তিরিশ–‌চল্লিশের দশকে নাকি ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের সন্ধেগুলো ভরে থাকত ইংরেজি গানের সুর, গ্লাসের ঠোকাঠুকি আর উচ্ছল হাসির আওয়াজে। বড়দিন বা নিউ ইয়ার্স ইভে তো কথাই নেই। ফুর্তির ফোয়ারা। ক্রিস্টমাস কেক বেকিং একটা বিরাট উৎসব ছিল অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারগুলোতে। ছিল বলছি, প্রসঙ্গটা ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ বলে। কলকাতা থেকে কালিকট, ক্রিশ্চানরা চিরকাল বড়দিন এলেই মেতে ওঠেন। কেক তৈরি সেই উৎসবের একটা অঙ্গ। কিন্তু আজকের ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের সঙ্গে কেক বেকিং, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, বিঙ্গো পার্টির যোজন যোজন দূরত্ব। বড়দিন আসে যায়, বড় জোর কেউ রাঁচি থেকে সস্তার কেক এনে সাময়িক পশরা সাজায়। অথচ একসময় বাংলোগুলো থেকে কেকের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ত শাল–‌মহুয়ার অরণ্যে। যাঁদের অনেক কেক বানানোর প্ল্যান থাকত, তাঁদের বাড়ির মেমসাহেবরা স্থানীয় বেকারির লোকেদের বাড়িতে ডেকে পাঠাত।
ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ থেকে ঘুরে এসে লিখলেন তপশ্রী গুপ্ত

এক রাতে ভুল করে চলে গেছিলাম ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ। সেটাই প্রথম যাওয়া। সঠিক বলতে গেলে, রাত দেড়টা নাগাদ নিজেকে অবিষ্কার করেছিলাম ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে। না, স্বপ্নে নয়। সত্যি গেছিলাম বছর তিরিশ আগে পথ ভুল করে। চ্যালেঞ্জ করলে সাক্ষী জোগাড় করতে পারব না। কারণ আমার সেদিনের সঙ্গী সহকর্মী তুহিন আর নেই। আসলে আজকাল কাগজ থেকে আমাদের পাঠানো হয়েছিল কলকাতা–জামশেদপুর মনসুন কার র‌্যালি কভার করতে। কলকাতা ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের হাতে যে কিট দেওয়া হয়েছিল, তাতে ছিল পথনির্দেশ, যাকে র‌্যালির ভাষায় বলে টিউলিপ। কিন্তু র‌্যালি–‌অভিজ্ঞ ছাড়া যে সেই টিউলিপের মর্মোদ্ধার করা অসম্ভব সেটা আমরা বুঝিনি। তাই মাঝরাস্তায় হারিয়ে গেছিলাম এবং আমাদের থেকেও বেশি চালাক–‌চতুর ড্রাইভারের কল্যাণে টিপটিপে বৃষ্টিতে নিশুতি রাতে পা রেখেছিলাম ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে। তাতে অবশ্য আমার বা তুহিনের যে কিছু এসে গেছিল, এমনটা ভাবা ভুল। তুহিন ছিল অস্তিত্বগত ভাবে যাকে বলে পার্পেচুয়ালি হাই আর আমার চিরকাল ভুলপথে হাঁটার নেশা। ফলে একটা তূরীয় আনন্দ আমাদের ঘিরেছিল সেই রাতে। তবে নির্জন রাস্তায় তুহিনের নানারকম সাহেবি নাম ধরে ডাকাডাকি এবং কোনও অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বাড়িতে কড়া নেড়ে কফি খাওয়ার ইচ্ছেতে আমি প্রবল বাধা দিয়েছিলাম, এটুকু মনে আছে।
