রবীন্দ্রনাথ প্রচলিত সাহেবি শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধী ছিলেন বলেই সত্যেন্দ্রনাথের মতো প্রচলিত পথে তিনি অগ্রসর হননি, তবে কখনও ফাঁকিবাজিকেও তিনি প্রশ্রয় দেননি। তাঁর প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের ধূসর পাতাগুলি উল্টেপাল্টে দেখলে বোঝা যাবে কী পরিশ্রম আর শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের বিকল্প বিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। রবি ঠাকুরের ‘সচলায়তন’ নিয়ে লিখলেন বিশ্বজিৎ রায়

খেয়াল করে দেখেছি স্কুল-পালানে রবীন্দ্রনাথই বাঙালির সবচেয়ে বড় বন্ধু এবং সবচেয়ে বড় শত্রু। প্রচলিত নিয়মকানুনের বাইরে গিয়ে যে শেষ পর্যন্ত সফল হওয়া যায়, তার বড় উদাহরণ স্কুল-পালানে রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের দাদা সত্যেন্দ্রনাথ একেবারেই কপিবুক ভাল ছাত্র। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ শেষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ইংল্যন্ডের রানির কাছে ক্ষমতা গেল, ভারতীয়রা প্রত্যক্ষভাবে ইংল্যান্ডেশ্বরীর প্রজা হলেন। প্রজা হয়ে অবশ্য প্রথম শ্রেণির নাগরিকের মতো সুযোগ-সুবিধে সব মিলল না, তবে কিছু কিছু তো মিলল। যেমন সিভিল সার্ভিসে ভারতীয়রা যোগ দেওয়ার অধিকার পেলেন– সে সুযোগ কাজে লাগালেন ঠাকুরবাড়ির ভাল ছাত্র সত্যেন্দ্রনাথ।  
উদ্যোগপতি দ্বারকানাথের পরিশ্রমে ঠাকুরবাড়িতে ধনলক্ষ্মী প্রবেশ করেছিলেন। পুত্র দেবেন্দ্রনাথের পিতা দ্বারকানাথের মতো অর্থনৈতিক উদ্যম ছিল না। এজন্য দ্বারকানাথ দেবেন্দ্রকে চিঠিতে বকাবকিও করেছিলেন। তবে মহর্ষির এই পুত্রটি পিতার মতো জমিদারিতে আর আধ্যাত্মিক সামাজিকতায় নিজেকে মজিয়ে রাখেননি। রানির প্রজা হয়েই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিলেন– তিনিই রানির ভারতের প্রথম আইসিএস। সাধে বলে লেখাপড়া করে যে গাড়ি–ঘোড়া চড়ে সে! অনুজ রবির পক্ষে সত্যেন্দ্রনাথের কপিবুক ভাল ছাত্রের মডেলটি অনুসরণ করাই অনিবার্য ছিল।  
রবি কিন্তু তা করলেন না। কপিবুক ভাল ছাত্র তিনি হতে পারলেন না, তবে জীবনে সফল হলেন। কিশোর রবির ইস্কুল পালানোর গল্প তো বাঙালি-জীবনের জনপ্রিয়তম মিথ। রবীন্দ্রনাথ ইস্কুল পালিয়েও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কবি। অনেক বাঙালিই নিশ্চয়ই এই উদাহরণ মাথায় আর মনে রাখেন। প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে সাফল্যলাভের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথই তাঁদের আদর্শ। তাই বলছিলাম, স্কুল-পালানে রবীন্দ্রনাথের কথা বাঙালিকে সাহস জুগিয়েছে, যে আমাদের সাহস জোগায় সেই তো আমাদের বন্ধু। স্কুল পালানে রবীন্দ্রনাথও আমাদের বন্ধু। 
