সর্বধর্ম সমন্বয়ের জয়ধ্বজা পৃথিবীর কোনায় কোনায় পুঁতে দেওয়ার আয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ খুঁজে নিয়েছিল ১৩৩ বছর আগে। লিখেছেন দেবাশিস পাঠক

 

শ্রাবণ সংক্রান্তি। ঝুলন পূর্ণিমা। সাল ১৮৮৬। তারিখ ১৬ আগস্ট। রাত্রিবেলা। ঘড়িতে ১টা বেজে গিয়েছে। তিনবার মা কালীর নাম উচ্চারণ করলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। তারপর সমাধিস্থ হলেন। সে সমাধি আর ভাঙল না। সকালে দেহ দাহ করা হল কাশীপুর শ্মশানে। ছাইভরা পাত্র মাথায় করে নিয়ে এল ভক্তের দল। ওই কাশীপুরের বাগানবাড়িতেই। তাঁদের মুখে তখন শুধু একটাই কথা, ‘‌জয় রামকৃষ্ণ, জয় রামকৃষ্ণ, জয় রামকৃষ্ণ’‌। 
আগস্ট মাসের বাকি কটা দিন কোনও অসুবিধা হল না। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ভাড়া দেওয়াই ছিল। বাগানবাড়ির মালিক লালাবাবুর বিধবা স্ত্রী রানি কাত্যায়নী। বাগানবাড়ির স্বত্ব তিনি দিয়েছিলেন জামাই গোপালচন্দ্র ঘোষকে। চুক্তি পুনর্নবীকরণের সময়ই তাঁকে জুন মাস থেকে আগস্ট মাস অবধি ভাড়া অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল। ভাড়াটা মোটেই কম নয়। মাসে ৮০ টাকা। এই অঙ্ক কতটা বেশি, তা বোঝানোর জন্য একটা তথ্যই যথেষ্ট। সে সময় এক টাকায় প্রায় সাড়ে ১৬ কিলো চাল পাওয়া যেত। অন্তত পূর্ববঙ্গের জেলা গেজেট তেমনটাই জানাচ্ছে। 
ফলে সমস্যাটা তৈরি হল আগস্ট মাস ফুরোলে। 
ঠিক ছিল, ১৭ থেকে ৩১ আগস্ট, এই ১৬ দিনের মধ্যে সারদামণি দেবী ও রামকৃষ্ণের ব্রহ্মচারী সেবক ভক্তরা, যাঁরা এতদিন কাশীপুরের বাড়িতে ছিলেন, তাঁরা অন্য কোথাও চলে যাবেন। আর রামকৃষ্ণের যে ছাই আর অস্থি শ্মশান থেকে আনা হয়েছিল, তা যাবে কাঁকুড়গাছির যোগোদ্যানে। সেই মতো রামকৃষ্ণের ভস্মাস্থি রাখা ছিল যে কলসীটাতে, সেটা যোগোদ্যান চলে গেল ২৩ আগস্ট, জন্মাষ্টমীর দিন। তবে তা নিয়ে ভক্তদের মধ্যে একটু মন কষাকষি হল। আগে ঠিক হয়েছিল ওই কলসী গঙ্গার ধারে একটা মন্দির করে সেখানে রেখে দেওয়া হবে। কিন্তু মন্দির করা তো আর চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। জমি কিনতে হবে। তার ওপর ইট–সুরকি– সিমেন্টের কাঠামো নির্মাণ। বিস্তর খরচ। অত টাকা আসবে কোত্থেকে? তাই ওই ভাবনায় জল ঢেলে যোগোদ্যানে রাখার সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই ব্যবস্থা মনঃপূত হয়নি ত্যাগী ভক্তদের। তাঁরা বেঁকে বসলেন। তাতে বেজায় চটেছিলেন রামচন্দ্র দত্ত, দেবেন্দ্রনাথ নাথ মজুমদার আর নিত্যগোপাল। কাঁকুড়গাছিতে যোগোদ্যানের জমিটা রামচন্দ্রের। কলকাতায় দেব লেন বলে যে রাস্তাটা আছে, দেবেন মজুমদারের বাড়ি ছিল সেখানেই। ওঁর নামেই ওই রাস্তার নামকরণ। আর নিত্যগোপাল? আজকের কলকাতায় দেশপ্রিয় পার্কের কাছে অবস্থিত মহানির্বাণ মঠ। সেখানেই সমাধিতে শায়িত তাঁর মরদেহ। সেখানেই নিত্য পূজিত তাঁর মূর্তি। 