আবার দেখা হল এতদিন পর, এই অক্টোবরে। সেটাও প্ল্যান করে নয়। বেতলা থেকে রাঁচি ফেরার পথে মনে হল একটু ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ ঘুরে গেলে কেমন হয়। ষোলো–‌আঠেরোর ভুল প্রেম যেমন চিরজীবন চোরাটানে জানান দেয়, সেরকমই আমাকে টানছিল ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ। রেল স্টেশনটা যেন পড়ে আছে সেই ব্রিটিশ আমলে। ছোট্ট, অলস, প্ল্যাটফর্ম আর লাইন একই লেভেলে। যদিও আমরা গাড়িতে আসছিলাম রাঁচি থেকে, রাস্তাটাই এমন যে ঢুকলাম স্টেশনের পাশ দিয়ে। এখানে বলে রাখা ভাল যে কলকাতা থেকে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ যেতে চাইলে ট্রেনে বা প্লেনে রাঁচি গিয়ে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে যাওয়াই ভাল। ঝাড়খণ্ডজুড়ে কোয়েল, ঔরঙ্গা, সুবর্ণরেখা, কোয়েনা–‌ অজস্র নদী। পথের ধারে কারও না কারও সঙ্গে দেখা হয়ে যাবেই। সেসব নদীতে চমৎকার বাঁক। নারীর কোমরের খাঁজের মতো মোহময় সেসব হঠাৎ মোড় নেওয়া নদী আর জলের ওপারে হালকা টিলার সারি যেন টেম্পারা ছবি। বারবার রং করে বারবার ধুয়ে ফেলার টেকনিকে উজ্জ্বল। সে যাই হোক, ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ স্টেশনটা দেখে আমার শিমুলতলার কথা মনে পড়ল। এরকম সব আশ্চর্য রেল স্টেশনের সঙ্গে দেখা হলেই বুকের মধ্যে অপার নির্জনতার বলয় তৈরি হয়। মনে হয়, এরকম একটা স্টেশনে আসার কথা অনেক আগেই দেওয়া ছিল কারওকে। কিন্তু সে কেন, কেউই আসবে না আমাকে নিতে। অনেক বছর আগে ভোররাতে বাগ এক্সপ্রেস থেকে শিমুলতলায় নেমে এরকম খালি হয়ে গেছিল ভেতরটা। এই ভরদুপুরে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের রেল লাইনের ধারে দাঁড়িয়ে সেই একরকম লাগল।
স্টেশনের ঠিক বাইরে গরমাগরম তেলেভাজা বিক্রি করছিল খাঁটি ঝাড়খণ্ডি যুবক। তার কাছে শকুর পাতায় চাটনি দিয়ে ডালবড়া আর চালের গুঁড়োর ইডলি টাইপ ধুসকা খেলাম ঝাল ঘুগনি দিয়ে। এবার ভেতর দিকে যাব সাহেবি বাংলো সন্ধানে। ইতিমধ্যেই গুগল জানিয়েছে, স্বাধীনতার বছর দশেক আগে ৪০০ ঘর অ্যাংলো ইন্ডিয়ান টিলা আর জঙ্গলে ঘেরা পালামৌর এই ছোট্ট জনপদে ঘর বাঁধলেও, ষাটের দশক থেকেই পলায়ন শুরু। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা সেই বিরল জাতি যাদের রীতিমতো প্ল্যান করে সৃষ্টি করা হয়েছিল। পৃথিবীতে হাতে গোনা এরকম কয়েকটাই মাত্র সম্প্রদায় আছে। ব্রিটিশ শাসকদের সাম্রাজ্যবাদী কৌশল বলা যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রীতিমতো উৎসাহ দিত সাহেব কর্মচারীদের ভারতীয় মেয়ে বিয়ে করার জন্য। এই সেতুবন্ধন তাদের উপনিবেশের ভিত শক্ত করবে বলে ধারণা করেছিল তারা। এমনকী ইয়োরোপীয় বাবা আর ভারতীয় মায়ের সন্তান হলে সেই আমলে পনেরো টাকা ইনাম মিলত। কলকাতা ব্রিটিশ শাসনের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এই শহরে অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের সংখ্যা বরাবরই বেশি।
