‘‌শ্যামবাজার থেকে বি টি রোড ধরে মাইল দেড়েক দূরে,.‌.‌.‌ স্টপে নেমে একটু গিয়ে বাঁদিকের রাস্তা জুড়ে একটা মস্ত পাঁচিল, ফায়ারিং স্কোয়াডের পাঁচিলের মতন নিষ্ঠুর একটানা;‌ শাদা। আত্মপ্রত্যয়ের অভাবে প্রতুলের অসংলগ্ন হাঁটার ঠিক আড়াই মিনিট লম্বা। পাঁচিলের পরে কাঠা চারেক খালি জমি। জমির ওপর শীতলা মন্দির। মন্দিরের পিছনে ছোট্ট শাদা বাড়ির দোতলাটা প্রতুলদের।’‌ 
পাঠক, ওপরের অংশটুকু দিয়ে শুরু হয়েছিল একটি বাংলা উপন্যাস— ‘‌এখন আমার কোন অসুখ নেই’‌ এবং ওটি ছিল উপন্যাসের নায়ক প্রতুলের বাড়ির পথনির্দেশ। ১১ জুলাই, ১৯৮০ সকালবেলা আমরা ওই নির্দেশ অবিকল অনুসরণ ক‌রে পৌঁছে গেলাম প্রতুলের দোতলায়। সেই ফায়ারিং স্কোয়াডের মতো একটানা পাঁচিল, সেই গ্রিল দেওয়া দক্ষিণ খোলা বারান্দা, সেই শীতলামন্দির সব হুবহু। তবে ফ্ল্যাটে প্রতুল নয়, পাওয়া গেল সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে। আজ বুঝতে পারি উপন্যাসের ঐ প্রতুল ৯০%‌ সন্দীপন ছাড়া আর কে?‌ ফ্ল্যাটে দুটি কামরা। একটিতে সবুজ চক দিয়ে লেখা ৭১এ ও অপরটিতে ৭১বি লেখা। মহা–‌মুশকিল!‌ ৭১/‌বি–এর জানালাগুলো ছিল পর্দাহীন ও খোলা। আমরা আর কিছু না ভেবে ৭১/‌বি–তে ঢুকি। সিঙ্গল চৌকিতে পাশ বালিশে মাথা রেখে কাত হয়ে শুয়ে তখন সন্দীপন পড়ছিলেন আলবেয়ার কামুর নোটবুক। এখন, সত্যি, ওঁর কোনও চশমা নেই। কেন না ওঁর চোখে দেখলুম বহু পুরনো এবং পরিত্যক্ত একটি মেয়েলি চশমা, বোধহয় স্ত্রীর। উঠে বসে প্রথমেই বলে উঠলেন:‌ বাট ইজ দেয়ার অ্যান ইভনিং অফ লাইফ‌?‌ হতচকিত আমরা কী করব বুঝতে না পেরে দুটি চেয়ারে বসে পড়ি। দে’‌জ মেডিক্যালের ছবিহীন ইয়ার–‌ক্যালেন্ডারের বিভিন্ন তারিখের গায়ে হিজিবিজি, মন্তব্য— বেলাদি ২৪৩০৮৫.‌.‌.‌3pm‌ কফিহাউস সেন্ট্রাল (k)...start সোরবিলিন...বরুণদের বাগানবাড়ি...। একটি তারিখের গায়ে ‌: ‘‌এমন ঘটনা যেন জীবনে না ঘটে’‌ (‌লালকালিতে)‌। তৃণা, ওঁর একমাত্র মেয়ে, পরে আমাদের জানাল ওই মন্তব্যটা তাকে কেন্দ্র করে লেখা। এ ঘরে লেখার কোনও সরঞ্জাম নেই,—খাতা, কলম, এমনকী লেখার টেবিলও নেই। আছে খানকয়েক বই, দেওয়ালে কার যেন আঁকা একটা বড় মাপের ছবি আর আছে অজস্র পরিত্যক্ত ওষুধের শিশি, লিভ ফিফটি–‌টু, ক্লোরাম্বিন, সিলিন, অ্যালকাসাইট্রন...এই সব। আর, একটা নোংরা চিরুনি। পাশেই রান্নাঘর, বুঝতে পারি। কেন না সেখান থেকে ভেসে আসছে কাপ– ডিস, থালাবাটি, কড়ায় খুন্তি ঘষার আওয়াজ— প্রতুল যাকে বলে ‘‌নন এসেনসিয়াল সাউন্ডস’‌ যত্তসব।’‌ ওখানে রয়েছেন ওঁর স্ত্রী শ্রীমতী রিনা চট্টোপাধ্যায়, যাঁকে নাকি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘‌রান্নাঘরের রানি’‌। মেয়ে তৃণা একবার এ–‌ঘরে এসে জানিয়ে যায়, ‘‌বাবা, অনন্ত এখনও আসেনি।’‌ কে অনন্ত?‌
এখন সকাল আটটা। হঠাৎ সন্দীপন বলতে শুরু করেন, ‘‌আমি একজন সামান্য...’‌। আমি বাধা দিয়ে বলি— ‘‌এসব আপনি পরে বলবেন’‌। উনি তবু বলতে শুরু করেন...