শেষে নরেন্দ্রনাথ দত্ত ব্যাপারটা মিটমাট করে দিলেন। রামচন্দ্রের তুতো ভাই তিনি। তিনিই সামলালেন ত্যাগী ভক্তদের। স্পষ্ট বললেন, ‘দেখো, আমাদের একটু বিবেচনা করে চলা উচিত। পরে যেন লোকে না বলতে পারে যে রামকৃষ্ণের চ্যালারা তাঁর দেহ পোড়ানো ছাই আর হাড় নিয়ে মারামারি করেছিল। ওসব ওঁরা নিয়ে যান। আমরা বরং ঠাকুর যেমন ভাবে বলে গেছেন, তেমন ভাবে জীবন গড়ার চেষ্টা করি।’‌ তাতেও যে গোল এক্কেবারে মিটে গেল, তা নয়। নিরঞ্জন ও শশী, পরবর্তীতে স্বামী নিরঞ্জনানন্দ ও স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ, রাতের অন্ধকারে কলসীর অর্ধেক জিনিস ফাঁকা করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বলরাম বসুর বাড়ি। নরেন্দ্রকে সে কথা জানানো হল। ব্যাপারটায় তিনি কোনও আপত্তি করলেন না। আবার জন্মাষ্টমীর দিন সকালে ভস্মাস্থি নিয়ে কাশীপুর থেকে কাঁকুড়গাছি যে শোভাযাত্রা গেল, তাতেও অংশ নিলেন। যোগোদ্যানে শ্রী রামকৃষ্ণ সমাধি মন্দির নিয়ে তাঁর যে কোনওরকম আপত্তি আছে, তাও কারও মনে হল না। 
আগস্ট মাস শেষ হলে সারদা দেবীকে পাঠানো হল প্রথমে বলরাম বসুর বাড়ি, তার পর সেখান থেকে বৃন্দাবন। বুড়ো গোপাল, কালীপ্রসাদ, তারকের মতো কয়েকজন ত্যাগী ভক্তও সেখানে গেলেন। আর বাকিরা যে যাঁর বাড়িতে ফিরে পড়াশোনায় মন দিলেন। চোখের সামনে তাঁরা দেখেছেন রামকৃষ্ণের ত্যাগব্রতের জীবন। তারপর ফের ‘কামিনী-কাঞ্চনে’ ফিরে যাওয়া তাঁদের পক্ষে সহজ ছিল না। ফলে, পুরো ব্যবস্থাটা তাঁদের মোটেও ভাল লাগেনি। অথচ, করারও নেই কিছু। পরিপার্শ্ব আদৌ অনুকূল নয়। সবাই বলছেন, রামকৃষ্ণ যখন নেই, তখন একসঙ্গে থেকে-খেয়ে কাজ কী! গৃহী ভক্তদের একাংশের সাফ কথা, ‘‌ঠাকুর তো সংসার ত্যাগ করতে বললেন না, বরং বলেছেন, সংসার কেল্লাস্বরূপ; এই কেল্লায় থেকে কাম, ক্রোধ ইত্যাদির সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারা যায়।’‌ ‘কথামৃত’-এর পাতা ওল্টালে, মহিমাচরণের সঙ্গে রামকৃষ্ণের কথাবার্তা, আলাপ–আলোচনা পড়লে বোঝা যায়, ভক্তদের মধ্যে এরকম মানসিকতার উদয় হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ওদিকে রামচন্দ্র দত্তর মতো কেউ কেউ মনে করতেন, যারা রামকৃষ্ণকে চোখে দেখেছে, তাদের আর সাধন ভজনের দরকার নেই। কিন্তু নরেন্দ্র, রাখাল, নিরঞ্জন, বাবুরাম, শশী, শরৎ, কালী, যোগেন, সারদা, সুবোধ, এমনকী লাটুও জানে এবং মানে, ও পথ তাদের জন্য নয়। ভক্ত সঙ্ঘ গঠন করতে হবে, শিবজ্ঞানে জীবসেবা করতে হবে, তবেই রামকৃষ্ণের ভাবনাচিন্তাগুলো একটা নির্দিষ্ট আকার পাবে। 
