পবিত্র সরকার 
আমি কিছুদিন আগে যা ঘটেছে তা যদি না ঘটত এমন একটা লেখা লিখতে অনুরুদ্ধ হয়েছিলাম। সে লেখা যা হয়েছে হয়েছে। লিখে দু’‌একটা বাহবার ফোন পেয়ে মনে হল— এ ব্যাপারটা তো মন্দ নয়, বেশ একটা মজা আছে। আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখি, আর লক্ষ করি যে বেশিরভাগ মানুষের কাছে চারপাশে কিছুই ঘটে না, সব যেমন চলছিল তেমনই চলে। ওই যে ব্রাউনিং বলে একজন ইংরেজ কবি ছিলেন, যিনি Pippa Passes না কী একটা কবিতায় লিখেছিলেন—God is in his heaven and all is right with the world, সবাই যেন ভাবছে ব্যাপারটা ঠিক তাই, আমি আমার মতো থাকি। লোকে অবশ্য বলে অনেক কিছুই ঘটছে, মিডিয়া তাই নিয়ে তোলপাড়। কিন্তু যা ঘটে তাতে আমার কী এসে যায়। যদি ভাবি তা হলে তো ঘটনাটাকেই ‘নাস্তি’ করে দিলাম, আমার পৃথিবীতে তা ঢোকবার পথই পেল না। কথাটা সহজ। যে ঘটনার ছ্যাঁকা আমার গায়ে লাগেনি সেই ঘটনা মোটেই ঘটেনি। তাই আমরা খাই-দাই দাড়ি কামাই, মাস্ক না পরে বাজারে যাই, বউ বা রান্নার লোক পাঁচ পদ রান্না করে, তার ছবি তুলে ফেসবুকে দিই। আমার পৃথিবীতে যা ঘটে খুব গুরুত্বপূর্ণ—মেয়ের পুজোর সাজগোজ কিনতে হবে, বউয়ের নতুন শাড়ি, আমার নিজের পোশাক-আশাক, করোনার দাপটে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যানটা প্রায়ই ভেস্তে যাচ্ছে নইলে একবার ইউরোপটা একবার অ্যাটেম্‌ট নেওয়া যেত ট্র্যাভেল এজেন্সি ধরে।
না, পৃথিবীতে কিছুই ঘটছে না। করোনা ঘটছে না তা বলতে পারি না— হ্যাঁ দশ লাখের বেশি মানুষ এর মধ্যেই টেঁসে গেছে, কিন্তু আমার কাছাকাছি এখনও ছোবল বসায়নি। বসালে দেখা যাবে। ফলে কাগজেপত্রে টেলিভিশনে অনেক কিছুই ঘটছে, কিন্তু আমার কাছে কিছুই ঘটছে না। আমার এই ছোট্ট পৃথিবীতে পরিযায়ী শ্রমিক বলে কিছু নেই, আমি তাদের নিজের চোখে দেখিনি। সেকেন্দ্রাবাদ স্টেশনে রক্তমাখা রুটি আমি দেখিনি। আমি স্ত্রী–সন্তান নিয়ে, বোঝা মাথায় রোদবৃষ্টির মধ্যে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হাঁটিনি, আমার শহরে কালো জর্জ ফ্লয়েডকে সাদা পুলিশ গলায় এমনভাবে হাঁটু চেপে ধরেনি যে সে বলবে ‘আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে’, আমার মেয়ে বাড়ি থেকে বারো কিলোমিটার দূরে রাস্তায় মরে পড়ে যায়নি। আমার ঘর আমফানে উড়ে যায়নি, বাঁধ ভেঙে আমার বাড়ি জলে ডুবে যায়নি। মনীষা বাল্মীকিরা ধর্ষিত হয়নি, তাদের জিভ কাটা হয়নি, শরীর বাড়ির লোকজনকের আটকে রেখে পুড়িয়ে  দেওয়া হয়নি। যেন চারদিকে ধর্ষিতার খবর আসছে না, যেন পৃথিবীতে চিত্রতারকার আত্মহত্যা থেকে কোনও ঘটনা ঘটছে না। আমার হাতে সেই মন্ত্র আছে যা এই সমস্ত কিছুকে নাকচ করে পৃথিবীটাকে একটা মিনি স্বর্গ বানিয়ে তুলতে পারে আমার আর আমার পরিবারের জন্য। মনীষাকে ‘নেই’ করে দিতে একটু সমস্যা হচ্ছে নিজের সঙ্গে, তবে সেই যে বাংলায় মেয়েদের জন্যে একটা প্রবাদ তৈরি হয়েছিল, হয়তো মেয়েরাই তৈরি করেছিল সেই প্রবাদ— ‘পুড়বে নারী, উড়বে ছাই, তবে নারীর গুণ গাই’—সেটা আর-একবার প্রমাণিত হল। নারী যদি নিজে মনের সুখে পুড়তে না চায়, নির্বাচিত সরকার আছে কী করতে! সরকার দয়া করে পুড়িয়েছে, পুলিশ কাউক্কে ধারে-কাছে ঘেঁষতে দেয়নি, সরকার পরিবারকে টাকা দিয়েছে, অতি মহানুভব ম্যাজিস্ট্রেট তার পরিবারকে বলেছেন, করোনায় মরলে তো এই টাকা পেতে না। আহা! টাকার কী মহিমা। আমাদের কর্তারা ভাবে টাকায় সব হয়। টাকায় এ সব বিচ্ছিরি ‘নেই’  