স.‌চ:‌ আমি প্রথমেই বলতে চাই যে আমি একজন সামান্য মানুষ। আমার কোনও প্রতিভা নেই। মাথার পিছনে কোনও জ্যোতি নেই। আমি লেখক নই। 
‌• তার মানে, শুরুতেই ব‌লে নিলেন যে এ কারণেই আপনি একজন অসাধারণ, প্রতিভাবান, জ্যোতির্ময় এবং লেখক। 
স.‌চ:‌ এটা তো তুমি বললে!‌
• বেশ মানলুম আপনি লেখক নন। সব সময়েই এসব বলেন। কিন্তু এই যে ‘‌বিপ্লব ও রাজমোহন’‌ গল্পটা...এর লেখক তবে কে?‌ কেন যে এসব বলেন?‌ সরল বাক্যে বলুন। 
স.‌চ:‌ এ কথাটা আমি বারবার বলি নানা কারণে। আমার ক্ষেত্রে I exist therefore I write. একজন নগণ্য মানুষ হিসেবে এই existence–এর যেটা উল্টো—I write therefore I exist‌— এ রকম ধারণা বা তার ভয়াবহ আরতিই আমাকে কম লেখক ও বেশি সামান্য মানুষ তৈরি করেছে। দ্বিতীয় কথা হ‌ল মানবসমাজের মাইক্রোস্কোপিক অংশ হল লেখক–শিল্পী এবং একজন লেখক বা শিল্পীর যেটুকু অংশ ক্রিয়েটিভ তা এতই সামান্য যে সবচেয়ে ক্ষমতাবান মাইক্রোস্কোপেও ধরা পড়বে না। বুঝতেই পারছো, কী নগণ্য সময় একজন লেখক বা শিল্পী তাঁর লেখা বা শিল্পের জন্য ব্যয় করেন। এবং মনে রাখতে হবে, প্রায় আপামর লেখক দিয়ে থাকেন যা দেওয়া যায় অর্থাৎ তাঁর পরিত্যাজ্য অংশটুকু, যেমন—নখ, চুল, লোম ইত্যাদি। পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাসের জীবনানন্দ বা কাফকার মতো লেখক আর ক‌জন— যাঁরা কেবল তাঁদের অপরিত্যাজ্য অংশ রেখে গেছেন?‌ অপরিত্যাজ্যকে দিতে পারি না— তাই লেখক ভাবি না। 
• শুরুতেই পৃথিবীর সাহিত্য, তার ইতিহাস, জীবনানন্দ, কাফকা। 
স.‌চ:‌ কথাটা বলতে হ‌ল— কুড়ি বছর ধরে আমাদের চারপাশের কথা ভেবে। চল্লিশের দশক থেকে গোটা পঞ্চাশের দশকের লেখকদের মোটামুটি এই বক্তব্য ছিল:‌ ‘‌আমরা সবাই এসেছি গাটার থেকে। কিন্তু ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল— অর্থাৎ সাহিত্য— তাই, লক্ষ করো, আজ আমরা এ কোথায়!‌’‌ এই বক্তব্য ছিল কর্মবীর আলামোহন দাসেরও। প্রাক্‌ চল্লিশ যুগ পর্যন্ত এ শুধু তাঁকে মানাত। পরে দেখছি, এটা লেখক–শিল্পীদের ক্ষেত্রেও দিব্বি মানিয়ে যাচ্ছে। এজন্যেও আর নিজেকে লেখক বলি না। 
• দেখুন, আপনার ক্ষেত্রে ‘‌কম লেখক’‌ ব্যাপারটা বুঝতে পারি। কিন্তু ‘‌বেশি মানুষ’‌—তো বোঝা যাচ্ছে না। 
স.‌চ:‌ বেশি মানুষ বলতে আমি বোঝাচ্ছি, সাধারণ মানুষ, আরও বেশি সামান্য মানুষ। 
• সাধারণ মানুষ যা যা ক‌রে থাকে তার তো কিছুই আপনাকে করতে দেখি না, যেমন ধরুন রেশন আনা, রাস্তার কল থেকে জল তোলা, পানের পিক ফেলে বেলা ১০টায় অফিস পৌঁছোনো। অন্নপ্রাশনের নিমন্ত্রণে যান কি?‌
স.‌চ:‌ জল তোলে আমাদের বাড়িতে অনন্ত (‌ভারী),‌ রেশন আনে ছোটখুকি (‌পরিচারিকা),‌ অনন্ত যেমন একজন worthy‌ ভারবাহক, তেমনি অামি একজন উত্তরোত্তর worthy সাধারণ মানুষ হয়ে উঠছি। একজন সাধারণ মানুষের মধ্যেই তো যত অসাধারণত্ব। এর জন্য কানা, খোঁড়া, সেক্স–‌ম্যানিয়াক, ইমপোটেন্ট, পাগল বা মার্ডারার কারও দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন নেই। একজন লেখক হওয়ার তুলনায় একজন লেখকের আদর্শ চরিত্র হয়ে উঠেছি এ–‌ভাবে। লেখক হতে চাই না। 'I write therefore I am'— হতে চাই না। 