আর একজন ছিলেন, যিনি প্রায় এরকম কথাই ভাবতেন। তিনি সারদামণি। বুকভরা মাতৃস্নেহ নিয়ে তিনি কেঁদে কেঁদে বলতেন, লোকচক্ষুর আড়ালে চোখের জলে সারতেন অন্তরের প্রার্থনা, ‘‌ঠাকুর! তুমি এলে আর এই ক’‌জনকে নিয়ে লীলা করে আনন্দ করে চলে গেলে; আর অমনি সব শেষ হয়ে গেল? তাহলে আর এত কষ্ট করে আসার কি দরকার ছিল? ... আমার প্রার্থনা, ... ওরা সব তোমাকে আর তোমার ভাব উপদেশ নিয়ে একত্রে থাকবে, আর এই সংসারতাপদগ্ধ লোকেরা তাদের কাছে এসে তোমার কথা শুনে শান্তি পাবে। এইজন্যই তো তোমার আসা।’‌  
ছেঁড়াখোঁড়া ভাবনার ঢেউগুলো বিচ্ছিন্নভাবে উঠছিল আর নামছিল, কিন্তু কিছুতেই দানা বাঁধছিল না।
আর এ সময়েই মাঠে নামলেন সুরেন্দ্রনাথ মিত্র। স্বেচ্ছায় কিংবা কিছুটা বাধ্য হয়ে। ভেতরকার তাড়নায়। 
নরেন্দ্রর মতোই কলকাতার সিমলা পাড়ায় বাড়ি সুরেন্দ্রর। ডস্ট কোম্পানির ম্যানেজার। দক্ষিণেশ্বরে যেসব ছেলের দল রামকৃষ্ণের কাছে রাত কাটাতেন, তাঁদের জন্য লেপ-বালিশ থেকে শুরু করে ডাল-রুটি অবধি যাবতীয় জিনিসের খরচ-খরচার ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এই মানুষটা। কাশীপুরের বাগানবাড়ির ভাড়াও জোগাতেন তিনি। রামকৃষ্ণ কখনও তাঁকে ডাকতেন ‘‌সুরেন্দ্র’ বলে, কখনও আবার ‘সুরেশ’ বলে। আর বলতেন, ‘‌ও হল আমার অর্ধেক রসদদার।’‌ এ হেন সুরেন্দ্রনাথ দেখা দিলেন ত্রাতা রূপে। 
একটা ছবি আঁকিয়েছিলেন সুরেন্দ্র। মা কালীর। ভয়ঙ্কর সেই রূপ। করালবদনা দেবীর ছবি। ছবিটা বাড়িতে আনার পর বাড়ির লোকজন প্রবলভাবে আপত্তি জানান। ওই ভয়ঙ্কর মূর্তি তাঁরা বাড়িতে রাখতে নারাজ। ফলে ছবিটা রাখা ছিল কাশীপুরের উদ্যানবাটীতে। শ্রীরামকৃষ্ণের ঘরে। বাড়িটা ছেড়ে দেওয়ার পর ছবিটা কোথায় রাখা হবে তা নিয়ে চিন্তা একটা ছিলই। এরই মধ্যে আচমকা অলৌকিকের দমকা বাতাস।   
অফিস থেকে ফিরে ধ্যানে বসেছিলেন সুরেন্দ্র। রোজকার মতো। হঠাৎ মনে হল, স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ এসে দাঁড়িয়েছেন সামনে। বলছেন, ‘‌আমার ছেলেগুলো সব পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের একটা ব্যবস্থা কর। করছিস কী তুই?’‌ সঙ্গে সঙ্গে সুরেন্দ্র ছুটলেন নরেন্দ্রর বাড়িতে। বললেন, একটা বাড়ি ঠিক করো। সেখানে ঠাকুরের ব্যবহার করা সব জিনিসপত্র থাকবে। আর থাকবে তোমরা। ঠাকুরের ত্যাগী ছেলেরা। খরচপাতি সব আমি দেব। ওই কাশীপুরে যেমন দিচ্ছিলাম আর কী।
