১৯৭৭–‌এর ডিসেম্বর পরিস্থিতি এমন ছিল যে, জাতীয় সড়ক টপকালে হাতির দল কলকাতা ঢুকে পড়বে। ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরি পরামর্শ দেন, জাতীয় সড়কে সারি দিয়ে ট্রাকগুলো দাঁড় করিয়ে দাও। ট্রাকের মুখগুলো থাক হাতির পথের দিকে।
সব ট্রাকের হেড লাইট জ্বালানো থাক।
বিশিষ্ট হস্তিবিশারদ প্রয়াত ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরিকে নিয়ে লিখলেন অরূপ বসু।

 

পারিবারিক কাজে সেবার শিলং গেছেন ধৃতিকান্ত। অসম তখন অখণ্ড। শিলং তার রাজধানী। সেটা সম্ভবত ১৯৫৯। পাইনউড হোটেলের পাশেই শিলং ক্লাব। এখানে সারা দেশের অনেক কেষ্টবিষ্টুরা থাকেন। আড্ডা জমান। সেখানেই একদিন সয়ার সাহেবের সঙ্গে ধৃতিকান্তর আলাপ। জন্মসূত্রে সয়ার খাসিয়া। পেশাগতভাবে তখন তিনি অসমের মুখ্য বনপাল। এমনিতে ধৃতিকান্তের পরিবারে হাতি শিকারের চল তেমন নেই। যদিও তাঁরই জ্ঞাতি পূর্বপুরুষ সূর্যকান্ত আচার্য বাংলায় প্রথম শিকার কাহিনি লিখেছেন। ময়মনসিংহের চার আনি জমিদার পরিবারের সন্তান, মাতুল বংশ জগৎকিশোরের পরিবারে লালিত ধৃতিকান্ত ছেলেবেলা থেকেই পারিবারিক হাতির পালের সঙ্গেই বড় হয়েছেন। কিন্তু দেশভাগের পর হাতির সংস্রব চলে যায়। মেধাবী ছাত্র বইয়ের পাতায় বন্যপ্রাণীকে তখন নিবিড়ভাবে খুঁজছেন। আফ্রিকার হাতি শিকারের গল্প পড়তে পড়তে বুঁদ হয়ে যান। 
‌সেই সময়ে অসমে মিলবয় সয়ার প্রবর্তিত এলিফ্যান্ট কন্ট্রোল লাইসেন্স চালু ছিল। মানে, খুনিয়া হাতি মারতে কিংবা নাগরিক সমাজের ক্ষতিকারক কোনও পুরুষ হাতি মারতে অভিজ্ঞ শিকারিদের অনুমতিপত্র দেওয়া হত। এই সয়ার সাহেবই কাছাড়ে গুন্ডা হাতি মারার অনুমতিপত্র জোগাড় করে দেন ধৃতিকান্তকে। ভবানীপুরে ধৃতিকান্তের বাড়ির লোকজন কিন্তু বিশেষ করে বাবা–মা ধৃতিকান্তের এই শখকে ভালভাবে নেননি। তাঁদের বক্তব্য, হাতি লোকে পোষে, হাতি কেউ মারে!‌
১৯৬০–‌এ পুজোর ছুটিতে শিলচর হয়ে কাছাড়ের কাছে লোহারবন্দে ধৃতিকান্ত জীবনের প্রথম গুন্ডা হাতি শিকারে যান। স্মৃতিচারণায় লিখেছেন লোহারবন্দে কাটিয়ে পরদিন সকালে বিলাইপুরের উদ্দেশে হেঁটে রওনা হলাম। মাত্র সাত মাইলের পথ। সেটা এমনকী, সেলুজ–‌টিলারদের মতো শিকারিরা তো ২০ মাইল রাইফেল কাঁধে হেঁটে যেতেন। করবেট ৫ হাজার ফুট চড়াই ভেঙে ১৫ মাইল দূরের মানুষখেকো চিতার খোঁজ করতেন। জঙ্গলে ঢোকার পর সামনে মংরা ট্র‌্যাকার হাতির পায়ের দাগ লক্ষ্য করে চলেছে, পেছনে ধৃতিকান্ত। একটু পরেই মংরা হঠাৎ হাত তুলে দাঁড়িয়ে গেল। মংরা নিজের কানের পেছনে হাত দিয়ে কিছু শোনার ইঙ্গিত করল.‌.‌.‌ ভর্‌–‌র্‌–‌ভুস। আওয়াজ পেলাম, তারপরেই ডালপালা ভাঙার শব্দ।.‌.‌.‌