• সময় নেই বেশি, পূষন, তুমি ‘‌বিপ্লব ও রাজমোহন’‌ প্রসঙ্গে কিছু বলবে?‌
• হ্যাঁ, রাজমোহন প্রথম নিজে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল, রমার জামাকাপড়ে আগুন দিতে চেয়েছিল এবং পরে লাহিড়ীকে মারতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষে কোনওটাই না ক‌রে সে তার বই–এর র‌্যাকে আগুন ধরিয়ে দিল। এটা কি খুব ‌একটা ভায়াবেল অলটারনেটিভ?‌
স.‌চ:‌ এর উত্তর গল্পের মধ্যেই আছে। এবং তা খুব ওবভিয়াস। রাজমোহন প্রথমে যা করতে চেয়েছিল শেষে তা–‌ই করল। আত্মহত্যা। যা তার বিপ্লব। অলটারনেট কই করল?‌
• এই একটা গল্পের ব্যাপারে আপনার বেশ দুর্বলতা আছে, যেটা আপনার কথাবার্তায় মাঝে মাঝে বোঝা যায়। এটা কি আপনি একটি ইউনিক স্টোরি ব‌লে মনে করেন?‌
স.‌চ:‌ প্রায় সমস্ত বাঙালি লেখক নিজের সম্বন্ধে হামবাগ ধারণা রাখে যে— আমরা লেখক, তাই লিখি। এ গল্প সেই বাহুল্য বর্জিত। সাহিত্যে যে বাস্তবতা আমরা পেয়ে থাকি তা জাগর জীবনের। তুলনায় স্বপ্নের বাস্তবতা অনেক বেশি শক্তিশালী। আমার ধারণা গল্পটা profound indifference‌ বা bitterness থেকে লেখা হয়েছে এরকম মনে হতে পারে কিন্তু একইসঙ্গে এর যে কোনও দু‌টি পাতার ফাঁকে profound peace বা happiness-এর ইলিউশন থেকে গেছে। এরকম সহাবস্থান, সমন্বয় ও তাদের বিরোধিতা— জীবনে অভিজ্ঞাত বাস্তবতা ও শিল্প বা স্বপ্ন–‌বাস্তবতার—
• আপনার বাংলা সাহিত্যের পড়শোনাটা একটু জানতে হচ্ছে। 
স.‌চ:‌ এরকম প্রশ্ন খানিকটা উদ্ধত করে দেয়। বলতে ইচ্ছে ক‌রে, এর উত্তর ভাল একজন প্যাথোলজিস্ট দিতে পারে। কেন না, যা পড়েছি তা তো বায়োলজির অন্তর্গত হয়ে গেছে। স্টুল, ইউরিন, ব্লাড এসবে পাবে। 
• এড়িয়ে–‌যাওয়া কথা হল না?‌
• হ্যঁা। এসব স্টান্ট কথাবার্তা শুনতে একদম চাই না। কই কোনও প্যাথোলজিস্টের রিপোর্টে সাহিত্যের column‌ তো দেখি না। 
স.‌চ:‌ হ্যাঁ থাকে। তোমার সেরকম প্যাথোলজিস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি, অামার হয়েছে। যাই হোক, পড়াশোনা ব্যাপারটায় অামি কোনওদিন তেমন গুরুত্ব দিইনি। সর্বান্তকরণে জীবনযাপনই আমাদের শ্রেষ্ঠ পড়াশোনা। তা ছাড়া জানোই তো আমার স্মৃতি বলে কিছু নেই।
• আজকাল কি কিছুই পড়ছেন না?‌
স.‌চ:‌ আমার বুক শেলফ–‌এ মাত্র ১০টা বই ধরে। নতুন বই এলেই পুরনো বই ফেলে দিতে হয়। এখন পড়ছি সিঙ্গারের দুটো–‌একটা গল্প, আর কামুর নোটবুক আবার এবং আবার। এই বই দুটি আবার এসেছে ব‌লে ফেলে দিতে হয়েছে মঁতেন–‌এর অটোবায়োগ্রাফি আর শ্যামলের ঈশ্বরীতলার রূপকথা। পঞ্চম নোটবুকে কামু এক জায়গায় বলছেন:‌ সারাদিন পাখিরা এলোমেলো ঘোরে, কিন্তু সন্ধেবেলা তারা একটা direction ‌পায়। এত ব‌লে তিনি একটাই প্রশ্ন রেখেছেন:‌ But is there an evening of life? ভাবা যায়!‌ এরকম প্রশ্নের মুখোমুখি এখনও হয়েছি ব‌লে তো মনে পড়ে না। দাঁত পর্যন্ত সশস্ত্র লাগছে!‌