আবার এই স্কুল-পালানে রবীন্দ্রনাথের ইমেজ বাঙালির বড় শত্রু। উদ্যমী বাঙালির বিপরীতে বঙ্গজদের আরেক রূপও আছে। চাঁদের যেমন আলো থাকে, তেমন অন্ধকারও থাকে। সেই অন্ধকার রূপে বাঙালি জন্ম ফাঁকিবাজ। বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় ‘গৃহসুখপরায়ণ অলস’। পরিশ্রম না করে শর্টকাটে সফল হওয়ার নেশা তার মজ্জাগত। এই ফাঁকিবাজ বাঙালিরা ভাবে রবীন্দ্রনাথ যখন ইস্কুল থেকে পালিয়ে সফল হয়েছিলেন, তখন আমরাও বুঝি ফাঁকিবাজি করে সফল হতে পারব। রবীন্দ্রনাথ এদিক দিয়ে যেন ফাঁকিবাজির ‘আইকন’। এই ভাবনা থেকে আম-বাঙালির অনেকেই রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকেই ফাঁকিবাজির ভরকেন্দ্র বলে মনে করেন। তাঁরা ভাবেন, এই প্রতিষ্ঠানটির সবাই খালি মনের সুখে নাচ-গান করে, ছবি আঁকে। গাছতলায় ক্লাস হয় বলে বিন্দুমাত্র পরিশ্রম না করলেও চলে। এমন অলস জীবন কাটালে আর নিয়মহীনতার নৈরাজ্যে গা ভাসালে যে–কোনও জাতির পতন হবেই। বাঙালিও বাদ যাবে না। এদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের স্কুল পালানে ভাবমূর্তি বাঙালির শত্রু।   
এই ভাবনার গোড়াতেই কিন্তু গলদ। রবীন্দ্রনাথ প্রচলিত সাহেবি শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধী ছিলেন বলেই সত্যেন্দ্রনাথের মতো প্রচলিত পথে তিনি অগ্রসর হননি, তবে কখনও ফাঁকিবাজিকেও তিনি প্রশ্রয় দেননি। তাঁর প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের ধূসর পাতাগুলি উল্টে-পাল্টে দেখলে বোঝা যাবে কী পরিশ্রম আর শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে তিনি নিজের বিকল্প বিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। আসলে আমরা ভুলে যাই প্রচলিত মান্য পথে এগিয়ে যাওয়া বিকল্প পথে এগিয়ে যাওয়ার থেকে তুলনায় সহজসাধ্য। মান্য পথকে অতিক্রম করে অন্য পথে এগোতে চান যাঁরা, তাঁদের পরিশ্রম করতে হয় আরও বেশি। তাঁদের চলার পথ তো কাটা নেই, পথ তাঁদের নতুন করে কাটতে হচ্ছে। 
রবীন্দ্রনাথ চেনাপথে চলার সাধারণ মানুষ ছিলেন না, তিনি নতুন পথ তৈরি  করেছিলেন। পথ তৈরি করতে হয় যাঁদের, তাঁদের নিজেদের সংশোধন করতে করতে ঠোক্কর খেতে খেতে এগোতে হয়। রবীন্দ্রনাথকেও তাই করতে হয়েছিল। তিনি প্রচলিত ইস্কুল ব্যবস্থার বিরোধিতা করলেও নৈরাজ্যকে প্রশ্রয় দেননি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ রয়েছে ‘অচলায়তন’ নাটকটিতে। এমনিতে ‘অচলায়তন’ শব্দটি রবীন্দ্র–নাটক ফেরতা হয়ে বাঙালির ব্যবহারে বিশেষ অর্থ লাভ করেছে। যা কিছু নিয়মসর্বস্ব তাকেই বাঙালি অচলায়তন বলে দাগিয়ে দেয় এবং ‘ভাঙ ভাঙ কারা’ বলে লাফিয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের ‘অচলায়তন’ নাটকটি কিন্তু মোটেই নিয়মহীনতাকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়নি। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকারকে উৎসর্গ করা এই নাটকে নিয়মসর্বস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঁচিল ভেঙে দেওয়া হল বটে, কিন্তু নাটক সেখানেই শেষ হয়ে গেল না। ব্রাত্য শোণপাংশুর দল পাঁচিল ভেঙে দিয়ে ‘বিপ্লবী’ দাদাঠাকুরকে বলে, ‘দেয়াল তো একটাও বাকি রাখি নি। এখন কী করব?’ দাদাঠাকুর তখন তাদের একটা কাজ দেন। বলেন, ‘নূতন সৌধের সাদা ভিতকে আকাশের আলোর মধ্যে অভ্রভেদী করে দাঁড় করাও। মেলো তোমরা দুই দলে, লাগো তোমাদের কাজে।’ পুরনো নিয়মসর্বস্বতার দেওয়াল ভাঙার পর নতুন সৌধ গড়ে তোলা চাই। আত্মসংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ছাড়া নতুন কিছু গড়া কঠিন। রবীন্দ্রনাথ ইংরেজ উপনিবেশের নিয়ম–কানুনওয়ালা শিক্ষা ব্যবস্থা নিজের জীবন দিয়ে অস্বীকার করেছিলেন, তার পরিবর্তে গড়ে তুলেছিলেন বিকল্প এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলস্য আর ফাঁকিবাজিকে কিন্তু মোটেই বড় করে তোলেননি। নূতন সৌধ নির্মাণের শ্রমে ক্রমে যোগ্য মানুষদের সামিল করে নিতে চেয়েছিলেন। 
এই শ্রমে নিজের প্রিয় সন্তানকেও নিবেদন করতে দ্বিধা করেননি। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ আশ্রম বিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। ২০ আগস্ট ১৯০৯ তারিখে লেখা চিঠিতে মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানিয়েছেন, ‘এমন জায়গায় সুখী লোকের ছেলের স্থান নাই। আপনি ত জানেন রথীও এখানকার মোটা রুটি খাইয়া মানুষ হইয়া গিয়াছে।’ মোটা রুটি কথাটি আলঙ্কারিক অর্থে নয়, আক্ষরিক অর্থেই ব্যবহার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ওই চিঠিতেই অভিভাবকদের প্রতি গভীর একটি নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। ‘আদুরে ছেলেদের আদর ঝাড়াইয়া দেওয়াই তাহাদের পক্ষে সবচেয়ে বড় শিক্ষা। ইহাতে যে অভিভাবক কষ্টবোধ করেন, তাঁহারা নিজের কোলের উপরে বসাইয়াই ছেলের সর্ব্বনাশ করিতে পারেন তাহাতে কেহ বাধা দিবে না।’ এমন চিঠি যিনি লিখতে পারেন তিনি আর যাই করুন আলস্য ও নৈরাজ্যের ইস্কুল গড়ে তুলতে চাইতে পারেন না।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতিষ্ঠানে একই সঙ্গে দুয়ের সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছিলেন। সেখানে যেমন শৃঙ্খলা থাকবে, তেমনি থাকবে মুক্তি। ব্রহ্মচর্যাশ্রমের গোড়ার দিকে তাঁর নানা লেখায় বারবার শৃঙ্খলার প্রসঙ্গ এসেছে। বিদ্যালয় পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য নানা কায়িক শ্রমের নির্দেশ দিয়েছেন। ‘যেখানে কোন ছাত্রের কাপড় কম আছে সেখানে সে যেন কাপড়কাচা সাবান দিয়া স্বহস্তে প্রত্যহ নিজের কাপড় কাচে – ও ব্যবহার্য্য গাড়ু