স্বাধীনতার পর সারা দেশ থেকেই দলে দলে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা পাড়ি দিয়েছেন আতঙ্কগ্রস্ত অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা। কেন আতঙ্ক?‌ সেটা জানতে গেলে ফিরতে হবে ১৯৩৩ সালে যখন আর্নেস্ট টিমোথি ম্যাকক্লাস্কি নামে কলকাতার এক ব্যবসায়ী প্রথম ভাবলেন, কলোনি তৈরি করা দরকার। আইরিশ বাবা আর ভারতীয় মায়ের সন্তান টিমোথি হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান হওয়ার জ্বালা। ‘‌সাদা চুহা’‌, ‘‌কচ্চা সাহেব’‌ — কত বিদ্রুপ যে সইতে হত!‌ সেজন্যই তাঁর মনে হয়েছিল নিজভূমি দরকার। নয়তো মাথা উঁচু করে বাঁচা মুশকিল। ছোটনাগপুরের রাতুর রাজার কাছ থেকে ১০,০০০ একর জমি কিনলেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের জন্য মুলুক তৈরি করবেন বলে। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা না–‌ব্রিটিশ না–‌ভারতীয়, এই অস্তিত্ব সঙ্কটে বিপন্ন বোধ করছিলেন। তা ছাড়া যত উজ্জ্বল হচ্ছিল স্বাধীনতার সম্ভাবনা, তত ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় বুক কাঁপছিল অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের। তৈরি হল কলোনাইজেশন সোসাইটি। কলোনি গড়ে নিজস্ব স্পেসের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন ম্যাকক্লাস্কি। ম্যাকক্লাস্কি সাহেব যে নেহাত নাম কিনতে চাননি, আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন স্বজাতিকে আত্মসম্মান রক্ষার সুযোগ করে দিতে, তার প্রমাণ, তিনি বেঁচে থাকার সময় কিন্তু এই জায়গাটা তার আসল নাম লাপরা সেটলমেন্ট বলেই পরিচিত ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা নাম দিল ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ। ভাবলে দুঃখ হয়, একটু দূরেই জামশেদজি টাটার নামে জামশেদপুরকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেল পার্সিরা, তার ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের বেলায়।
অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা সঙ্গে করে এনেছিল ঢাউস পিয়ানো থেকে শুরু করে রাইফেল পর্যন্ত, সাহেবিয়ানার হরেক সরঞ্জাম। তিরিশ–‌চল্লিশের দশকে নাকি ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের সন্ধেগুলো ভরে থাকত ইংরেজি গানের সুর, গ্লাসের ঠোকাঠুকি আর উচ্ছল হাসির আওয়াজে। বড়দিন বা নিউ ইয়ার্স ইভে তো কথাই নেই। ফুর্তির ফোয়ারা। ক্রিস্টমাস কেক বেকিং একটা বিরাট উৎসব ছিল অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারগুলোতে। ছিল বলছি, প্রসঙ্গটা ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ বলে। কলকাতা থেকে কালিকট, ক্রিশ্চানরা চিরকাল বড়দিন এলেই মেতে ওঠেন। কেক তৈরি সেই উৎসবের একটা অঙ্গ। কিন্তু আজকের ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের সঙ্গে কেক বেকিং, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, বিঙ্গো পার্টির যোজন যোজন দূরত্ব। বড়দিন আসে যায়, বড় জোর কেউ রাঁচি থেকে সস্তার কেক এনে সাময়িক পশরা সাজায়। অথচ একসময় বাংলোগুলো থেকে কেকের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ত শাল–‌মহুয়ার অরণ্যে। যাঁদের অনেক কেক বানানোর প্ল্যান থাকত, তাদের বাড়ির মেমসাহেবরা স্থানীয় বেকারির লোকেদের বাড়িতে ডেকে