• শুনেছি— ক্রফোর ফারেনহাইট 451 ‌ছবিটা দেখে ‘‌বিপ্লব ও রাজমোহন’‌ লিখেছিলেন। 
স.‌চ:‌ ওটা ঠিক শোনোনি। বা, বেশ ভুল শুনেছো। আমার গল্প ১৯৬৯–‌এ লেখা। প্রথম মিনিবুক। তখন ফারেনহাইট 451–‌এর কেউ নামই শোনেনি। ছবিও দেখিনি। গল্পটার সোর্স জানতে চাইলে বলব— আমাদের পাড়ায় যখন বন্দুকের নল থেকে বিপ্লব বেরোচ্ছিল, তখন একদিন অরূপরতন (‌বসু)‌ আমাদের বাড়িতে আসে। কথার–‌কথা হিসেবে অরূপ আমার ওই ছোট বুক–‌সেলফটা দেখে হঠাৎ ব‌লেছিল:‌ আমরা আর কী বিপ্লব করতে পারি!‌ বড় জোর আমাদের বইগুলো পুড়িয়ে দিতে পারি। অরূপের ওই কথাটা থেকেই গল্প। 
• এই গল্পটা নাকি আপনি লেখেননি, প্রথমে টেপরেকর্ডারে মুখে ব‌লে গিয়েছিলেন!‌‌
স.‌চ:‌ এই একটি মাত্র গল্প যা আমি সত্যি সত্যিই লিখিনি। মুখে ব‌লেছিলাম। এর ভাষা শুধু এই জন্যে ইউনিক!‌ ওই সময় আমার ভাই ডাঃ চিত্তরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় আমেরিকা থেকে আমার জন্যে একটা টেলিফাঙ্কেন টেপরেকর্ডার আনে। চার ট্রাকে যেটা ১৮০ মিঃ চলে। ওটা নিয়ে কী করব বুঝতে না পেরে ওখানে গল্পটা বলতে শুরু করি। সাতদিন ধরে মোট প্রায় ঘণ্টা কুড়ি বলি আর ইরেজ করি। পরে ওখান থেকে প্রয়োজনীয় অংশটুকু লিখে নিই। মুখে বলেছিলাম ব‌লে ‘‌তো, এই হচ্ছে রাজামোহন’‌ থেকে ‘‌তো’‌ অব্যয়টি পাই যা বাংলা সাহিত্যকে দেওয়া আমার সংক্রামক উপহার। এমনকী শ্রদ্ধেয় বিমল করও ওটি ব্যবহার করেছেন। প্রসঙ্গত বলি, এই গল্পের এমন একটা লাইন নেই যা আমার আত্মজৈবনিক হুবহু–‌ঘটনা নয়। এমনকী, রাজমোহনের প্রতি রমার ওই ডায়লগ— ‘‌আমি গুণ্ডা লাগাব.‌.‌.‌হাত পা ভেঙে আমার কাছে ফেলে দিয়ে যাবে’‌— এই উক্তিটিও আমার স্ত্রী রিনা কোনও কারণবশত আমাকে হুবহু বলতে বাধ্য হয়েছিলেন। ‌
• আপনার শ’‌তিনেক বই সমেত র‌্যাকটা?‌ ওটা কই পোড়েনি তো!‌
স.‌চ:‌ শ’‌তিনেক নয়, ভুল দেখছো। ওতে ঠিক দশটাই বই আছে, বাকিগুলো বই নয়, ফেলে দিয়েছি। হ্যাঁ, এ ব্যাপারেও, গল্পে যেমন আছে— শেলফটা আমি আমাদের দমদমের বাড়িতে থাকার সময় ওই উপিন্দর সিং নামে একজন ছুতোরকে দিয়ে তৈরি করিয়েছিলাম। ডিজাইন আমার। রং নিজে করেছি। তবে পোড়া ব্যাপারটা.‌.‌.‌সিঙ্গারের গল্পে.‌.‌.।‌
• কামু গেল। আবার সিঙ্গার!‌
স.‌চ:‌ হ্যাঁ, সিঙ্গারের গল্পে একজন ভদ্রমহিলাকে পেয়েছিলাম, যিনি রুমাল নাড়ালে দেখা যেত তাঁর হাতে আগুন, পরমুহূর্তেই সেটা আবার রুমাল হয়ে যায়। আমার বুক শেলফটা ওভাবেই পুড়েছিল। পুড়েছিল আবার থেকেও গেছে। তবে গল্পে যখন গীতবিতান পোড়ে তখন তার ভেতর ছিল একটা শুকনো ঝাউপাতা। ওই ঝাউপাতাটা যদি সত্যিই না থাকত,  তা হলে আগুন জ্বলে ওঠার কোনও প্রয়োজন হত না, মানে গল্পে আর কী!‌ ঝাউপাতাটা দেখবে পূষন?‌
• পোড়া?‌
স.‌চ:‌ না। 
• কোনও প্রয়োজন নেই। একটা ব্যাপার বেশ পরিষ্কার হ‌য়ে গেল। আপনি, আপনার বুক শেলফ‌, আপনার লেখালেখি ইত্যাদি সবই basically reactionary‌ ব্যাপার। রাজনৈতিক–‌অর্থনৈতিক কাঠামো সম্বন্ধে আপনার কোনও ধারণা নেই। যা খুশি সিদ্ধান্ত নেন। যা ইচ্ছে যায় বলেন। কাজেই আপনার গল্প থেকে ‘‌বিপ্লব’‌ শব্দটি তুলে নিলে আমি খুশি হব, অর্থাৎ শুধু—‘‌রাজমোহন’‌। 