সাম্প্রতিক অতীতে ভবানীপুরের বাড়িতে যখন গেছি, এই মানুষটাই হয়তো ওয়াকারে ভর দিয়ে কিংবা হুইলচেয়ারে চড়ে বসার ঘরে আসতেন আড্ডা মারতে। শুধু শিকারের গল্প নয়। এশীয় হাতি নিয়ে তাঁর বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের টুকরো টুকরো কাহিনি শোনাতেন। ছেঁড়া সুতো জুড়ে দিতেন ইতিহাসবিদ পুত্র ড.‌ শিবকান্ত লাহিড়ী চৌধুরি কিংবা শিক্ষাবিদ স্ত্রী ড.‌ শীলা লাহিড়ী চৌধুরি। দীর্ঘ শুভ্র শরীর ধবধবে সাদা পকেটওয়ালা গেঞ্জিতে মাঝে মাঝে মুখ মুছতেন। কয়েক বছর আগের আড্ডাটা ছিল এরকম।
সবাই জানে, হাতি নিয়ে তাঁর বিস্তর অভিজ্ঞতা। ভারতে তো বটেই। ভারতের বাইরেও হস্তিবিশারদ হিসেবে তাঁর খ্যাতি আছে। ছেলেবেলা থেকে হাতির সান্নিধ্যে বড় হয়ে উঠেছেন। পারিবারিক জমিদারিতে মস্ত বড় হাতিশালা ছিল। ময়মনসিংহের কালীপুরের জমিদারি থেকে সেই হাতিশালা পরে চলে যায় মুক্তাগাছার জমিদার আচার্যদের কাছে। সম্পর্কে তাঁরা আবার জ্ঞাতি। মুক্তাগাছার আচার্যরা হাতির ব্যাপারে আরও পারদর্শী। ভবানীপুরের মতো শহরের মাঝখানে বিরাট এলাকাজুড়ে বাড়ি। 
দীর্ঘ ঋজু ধৃতিকান্ত চেয়ারে চড়ে এমনই এক আড্ডায় শামিল হলেন।  বললেন, কিছুদিন আগে কালীপুরের জমিদার ধরণীকান্ত লাহিড়ী চৌধুরির একটা উইল পেয়েছি। তাতে দেখা যাচ্ছে ১৮৫০ সালের আগেই আমাদের বাড়িতে ২২টা হাতি ছিল। এই পুরো হস্তিশালটা মুক্তাগাছার জমিদার আচার্যদের দিয়ে দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন ধরণীকান্তের ছেলে নরেন্দ্রকান্তের শ্বশুরমশাই। তখনকার দিনে পথঘাট ভাল ছিল না। এতো গাড়ির চল হয়নি। জমিদারির খাজনা আদায়, বাড়ির লোকের ঘুরতে যাওয়া, সব কাজই হত হাতিতে। এছাড়া শিকার তো আছেই। ফলে ছেলেবেলা থেকে হাতির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠত। হাতি খুব বুদ্ধি ধরে। একবার শুনেছি, ধরণীকান্ত হাতির সামনে পড়ে গিয়েছিলেন, মানে পায়ের তলায়। বাড়ির হাতি। পাটা তুলেই খেয়াল করেছে চেনা মানুষ। ওই অবস্থায় চেঁচাতে শুরু করে। লোকজন গিয়ে ধরণীকান্তকে সরিয়ে দেয়। হাতির পিঠ থেকে নামার সময় ভুলেও সামনে দিয়ে নামা উচিত নয়। তাতে অনেক সময় চেনা লোকেরও বিপদ হতে পারে।
সারা জীবনে ২২টা গুন্ডা হাতি ঘায়েল করেছেন ধৃতিকান্ত। দলমার দামাল হাতিদের থেকে শহর কলকাতাকে বাঁচিয়েছেন। এই গল্প শুনিয়েছিলেন ড.‌ শীলা লাহিড়ী চৌধুরি। বললেন, ‌সেবার দলমার হাতির দল বঁাকুড়া, মেদিনীপুর টপকে হুগলি পর্যন্ত চলে এসেছিল। সেদিন রবিবার মহাকরণে রাজ্যের বনবিভাগের জরুরি সভা ছিল। বিশেষজ্ঞ হিসেবে ডাক পড়েছিল ধৃতির। সারাদিন পরে সন্ধেতেও যখন ধৃতি ফেরেনি উদ্বিগ্ন হয়ে খোঁজ নিলাম। এক ফরেস্ট অফিসার জানালেন, উনি অপারেশনে গেছেন। পরে বাকিটা শুনি। ১৯৭৭–‌এর ডিসেম্বর পরিস্থিতি এমন ছিল যে, জাতীয় সড়ক টপকালে হাতির দল কলকাতা ঢুকে পড়বে। ধৃতি পরামর্শ দেয় জাতীয় সড়কে সারি দিয়ে ট্রাকগুলো দাঁড় করিয়ে দাও। ট্রাকের মুখগুলো থাক হাতির পথের দিকে। সব ট্রাকের হেড লাইট জ্বালানো থাক। হাতির দল কাছাকাছি এলেই একসঙ্গে সব ট্রাক হর্ন বাজাতে শুরু করবে। তাতে কাজ হয়। হাতির দল ফিরে যায়। কলকাতা বাঁচে।