পাঠাত। মা বা শাশুড়ির থেকে শেখা সিক্রেট রেসিপি থাকত তাঁদের কাছে। কেকের উপকরণ কিনত তারা নিজের হাতে। মিক্সিং, যা কিনা কেক তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, সেটা করতে হত গৃহিণীর কড়া নজরদারিতে। তারপর সেই ফ্যামিলির নাম লেখা ছোট–‌বড় বেকিং ট্রেতে ঢেলে আভেনে ঢোকানো হত। গুলিয়ে ফেললে গর্দান যাবে, ভালমতো জানা ছিল বেকারি মালিকের। রোদ পড়লে লনে ব্যাডমিন্টন খেলত দুরন্ত কিশোরীরা। সন্ধে নামলে বাংলোর সামনের সুঁড়িপথ ভরে থাকত পশ্চিমি সুরে, রেকর্ড প্লেয়ারে বাজত সিনাত্রা, ডিলান, কান্ট্রি মিউজিক— ‘‌স্ট্রবেরিজ, চেরিজ অ্যান্ড অ্যাঞ্জেল কিসিং স্প্রিং’‌। রবিবারের সকালে গির্জায় প্রার্থনা তো আসলে গেট টুগেদার। গঞ্জের স্থির জীবনে স্কার্ট–‌গাউন–‌হ্যাটের ফ্যাশন–শো। শীতকালে লনে বসত হাউজির আসর, সঙ্গে খানাপিনা। ডরোথির ফ্রুট ওয়াইন আর মেন্ডিসের এক ডজন চিতা শিকারের গল্প এখনও লোকের মুখে মুখে ফেরে।
বছর দুয়েকের মধ্যে ম্যাকক্লাস্কি মারা গেলেও তাঁর স্বপ্ন যে একেবারে ব্যর্থ হয়েছিল তা কিন্তু বলা যায় না। ১৯৩৯ সালের মধ্যে অন্তত আড়াইশো অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবার বসবাস শুরু করেছিল ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে। কিন্তু ম্যাকক্লাস্কি সাহেব যতটা আবেগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ‘‌লিটল ইংল্যান্ড’‌ তৈরির জন্য, সম্ভবত ততটা বাস্তববুদ্ধি তাঁর ছিল না। না হলে জাতভাইদের রুটিরুজির ব্যাপারটা নিয়ে নিশ্চয়ই আর একটু মাথা ঘামাতেন তিনি। ব্রিটিশ আমলে অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের অড়েকেই রেল, সেনাবাহিনী বা অন্য সরকারি চাকরি করত। কিন্তু স্বাধীনতার পরে সেই সুযোগ কমে এল। ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে এসে যারা ডেরা বাঁধল, তারা প্রথম দিকে মহা উৎসাহে চাষবাস করলেও, ক্রমশ বোঝা গেল, অভিজ্ঞতার অভাবে লোকসান বাড়ছে। ফলে পালাও পালাও রব উঠল ষাটের দশকে। আর আজ এই ২০১৯ সালে হাতে গোনা কজন পড়ে আছে। এবং তাদের অবস্থা সঙ্গিন।
ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে বেড়াতে গিয়ে পুরনো আমলের বাংলোর খোঁজ করলে তিনরকম দেখবেন। এক, পোড়ো বাড়ি–‌ যার দরজা, জানালা উধাও। ইট বেরিয়ে গেছে। জঙ্গলের ধারে গা–ছমছমে চিমনিওয়ালা সেই বাংলো যেন রাস্কিন বন্ড–‌এর গল্প থেকে উঠে এসেছে। তার থেকেও ভয়ের ব্যাপার হল, পরিত্যক্ত, অথচ ঢুকতে গেলে মাকড়সার জাল মুখে জড়িয়ে যায় না, চামচিকে ঝাপটা মারে না, আগাছা পা আটকে ধরে না। ফায়ার প্লেসের ওপর রঙিন গ্রাফিতি, সযত্নে ঝাড়ু দিয়ে একপাশে জড়ো করে রাখা আবর্জনা আর অবশ্যই খালি বোতল, পোড়া সিগারেটের টুকরো বলে দেয়, এখানে নিয়মিত কারাপ লোকের আনাগোনা আছে। দ্বিতীয় ধরনের বাড়িগুলোর বয়স হয়েছে, কিন্তু রং–‌টং করে কলি ফেরানো। বারান্দায়, লনে, বারমুডা, গামছা মেলা। ফটকে মুখার্জি বা আগরওয়াল যা হোক ফলক থাকতে পারে। এগুলো হস্টেল বা পেইং গেস্ট রাখার জায়গা। ১৯৯৭ সালে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে ডন বস্কো অ্যাকাডেমি আবাসিক স্কুল তৈরি হওয়ার পর অর্থনীতিতে একটা নতুন মোড় এসেছে। পাটনার অ্যাংলো ইন্ডিয়ান আলফ্রেড রোজারিও তাঁর সম্প্রদাযের দুর্দশা ঘোচানোর জন্য ব্যবস্থাটা মন্দ করেননি। দূর দূরান্ত থেকে ছাত্র আসে পড়তে। প্রথমে তিনি নিয়ম করেছিলেন, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছাড়া আর কেউ হস্টেল চালাতে পারবে না। কিন্তু কয়েক বছরেই এমন বেড়ে গেল ছাত্র যে অন্যরাও কোমর বেঁধে নেমে পড়ল। ‘‌‌অনেক বছর তো এমন অবস্থা হয়েছিল যেন ভুতুড়ে শহর। এখন রবিবারে কোনও সেলুনে ঢুকতেই পারবেন না, এত ভিড়। তা বলে ভাববেন না ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের দারুণ হাল ফিরেছে। কারেন্ট থাকে না অর্ধেক সময়। ভাল হাসপাতাল নেই একটা। অথচ দেখুন রাঁচি তেকে মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের পথ।’‌ আপশোস ঝরে পড়ল এক থেকে যাওয়া অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের গলায়। তৃতীয় কিসিমের বাড়িতে থাকে কিটি বা ব্র‌্যান্ডিসের মতো যারা ফল বেচে বা মুদির দোকান চালিয়ে দিন গুজরান করছে। উঁচু উঁচু সিলিং–‌এর জরাজীর্ণ বাড়ি। সেখানে মানুষ, ছাগল, মুরগির সহাবস্থান। সেখানে পলেস্তারা খসা দেওয়ালে ফ্রেমবন্দি হ্যাট–‌কোট–‌গাউন পরা স্মৃতির মুখ। তবে ইংরেজ, ফরাসি, পর্তুগিজ রক্ত শরীরে বওয়াটাকে আর অহঙ্কারের বিষয় বলে মানেন না এঁরা। বরং মনে করেন, গায়ের রংটা আর একটু কম ফর্সা হলে সুবিধে হত। আংরেজ কি আওলাদ বলে গাল শুনতে হত না কিংবা বেড়াতে আসা কলেজের ছেলেমেয়েরা দরজায় কড়া নেড়ে বলত না, অ্যাংলো দেখতে এসেছি।
দেশে এত জায়গা থাকতে পালামৌর অরণ্যে কেন ঘাঁটি গাড়ার কথা ভাবলেন ম্যাকক্লাস্কি সাহেব, এই কৌতূহল জাগতেই পারে। ম্যাকক্লাস্কির বন্ধু স্যর হেনরি গিডনি নাকি ব্রিটিশদের কাছে দরবার করেছিলেন আন্দামান–‌নিকোবরে জমি পাওয়ার জন্য। জনা দশেক অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের একটা দল পাঠানো হয়েছিল সরেজমিনে দেখে আসার জন্য। তাদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয় আন্দামানে। বাকি সাতজন ধুঁকতে ধুঁকতে ফেরত আসে দেশে এবং রিপোর্ট দেয়, আন্দামান–‌নিকোবর আদৌ কলোনি তৈরির উপযুক্ত জায়গা নয়। ব্রিটিশরা সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দেয় হেনরির প্রস্তাব। বরং অনেক বেশি বাস্তববুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলেন ম্যাকক্লাস্কি। পালামৌর অরণ্য বাঘ–‌ভালুকে ভরা ছিল ঠিকই। ছাগল–‌মুরগির খোঁজে চিতাবাঘের লোকালয়ে হানা দেওয়া বা ধান পাকলে হাতির হামলা সেই সময়ে ছিল রোজকার ঘটনা। সাঁওতাল অধ্যুষিত সেই জঙ্গুলে এলাকায় কী এমন সম্ভাবনা দেখেছিলেন তিনি?‌ ইতিহাস বলে, তিনি দেখেছিলেন উপনিবেশ গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় তিনটি জিনিস আছে এই এলাকায়। তিনটিরই ইংরেজি আদ্যক্ষর আর–‌ রেল, রিভার, রোড। সেখানেই লুকিয়েছিল তাঁর সাফল্যের রহস্য। যদিও সেই সাফল্য স্থায়ী হল না রোজগারের ব্যবস্থা না থাকায়।