মাজিয়া পরিষ্কার রাখে’(অক্টোবর ১৯০২, মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখিত পত্র)। ‘ছেলেদের মধ্যে যাহারা নিতান্ত বিকৃতিগ্রস্ত তাহাদিগকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র করিয়া শারীরিক পরিশ্রমের কাজে বেশি করিয়া নিযুক্ত করিয়া দিবেন। এইরূপ ছেলেদের ছুতার বা কামারের কাজে রীতিমত ভিড়াইয়া দিলে নিশ্চয়ই তাহাদের উপকার হইতে পারে।’ (৬ জানুয়ারি ১৯০৮, ভূপেন্দ্রনাথ সান্যালকে লিখিত পত্র) ‘প্রত্যেক বালক একটি করিয়া বৃক্ষরোপণ করিবে এবং প্রত্যহ দুইবেলা তাহার তলা খুঁড়িয়া তাহাতে জলসেচ করিবে–গাছের গোড়ায় শুষ্কপত্রের সার দিয়া যাহাতে গাছগুলি বাড়িয়া ওঠে তাহার চেষ্টা করিবে।’ ( ৪ নভেম্বর ১৯০৯, ক্ষিতিমোহন সেনকে লিখিত পত্র) এই কায়িক শ্রম একরকম শৃঙ্খলার বোধ তৈরি করে। কায়িক শ্রম যেমন ছিল, তেমন ছিল মুক্তির নানা পথ।
প্রকৃতির মধ্যে মিলত মুক্তি। শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রম সংলগ্ন উদার প্রকৃতির কথা নানা জনের লেখায় ফিরে ফিরে এসেছে। আর মুক্তি মিলত নানা অনুষ্ঠানে। সেই অনুষ্ঠান কিন্তু বৈচিত্র‌্যহীন ছিল না। প্রতি বছর যে একই রকম অনুষ্ঠান করা হত তাও নয়। রবীন্দ্রভবনে রাখা রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডায়েরিতে ১৯২৯–এর মার্চ মাসে বসন্তোৎসব পালনের একটি বিবরণ পাওয়া যায়। রথীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতিতে তখন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। লিখেছেন, ‘আজ সকালে ভোর থেকে উৎসব শুরু হয়েছিল। ৬।।টার সময় আমতলায় সকলে উপস্থিত হয়েছিলেন।’ রথীন্দ্রনাথ তৎসম ‘আম্রকুঞ্জ’ না লিখে আমতলাই লিখেছেন। আমতলা শব্দটি ঘরোয়া। অনুষ্ঠানের বিবরণের মধ্যেও সেই আমেজ আছে। সকালে তো গান আর আবির খেলা হল। আর বিকেলে? রথীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন, ‘বিকালে কলাভবন থেকে নন্দবাবু ও সুরেনবাবু এক চমৎকার fancy dress party সাজিয়েছিলেন। ভারতবর্ষের নানারকম types এক একজন সেজেছিলেন – আর একজনকে বর সাজিয়ে এই সব বিভিন্ন বরযাত্রী সমভিব্যাহারে বর উত্তরায়ণে বিবাহ করতে উপস্থিত হলেন। সেখানে বরযাত্রীদের অভ্যর্থনার উপযুক্ত ব্যবস্থাই ছিল–কলাবউয়ের সঙ্গে বরের বিয়েও দেওয়া হোলো।’ খেয়াল করার বিষয় এই যে অনুষ্ঠানের মধ্যে ‘রাবীন্দ্রিকতা’ ছিল না। ‘রাবীন্দ্রিকতা’ তখনও এখনকার মতো ‘রিচুয়াল’ হয়ে ওঠেনি। সজীব বৈচিত্র‌্যময় সেদিনের সে অনুষ্ঠান। রথীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘এই সব ঘটার পর একটা ছোট অভিনয় দিয়ে সকলকে entertain করা হোলো। অভিনয়টা একটু নতুনরকম হয়েছিল। একটা জাপানী পুতুলের দোকানের ঘটনা–মেয়েরা মুখোস পরে পুতুল সেজেছিল।’ বসন্তোৎসবের সন্ধেবেলা কেবল রবীন্দ্র–নাট্যই পরিবেশন করতে হবে এমন বিধি তখনও গড়ে ওঠেনি বলেই হয়তো আশ্রমিকদের মধ্যে নানা কৌতূহল সজীব ছিল। তার মানে অবশ্য এই নয় যে তাঁরা গুরুদেবের সৃষ্টিতে আনন্দ পেতেন না। খুবই পেতেন। রবীন্দ্রনাথের নতুন নতুন গানে, নাটকে আশ্রমিকেরা মুক্তির স্বাদ যে পেতেন তাতে সন্দেহ নেই। তবে ‘কেবল রবীন্দ্রনাথ’ই তাঁদের অবলম্বন ছিল না।  
