, কেবলমাত্র এক নেশা উদ্রেককারী পানীয় নয়। বিশুদ্ধ মতে আসলে তা ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে ক্ষরিত অমৃতধারা।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। কালের প্রভাবে কালী মা দেবী মন্দিরে অধিষ্ঠিতা। তেমনই এক প্রসিদ্ধ কালীক্ষেত্র রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণেশ্বর। মা ভবতারিণীর মূর্তি। পূজারি ছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। আরও এক পৃথিবী বিখ্যাত মন্দির কালীঘাট। সারা পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের মানুষ পুজো দেন এই মন্দিরে। কলকাতার এবং সম্ভবত বাংলার প্রথম বারোয়ারি কালীপুজো ছিল মধ্য কলকাতার আদি বারোয়ারি কালীপুজো। ১৮৫৮ সালে বিহারীলাল বসু নামে এক ব্যক্তি এই পুজো শুরু করেন। ১৯২৪–’‌২৬ সাল নাগাদ পুজোটি বারোয়ারি হয়। আমরা অবশ্য ছোটবেলায় কালীপুজোর রোমাঞ্চ বলতে বুঝতাম ‘ফাটাকেষ্ট’র কালীপুজো। 
কালী যেমন দেবী হিসেবে রহস্যজনক, তেমনি তাঁর মন্দির ঘিরেও আছে সব আশ্চর্য গল্প। যেমন, রাজারাপ্পার ছিন্নমস্তার মন্দির। গল্পে শোনা, সে মন্দিরের চাতাল ভেসে যেত বলির রক্তে। অথচ, কোনও মাছি উড়তে দেখা যেত না। পশ্চিমবঙ্গের নানান মন্দিরে নানান কাহিনিতে কালী অধিষ্ঠিতা। যেমন, তমলুকের দেবী বর্গাভীমা, কাঁথির কপালকুণ্ডলা নামাঙ্কিত মন্দির, মালদার জহুরা কালী, বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী, বীরভূমে বামাক্ষ্যাপার সাধনক্ষেত্র তারাপীঠ, নলহাটির ললাটেশ্বরী, শেওড়াফুলির নিস্তারিণী, বর্ধমানের কঙ্কালেশ্বরী, এর পিছনে লুকিয়ে আছে অজস্র ইতিহাস।      
কালী শব্দটি সহজ ভাষায় কালো বা কৃষ্ণ বা ঘোর বর্ণ। ‘কাল’ শব্দের অর্থ সাধারণত দুটি— মৃত্যু বা নির্ধারিত সময়। কালী আসলে কাল শব্দের স্ত্রী লিঙ্গ। সহজ করে ভাবলে, কাল (সময়) কে কলন (রচনা) করেন যিনি, তিনিই কালী। আর একটি মজার কথা না বললেই নয়। একদিন বিকেলে দেবী পার্বতী নাকি শিবকে প্রশ্ন করেছিলেন, আমার কোন রূপটি তোমার সবচেয়ে বেশি পছন্দের? স্বামীর উত্তরে বিস্মিত হয়েছিলেন দেবী পার্বতী। স্বয়ং শিব বলেছিলেন, কালীর ভয়াল মূর্তি তাঁর সবচেয়ে বেশি পছন্দের। তারপর পার্বতী শিবকে কী বলেছিলেন, সে কথা আমাদের জানা নেই। স্বয়ং জয় মা কালীই জানেন। ■অমাবস্যার নিশুতি রাত। মফস্‌সলের এই গ্রাম শহর এলাকায় তখনও স্ট্রিট লাইট আসেনি। হেমন্তের হালকা ঠান্ডা। বেরিয়েছি পাড়ার এক দাদার সঙ্গে অনিশ্চিত নিরুদ্দেশ যাত্রায়। উদ্দেশ্য, ডাকাত কালী দেখা। পাড়ার সীমানা পেরোতেই ঝুপ করে আরও গাঢ় অন্ধকার নেমে এল। ভাঙাচোরা পথঘাট। ঝোপজঙ্গল, ডোবা, বাঁশঝাড় পেরিয়ে হঠাৎ এক প্রদীপ–জ্বলা মন্দিরের চাতালের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মন্দির প্রায় ভাঙা। ইট খসে পড়ছে। চারপাশ আগাছায় ঘেরা। মন্দিরের ঠিক বাঁদিকেই একটা প্রকাণ্ড হাড়িকাট আর মন্দিরের ভিতরে এক ভয়াল কালীমূর্তি। গা ছমছম করে উঠল। ভেঙে গেল ঘুম...