নিজেই ‘নেই’ হয়ে যায়, টাকা দিয়ে সব আরাম্প্রদ ‘নেই’ কেনা যায়। বাবরি মসজিদ নিজে নিজে শখ করে ধ্বংস হয়, সেটা দেখতে দেখতে প্রবীণ এক নেতার কাঁধে উঠে নাচেন না এক ‘সন্ন্যাসিনী’, দিল্লিতে দাঙ্গাকারীদের মধ্যে বিরোধীদের নেতাদেরও নাম নিজে-নিজেই ফুর্তি করে ঢুকে পড়ে না, পরে এই তত্ত্ব প্রচারিত হয় না (৭ সেপ্টেম্বরের সংবাদপত্র দ্রষ্টব্য) যে, লোকে ওই দলিত বাল্মীকির পরিবারকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দিয়েছে ধর্ষণ আর হত্যা প্রচার করার জন্য।  
আহ! লক্ষ লক্ষ মধ্যবিত্তের মতো আমি কী দারুণ একটা জীবন পেয়েছি। ভাবা যায়! আমার জীবনে আপাতত রোগ নেই, দেশ জুড়ে ধারাবাহিক ধর্ষণ নেই, হত্যা নেই, মৃত্যু নেই। করোনা-রুগিকে পাড়াছাড়া করা নেই, বেসরকারি হাসপাতালে ন’‌দিনে ন’‌লক্ষ টাকা বিল নেই, ঘরে বন্ধ অবস্থায় মরে থেকে দুর্গন্ধ ছাড়া নেই। স্বামীকে স্ত্রীর বা স্ত্রীকে স্বামীর খুন করা নেই, মোড়লদের তোলাবাজি নেই, গরিবের ত্রাণ লুট করা নেই। আমি এক বৈদান্তিক মায়াবাদী, যাতে আমি জগৎকে মিথ্যা আর মায়া বলে মনে করি। শুধু আমি সত্য, আমার পরিবার সত্য, আমার চাহিদা আর বিনোদন সত্য। আর সব অলীক, দর্শনের ভাষায় বলতে গেলে অধ্যাস—দড়িতে যেমন সাপ দেখা।   
আমি শুধু আমাকে নিয়ে আছি, হয়তো আমার পরিবারকে নিয়ে। আমি বাজারে ভিড় করি, মদের দোকান খুললে কেউ-কেউ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াই। চায়ের দোকানে আর মন্দিরে ভিড় জমাই (কিছু হলে ঠাকুর দেখবেন), পুরী বা তিরুপতির মন্দিরে সেবকদের ঝাঁকে ঝাঁকে করোনা হওয়ার কথা আমি বিশ্বাস করি না, সিনেমা হল খোলবার আশায় মুখিয়ে থাকি। আমার রোল মডেল হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, আমি সব সময় অন্যের ষড়যন্ত্রে বিশ্বাস করি। আমি মনে করি করোনাটা ওষুধ-ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্র, ডাক্তার স্বাস্থ্যকর্মী থেকে পুলিশ যে এত এত মারা যাচ্ছে—লাখখানেক ভারতীয়ের কথা বাদই দিলাম—সব খবরের কাগজের ভুয়ো প্রচার, তবে ঘণ্টা-কাঁসর শাঁখ বাজাতে হলে আমি মহা উদ্যমে সে সব বাজাই। ছেলেবেলায় ঝড় আর ভূত তাড়াতে এ সব শিখতে হয়েছিল গ্রামে, এখন শহরে এসেও সে সব ছাড়িনি।  
এই আমিই তো ভোট দেব। কাজেই আমাকে ভয় করো হে প্রশাসক, আমার ওপর মিথ্যে মিথ্যে করে নানা বিধিনিষেধ চাপাতে এসো না। নানা আজেবাজে খবর দিয়ে আমার পিলে চমকে দিয়ো না, দিলে তোমাকে তার ফল ভুগতে হবে। চারদিকে যত যাই ঘটুক, যত দলিত কন্যা ধর্ষিত হোক, পৃথিবীতে করোনার মৃত্যু দশ লাখ ছাড়িয়ে বিশ লাখের দিকে লাফিয়ে লাফিয়ে চলুক, আমার কাছে তা মায়া। আমি আমার চারদিকে এক রঙিন কাচের দেওয়াল তুলে দিয়েছি, সেখান দিয়ে বাইরের কোনও কুবাতাস ঢোকে না। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও। আমি আর আমার কাজ আর বিশ্বাসের এই কাচের ঘর ছাড়া আর কোনও কিছুই নেই।  
আমি এই সুখ নিয়ে আছি যে, কারও হাতে কোনও ঢিল নেই, সে ঢিল আমার ঘরের দেয়ালে পড়বে না, করোনা, খুন, ধর্ষণ কিছুই আমার পৃথিবীর ঘটনা নয়। সব ঝুট হ্যায়, সব ঝুট হ্যায়। আমি আমার মতো আছি।
তবে মাঝে মাঝে একটা পিনের মতো ভয়ভাবনা জাগে। আমারও মেয়ে বড় হচ্ছে, আর করোনা আমার পাড়াতেও ঢুকেছে। একটু ভয় হয়। আবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিষ্ঠুর আর আত্মবিশ্বাসী মুখের দিকে তাকাই। ভয় ঝেড়ে ফেলি। ■     
 

জনপ্রিয়

Back To Top