অশোককুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘অবিরাম জ্বরের রূপকথা’ ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের পটভূমিকায় রচিত এক চিত্তাকর্ষক উপন্যাস, যার কেন্দ্রে রয়েছে একটি পরিবারের চার প্রজন্মের এক বর্ণময় উপাখ্যান। দ্বারিকানাথ, কৃতীন্দ্রনাথ, পুণ্যেন্দ্রনাথ আর দ্বিজোত্তম ঘোষাল— এঁদের মধ্যে তিন প্রধান চরিত্র রীতিমতো পাশ করা অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক। উপাখ্যানের পরতে–পরতে যেমন বিভিন্ন কৌতূহল–উদ্দীপক চরিত্রের ভিড়, তেমনই অনায়াসে জায়গা করে নিয়েছে বিভিন্ন ঘটনার আকস্মিকতায় থমকে যাওয়া সময়ের বিবরণ। রয়েছেন প্রতিভাময়ী কবিরাজ মধুমাধবী— কৃতীন্দ্রনাথের খুড়তুতো বোন ও তার আশৈশব প্রেমিকা। ব্যতিক্রমী জীবনযাপনের প্রতি কৃতীন্দ্রনাথের আকর্ষণ, ব্যক্তিগত সততা, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নিজের চিকিৎসক সত্তার প্রতি তার নিবিড় অবস্থান এবং ক্ষুরধার আত্মবিশ্লেষণ— উপন্যাসটিকে এক মহত্তর উচ্চতায় নিয়ে যায়।
রোগনির্ণয় ও নিরাময়ের ক্ষেত্রে বর্তমান চিকিৎসা–ব্যবস্থার যে সাফল্য আমরা দেখতে পাই তার সূত্রপাত অনেকটাই ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে পশ্চিম দুনিয়ায়। ইংরেজ–শাসিত ভারতবর্ষে, বিশেষত তদানীন্তন রাজধানী কলকাতায় তার সামগ্রিক প্রভাব পড়েছিল পূর্ণমাত্রায়। লক্ষণীয়, ১৮৩৫ সালে যে ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজ স্থাপিত, তা শুধু কলকাতার নয়, ভারতবর্ষের নয়, তা ছিল সমগ্র এশিয়ার প্রথম মেডিক্যাল কলেজ। এই বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসাবিদ্যার সুফল কীভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছেন নামী–অনামী ডাক্তাররা, কীভাবে আরও মেডিক্যাল স্কুল–কলেজ স্থাপন করে তাঁরা চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষাকে প্রসারিত করতে চেয়েছেন, রোগের কারণ এবং নিরাময় সম্পর্কে মানুষের ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে প্রয়াসী হয়েছেন, কীভাবে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়তে হয়েছে তাঁদের— তারই এক তন্নিষ্ঠ বিবরণী এই আখ্যান। যা একই সঙ্গে মহৎ উপন্যাসের কক্ষচ্যুত না হয়েও, হয়ে ওঠে ভবিষ্যৎ গবেষণার এক নির্ভরযোগ্য ভাণ্ডার। ডাঃ রাধাগোবিন্দ কর (আর জি কর) আর ডাঃ সুরেশপ্রসাদ সর্বাধিকারীকে আর কোথায় বা এমন অন্তরঙ্গভাবে চেনা যেত!
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, শরীর ও রোগ এই দু’য়ের পারস্পরিক সম্পর্ক, তার ক্রিয়া–প্রতিক্রিয়ার সঠিক চিত্র পাওয়া যায় শবব্যবচ্ছেদে। আমরা জানতে পারি বঙ্গদেশ–সহ প্রাচীন ভারতীয় সমাজ এই প্রক্রিয়া মেনে নেয়নি বহুদিন। ছাত্রদের মনের বাধা কাটাতে মধুসূদন গুপ্ত শবব্যবচ্ছেদ করেন ১৮৩৬ সালে— মেডিক্যাল কলেজে। বিশ্বাঙ্গনে শবব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে শরীরের রহস্য উন্মোচনে যেমন এগিয়ে এসেছিলেন অধ্যাপক ভেসালিয়স, তাঁদের শিল্পকর্ম নিয়ে যোগ দিয়েছেন রেমব্রাঁ, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো প্রমুখ অবিস্মরণীয় শিল্পী।
আখ্যানটি পড়ে আমরা যেমন জানতে পারি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কলেরা মহামারীর খবর, তেমনই পেয়ে যাই ১৮৮৪ সালে কলকাতায় কমা ব্যাসিলাস চিহ্নিত করবার কাহিনী! জানা যায়, নাপিতদের সার্জন হয়ে ওঠবার খবর এবং তাঁদের সংগঠন সংযুক্ত বারবার–সার্জন কোম্পানির স্বীকৃতি পাবার কথাও।
সবশেষে বলি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রগতির প্রেক্ষাপটে, আখ্যানের চরিত্রগুলির প্রবহমানতা, শক্তি এবং দুর্বলতার চিত্র এমনই নিখুঁত, মনে হয়, এ কোনও কল্পকাহিনী নয়, ঐতিহাসিক সত্য। এবং এইজন্যেই অবিরাম জ্বরের রূপকথা হয়ে ওঠে এক অনন্যসাধারণ তথ্য–উপন্যাস। বাংলা ভাষায় এমন কথাচিত্র আমি অন্তত পড়িনি।‌‌‌
অবিরাম জ্বরের রূপকথা • অশোককুমার মুখোপাধ্যায় • 
দে’জ পাবলিশিং • ৩৫০ টাকা
অঞ্জনলাল দত্ত

 

জনপ্রিয়

Back To Top