ইতিহাসের শেষ নেই। ইয়োরোপে জিপসিরা নাকি এক কৃষ্ণবর্ণা দেবীর পুজো করতেন। যার পোশাকি নাম ‘ক্যালিয়াস’। এশিয়াতেও প্রাচীনকালে এক কালো দেবী বিরাজ করতেন। যার নাম ছিল কাইবেল। একটি শহরও ছিল তাঁর নামে, ‘কালিপোলিস’। পরবর্তীকালে এই শহরই হয়তো নাম পাল্টে হয়েছিল ‘ক্যালিপোলি’। শোনা যায়, ফিনল্যান্ডেও এক কৃষ্ণাঙ্গ দেবীর পুজো চালু ছিল। যার নাম ‘কালমা’। মিশরীয় সভ্যতায় ফারাওরা নানা দেবদেবী পুজো করতেন। তার মধ্যে কালো রঙের এক নারীমূর্তির পুজোও প্রচলিত ছিল। নাম, ‘কালিম্রাতস’। রোমে যুদ্ধের দেবী ছিলেন ‘বেলোনা’। অনেকটা মা কালীর মতো। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতায় চতুর্ভুজা কালো পাথরের এক দেবীমূর্তি পাওয়া যায়। রামায়ণে মহীরাবণ বধের মুহূর্ত। নিকষ কালো এক ভয়ঙ্কর দর্শনা দেবীর আবির্ভাব। যিনি বর্তমানে শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ ভারতে কৃষ্ণাম্মাকলি নামে কোথাও কোথাও পুজো পান। মহাভারত, সেখানেও অন্য রূপে কালী। শবর, যাদব এই সব আদি ভারতীয় প্রজাতির মধ্যে এক কৃষ্ণবর্ণা দেবীর ইতিহাস পাওয়া যায়। বাইবেলের বুক অফ হিব্রুতে এক কালো দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। বাণভট্টের নাটক ‘কাদম্বরী’তে চণ্ডীর উপাখ্যান রয়েছে। বাকপতির প্রাকৃত ভাষায় লেখা গৌড়বহ বইটিতেও আছে ‘বিন্ধ্যবাসিনী’ নামে এক দেবীর কথা। যিনি শবরদের আরাধ্যা। মূল বর্ণনা অনুযায়ী তিনি অনেকটা কালীর মতো। স্বামী অভেদানন্দের মতে, বৈদিক দেবী ‘রাত্রি’ পরবর্তীতে দেবী কালিকা। কালীপুজো সাধারণত নিম্নবর্ণ বা অবৈদিক সমাজেই জনপ্রিয় ছিল। পরে এটি সনাতন হিন্দুধর্মের মূল স্রোতে এসে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার পায়।     
পুরাণের তথ্য রোমাঞ্চকর। স্বর্গরাজ্যে অসুরদের ভয়ঙ্কর অত্যাচার। দেবতাদের তাড়িয়ে দিয়ে স্বর্গরাজ্য দখলের চেষ্টা করছে অসুরেরা। মহাসুর রক্তবীজ ব্রহ্মার বরে প্রবল পরাক্রমশালী। তার শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়লেই জন্ম নিচ্ছে অজস্র অসুর। এই কঠিন পরিস্থিতিতে দেবতাদের রক্ষায় এগিয়ে এলেন দেবী দুর্গা। সব অসুর মারলেন। কিন্তু রক্তবীজকে কিছুতেই মারতে পারছেন না। দেবী দুর্গার রক্তিম ভুরু যুগলের মাঝখান থেকে জন্ম নিলেন কালী। রক্তবর্ণ লকলকে জিভ, রুদ্রমূর্তি নগ্নিকা। রক্তবীজকে হত্যা করলেন। শূন্যে তুলে শরীর থেকে শুষে নিলেন সব রক্ত। তারপর যুদ্ধজয়ের আনন্দে বিজয়নৃত্য শুরু করলেন উন্মাদিনী কালী। তার নৃত্যে স্বর্গে ত্রাহি ত্রাহি রব। সৃষ্টি প্রায় রসাতলে যায় যায়। মহাদেব স্বয়ং শুয়ে পড়লেন কালীর পায়ের তলায়। এই দৃশ্যে লজ্জায় জিভ কাটলেন কালী। কোমরবন্ধনীতে ধড়হীন মুণ্ড। গলায় মুণ্ডমালা। পায়ের তলায় শিব... ইনিই কালী।      