স.‌চ:‌ এরও কি উত্তর দিতে হবে প্রশান্ত?‌
• নিশ্চয়ই। 
স.‌চ:‌ শোনো, বিপ্লব সম্পর্কে পূষনের দেখছি বেশ একটা ‘‌পেগান আইডিয়া’‌ আছে। লরেন্সের যেমন ছিল নারী নিয়ে:‌ তুমি আর আমি। আর সূর্য। তেমনি বিপ্লব আর পূষন। পূষন ছিপ ফেলেছে, শালা, ফাতনা কেন নড়ে না!‌ বিপ্লব মানে তো আমার–‌কেন–‌রিকেটি–‌বউ এবং বাহাত্তর ইঞ্চি পাছার ‌dialectics নয়। পৃথিবীজুড়ে বিপ্লব এখন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। এখন পরাজয়ের সময়। কিন্তু এই পরাজয় যে victory–‌চেতনা দেয় সেসম্পর্কে সচেতনতাই বিপ্লবী চেতনা। ওই পেগান যৌন উপভোগ যা দিতে পারে তা নিঃসন্দেহে ব্যর্থতাবোধ। ফিউটিলিটি অফ সেক্স তখনই আসে, যা আনে আবার ভার্জিন হ‌য়ে ওঠার প্রশ্ন। এই হ‌ল বিপ্লবী প্রক্রিয়া। এরকম একজন বিপ্লবী বা সচেতন বার্থ পেগান যা পারে তা হ‌ল ক্রমাগত পরাজয়ের কথা স্বীকার করা। যা এক মরালিটির জন্ম দেয়, পরবর্তী জেনারেশনের জন্য। এই মরালিটি থেকে জন্মায় নতুন আশা। রাজমোহনের কাছ থেকে ‘‌বিপ্লব’‌ কেড়ে নিলে তা হবে সর্বহারার পা থেকে শৃঙ্খল কেড়ে নেওয়া।
•‌ বিপ্লবী বলতে তো বুঝি, মার্কুইস দা সাদ‌, জাঁ পল মারা, গুয়েভারা, মাও–‌সে–‌তুং। রাজমোহন কি এরকম কারওর মতো হয়ে উঠতে পেরেছে?‌
স.‌চ:‌ রাজমোহন এদের মতো হ‌তে যাবে কোন দুঃখে। গল্পটাতে এক জায়গায় আছে দেখবে ‘‌জলের তলায় তাকে মানায় না। রাজমোহনকে, সে ভেবে দেখেছে। সে রোহিণী নয়। সে গ্রেফও নয়;‌ রোহিণীকে মানায়, সে রাজমোহন।’‌ বা রেল লাইনের ধারে পড়ে থাকা এক খণ্ড কাটা হাত, রাজমোহন ছুঁয়ে দেখেছিল বইকি, হ্যাঁ, রাজমোহন, রাজমোহনই তো, রাজমোহন ছুঁয়েছিল’‌। অতএব, বিপ্লবীদের যে লিস্টি তুমি রাখলে, তার পরে লেখো— এবং রাজমোহন।
•‌ মনে পড়ছে, গল্পটা লেখার আগে একটি চিঠিতে কৃষ্ণগোপাল মল্লিককে লিখেছিলেন, এমন একটা ভাষা খুঁজছি যা দিয়ে লেখা যায়। তা, সেই ভাষা কি আপনি পেয়েছিলেন?‌
স.‌চ:‌ এই গল্পে, হ্যাঁ, একবার পেয়েছিলাম। তারপর আর পাইনি। সেই ভাষাতেই আমি বলি গল্পটা। কীরকম জানো?‌ একটা গ্লাস কেসের মধ্যে ভোজ্যবস্তু। গ্লাসকেসটা হল ভাষা। ভোজ্যবস্তুরও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মাছির (‌পাঠকের)‌ শুঁড় ডোবানোর সুযোগ এখানে নেই।
•‌ আপনি নাকি এক সময় কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার ছিলেন?‌ স্বাধীনতা, নতুন সাহিত্য ইত্যাদি কাগজে লিখেছেন, শুনেছি।
স.‌চ:‌ আমি কমিউনিস্ট পার্টির ক্যান্ডিডেট–‌মেম্বার ছিলাম ১৯৫০/‌৫১ সালে যখন কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ছিল। তখন হাওড়ায় থাকতাম। কদমতলা লোকাল কমিটিতে ছিলাম। কমরেডদের মধ্যে ছিলেন হরপ্রসাদ ঘোষ, বনবিহারী চক্রবর্তী। বনবিহারী পরে পয়লা মে এম–‌এল পার্টির ঘোষণা সভায় কানু সান্যালের সঙ্গে মনুমেন্টের নীচে বক্তৃতা করেছিলেন। হরপ্রসাদদা, হাওড়া জেলা কমিটির সভ্য।
• পোস্টার মেরেছেন কখনও?‌ পার্টির কাগজ বিক্রি?‌