নরেন্দ্রর মনে হল, রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ গড়ে তোলার সমূহ সম্ভাবনা উপস্থিত। দেরি না করে শুরু করে দিলেন বাড়ি খোঁজা। আর চিঠি দিলেন তারকনাথকে। বৃন্দাবনে। জানিয়ে দিলেন, মঠের জন্য বাড়ি খোঁজা শুরু হয়েছে। খোঁজ মিললেই নরেন্দ্র তারককে টেলিগ্রাম করবেন। তার পাওয়া মাত্র তারককে কলকাতায় এসে মঠের হাল ধরতে হবে। তারক বৃন্দাবন থেকে কাশীতে এসে বসে রইলেন, অধিনায়ক নরেন্দ্রর কাছ থেকে কবে তার আসে, সেই প্রতীক্ষায়।
ভবনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন নরেন্দ্রর বন্ধু। বরানগরের ছেলে। নরেন্দ্রর কথামতো বাড়ি খোঁজা শুরু করেছিল সে। পাওয়াও গেল। টাকির জমিদার মুন্সিবাবুদের পোড়ো বাড়ি। গঙ্গার তীরে পরামানিক ঘাট রোডে। ছ-খানা ঘর। পেছন দিকটা ভাঙা। রাস্তা দিয়ে ঢুকলে খানিকটা খোলা জমি। সেটুকু পার হলে সিঁড়ি। সেটা দিয়ে উঠলে কাঠের রেলিং আর থামওয়ালা বারান্দা। ভিতরের দিকটা বাইরে থেকে দেখা যেত না। সেই ভেতরের অংশে এমন আবর্জনা আর জঙ্গল সৃষ্টি হয়েছিল যে সেটা শেয়াল আর সাপের বাসা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাড়িটার স্বত্বাধিকারী ভুবন দত্ত। মাসে মাসে ভাড়া ১১ টাকা। সুরেন্দ্র সে টাকা দিতে তৈরি ছিলেন। বাড়ি পাওয়ামাত্র খবর গেল তারকের কাছে। কাশী থেকে চলে এলেন তিনি। রাখালকে নিয়ে বলরাম বসুর বাড়িতে গেলেন নরেন্দ্র। সেখান থেকে নিয়ে এলেন ঠাকুরের ব্যবহৃত জিনিসপত্র। বরানগরের বাড়িতে একটা বিছানার ওপর বসানো হল রামকৃষ্ণের ছবি। সামনে রাখা হল তাঁর ব্যবহৃত চটিজোড়া। পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে, ধূপধুনো দিয়ে নিত্য পুজোর আয়োজন হল মোটামুটিভাবে। শুরু হল বরানগর মঠের যাত্রা। ইতিহাসের ধূসর পাতা সাক্ষী দিচ্ছে সাল–তারিখের হিসেব মেনে যাত্রা শুরুর দিনটা ছিল ১৯ অক্টোবর, ১৮৬৬, মঙ্গলবার।  
মাত্র মাস দু’‌য়েকের মধ্যে ঘটে গেল এত কিছু। রামকৃষ্ণ তাঁর মানসপুত্রকে বলে গিয়েছিলেন, ‘‌তুই ছেলেদের একত্রে রাখিস আর দেখাশোনা করিস।’‌ সে নির্দেশ অমান্য করার সুযোগ নরেন্দ্র পাননি।