বাংলাদেশে কালীপুজো এল কেমন করে? এখানেও অস্পষ্ট ইতিহাসের কথা। বহুকাল আগে এই বাংলার নাম ছিল গৌড় বা বঙ্গ। সেই দেশের নদিয়ার ফুলিয়ায় মতান্তরে নবদ্বীপে থাকতেন তন্ত্র মহাযোগী কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। তৎকালীন বাংলার এই বিশুদ্ধ সাধক সারাদিন পুজোপাঠেই মগ্ন থাকতেন। একদিন রাত্রে গভীর ঘুমে এই সাধক স্বপ্নাদেশ পান। সেখানে দৈববাণীতে নির্দেশ ছিল, কাল সকালে ঘুম ভাঙার পরে তিনি প্রথম যাকে দেখতে পাবেন, তিনিই দেবীর জাগতিক রূপ। কাকভোরে ঘুম থেকে উঠলেন সাধক কৃষ্ণানন্দ। দেখলেন, ঘরের দাওয়ায় বসে আছেন এক এলোকেশী কৃষ্ণবর্ণা অর্ধবসনা। সকালের অস্পষ্ট আলোয় যোগীপুরুষ কৃষ্ণানন্দকে দেখে এই অপরিচিতা নারী তৎকালীন সামাজিক লজ্জারীতি অনুযায়ী জিভ কাটলেন। চকিতে অদৃশ্য হলেন। সাধক কৃষ্ণানন্দ তাঁকে প্রণাম জানালেন। মাটি দিয়ে গড়লেন ভয়ঙ্কর কালো এক দেবীর মূর্তি।  আশ্চর্যের বিষয় হল, বাংলার সাধক সমাজ অনেকেই একে আগমবাগীশি কাণ্ড বলে উপেক্ষা করত। পরবর্তীকালে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় কালীপুজোকে জনপ্রিয় করেন। ইতিহাসের পক্ষে–বিপক্ষে নানান যুক্তি থাকলেও ১৬৯৯ শকাব্দে (১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে, মতান্তরে ১৭৬৮ সালে) কাশীনাথের ‘কালী সপার্যস বিধি’ গ্রন্থে দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালীপুজোর উল্লেখ পাওয়া যায়। সপ্তদশ শতাব্দীতে বলরাম লিখিত ‘কালিকামঙ্গল’ কাব্যে বাৎসরিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কালীর উল্লেখ আছে। মধ্যযুগের শেষ দিকে বাংলার ভক্তিমূলক সাহিত্যে সাধক রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য এবং অন্যান্য কালীভক্ত উপাসকেরা লিখলেন ভক্তিমূলক গান, যার পোশাকি নাম শ্যামাসঙ্গীত। শ্রীম লিখিত বই ‘রামকৃষ্ণ কথামৃত’তে আছে কালীমায়ের কথা। স্বামী বিবেকানন্দের দীর্ঘ কবিতা ‘মৃত্যুরূপা মাতা’ এবং ভগিনী নিবেদিতার ‘KALI- THE MOTHER’ বইটিও কালীঠাকুরকে নিয়ে লেখা। যে কথা না বললেই নয়, পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে কালীর উপাসনা শক্তি আরাধনা হিসেবে ধরা হত।         