স.‌চ:‌ ভোরে উঠে পোস্টার মারতে যেতাম। ক্লান্ডেস্টাইন, স্বাধীনতা এইসব পত্রিকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিক্রি করেছি। ওইসব কাগজে লিখেছি। বিশ্বনাথ মুখার্জির স্ত্রী গীতা মুখার্জি তৎকালীন গ্রেস সিনেমার সামনে ‘‌কমরেড রেজিস্ট করুন’‌ বলে হাঁক দিলে, দোকান থেকে জলের ট্যাঙ্ক নামিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করেছি। মহম্মদ আলি পার্কে লাঠিও খেয়েছি.‌.‌.।‌
•‌ কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সরে এলেন কেন?‌
স.‌চ:‌ ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত এর জের কম–বেশি চলেছিল। তারপর দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘‌পরিচয়’‌ পত্রিকা থেকে আমার ‘‌বিজনের রক্তমাংস’‌ গল্পটি প্রত্যাখ্যান করলে আমার সাহিত্য–‌চেষ্টা তার নিজের অববাহিকা খুঁজে নেয়। হ্যাঁ, আমি এখনও একজন কমিউনিস্ট। আমার শ্রেণি–‌সঙ্ঘর্ষ সম্পর্কে চেতনা এখন প্রখরতর এবং এর উৎস আজ মার্কসবাদের অনেক অতীত থেকে— ওল্ড টেস্টামেন্টের ‘‌প্রোপার্টি ইজ রবারি’‌ থেকে, মহাদেবের জটা থেকে বলা যায়।
•‌ আপনার লেখা সম্পর্কে অনেকের অভিযোগ যে আপনার লেখা বড় রিপিটেটেড.‌.‌.‌ একই কথা বার বার বলেন।
স.‌চ:‌ আমার মূল চরিত্র একটা। বিজন, অংশু, রাজমোহন, প্রতুল, এ যাবৎ এই চারটি নামে। বিজন বছর পঁচিশ, অংশু মধ্য তিরিশ এবং রাজমোহন উত্তর চল্লিশে অর্থাৎ যখন আমি যে বয়সে তখনই ওসব লেখা। আমি তো একটাই লোক, অনেককে নিয়ে লিখব কী করে?‌ একে রিপিটেশন বলে না।
•‌ কিন্তু আমাদের সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতা তো এরকম নয়। নিজেকে ছাড়া কি একজন লেখক আর কিছু লিখবেন না?‌
স.‌চ:‌ হ্যাঁ, আর এক রকমের সাহিত্য রয়েছে। সেখানে ‘‌চিনি গো চিনি তোমারে’‌র ব্যাপার। সে লেখা পড়ে পাঠক গালে হাত দিয়ে ভাববে, আরে, এ তো আমারই জীবন। এ উনি জানলেন কী ক‌রে?‌ পাঠিকা ভাববে, কাণ্ড দ্যাখো, নারী–‌চরিত্র যা নাকি দেবতাদেরও অজ্ঞাত তাও ওঁর নখদর্পণে!‌ পাঠকের সারফেস জীবন এখানে লেখকের দ্বারা উপস্থাপিত জীবনের সঙ্গে দিব্বি মিলে যায়। একেই জনপ্রিয় বা জনতাপ্রিয় সাহিত্য বলে।
•‌ আপনার সাহিত্য–‌ধারণাটা কীরকম?‌
স.‌চ:‌ জীবন আসলে মানুষের Surface Reality‌–‌তে অভিজ্ঞাত জীবনের চেয়ে অনেক বেশি নিষ্ঠুর, ভযাবহ, রোমহর্ষক ও সুখকর। স্বপ্নের কাম, ক্রোধ, ভালবাসার সঙ্গে জাগরণের কাম, ক্রোধ, ভালবাসা ইত্যাদির তুলনা করলেই এ ব্যাপারটা বোঝা যাবে। আমি এই সাহিত্য ধারণায় বিশ্বাসী। আগেই বলেছি বাংলায় জীবনানন্দর উপন্যাস, গল্পে এই জিনিস পাওয়া যায়। আসলে স্বপ্ন হচ্ছে পরিপূর্ণ রিয়্যালিটি। কারণ সজাগ জীবনকে বিন্দুমাত্র অবলম্বন না ক‌রে স্বপ্ন হয় না।
•‌ আপনি যে পরিপূর্ণ রিয়্যালিটির কথা বললেন তা কি বাংলা লেখকদের মধ্যে বেশি পাওয়া যায়?‌
স.‌চ:‌ না। এর কারণ অধিকাংশ বাঙালি লেখক এসেছেন মফস্‌সল থেকে বা গ্রাম–‌গঞ্জ থেকে। অনেকেই পূর্ববঙ্গ থেকে। মতি নন্দী ছাড়া চট করে নাগরিক লেখকের কথা মনে আসে না।
•‌ তা হলে নাগরিক না হলে কি লেখক হওয়া যায় না?‌