বরানগর মঠে তখন তারক, কালীপ্রসাদ, বুড়োগোপাল নিত্য বাসিন্দা। লাটুও। কালীপ্রসাদ পরবর্তীকালে ‘আমার কথা’-য় লিখছেন, যাঁদের ঠিকঠাক বাড়ি ছিল না, তাঁরাই ‘প্রথমে বরাহনগর-মঠের নূতন ভাড়াবাড়িতেই বাস’ করতেন। নরেন্দ্র যাতায়াত করেন কলকাতার বাড়ি থেকে। শরৎ, শশী, হুটকো গোপালও তাই করত। সেসব দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পরবর্তীকালে লাটু অর্থাৎ স্বামী অদ্ভুতানন্দ বলেছেন, ‘‌লোরেন ভাই মঠে না থাকলে মঠ জমত না।’‌
সেই লোরেন ভাই মঠে থাকা শুরু করলেন আর একটা ঘটনার পর।
বাবুরামের বাড়ি ছিল হুগলি জেলার আঁটপুরে। বাবুরামের মা মাতঙ্গিনী দেবী সেবার ছেলের বন্ধুদের বললেন, বড়দিনের ছুটিতে সবাই যেন তাঁদের গ্রামের বাড়িতে আসে। বাবুরাম তখন কলকাতায়। প্রথমে ঠিক ছিল, বাবুরাম তো যাবেনই, সঙ্গে যাবেন নরেন্দ্রনাথ। কিন্তু কদিন পর দেখা গেল ইচ্ছুকের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। নরেন্দ্র, বাবুরামের সঙ্গে জুটে গেল শরৎ, শশী, তারক, কালী, নিরঞ্জন, গঙ্গাধর ও সারদা। সঙ্গে তবলা, বাঁয়া ও তানপুরা। বেড়াতে গেলে গান না হলে জমে নাকি? হাওড়া থেকে তারকেশ্বরের ট্রেনে উঠলেন ন’‌জন। ট্রেন ছাড়তেই শুরু হল গান। ‘‌শিব শঙ্কর ব্যোম ব্যোম ভোলা’‌, ‘‌ডুব ডুব ডুব রূপ সাগরে আমার মন’‌, ‘‌প্রভু, ম্যায় গুলাম, ম্যায় গুলাম, ম্যায় গুলাম তেরা’‌ ইত্যাদি। মূল গায়েন অবশ্যই নরেন্দ্র। ট্রেন হরিপাল স্টেশনে থামলে এক এক করে নেমে পড়লেন সবাই। সেখান থেকে ঘোড়ার গাড়িতে আরও আট কিলোমিটার পথ। সন্ধে হচ্ছে হচ্ছে এরকম সময় মাতঙ্গিনী দেখলেন ছেলের দল হাজির। হইহই করতে করতে। তিনিও দারুণ খুশি। খাবার-শোয়ার বন্দোবস্ত করতে করতে রাত এল নেমে।  
পরদিন ২৪ ডিসেম্বর, শুক্রবার।
ঠিক হল রাতে ধুনি জ্বালিয়ে জপ ধ্যান করবেন সবাই। কাশীপুরের বাগান বাড়িতে নরেন্দ্রর এ অভ্যাস ভাল মতোই ছিল। একদিন গিরিশ ঘোষ আর নরেন্দ্র ধ্যানে বসেছেন। মশার জ্বালায় গিরিশের ধ্যান ভেঙে গেল। চোখ খুলে দেখলেন, নরেন্দ্রর পুরো শরীর মশায় ছেঁকে ধরেছে। কিন্তু নরেন এত ধ্যানমগ্ন যে বার বার ডেকেও তাঁর সাড়া পাওয়া গেল না। গিরিশ একটু ধাক্কা দিলেন। নরেন্দ্রর অচৈতন্য শরীর পড়ে গেল। সেই নরেন্দ্র ধ্যানে বসেছেন। ধুনি জ্বালিয়ে। গুরুভাইদের সঙ্গে। 
শীতের রাত। আকাশভরা তারা। হঠাৎ যিশু খ্রিস্টের কথা বলতে শুরু করলেন। 
যিশু ক্রুশবিদ্ধ হয়ে লোকান্তরিত হয়েছেন বহুদিন। সল রোমান নাগরিক। তুরস্কের তরসাসে এক ইহুদি পরিবারে তাঁর জন্ম। যিশুকে নিয়ে তাঁর বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। একদিন দামাস্কাসের পথে যাচ্ছিলেন ঘোড়ায় চেপে। আচমকা মাটিতে পড়ে গেলেন। শুনলেন কেউ যেন পিছন থেকে ডাকছে তাঁর নাম ধরে আর বলছে, ‘‌সল, সল, আমায় কেন তোমরা ক্রুশে বিঁধে মারলে? আমার যে বড্ড লেগেছে।’‌ সল বললেন, ‘‌প্রভু, তুমি কে?’‌ উত্তর এল, ‘‌আমি যিশু, যাকে তোমরা মেরেছিলে।’‌