ধৃতিকান্ত বললেন, আমাদের বাড়িতে বিরাট মাপের বেশ কয়েকটি হাতি ছিল। শেরবাহাদুর, শম্ভুপ্রসাদ, বজ্রপ্রসাদ, ভোলানাথ। বুড়িগঙ্গার চোরাবালিতে ডুবে যায় ভোলানাথ। ঢাকা যাওয়ার জন্য বুড়িগঙ্গা ক্রশ করতে হয়। ভোলানাথ সাঁতরে পাড়ের কাছে গিয়ে একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারপর হঠাৎ তলিয়ে যেতে শুরু করে। বিপদ বুঝে ভোলানাথ চেঁচায়। কিন্তু তখন আর কিছু করার নেই। ১৮২৭ সালের ভূমিকম্পে কাছাড়, সিলেট, বাংলা, অসমের অনেক জায়গাতেই পাহাড়–জঙ্গলে বড় বড় ফাটলের সৃষ্টি হয়। ওটাকে বলা হত ডাব। একবার শেরবাহাদুরের পিঠে চড়ে আমি আর নয়ন আচার্য যাচ্ছি, হাতি ডাবে পড়ল। সেটা শেরবাহাদুর। বিপদ বুজে শের চেঁচাচ্ছে। অন্যরা বাঁশ, গাছের গুঁড়ি এগিয়ে দিল। বিপদ থেকে শের ও শের–‌সওয়ারি বেঁচে গেল।
জঙ্গলে নানা ধরনের হাতি শিকারি, সেকালের জমিদার, আর শখের শিকারিরা যেতেন। তার মধ্যে একটি হল লোক লশকর, ‘‌কুনকি’‌ হাতি দিয়ে জঙ্গল ঘিরে কোনও হাতিকে মারা। ধৃতিকান্ত কিংবা মুক্তাগাছার আচার্যরা কখনও এই ধরনের হাতি শিকারে যায়নি। কারণ হাতিকে ভালবেসেই তারা বড় হয়েছে। তারা সেই হাতি শিকার করেছে, যে হাতি মানুষের কাছে, জনপদের কাছে বিপজ্জনক। আরও পরিষ্কার করে বললে ‘‌গুন্ডা হাতি’‌। এই হাতি শিকার করা খুব কঠিন। প্রথমত, তারা বারবার জঙ্গলে চলার পথ বদলায়। শিকারিদের সম্পর্কে খুব সতর্ক থাকে। এই ধরনের হাতি শিকার করতে গেলে, বিশেষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জঙ্গলের বাসিন্দা দরকার। তাঁরা জঙ্গলের চেহারা দেখে বুঝতে পারেন, হাতি কোন পথে গেছে। এঁদের বলে ট্র‌্যাকার। হঠাৎ যেন মনে পড়ে গেল ধৃতিকান্তর। বললেন, মংরা খুব ভাল ট্র‌্যাকার ছিল। একবার গারো পাহাড়ে এক গুন্ডা হাতিকে ট্র‌্যাক করতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম। চারদিন জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছি। ঘুরতে ঘুরতে এক বনবস্তিতে কয়েকজন কুকির দেখা পেলাম। মানুষগুলো এমনিতে ভাল। ওরা বলল নীচের দিকে নদী আছে। সেটা ধরে লুসাই ‘‌হিলস’‌–‌এর দিকে যাও। কিছুটা দূরে, সেদিন হলই (‌Holoi)‌ ডাঙা বনবাংলোতে রাত কাটালাম।
হাতি কিন্তু খুব কাছে এলে সামনের মানুষটাকে দেখতে পায় না। ওদের চোখ দু’‌দিকে দেখে। তাই সামনে কোনও কিছু থাকলে তা আক্রমণ করে।