স.‌চ:‌ হবে না কেন!‌ ফেলিনি গ্রাম থেকে.‌.‌.।‌
•‌ এত লেখক থাকতে চলচ্চিত্রকার ফেলিনি আসছে কেন?‌
স.‌চ:‌ হঠাৎ ফেলিনিকেই মনে পড়ল আর কী?‌.‌..‌‌ আর, জীবনানন্দর কথা আগে বলেছি, তা, ফেলিনি গ্রাম থেকে রোমে আসেন যুব বয়সে। তাঁর ‘‌লা দলচেভিতা’‌ দেখে রসোলিনি মন্তব্য করেছিলেন—a provincial film. ‌তা ‌‘‌‌লা দলচেভিতা’‌ যদি provincial film ‌হয়, তা হলে ভেবে দেখো, আমাদের নাগরিক ছবিগুলো কোথায় দাঁড়াবে। পরে ফেলিনি ‘‌সাড়ে আট’‌ এবং ‘‌অ্যামারকর্ড’– এর মতো ছবি করেছেন।
•‌ কমলকুমার মজুমদারকে কি তা হলে নাগরিক লেখক বলা যাবে?‌
স.‌চ:‌ উনি একজন আপাদমস্তক provincial writer, ‌উনি তো এলিটিস্ট। জাতপাতে বিশ্বাস করতেন। তাঁর লেখা হ‌ল অভিজাতদের জন্য অভিজাত দ্বারা অভিজাত লেখা।
•‌ একজন লেখকের জীবনযাপন কীরকম হওয়া উচিত বলে মনে করেন?‌
স.‌চ:‌ লেখককে somehow happy ‌থাকতেই হবে। তিনি হয়তো লিখবেন B‌itterness ‌নিয়ে but he must be happy. ‌তাঁর মাথা থাকবে শ্যামলে শ্যামল আর নীলিমায় নীল হ‌য়ে।
‌•‌ কিন্তু Happy ‌থাকা কি সমসময় সম্ভব হয়?‌
স.‌চ:‌ যতক্ষণ সম্ভব হবে শুধু ততক্ষণই একজন লেখক লিখবেন। গ্রীষ্মে, বর্ষায়, শরতে, হেমন্তে সবসময় লিখতে কে বলছে।
•‌ তা, ওই Happyness–‌এর precondition ‌গুলো কী, কী বলে আপনি মনে করেন?‌
স.‌চ:‌ আমি তো ভাই বলব,— তাঁর একটি সুতৃপ্ত যৌবনজীবন থাকা দরকার। তিনি ক্ষুধিত থাকবেন না। তিনি পাবেন একটু নিঃস্বর নির্জনতা। তাঁর ঘুম হবে, পায়খানা হবে স্বাস্থ্যবান, প্রস্রাব ক‌রে তিনি হবেন নির্ভার। একটা পাগলের যা যা দরকার আর কী!‌
•‌ আপনার লেখার সোর্স কী?‌
স.‌চ:‌ হ্যাপিনেস।
•‌ আপনার Marital ‌এবং extramarital affair ‌সম্পর্কে কিছু বলুন।
স.‌চ:‌ এর উত্তর ‘‌এখন আমার কোন অসুখ নেই’‌তে আছে।
•‌ কিন্তু সে তো গল্প।
স.‌চ:‌ আগেই বলেছি আমি বানিয়ে কিছু লিখতে পারি না। সমস্ত লেখা আমার আত্মজীবনী বলা যেতে পারে।
• এই যে, এতদিন, মানে প্রায় বছর ২০ তো লিখলেন–টিখলেন। পাঠক–‌পাঠিকাদের কথা ভাবেন কখনও?‌
স.‌চ:‌ বেশি পাঠক পায় মাস–‌মিডিয়া। লেখককে তাঁর পাঠক তৈরি ক‌রে নিতে হয়। যাঁরা এভাবে তৈরি হয়ে ওঠেন শুধু তাঁরাই লেখকের পাঠক। বাকি সব মিডিয়ার পাঠক। আমি জানি, অল্পসংখ্যক হ‌লেও আমার পাঠক আছে, এবং তাঁরা পড়লেই আমি খুশি। মিডিয়ার পাঠক নিয়ে আমি ভাবি না।
•‌ সেটা নিয়ে তা হলে ভাবে কারা?‌
স.‌চ:‌ কেন, মিডিয়া একাদশ?‌ সকলেই দেখি থরহরি কাঁপছে— এই বুঝি দ্বাদশব্যক্তি হয়ে গেলাম। ওই বুঝি অতি ভৈরব হরষে আর একজন এসে গেল!‌ বুঝলে, ট্র‌্যাজিক অবস্থা। আমার মতো করুণাজীবীও এদের করুণা করে।
• আপনাকে তো প্রায়ই বড় কাগজ বা যাকে আমরা establishment ‌বলি, তাদের বিরুদ্ধে নানান কথা বলতে বা লিখতে দেখি। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, আপনার দুটো বড় লেখা দুটি বড় কাগজ আনন্দবাজার এবং অমৃততে প্রকাশিত হয়েছে।
স.‌চ:‌ এটাই কি প্রমাণ করে না যে আনন্দবাজার বা অমৃত আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। মাত্র একটা ক‌রে উপন্যাস— কুড়ি– বাইশ বছরে?‌