ঘটনার পর তিন দিন চোখে দেখতে পাননি সল। হাতড়ে হাতড়ে পথ চিনে পৌঁছেছিলেন দামাস্কাসে। 
সেই থেকে বদলে গেলেন সল। ফিরে পেলেন দৃষ্টিশক্তি। আর কাঁধে তুলে নিলেন খ্রিস্ট ধর্মের ক্রশ। হয়ে উঠলেন সন্ত পল। খ্রিস্ট ধর্মের জয়পতাকা বাহক। দেশে দেশান্তরে। 
শ্রীরামকৃষ্ণও অমৃতলোকে। মরভুবনে তাঁর কথা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য, তাঁর জয়পতাকা বইবার জন্য আছেন তাঁর সন্ন্যাসী শিষ্যরা। তাঁদেরও নিজেদের বদলে ফেলার সময় সমাগত। সামনে জ্বলছে আগুন। তাকে সাক্ষী রেখে ন’‌জন অমৃতস্য পুত্র শপথ নিলেন, আর ঘরে ফিরবেন না তাঁরা। সন্ন্যাস নেবেন। বরানগরের মঠই হবে তাঁদের নয়া ঠিকানা। সব্বাই জোট বেঁধে থাকবেন। একসঙ্গে। এক মন্ত্রে। অভিন্ন চৈতন্যের প্রজ্ঞায়। 
স্মৃতিচারণা করতে বসে স্বামী শিবানন্দ লিখেছেন, ‘‌ঠাকুর তো আমাদের সন্ন্যাসী করে দিয়েইছিলেন, ওই ভাব আরও পাকা হল আঁটপুরে।’‌
২৫ ডিসেম্বরের আগের শীতের রাতে বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে খোলা আকাশের নীচে নতুন জীবনের প্রতিজ্ঞা করলেন ন’‌জন নবীন। পরবর্তীকালের ন’‌জন গৈরিক তরবারি। সল বদলে গিয়েছিলেন সন্ত পলে। আর নরেন্দ্র, বাবুরাম, শরৎ, শশী, তারক, কালী, নিরঞ্জন, গঙ্গাধর ও সারদা বদলে গেলেন স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী প্রেমানন্দ, স্বামী সারদানন্দ, স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ, স্বামী শিবানন্দ, স্বামী অভেদানন্দ, স্বামী নিরঞ্জনানন্দ, স্বামী অখণ্ডানন্দ আর স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ পরিচয়ে। রামকৃষ্ণের বাণী ও ভাবনা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ন’‌জন সন্ত। 
সর্বধর্ম সমন্বয়ের জয়ধ্বজা পৃথিবীর কোনায় কোনায় পুঁতে দেওয়ার আয়োজন এভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ খুঁজে নিয়েছিল আজ থেকে ১৩৩ বছর আগে। হিন্দু সন্ন্যাসীর আবির্ভাব লগ্ন চিহ্নিত হয়েছিল খ্রিস্টীয় পরবের পুণ্যাহে। আমাদের এই বাংলাতেই।‌‌‌‌‌‌ ■

ছবি নির্বেদ রায় সঙ্কলিত সটীক ‘‌স্বামী বিবেকানন্দ:‌                আ পিক্টোরিয়াল ট্রিবিউট’ বইয়ের সৌজন্যে। প্রকাশক                     দি এশিয়াটিক সোসাইটি। 
 

জনপ্রিয়

Back To Top