ঋত্বিক মল্লিক
ধরুন আপনি আশাপূর্ণা দেবীকেই প্রশ্ন করে বসলেন, ‘বলুন তো, আশাপূর্ণা দেবী কে ছিলেন?’ একটু মৃদু হেসে তিনি বলবেন, ‘তিনি তো মা সরস্বতীর স্টেনোগ্রাফার!’ যদি জিজ্ঞাসা করেন, এরকম কেন বলছেন? তাহলে এর উত্তর হল, তাঁকে গল্প বা উপন্যাসের প্লট নিয়ে ভাবতে হয় না, চিন্তা করতে হয় না শব্দ সাজানোর কৌশল নিয়ে, তিনি লিখে চলেন অবিরাম।
এই স্বতস্ফূর্ততাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ। শিক্ষিত এবং এলিট পাঠকসমাজ ঠিক এই অপবাদটাই দিতে চেয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি নাকি ‘রান্নাঘরের লেখিকা’। অথচ এই অপবাদটাই ছিল তাঁর ইউএসপি; রান্নাঘরের মেয়েদের কথা বলতে বসে তিনি যখন আটপৌরে চরিত্রগুলির মধ্যেই কোনও চমক এনে হাজির করেছেন, তখন সে চমকানির জোর গেছে বহুগুণ বেড়ে। 
আশাপূর্ণা দেবী মনে করতেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে যাকে সুখী মনে হয় সে হয়তো আদৌ সুখী নয়, আবার যাকে নেহাত দুঃখী মনে হয় সে সত্যিকারের দুঃখী নয়। বাইরের চেহারা আর ভেতরের চেহারা দুটোর মধ্যে হয়তো আকাশপাতাল তফাত।’ 
আশাপূর্ণার এই কথা ক’‌টি কি আসলে নিজের প্রতি নিজেরই এক তির্যক ইঙ্গিতের সাক্ষ্য বহন করে? বাইরে থেকে তাঁকে দেখলে মনে হবে, সাফল্য আর খ্যাতির চুড়োয় উঠে মানুষ ঠিক যেভাবে থাকতে চায়, জীবনের যশাকাঙ্ক্ষার পাত্রটি তো তাঁর ঠিক তেমনিভাবেই পুরো হয়েছিল। জ্ঞানপীঠ, পদ্মশ্রী, দেশিকোত্তম— কী তিনি পাননি! মোট চারটি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি লিট দিয়েছিল। একজন সাহিত্যসাধকের কাছে এর চেয়ে বেশি আর কী চাওয়ার থাকতে পারে! অথচ এর অন্তরালের ইতিহাসটি কিন্তু এই প্রথিতযশা মানুষটির প্রেক্ষাপট হিসেবে বড়ই বেমানান ছিল। ঠাকুমা নিস্তারিণীর কড়া শাসনের ঠেলায় প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার সামান্য ছোঁয়াও ছেলেবেলায় তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। দাদাদের পড়া শুনে শুনে উল্টোদিক থেকে পড়তে শিখেছিলেন বর্ণপরিচয়। এমন–কি, মাত্র ষোলো বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যখন কৃষ্ণনগরের শ্বশুরবাড়িতে এলেন, তখন সে-বাড়িতে নাকি পঞ্জিকা ব্যতিরেকে অন্য কোনও বই–ই ছিল না!
আশাপূর্ণার নায়িকাদের আবেদন বৌদ্ধিক মগজের কাছে নয়, বরং অন্তর্মুখী হৃদয়ের কাছেই তার সমাদর কিছু বেশি। তাঁর চরিত্রগুলি যেন তাঁরই অভিজ্ঞতার পরিসর থেকে রসদ সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে। তাই তারা এত জীবন্ত, এত বাস্তব। বানানো, সুচিন্তিত, আরোপিত শিক্ষার ছাপ অযথা আন্দোলন তুলে সেই ছবিগুলিকে নষ্ট করে ফেলেনি।
এ জন্যেই আশাপূর্ণা দেবী লেখক হিসেবে তাঁর ঘরানায় একক সিদ্ধিলাভ করেছেন বলা চলে। শুধু একটি আটপৌরে অন্দরমহলে জীবন কাটিয়ে, তার গন্ধে-স্পর্শে বাঁচতে শিখলেই আশাপূর্ণা হওয়া যায় না, আশাপূর্ণা হতে গেলে আসলে একইসঙ্গে প্রয়োজন আদবকায়দায় ভরা প্রথাগত শিক্ষার চকমকিতে চোখ ধাঁধিয়ে না ফেলে নিজের সারল্য ও স্বতঃস্ফূর্ততা বজায় রেখে চলার ক্ষমতা। 
তাই আশাপূর্ণার লেখার সারল্যে ভুল বুঝে আশাপূর্ণা হওয়ার চেষ্টা করলে তা হয়ে দাঁড়াবে আত্মহত্যার শামিল। যে সময় যে জীবন তিনি কাটিয়েছিলেন, আজ যাঁরা লিখতে বসেন, লিখতে চান আশাপূর্ণার মতো ব্যাপ্তি নিয়ে, তাঁর মতো সাফল্যের স্বপ্ন দেখে, তাঁদের সময় এবং জীবন অবশ্যই অন্যরকম। তাঁদের পণ্ডিতি কখনওই মেনে নেবে না এত কিছু আনলার্ন করার ভাবনাকে। শিক্ষিত এলিট সমাজকে হেলাভরে তুচ্ছ করার সাহস আশাপূর্ণা দেবীর মতো আর কেউ দেখাবেন বলে তো মনে হয় না!‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top