এই যে আনন্দ তার মধ্যে সংযম আর শৃঙ্খলার অভাব দেখা দিলেই সচেতন হয়ে উঠতেন আশ্রম কর্তৃপক্ষ। অসংযত পড়ুয়াদের প্রয়োজনে আশ্রম থেকে চলেও যেতে হয়েছে। ১৯ জুলাই ১৯০৮ সালে অজিতকুমার চক্রবর্তীকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘...কে অনতিবিলম্বে বিদায় করে দেবে। বিকৃতিই যখন এই ছেলেটির পক্ষে প্রকৃতিগত তখন আমরা এর কোনো উপকার করতে পারব না মাঝের থেকে অন্য ছেলেদের বিপদে ফেলা হবে। কি আর বলব!’ একজনের অসংযম যাতে অন্যদের মধ্যে সঞ্চারিত হতে না পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা। ১৯১৩ সালের জানুয়ারি মাসে নেপালচন্দ্র রায়কে চিঠিতে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘মনকে অতিশয় আনুকূল্য করলে তার স্বাভাবিক সৃজন চেষ্টার আনন্দকে আচ্ছন্ন করে দেওয়া হয়।’ কথাটা কেবল যে মনের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ সত্য বলে মনে করতেন তাই নয়, শরীরের ক্ষেত্রেও সত্য বলে মনে করতেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে শরীরকে ‘অতিশয় আনুকূল্য’ দেওয়ার বিধি ছিল না। এমনকী অভিভাবকেরা তাঁদের পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্যের উপকরণ বিদ্যালয়ের আঙিনায় ঢোকাতে চাইলে আটকানো হত। ‘কোন ছাত্রের অভিভাবক কোন বিশেষ খাদ্যসামগ্রী পাঠাইলে অন্য ছাত্রদিগকে না দিয়া তাহা একজনকে খাইতে দেওয়া হইতে পারিবে না।’ (১৩ নভেম্বর ১৯০২, কুঞ্জলাল ঘোষকে লেখা চিঠি) অসচেতন অভিভাবকেরা যেমন ছিলেন তেমনই ছিলেন সংবেদনশীল সচেতন অভিভাবক। ইন্দিরা তখন শান্তিনিকেতনের ছাত্রী। আশ্রমের মোটা খাওয়া–দাওয়া পছন্দ হচ্ছে না তাঁর। পিতাকে চিঠি লিখছেন মেয়ে, খাওয়া–দাওয়া নিয়ে নানা অভিযোগ। জওহরলাল মেয়ের সেই আদুরে কথা কানে তোলার পাত্র নন। গুরুদেবের প্রতিষ্ঠানে মেয়ের খাওয়া–দাওয়ার স্বাচ্ছন্দ্য না–জুটলেও প্রকৃত শিক্ষা যে হবে সে বিষয়ে তাঁর মনে দ্বিধা নেই।
রবীন্দ্রনাথ তখন পেনাঙে, তাই রথীন্দ্রনাথই সামাল দিচ্ছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যত্ন করে খাতায় লিখে রাখছেন আশ্রম পরিচালনার খবরা–খবর। খাতার গোড়ায় বিভাগওয়ারি ‘সূচি’। সেই সূচিতে ক্রমান্বয়ে ছিল ‘দৈনিক কর্ম্মের তালিকা/শিশুবিভাগ (ছাত্রদের নাম)/ বিদ্যালয় অধ্যাপক দিগের নাম/ স্কুলের ছাত্রদের নাম/ নারীভবন/ কলাভবন/ বিদ্যাভবন/ শিক্ষাভবন (College Dept)/ লাইব্রেরি/ আপিস/ Guest House/ রান্নাঘর/ কারখানাঘর/ ছাপাখানা/ আরোগ্যভবন (Hospital)/ সমবায় ভাণ্ডার/ ছাত্রাবাস’ এই সূচি দেখলে প্রতিষ্ঠানটির গঠন সম্বন্ধে ধারণা স্পষ্ট হয়। পিতার অনুপস্থিতে কোথাও যেন অনিয়ম তৈরি না হয় সে–বিষয়ে রথীর যত্নের শেষ নেই। এমন কী বাইরে থেকে কেউ এসে ফাঁকি দিয়ে যাতে আশ্রমের অর্থ নিয়ে চলে না যান সে বিষয়েও তিনি সজাগ। রথীন্দ্রনাথের ১৯২৯–এর ডায়েরিতে ছোট্ট কিন্তু তীক্ষ্ণ তির্যক মন্তব্য অধ্যাপক তারাপুরওয়ালা প্রসঙ্গে। ‘Dr. Tarapurwala আজ এসেছেন–দু চারদিন থেকে কতকগুলো বক্তৃতা দিয়ে ওঁর প্রফেসরি কাজ সেরে চলে যাবেন। এত সহজে ফাঁকি দিয়ে বছরে ১৮০০ কেউ কখনো নেয়নি। এর প্রতিবিধান হওয়া উচিত।’ তারাপুরওয়ালা সম্বন্ধে এই মন্তব্য অবশ্য অনেকেরই না–পসন্দ হতে পারে। রবীন্দ্রনাথও বাইরে থেকে বিদ্যালয়ের খোঁজ–খবর জানতে রথীন্দ্রকে চিঠি লিখতেন। সেখানে নানা পরামর্শ থাকত। সেই চিঠি রথীন্দ্র সুযোগ পেলেই অন্যদের পড়ে শোনাতেন। লিখেছেন রথীন্দ্র, ‘আজ পেনাঙ্‌ থেকে ডাক এসেছিল। বাবা যাদের চিঠি লিখেছিলেন দেবার আগে চা চক্রে সবাইকে শুনিয়ে তারপর বিলি করলুম। আগেকার চিঠিও কতকগুলো পড়লুম। বিদ্যালয়ের নানা বিষয়ে আলোচনা আছে বলে সবাইকে শুনিয়ে দিলুম সুযোগ পেয়ে।’ বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যেমন ছাত্রদের সচেতন করতে হয়, তেমনই সচেতন করতে হয় অধ্যাপকদের।  
রথীন্দ্রনাথের এই খাতায় ‘দৈনিক কর্ম্মের তালিকা’য় চোখ রাখলে বোঝা যাবে রবি ঠাকুরের এই প্রতিষ্ঠান কতটা নিয়মতান্ত্রিক। (তালিকাটি লেখার সঙ্গে দেওয়া হল।)
এই নিয়মে যারা চলবে তাদের মধ্যে শৃঙ্খলার নিজস্ব ধারণা গড়ে উঠবে সন্দেহ নেই। ১৯২৯–‌৩০ সালে যখন এই কর্মসূচি পালন করা হত, তখন শান্তিনিকেতনের বিদ্যাভবনের অধিনেতা বিধুশেখর শাস্ত্রী। শিক্ষাভবনে অর্থাৎ কলেজে বাংলা আর সংস্কৃত পড়ান ক্ষিতিমোহন সেন, নিতাইবিনোদ গোস্বামী। ইতিহাস পড়ানোর দায়িত্ব নেপালচন্দ্র রায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। জগদানন্দ রায় অঙ্ক করান। অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তী ইংরেজির অন্যতম শিক্ষক। এঁদের পড়ানোর গুণে আর সামগ্রিক নিয়মনিষ্ঠাময় পরিকাঠামোয় পড়ুয়াদের শিক্ষা যে যথেষ্ট হত সন্দেহ নেই। আদি ব্রহ্মচর্যাশ্রমের বিস্তার ঘটেছে নানা বিভাগের মধ্যে, প্রচলিত ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে অস্বীকার করাও গেছে অনেকখানি। বিশ শতকের গোড়ায় রবীন্দ্রনাথের অনেক চিঠিতে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রসঙ্গে হিন্দুভারতের কঠোর আদর্শের কথা ধরা পড়েছিল। লিখেছিলেন তিনি, ‘আমি অনেক চিন্তা করিয়া সুস্পষ্ট বুঝিয়াছি যে, বাল্যকালে ব্রহ্মচর্য্য ব্রত, অর্থাৎ আত্মসংযম, শারীরিক ও মানসিক নির্ম্মলতা, একাগ্রতা, গুরুভক্তি এবং বিদ্যাকে মনুষ্যত্বলাভের উপায় বলিয়া জানিয়া শান্ত সমাহিতভাবে শ্রদ্ধার সহিত গুরুর নিকট হইতে সাধনা সহকারে তাহা দুর্লভ ধনের ন্যায় গ্রহণ করা–ইহাই ভারতবর্ষের পথ এবং ভারতবর্ষের একমাত্র রক্ষার উপায়।’ (১৯০২ সালের নভেম্বর মাসে কুঞ্জলাল ঘোষকে লেখা চিঠি)। পরে রবীন্দ্রনাথ এই কঠোরতার আদর্শ থেকে খানিক বাইরে এসেছিলেন। অতিরিক্ত কঠোরতা যে কাজের কথা নয় তা পরবর্তীকালে তাঁর নানা আচরণে প্রকাশিত। গান্ধী যে কঠোরতায় বিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথ সে কঠোরতার পক্ষপাতী নন। তবে আত্মসংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে তাঁর মতের পরিবর্তন হয়নি। ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিশ্বভারতীতে বিস্তার লাভ করেছে, শ্রীনিকেতনে গড়ে উঠেছে পল্লী–সংগঠনের প্রতিষ্ঠান। নারীদের জন্য হয়েছে আলাদা বিভাগ। কলা ও সঙ্গীতের চর্চা শুরু হয়েছে। এই বিস্তারে শিক্ষাক্রমে শ্রী আর নান্দনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। তবে সে নান্দনিকতা আর শ্রী কখনও আত্মসংযমকে অবমাননা করেনি। যেখানে অবমাননার ইশারা সেখানে কবি বেদনাহত। আশ্রমকন্যা অমিতা সেন তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন একদিনের কথা—‘শ্রীভবনের নীচের তলায় ভিতরের বারান্দায় একপাশে তিনি বসে আছেন, সামনে মেয়েদের জন্য সতরঞ্চি বিছানো। ... তিনি মুখ তুলে তাকালেন আমাদের দিকে – তারপর ব্যথাক্লান্ত একটানা স্বরে বলে যেতে লাগলেন তাঁর বেদনার কথা। ...বুঝতে পারলাম আমাদের মেয়েদের কারো কারো পোশাকে শালীনতার অভাব মাত্রা ছাড়িয়েছে।’ শ্রী আর সুন্দরের সঙ্গে অসংযত প্রকাশের পার্থক্য অনেক। 
শান্তিনিকেতনের ইতিহাসের এই পাতায় চোখ রাখতে রাখতে মনে হয় রবীন্দ্রনাথকে যে আমরা ভুল বুঝেছি তাতে আমাদেরই ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। রবীন্দ্রনাথ নিয়ম–সর্বস্ব অচলায়তন গড়ে তুলতে চাননি একথা সত্য। তবে যে সচলায়তন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তাতে সংযম ও শৃঙ্খলাকে কখনও অস্বীকার করেননি। তবে এই সংযম আর শৃঙ্খলা যাতে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বিধি না হয়ে ওঠে সেদিকে অবশ্য নজর রাখতেন। নানারকম মুক্তির আয়োজন ছিল বলেই শান্তিনিকেতনের যথার্থ আশ্রমিকেরা সংযম আর শ্রী–র সমন্বয় ঘটাতে পেরেছিলেন। 
সহজতা আর  স্বতঃস্ফূর্তির সঙ্গে ব্যক্তিগত শৃঙ্খলাবোধের মেলবন্ধনকেই তো আমরা লক্ষ্মীশ্রী বলে। গেরস্থালির আলপনার রেখায় লাবণ্য আর মুক্তি যেমন থাকে, তেমন থাকে পরিমিতি। রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের সচলায়তনটিও ছিল এমনতর। ■

জনপ্রিয়

Back To Top