•‌ প্রত্যাখ্যান কি আপনি করেছেন?‌ আবার লিখতে বললে লিখবেন না?‌
স.‌চ:‌ ভয় নেই, আর বলবে না।
•‌ আপনার সঙ্গে একমত হতে পারছি না। একটু অন্য কথা বলি।
স.‌চ:‌ আরও কথা আছে?‌ ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!‌ তাড়াতাড়ি বলো।
•‌ আপনাকে যদি একজন কবিতার প্রথম শ্রেণির পাঠক ব‌লে মনে করি। আপনার লেখায় কবিতার ভূমিকা কতটা?‌
স.‌চ:‌ কবিদের সান্নিধ্যেই আমি আমার লেখার প্রেরণা পেয়েছি। শুধু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা কাম্যু পড়লে আমি লিখতে পারতাম না। জীবনানন্দ দাশ পড়ে বুঝি, আমার লেখা দরকার। তবে, এটা বলতে পারি আমার লেখা বাংলা গদ্য ও পদ্য দুই থেকে সমান দূরে। গদ্যও নয়, পদ্যও নয়, এ অন্য কিছু।
•‌ সাম্প্রতিক বাংলা কবিতা সম্পর্কে কিছু বলুন।
স.‌চ:‌ সাম্প্রতিক কবিদের কথা মনে হ‌লে আমার সামনে এখন একটাই ছবি ভেসে ওঠে। একটা বিরাট ঈগল যার ১২ ইঞ্চি নখ বের করে গৃহস্থের বাছুর নিয়ে উড়ে যাওয়ার কথা এবং যে উড়েছিল। সে আজ মুখ থুবড়ে ওই পড়ে আছে। তার চারদিকে ঝোপ থেকে ঝোপে কেবল ফুড়ুৎ শব্দ।
•‌ এবার শেষ করব। শেষ প্রশ্ন। গত এক বছরে আপনার পড়া উল্লেখযোগ্য বই, দেখা ফিল্ম, উল্লেখযোগ্য ভ্রমণস্থান, প্রিয় মানুষ, বন্ধু, মহিলা, শ্রেষ্ঠ খাওয়া পানীয় ও খাবারের নামগুলো বলুন।
স.‌চ:‌ যথাক্রমে Seize the day (Saul Bellow), ‌‌সাড়ে–‌আট (‌ফেলিনি)‌, রাজাভাতখাওয়া (‌ডুয়ার্স)‌, ডাঃ বি.‌এল.‌ মিত্র, বরুণ চৌধুরি, স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়, বাকার্ডি (‌জিন)‌, পমফ্রেট ভাজা (‌কনটিকি রেস্তোরাঁ)‌।

‌এখন বেলা তিনটে। চারদিক বেশ চুপ হয়ে গেছে। ওঁদের এই বাড়িটিও। সাক্ষাৎকার শুরু হয়েছিল সেই সকাল আটটায়। কখন যে এত বেলা হ‌ল। ওঁদের মেয়ে তৃণা এখন স্কুলে। পরিচারিকা পাশের ঘরে ঘুমিয়ে। ওঁর স্ত্রী কখন স্কুলে চলে গেছেন, বুঝতেই পারিনি। তাঁর বোধ হয় ফেরারও সময় হয়ে এল। এখন, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা স্টোভের শব্দ নেই, নন এসেন্সিয়াল সাউন্ড নেই, নেই ভারী অনন্তর জল আনা বা বাড়ি বদল প্রসঙ্গ। নিস্তব্ধতার মধ্যে আমরা চটপট স্নান সেরে যাই ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ভাত খেতে। খাবার টেবিলে গিয়ে দেখি, ওটি আসলে খাদ্যদ্রব্যের টেবিল। থালা রাখার জায়গা নেই। মুগের ডাল, দুটি মুড়ো–সহ অন্তত ১২ পিস কাটা পোনা, দু রকম মধুর তরকারি এবং আরও মধুর সেই আম চিনির প্লাস্টিক চাটনি। একসময় আমি যথাসাধ্য মনঃসংযোগ করি একটি মাছের মুড়োয়। পূষন আর সন্দীপন তখন সব শেষ করে চাটনি খাচ্ছিলেন। তারপর যথাসময়ে অর্থাৎ যথাসময়ের একটু পরেই আমি চাটনি মুখে দিই। আহা!‌ আজও মুখে লেগে আছে। ‘‌রান্নাঘরের রাণী’‌কে সেদিন বাহবা দেওয়া হয়ে ওঠেনি। ছাপার অক্ষরে আজ বাহবা দিয়ে আমার তাঁকে জিজ্ঞাস্য:‌ আবার কবে খাব?‌‌

‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top