গল্পের সূত্র ধরলেন শীলাদেবী। বললেন, সাধারণত বাড়ির মহিলাদের সঙ্গে নিয়ে ওরা শিকারে যেত না। একবার ধৃতি ও আলো আচার্য গুন্ডা হাতি শিকারে গেছে। ঠিক হল, মূল জঙ্গলেতে ঢোকার আগে এক বনবাংলোতে আমরা দুই গৃহিণী থাকব। সঙ্গে থাকবে আমাদের গাড়ির চালক মহাদেব। সেবার ওদের ট্র‌্যাকার সিঙ্গের (‌Singer)‌। এই গারো মানুষটাও খুব ভাল ট্র‌্যাকার, বিশ্বাসী, আন্তরিক, জঙ্গলের গভীরে গিয়ে বুঝতে পারল, গুন্ডা হাতি একটা নয়, দুটো। রাতের অন্ধকারে শিকার করতে গেলে টর্চের আলো ফেলের মতো দক্ষ হেল্পার চাই। একজন সঙ্কেত দেয়, আরেকজন শিকার করে। Singer‌ তাই মহাদেবকে ডাকতে এসেছিল ‘‌ভাবলাম জঙ্গলে তাদের ভাল খাওয়া জোটেনি। লুচি–‌তরকারি করে নিয়ে ওদের খাওয়াতে গেছিলাম। ধৃতি এত রেগে গিয়েছিল যে, সামনে দাঁড়ানো যাচ্ছিল না। কারণ জঙ্গল পাতলা হলেও আমরা ফিরব কী করে?‌ শেষমেশ মহাদেবকে নিয়ে ফিরলাম। ওরা অন্য এক গারো যুবকের হাতে টর্চ তুলে দিল।’‌
যে ঘরে বসে হাতি নিয়ে আড্ডা হচ্ছে, তার একধারে দেওয়ালে দু’‌কোণে বিশাল দুটো হাতির দাঁত। দেখতে ঠিক ফালি চাঁদের মতো। ধৃতিকান্ত বললেন, ওগুলোকে বলে পালংদাঁত (‌পালঙ্ক)‌। মানে ওটার ওপর তক্তা ফেলে কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া যায়। এরকম দাঁত সচরাচর পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ দাঁত লম্বা হলেও এদিক–‌ওদিক বেঁকে যায়। পাশের ঘরে গিয়ে অন্য দাঁত দেখে ফারাকটা স্পষ্ট হল। বললেন, ইংরেজ আমলে নর্থ–‌ইস্ট ইন্ডিয়ায় হাতি শিকারের নতুন আইন হয়। ১৯৪২ সালে নর্থবেঙ্গলেও সেটা চালু হয়। তাতে বলা হয়, গুন্ডা ঘোষণা করার দরকার নেই, বিপজ্জনক বুঝলে যে কোনও হাতিকে শিকার করা যাবে। হাতি কিন্তু মাচানে বসে, গাড়িতে চড়ে কিংবা হাতির পিঠে বসে শিকার করা যায় না। পায়ে হেঁটে, সামনাসামনি গিয়ে শিকার করতে হবে। ১৯৪০ সালে নর্থবেঙ্গলে একটা আইন হয় যে, শিকারি হাতির ছোট দাঁতটা পাবে। ধৃতিকান্ত তা নিয়ে লড়াই করেছিলেন।
ধৃতিকান্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেন। তারপর লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা, কেমব্রিজের ক্লেয়ার হল কলেজের আজীবন সদস্য। আশুতোষ কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রভারতীর অধ্যাপক ১৯৭৭ থেকে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজার্ভেশন নেচারের অন্যতম হস্তি বিশেষজ্ঞ। ১৯৭৮ থেকে দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গ বন্যপ্রাণী উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। ১০৮০–‌র দশকে বিশ্ব বন্যপ্রাণী সংস্থার অর্থ সাহায্যে পূর্ব ভারতে হাতির সমীক্ষা করেন। ভারত সরকারের হস্তী প্রকল্পের রূপরেখা নির্ধারণে অন্যতম কারিগর। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘‌গজ’‌ পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক। হাতির প্রতি ভালবাসা থেকে গুন্ডা হাতি শিকার। কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি সময় দিয়েছেন সারাজীবন হাতি নিয়ে নিবিড় পড়াশোনা ও গবেষণায়। তাঁরই চেষ্টায় তাঞ্জোরের সরস্বতীমোহন লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন হাতি–‌বিষয়ক কোষগ্রন্থ পালকাপ্যের গজশাস্ত্রের প্রতিলিপি কলকাতায় তাঁর বাড়িতে এসেছিল। সেটা বিজয়া গোস্বামী আচার্যকে দিয়ে অনুবাদও করিয়েছিলেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে শেষ পর্যন্ত মুদ্রিত হয়নি। 
ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় সাহেবরাও ভারতে এসে হাতি শিকার করতে করতে হাতি নিয়ে চর্চার ওপর বেশি জোর দেন। কারণ ততদিনে যুদ্ধে হাতির ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু পাহাড় ও অরণ্যময় ভারতে যাতায়াতে হাতির প্রয়োজন বুঝে হাতি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে গেছে। ধৃতিকান্ত সবসময় হাতি নিয়ে গবেষণার ব্যাপারে লৌকিক কাহিনি, লোকাচার, বনবাসী মানুষের অভিজ্ঞতকা বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন। তাঁরই অন্যতম জ্ঞাতি পূর্বপুরুষ শশীকান্ত আচার্য তাঞ্জোর থেকে গজশাস্ত্রের একটি কপি আনিয়েছিলেন। তারপর স্থানীয় মাহুত ও হস্তচর্চায় মগ্ন কর্মীদের অভিজ্ঞতা মিশিয়ে একটি বই ছাপানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। আবার রংপুর পিরগাছার বড় তরফের জমিদার জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরি হস্তিতত্ত্ব গ্রন্থটি লেখেন। এতেও বাংলার হাতি–বিষয়ক নানা অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছিল। এই ধারা আরও পু্ষ্ট করে ধৃতিকান্ত তাঁর বাড়িতে হাতি–বিষয়ক গ্রন্থের এবং পুঁথির এক দুর্লভ সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছিলেন। হাতি নিয়ে অনেক প্রচলিত ধারণাও তিনি ভেঙে দেন। যেমন— বলতেন, ‘‌খবরের কাগজে অনেকসময় দলছুট হাতির কথা হলা হয়। দলছুট কথা ঠিক নয়। পুরুষ হাতিরা জোয়ান হলেই একা একা ঘোরে। জৈবিক প্রয়োজনে স্ত্রী সংসর্গের দরকারে কোনও দলে ভেড়ে। অবার সেটা মিটে গেলেই একা একা ঘোরে। এই ‘‌একোয়া’‌ হাতিরা বারবার দল বদলায় আর বেপরোয়া হয়। হাতিদের দলপতি কখনই পুরুষ হয় না। বেশি বয়সের স্ত্রী হাতিরাই দলের নেত্রী। সে সবার ঠাকুমা।