পালামৌর অরণ্যের সঙ্গে অবশ্য বাঙালির পরিচয় বহু দিনের। সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে সত্যজিৎ রায়, বুদ্ধদেব গুহ থেকে অপর্ণা সেন— ছোটনাগপুর মালভূমির অসামান্য প্রকৃতির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন ওঁরাও আর বাঙালির হাসিকান্না, প্রেম–‌বিরহ। তবে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের সঙ্গে বাঙালির প্রেমের মূলে বুদ্ধদেব গুহ। সত্তর–‌আশির দশকে যারা ষোলো–‌আঠেরো–‌কুড়ি, তারা কোয়েলের কাছে, একটু উষ্ণতার জন্যে, খেলা যখন পড়ে জেনেছে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির শরীর–‌মন কী চায় আর কী পায়। দক্ষিণ কলকাতার রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা, টেনিস খেলা, কর্পোরেট চাকরি করা যুবক–‌যুবতীরা আদিম অরণ্যের পটভূমিতে কেমন মুখোশ খুলে ফেলে মানুষ হয়ে ওঠে, নতজানু হয় নিখাদ প্রেমের কাছে, নদীর সামনে প্রাণ খুলে কাঁদে, গোধূলির প্রান্তরে বিলিয়ে দেয় নিজেকে— পড়তে পড়তে সেই চৌকাঠে পা রাখা বয়সে মনে হত এ তো আমারই কথা। আমারও ছুটি কিংবা সুকুদা বলে কেউ আছে, যে তীব্র প্যাশনভরা চিঠি লেখে, জীর্ণ ফাটল ধরা বাংলোয় অপেক্ষায় থাকে অনন্তকাল, দেখা হলে কপালে আলতো চুমু এঁকে দেয়। সেই সবের চালচিত্রে জেগে থাকে এক এবং অদ্বিতীয় ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ। আসলে সেও একটা চরিত্র। জর্জ, লাবু, মালু, বুধিয়া, কার্নি মেমসাহেব, সাহাবাবু, শৈলেন ঘোষ, প্যাট, ফাদার মার্টিন— সবাই মিলেমিশে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ। ‘‌একটু উষ্ণতার জন্যে’‌–‌তে এত চমৎকার বর্ণনা আছে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের যে মনে হয় আমিও সুকুমার নামের অসুস্থ কিন্তু নিয়মভাঙা যুবকটির পাশে দাঁড়িয়ে আছি সত্তর–‌আশি বছরের পুরনো কোনও সাহেবি বাংলোর বেড়ার ধারে, একটু দূরে পিটিস ঝোপের আড়ালে তিরতিরে নালা বইছে, এক্ষুনি তিতির পাখির ডাকে চমকে উঠব। একটা–‌দুটো লাইন তুলে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। ‘‌‌এ জায়গাটায় সকাল হয় না, সকাল আসে। অনেক শিশিরঝরানো ঘাসে ভেজা পাহাড়ি পথ মাড়িয়ে অনেক শঙ্খিনী নদী পেরিয়ে সোনা–‌গলানো পোশাক পরে সকাল আসে এখানে।.‌.‌.‌ ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের প্রতিটি সকাল আমার জন্যে যেন কী এক আনন্দের পসরা সাজিয়ে আনে। প্রতিদিন এই ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে পূবের ও পশ্চিমের পাহাড়ের রোঁয়া–‌রোঁয়া সবুজের দিকে তাকিয়ে আমি বারে বারে নিজেকে ভুলে যাই।’‌