কালীপুজো মানেই যেহেতু ভয়, বলি, ডাকাত জড়িয়ে আছে, সেজন্য কালীপুজো নিয়ে প্রচলিত গল্পেরও শেষ নেই। মহিষ–পাঁঠা– ভেড়া বলির সঙ্গে নরবলির কথাও শোনা যায়। সেইসঙ্গে শোনা যায় বিপুল অর্থব্যয়ের কথা। যেমন, খিদিরপুরের ন্যায়নারায়ণ ঘোষাল। তিনি নাকি ১৭৯৫ সালে কালীপুজোয় পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয় করে পঁচিশটি মহিষ, একশো আটটি পাঁঠা ও পাঁচটি ভেড়া বলি দিয়েছিলেন। শোভাবাজারের কালীকিঙ্কর ঘোষের কালীপুজো ছিল ভয়ঙ্কর সুন্দর। বলি এবং মদ্যপান ছিল এই পুজোর বিশেষত্ব। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নাতি ঈশানচন্দ্রের কালীপুজো নিয়েও অনেক কথা শোনা যায়। এক হাজার মন মিষ্টান্ন, পরিমাণমতো সেই ওজনের চিনি, এক হাজার শাড়ি, এমনকী ভোগ নিবেদনের জন্য হাজারখানেক মহিষ–পাঁঠা–ভেড়া বলি দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন নাকি এই রাজা। একইভাবে বরানগরে এক রাজা দেবী কালীর পাথরের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে এবং শয়ে শয়ে লোক খাইয়ে নিঃশেষিত হন।  
মুর্শিদাবাদের ডাহাপাড়ার দেবী কিরীটেশ্বরী। শোনা যায়, বাংলার নবাব মিরজাফর অসুস্থ অবস্থায় এই দেবীর চরণামৃত পান করতেন। তখন পলাশির যুদ্ধের দামামা বেজে গেছে। কলকাতা জঙ্গলে ভরা। জঙ্গলের ভিতর ডাকাতে কালীমন্দির। তেমনই এক কালীমন্দির চিতু ডাকাতের প্রতিষ্ঠিত চিত্তেশ্বরী কালীমন্দির। গ্রীষ্মের এক অমাবস্যায় এখানেই নাকি নরবলি হয়েছিল।        
ছোটবেলায় কালীপুজো নিয়ে যে ধন্দ ছিল, সে গোলমাল এখনও আছে। কালী কয় প্রকার ও কী, কী? তন্ত্রে এবং পুরাণে অনেক রকম কালীঠাকুর। তোড়ল তন্ত্র অনুসারে, কালী আট প্রকার। শ্রী কালিকা, মহাকালী, ভদ্রকালী, সিদ্ধ কালিকা, গুহ্য কালিকা, চামুণ্ডা কালিকা, দক্ষিণ কালিকা। মহাকাল সংহিতা মতে, কালী নয় প্রকার। শ্মশানকালী, দক্ষিণা কালী, কালো কালী, গুহ্য কালী, কামকলা কালী, ধন কালিকা, সিদ্ধি কালী, চণ্ডী কালিকা, ভদ্র কালী। জয়দ্রথ যামল গ্রন্থে কালী দশ প্রকার। সপ্তার্ণ কালী, প্রজ্ঞা কালী, বীর্য কালী, জীব কালী, ঈশান কালিকা, রমণী কালিকা, ইন্দিবর কালিকা, ধনদ কালিকা, রক্ষাকালী, ডম্বর কালী। আর অভিনব গুপ্তের তন্ত্রসার ও তন্ত্রালোক বইয়ে কালী তেরো প্রকার। চণ্ড কালী, মহা ভৈরব ঘোর, কালাগ্নি রুদ্র কালী, মহাকালী, মার্তণ্ড কালী, পরমার্থ কালী, রুদ্র কালী, মৃত্যু কালী, যম কালী, সংহার কালী, রক্ত কালী, স্থিতি কালী, সৃষ্টি কালী। সে রূপ যত প্রকারই হোক না কেন, আমরা কালীঠাকুর বলতে বুঝি, মুণ্ডমালিনী, গলায় পঞ্চাশটি মুণ্ডের মালা, মুণ্ডগুলি পঞ্চাশটি বর্ণ (তার মধ্যে ছত্রিশটি ব্যঞ্জনবর্ণ ও চোদ্দোটি স্বরবর্ণ)। মতান্তরে, একান্নটি যেহেতু দেবনাগরী