জমিদারবাড়ির উচ্চশিক্ষিত ধৃতিকান্ত কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। সেজন্যই তাঁর হাতি নিয়ে চর্চার জন্য বনবস্তিতে দিনরাত কাটানোটা কখনওই কঠিন হয়নি।
গারো পাহাড়ের আর এক জমিদার পরিবার গৌরীপুরের প্রকৃতীশচন্দ্র বড়ুয়া, যিনি লালজি নামে খ্যাত। বিশ্ববিখ্যাত এই হস্তিবিশারদের সঙ্গে তিনি কখনও শোনপুর, কখনও কিষানগঞ্জের মেলায়, কখনও কোনও অরণ্যে দিনের পর দিন কাটিয়েছেন। সে অভিজ্ঞতার গল্প লোকেদের বলতেন। 
‘‌শোনপুরের মেলায় প্রাতঃকৃত্যাদি সারা বেশ কঠিন কাজ। লালজি লোক পাঠিয়ে এক জোতদারের বাড়িতে ব্যবস্থা করেছিলেন। আধ কিলোমিটার দূরে জোতদারের বাড়ি। লালজি তাঁর মাহুত, মাহুতের সহকারী পাতাওয়ালা, সবাইকে নিয়েই শোনপুরে যেতেন। এদের দু–‌একজন আবার মাহুত, ফান্দি, শিকার, গাড়িচালনা সব কাজই জানত। যা হোক, আমরা সবাই সাত সকালে সেই জোতদারের বাড়ি চলেছি। প্রথমে একজন অগ্রপথিক, পেছনে লালজি ও আমি। তারও পেছনে দুটো লোক ঝারি হাতে। আরও পেছনে বালতি, তোয়ালে, সাবান হাতে দুটো লোক। হাতি নিয়ে নানারকম কাণ্ড দেখবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন লালজি শোনপুরের মেলায়। সেখানে হাতি কেনাবেচাতেও কত রকম জালিয়াতি হতে দেখেছি। হাতির সামনের পায়ে পাঁচ পাঁচ করে দশ, পেছনের পায়ে চার চার করে আট— মোট আঠারোটি নখ থাকার কথা। এর চেয়ে কম বলে দাম পাবে না। দেখতাম, মোষের শিং দিয়ে তৈরি নকল নখ আঠা দিয়ে হাতির পায়ে লাগিয়ে আঠোরোটা নখ করা হত। দলছুট গুন্ডা হাতিকে ট্র‌্যাক করতে গিয়ে একটা অভিজ্ঞতা বারবারই হয়েছে— তারা ‌রাতভর যদি ধানখেতে তাণ্ডব চালায়, ভোরে জঙ্গলের বেশিদূর যায় না। মাইলখানেকের মধ্যেই যে আরাম করার জায়গা খুঁজে নেয়। কারণ সে মস্তান, তার পরিবার–‌পরিজন নেই। হস্তিযূথ কিন্তু সেটা করে না। তারা লোকালয় থেকে দূরে জঙ্গলের গভীরে নিরিবিলিতে বিশ্রাম নেয়। তাঁর সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা কাছাড়ের জঙ্গলের। তিনি কাছাড়ের জঙ্গলের  বর্ণনা দিতেন ছবির মতো। বলতেন, পাহাড়ের ঢালে গিলে করা পাঞ্জাবির হাতার মতো ঢেউ খেলানো সমান্তরাল টিলার সারি। খাঁজে খাঁজে সামান্য, জমি ওখানকার লোকে বল ‘‌থল’‌। বর্ষার পর থকথকে কাদা। সেখানে গজিয়ে ওঠে ঘাসের জঙ্গল। গোয়ালপাড়া এলাকায় তার নাম পুরুণ্ডি। হাতির প্রিয় খাদ্য। কাছাড়ের জঙ্গল এক আশ্চর্য মৌন ভুবন। চোরাশিকারিদের জন্য এখন আর সেখানে বেশি হাতি নেই, একসময় প্রচুর ছিল।
বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ব্যাপারে একজন বড় যোদ্ধা ধৃতিকান্ত। তবে অন্য অনেকের মতের সঙ্গে তাঁর মত মিলত না। বলতেন, সংরক্ষণের পিছনেও আছে এখন আর্থিক কারণ। বন্যপ্রাণী ভিত্তিক পর্যটন এখন পৃথিবীর বহু দেশেরই লাভজনক ব্যবসা। বিপদ থাকবে না, ঝুঁকি থাকবে না, অথচ অরণ্য থাকবে। সেখানে পাখির গান, তার রঙিন পালকের বাহার, হরিণের চকিত চপল বিচরণ এসব চায়। সেখানো পোষা বাঘ থাকলেও ভাল হয়। বাঘকে তার মতো করে চলতে দেওয়া যাবে না। তিনি এটার খুব পক্ষপাতী ছিলেন না। আসলে তিনিও সালিম আলির সঙ্গে এক মত। পাখি শিকারে আপত্তি নেই, যদি শিকার করার মতো পর্যাপ্ত পাখি থাকে। বন্যপ্রাণী শিকারেও আপত্তি থাকতে পারে না যদি পর্যাপ্ত বন্যপ্রাণ থাকে। কারণ, তাঁর শিকার জীবন শুরুই কন্ট্রোল লাইসেন্স দিয়ে।
সুদেহী, সুপুরুষ ধৃতিকান্ত একটু অবসর পেলেই, যতদিন সুস্থ ছিলেন গাড়ি চালিয়ে চলে যেতেন কলকাতা থেকে দু’‌রাতের দূরত্বে কোনও অরণ্যে। প্রথম দিকে তাঁর সঙ্গী হতেন একদা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর প্রথম আপ্তসহায়ক অশোক বসু। বনবাংলোয় থাকার ব্যাপারে তাঁর কোনও ভয়ডর ছিল না।
একবার গুয়াহাটি ছাড়িয়ে রাজাপাড়া বনবাংলোতে উঠেছেন। গুন্ডা হাতিকে ট্র‌্যাক করতে। এমনিতে খাওয়ার ব্যাপারে তাঁর বাছবিচার নেই। একবার  দক্ষিণ কামরূপ ফরেস্ট ডিভিশনের লোকেরা সাবধান করেছিল। বলেছিল, রাজপাড়া বনবাংলোতে থাকবেন না, বড় সাপের উপদ্রব। ধৃতিকান্ত গা করেননি। বেশ পুরনো কাঠের ডাকবাংলো, ইকড়ার দেওয়াল। ইকড়া হচ্ছে অসম অঞ্চলের অতি দীর্ঘ এবং বেশ মোটা এক ধরনের ঘাস। বাঁশের বা কাঠের ফ্রেমে সার সার ঘাস লাগিয়ে তাতে মাটির প্রলেপ দিয়ে বাংলোর দেওয়াল বানানো হয়েছে। এরকম দুটো দেওয়ালের মাঝখানে একটু ফাঁক রেখে পুরু দেওয়াল। এর ফলে বাংলোর ভেতরটা গরমকালে ঠান্ডা, শীতকালে গরম। কিন্তু সেই দেওয়ালই সাপের বসবাসের জন্য স্বর্গ। সেবার ধৃতিকান্ত বাংলোয় একা। সাপের ভয়ে বনকর্মীরা বাংলোয় থাকতে রাজি হয়নি। ধৃতিকান্ত দিনের বেলাতেই ঘরের ছাদে সরসর খরখর আওয়াজ পেলেন। দেওয়ালেও। তাতে কী। ধৃতিকান্তের সঙ্গে একটা পেট্রোম্যাক্স ছিল, গ্রাম থেকে আরেকটা আনিয়ে নিলেন। দোনলা বন্দুকে ছররা গুলি ভরে নিলেন। সন্ধে হতেই পেট্রোম্যাক্স জ্বলল। রাত বাড়তে বাড়তে পেট্রোম্যাক্সের আয়ু ফুরিয়ে এল। একটা বড় টর্চ, একটা বড় খালি বোতল, আর একটা বন্দুক নিয়ে খাটের ওপর পা তুলে দিলেন। তারপর সারা রাত ইঁদুরের চিঁ–‌চিঁ শব্দ, পেঁচার ডাক, বার্কিং ডিয়ারের ডাক, ধৃতিকান্তের চোখে ঘুম আসেনি।
পরে তিনি শুনেছিলেন রাজাপাড়ার সেই বাংলো ভেঙে নতুন বিশ্রামঘর হয়েছে। কাঠের পুরনো বাংলোটির জন্য তাঁর মন কেমন করত।
ধৃতিকান্ত এখন চিরনিদ্রায় মগ্ন। ধৃতিকান্তের জন্য অনেকেরই আজ মন কেমন করে। ■    

নিজের বাড়িতে হাতির দাঁতের কারুকার্য দেখাচ্ছেন ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরি। বছর ছয়েক আগে। ছবি:‌ সমীরকুমার ঘোষ  
   

জনপ্রিয়

Back To Top