যে কোনও গঞ্জ শহরেরই যেমন সবচেয়ে জমজমাট জায়গা তার রেল স্টেশন, ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জেরও তেমন। আশির দশকে প্ল্যাটফর্মে কার্নি মেমসাহেবের চায়ের দোকান ছিল আড্ডা মারার জায়গা। বিশেষ করে বাঙালিবাবুরা, সে স্টেশন মাস্টার হোন কী হাওয়া বদলে আসা কলকাতার লোক, রোদ পড়লেই হাজির সেখানে। টুকটুকে সাজুগুজু করা কার্নি মেমসাহেবের চা তো বটেই, শিঙাড়া আর ভেজিটেবল চপেরও বেজায় নামডাক ছিল। অনেক সময় কলকাতা থেকে প্রিয়জনের আসার অপেক্ষায় বেঞ্চে বসে সময় কাটত মেমসাহেবের সঙ্গে গল্পগুজব করে। কার্নির মৃত্যুর পর সেই চায়ের দোকান চালাত এক কর্মচারী। আরও পরে এক সময় উঠেই গেল। আসলে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে মালগাড়ি দাঁড়ানোর সময় কমে গেল। এখন তো হাতে গোনা কটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন দাঁড়ায়।
তারপর ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের মুখ হয়ে উঠল কিটি মেমসাহেব। কিটি টেক্সেইরা। একসময় ফল বেচত স্টেশনে। ট্রেনের জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে তার কাছ থেকে কমলা, আপেল কিনত লোকে। পরে অবশ্য ছেলেমেয়েরা রোজগার করতে শুরু করলে আর কিটিকে ফলের ঝুড়ি নিয়ে বসতে দেখা যায়নি। আসলে যে কিটি ফর্সা, তার মুখখানা মিষ্টি, সেটা বুঝতে গেলে অন্যরকম চোখ লাগে। অগোছালো করে পরা শাড়ি আর বলিরেখার আড়ালে চাপা পড়ে গেছে তার স্কটিশ আদল। ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ নিয়ে যে কটা বই লেখা হয়েছে, যে কটা তথ্যচিত্র তোলা হয়েছে, তার প্রায় সবকটাতে কিটি। সে প্রথম থেকেই অন্যরকম, আদিবাসীদের সঙ্গে খোলামেলা মিশত, বিয়েও করেছে তাদেরই একজনকে, রমেশ। ছেলেমেয়েদের নাম অবশ্য রেখেছে সাহেবি কায়দায়— রবার্ট, সিলভিয়া, ইভনি, লিন্ডা।
জীবন চলিয়া গেছে আমাদের তিন কুড়ি বছরের পার!‌ সঙ্গে নিয়ে গেছে সবটুকু আলো। আজকের ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে যদি পৌঁছেই যান, ট্যুরিস্টের মন নিয়ে যাবেন না। প্রশ্ন করবেন না কী, কী দেখার আছে। ওসব ফেলে আসবেন রাঁচি, বেতলা, নেতারহাট, জামশেদপুরে। এখানে ঘুরে বেড়াবেন এক্কেবারে পথভোলা হয়ে। লালমাটির পথ বেয়ে কখনও উঠে যাবেন চড়াই ভেঙে অরণ্যের গভীরে, কখনও ডুগা ডুগি নামের জলধারার পাশে বসে থাকবেন চুপটি করে। দেখবেন সূর্যের সোনা মিশে ডুগি এক সময় হয়ে যাবে সুবর্ণরেখা, ছোটনাগপুরের মানুষ যাকে বলে সোনরেখা। সেন্ট জনস চার্চে যেতে পারেন, কিন্তু ভুলেও যাবেন না জাগৃতি বিহার নামে একই চত্বরে বিচ্ছিরি স্থাপত্যের মন্দির–‌মসজিদ, ভাঙা ঘরের গুরদোয়ারা আর অবহেলার কাঠের ক্রস পুঁতে রাকার ভাঁওতাবাজি দেখতে। বরং সন্ধেবেলা আধো অন্ধকার বারান্দায় ডেকে নিন কিটি মেমসাহেব, মেন্ডিজের মতো কারওকে। নির্ভেজাল বাংলায়, ভাঙা ইংরেজিতে, এমনকী ঠেঁট হিন্দিতেও গল্প করতে পারেন। এক সময় নিজেকে আবিষ্কার করবেন বিস্মৃত প্রদোষের আলো–‌আঁধারিতে। মনে হবে, এই জন্মে নয়, অন্য কোনও মায়ার দুনিয়ায় দেখা হয়েছিল, চেনা হয়েছিল এদের। বছর কয়েক আগে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের নিস্তরঙ্গ পুকুরে ঢেউ তুলেছিল কঙ্কণা সেনশর্মার শুটিং টিম। ‘‌আ ডেথ ইন দ্য গঞ্জ’‌। এবার কেউ কি একটা ডকুমেন্টারি করবেন — ‘‌ডেথ অফ গা গঞ্জ’‌?‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top