বর্ণমালায় একান্নটি বর্ণ। অনেকের মতে, নৃমুণ্ডমালায় নরমুণ্ড একশো আটটি। দেবী চতুর্ভুজা, এক হাতে বরাভয়, এক হাতে আশীর্বাদ, এক হাতে কাটা মুণ্ড আর এক হাতে আমাদের অতি পরিচিত খাঁড়া। দেবী নগ্নিকা, দিগম্বরী। তাঁর শক্তিকে ঢেকে রাখে এমন বস্ত্র কই? পায়ের তলায় শুয়ে আছেন স্বয়ং শিব। দেবী গতি, শিব স্থিতি। মাথায় কালো চুল। তাই তিনি চির বৈরাগ্যময়ী। গায়ের রং নিকষ কালো। তাই তিনি বর্ণের অতীত। তিনি ত্রিনয়নী। সূর্য, চন্দ্র, অগ্নির মতো অন্ধকার বিনাশকারী। দাঁত দিয়ে লাল জিভ কেটেছেন। ত্যাগ দিয়ে ভোগ দমন করেছেন। এই তো আমাদের কালো মা... মা কালী।
মা কালীর এত রূপের মধ্যে যে রূপগুলি আমাদের পরিচিত, তার নাম অষ্টধা কালীরূপ। এর মধ্যে অতি আশ্চর্য রূপ আকালী। একে অনেকে গুহ্যকালীও বলেন। সংসারী এবং গৃহীরা এর পুজো করেন না। কেবলমাত্র সাধকরাই করেন। দেখতে ভয়ঙ্কর। শরীরের রং গাঢ় মেঘের মতো। হাত দুটি। কোমরে ছোট কালো কাপড়। মাথায় জটা ও অর্ধচন্দ্র। চারদিকে সাপের ফণা বেষ্টিত। নাগাসনে বসে থাকেন। এঁর খাদ্য মড়া মানুষের মাংস। শোনা যায়, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ সীমানাতে আকালীপুর গ্রামে মহারাজা নন্দকুমার এই গুহ্যকালীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পুরাণের গল্পে আছে, দারুক নামে এক অসুরকে বধ করেছিলেন এক দেবতা। তারপর তিনি মহেশ্বরের শরীরে প্রবেশ করেন এবং নীলকণ্ঠ মহেশ্বরের গলার বিষের রঙে তিনি কালো রং ধারণ করেন। ইনি সর্পযুক্তা দেবী। ত্রিশূলধারিণী। ইনি শ্রীকালী। আর এক আশ্চর্য দেবীরূপ মহাকালী। প্রাচীন তন্ত্রমতে, এঁর পনেরোটি চোখ। দশ হাত। ইনিও ভয়ের। চামুণ্ডা কালী সাধক পূজিত। গায়ের রং নীল পদ্মের মতো। বাঘছাল পরে থাকেন। রুগ্ণ শরীরে দাঁতগুলি ভয়ঙ্কর। আরও ভয়ঙ্কর শ্মশানকালী। চোখ লাল। আলুলায়িত চুল। বাঁ হাতে মাংস–মদ। ডান হাতে সদ্য কাটা মানুষের মাথা। তিনি উলঙ্গ। গায়ের রং কাজলকালো। ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে নরবলি দিতেন, শ্মশানঘাটে শ্মশানকালীর পুজো করতেন। কী আশ্চর্য। দক্ষিণেশ্বরে এই শ্মশানকালীর পুজো করেছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবী স্বয়ং। এঁদের তুলনায় কল্যাণময়ী রূপ ভদ্রকালী। অতসীপুষ্পের মতো শরীর। মতান্তরে, গায়ের রং কালো। মাথায় জটা। কপালে অর্ধচন্দ্র। ইনি গৃহস্থ বাড়িতে পূজিত হন। সিদ্ধকালী রূপটি অবশ্য ততটা প্রচলিত নয়। তিনি সিদ্ধ সাধকদের দ্বারা পূজিত। তাঁর সারা গায়ে অলংকার। বাঁ পা শিবের বুকের ওপর অধিষ্ঠিত। সাধারণত, মণ্ডপে মণ্ডপে যে কালীর পূজা হয়, তিনি দক্ষিণা কালী। আমরা অনেক সময় তাকে শ্যামাকালী বলে ডাকি। তিনি ত্রিনয়নী। তাঁর ডান পা শিবের বুকের ওপর স্থাপিত।         
আমরা যারা বাঙালি, স্কুলে পড়ার সময় মিথ্যে বলছি না প্রমাণ করতে কত বার মা কালীর দিব্যি কেটেছি। যেন বিষয়টা এমন, তাঁর নামে মিথ্যে বলা যায় না। 
সাধারণত দুর্গাপুজোর পরে কালীপুজো হয়। এটাই প্রচলিত ধারণা। শরতের আশ্বিন মাসে দুর্গাপুজোর পরে হেমন্তের কার্তিক মাসে অমাবস্যা তিথিতে যে কালীপুজো হয়, শাস্ত্রমতে তা দীপান্বিতা কালীপুজো। জ্যৈষ্ঠ মাসের কালী পূজিত হন ‘ফলহারিণী’ দেবী হিসেবে। মাঘ মাসের চতুর্দশী তিথিতে পালিত হয় রটন্তী কালীপুজো। পৌষ এবং ভাদ্র মাসেও কালীপুজো হয়। এছাড়া যাঁরা কালীসাধক, তাঁরা প্রতি অমাবস্যায় প্রতি শনি এবং মঙ্গলবারে কালীপুজো করেন।
শুধু কল্পনা, বর্ণনা নয়, কালীকে বিজ্ঞানের আলোয় দেখা যেতে পারে। সৃষ্টির আদিযুগ। অন্ধকার, আলো নেই। কালো সেই সময়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন। বিগ ব্যাং থিওরির কথা যদি ধরি, সময়কাল সৃষ্টি হল। সেই কালেরও শেষ আছে। সৃষ্টি আছে, ধ্বংসও আছে। কালের প্রভাবে যা হারিয়ে যাবে। এই সৃষ্টির বর্ণনায় যা আমরা দেখি, তার রূপও সাঙ্ঘাতিক। মনে করা যেতে পারে, এই কাল, মহাকাল, কালো রং এবং সৃষ্টি এবং ধ্বংসের এই ভয়াবহতা কাল বা কালীর প্রতীক। এখন যে কালীকে আমরা দেখি, তিনিই মহাভারতে সৌপ্তিক পর্বে কালরাত্রি। পাণ্ডব সৈন্যদের স্বপ্নে দেখা দেন। কালিকাপুরাণে তিনি আদিশক্তি এবং প্রকৃতির বাইরে পরাপ্রকৃতি। আর, দেবীমাহাত্ম্যে রক্তবীজকে হত্যা করার জন্য তিনিই নরসিংহী, বৈষ্ণবী, কুমারী, মহেশ্বরী, ব্রাহ্মী, বরাহী, ঐন্দ্রী, চামু বা কালী এই অষ্টমাতৃকা রূপে সংস্থিতা।  
কালীপুজোর সঙ্গে কয়েকটা জিনিস আশ্চর্যজনকভাবে জড়িয়ে গেছে, যা হল মধ্যরাতে মদ্যপান এবং বাজি ফাটানো। শক্তির দেবীর মধ্যে একমাত্র মদ খাওয়ার কথা জানা যায় শ্রী শ্রী চণ্ডীর দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধে। প্রবল গর্জনে দেবী বলেছিলেন, ‘গর্জ গর্জ ক্ষণংমূঢ়, মধুযাবত পিবাম্যহম’। সংস্কৃতে মদের একটি প্রতিশব্দ মধু। আর সপ্তদশ শতকের বাশোলি চিত্রে সুরাকুম্ভ হাতে এক কালো দেবী আর সুরাপানরত পদ্মাসনা এক দেবীর ছবি পাওয়া যায়। সিদ্ধ কালী আবার আঘাত হানেন চাঁদে। চাঁদ থেকে নিঃসৃত অমৃতপানে তৃপ্ত হন। চামুণ্ডা, দক্ষিণাকালী এবং অন্যান্য কালীরূপিণীরা অসুরের রক্তপান করে থাকেন তাদের দুর্বল করার জন্য। কেবলমাত্র শ্মশানকালী, যিনি গৃহস্থের উপাস্য নন, শুধুমাত্র শ্মশানেই পুজো পান, তার কথাই শোনা গেছে কারণবারি পানের ক্ষেত্রে। কাজেই, গৃহস্থের কালীপুজোর ক্ষেত্রে মদ খাওয়ার যুক্তিটা যে কী, তা অজানা। লোকনাথ বসু তাঁর ‘হিন্দুধর্ম’ গ্রন্থে লিখেছেন, পঞ্চ ‘ম’ কারের প্রথমটি, অর্থাৎ মদ, কেবলমাত্র এক নেশা উদ্রেককারী পানীয় নয়। বিশুদ্ধ মতে আসলে তা ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে ক্ষরিত অমৃতধারা।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। কালের প্রভাবে কালী মা দেবী মন্দিরে অধিষ্ঠিতা। তেমনই এক প্রসিদ্ধ কালীক্ষেত্র রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণেশ্বর। মা ভবতারিণীর মূর্তি। পূজারি ছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। আরও এক পৃথিবী বিখ্যাত মন্দির কালীঘাট। সারা পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের মানুষ পুজো দেন এই মন্দিরে। কলকাতার এবং সম্ভবত বাংলার প্রথম বারোয়ারি কালীপুজো ছিল মধ্য কলকাতার আদি বারোয়ারি কালীপুজো। ১৮৫৮ সালে বিহারীলাল বসু নামে এক ব্যক্তি এই পুজো শুরু করেন। ১৯২৪–’‌২৬ সাল নাগাদ পুজোটি বারোয়ারি হয়। আমরা অবশ্য ছোটবেলায় কালীপুজোর রোমাঞ্চ বলতে বুঝতাম ‘ফাটাকেষ্ট’র কালীপুজো। 
কালী যেমন দেবী হিসেবে রহস্যজনক, তেমনি তাঁর মন্দির ঘিরেও আছে সব আশ্চর্য গল্প। যেমন, রাজারাপ্পার ছিন্নমস্তার মন্দির। গল্পে শোনা, সে মন্দিরের চাতাল ভেসে যেত বলির রক্তে। অথচ, কোনও মাছি উড়তে দেখা যেত না। পশ্চিমবঙ্গের নানান মন্দিরে নানান কাহিনিতে কালী অধিষ্ঠিতা। যেমন, তমলুকের দেবী বর্গাভীমা, কাঁথির কপালকুণ্ডলা নামাঙ্কিত মন্দির, মালদার জহুরা কালী, বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী, বীরভূমে বামাক্ষ্যাপার সাধনক্ষেত্র তারাপীঠ, নলহাটির ললাটেশ্বরী, শেওড়াফুলির নিস্তারিণী, বর্ধমানের কঙ্কালেশ্বরী, এর পিছনে লুকিয়ে আছে অজস্র ইতিহাস।      
কালী শব্দটি সহজ ভাষায় কালো বা কৃষ্ণ বা ঘোর বর্ণ। ‘কাল’ শব্দের অর্থ সাধারণত দুটি— মৃত্যু বা নির্ধারিত সময়। কালী আসলে কাল শব্দের স্ত্রী লিঙ্গ। সহজ করে ভাবলে, কাল (সময়) কে কলন (রচনা) করেন যিনি, তিনিই কালী। আর একটি মজার কথা না বললেই নয়। একদিন বিকেলে দেবী পার্বতী নাকি শিবকে প্রশ্ন করেছিলেন, আমার কোন রূপটি তোমার সবচেয়ে বেশি পছন্দের? স্বামীর উত্তরে বিস্মিত হয়েছিলেন দেবী পার্বতী। স্বয়ং শিব বলেছিলেন, কালীর ভয়াল মূর্তি তাঁর সবচেয়ে বেশি পছন্দের। তারপর পার্বতী শিবকে কী বলেছিলেন, সে কথা আমাদের জানা নেই। স্বয়ং জয় মা কালীই জানেন ■

 ছবি: সঞ্জয় ভট্টাচার্য

জনপ্রিয়

Back To Top