তাঁর সহকারীর নামও ওয়াটসন। টমাস এ ওয়াটসন। নিজের ঘর থেকে তিনি বলেছিলেন, ‘প্লিজ কাম হিয়ার, ‌মিস্টার ওয়াটসন— আই ওয়ান্ট ইউ।’‌ 
সভ্যতার ইতিহাসে সূচনা হল এক নতুন যুগের। লিখেছেন সমীরকুমার ঘোষ।

‘‌‌আশায় আশায় বসে আছি ওরে আমার মন, কখন তোমার আসবে টেলিফোন’‌‌— নাগরিক কালার বিরহে আকুল রাধার মনের কথা হাজির করেছিলেন গৌতম ‘‌মহীন’‌ চট্টোপাধ্যায়।
কয়েক দশক পরে টেলিফোনে ‘‌চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি’—‌ বেলাকে ফোনে এই সুখবর জানানোর আকুতিও শুনেছি অঞ্জন–‌কণ্ঠে।
যার মাধ্যমে এত ভাব–‌বিনিময়, প্রেম–‌আকুলতা, বিরহ–‌বিবাদ সেই টেলিফোনটি রয়ে গেছে অবহেলিত। একবারের জন্যেও সেলাম জানাই না;‌ মনেই হয় না যাঁর দৌলতেই আমাদের এত বাচালতা, সেই আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের জন্মদিনটিতে ওঁকে একটা ‘‌উইশ’‌ করি। ‘‌লাইক’ দিই বা বুড়ো আঙুল তোলা ইমোজি পাঠাই। অথচ নিজের–‌পরের জন্মদিন উদ্‌যাপন করি সাড়ম্বর। ফেসবুকের টাইমলাইনে শুভেচ্ছার বান ডাকে। উপেক্ষিত রয়ে যান হোতা গ্রাহাম বেল!‌ আসুন ৩ মার্চ ওঁর জন্মদিনটিতে একবার অভিবাদন জানাই। সদা–‌বাঙ্ময় জিহ্বা ওঁর উদ্দেশে বলে উঠুক— হ্যাপি বার্থ ডে গ্রাহাম বেল। এটুকু অন্তত ওঁর প্রাপ্য।
 
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন হয়ে উঠেছে আত্মার আত্মীয়। একটা সমীক্ষা জানাচ্ছে, দিনে চার ঘণ্টারও বেশি সময় আমরা ফোনে ব্যয় করি। ঘুম থেকে উঠে মুখ না ধুয়ে আগে দেখি ইনবক্স। চোখে হারাই ‘‌ও মোর ভালবাসার ধন’‌কে। এ থেকে নানা ‘‌অসুখের’ও‌ জন্ম। তার একটি ‘‌ফ্যানটম রিং’। যখন–‌তখন মনে হয়, ফোনটা বুঝি বাজছে, এই মেসেজ আসার সঙ্কেত হল!.‌.‌.‌। সঙ্গত কারণেই ২০১৮ সালে কেম্ব্রিজ ডিকশনারির ‘‌ওয়ার্ড অফ দ্য ইয়ার’‌ হয়েছিল ‌‘‌নোমোফোবিয়া’। নো মোবাইল ফোন ফোবিয়া। মোবাইল ফোন নেই বা থাকলেও ব্যবহার করতে পারছি না, এই আতঙ্ক বা ভয়। ‘‌স্মার্টফোন সেপারেশন অ্যাংজাইটি’‌ও বলা হয়। বিজ্ঞানী ল্যারি রোসেন এই প্রযুক্তি–‌নির্ভরতাকে অ্যাডিকশন নয় অবসেশন বলছেন। যাক সে কথা।

গলা যতই বাজখাঁই হোক না কেন, হেঁকে খুব দূরে শব্দ পাঠানো যায় না, এটা মানুষ একটু জ্ঞানগম্যি হতেই বুঝে ফেলেছিল। তাই দূরের মানুষকে কীভাবে বার্তা পাঠানো যায় তা নিয়ে সেই আদ্যিকাল থেকেই চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। শব্দতরঙ্গ যে বাতাসের থেকে অন্য ঘন মাধ্যমে দ্রুত ছুটতে পারে, এক সময় তার হদিশ পেয়ে যায়। মনে করুন, রেল লাইনে কান পেতে বহু দূরের ট্রেন আসার শব্দ শোনার বালকীয় খেলার কথা। একসময় প্রাসাদে ওপর মহল থেকে নিচের মহলে গোপন কথা চালাচালির জন্য ব্যবহৃত হত ‘‌কথা বলার নল’‌। শেক্সপিয়রের নাটকে যার উল্লেখ আছে। আরেকটা জিনিসের খেই ধরিয়ে দিই। সত্তর দশকে যখন টেলিফোনটা খেলনা হয়ে ওঠেনি, রাস্তার ফেরিওয়ালাদের কাছে পাওয়া যেত টেলিফোন খেলনা। ববিনের দুদিকে পাতলা কাগজ আঁটা। বড় মুখটায় কাগজে আটকানো থাকত সুতো। দুটো ববিনকে সুতোয়  জুড়ে তৈরি হত খেলাটি। ফিসফিস করে কথা বললে সুতো বাহিত হয়ে সেই কথা দিব্যি শুনতে পেত দূরে–‌থাকা অপরজন। ‘‌তুমি বলবে আমি শুনব’‌ নীতি। প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাহিনী নিয়ে তৈরি ‘‌ওরা থাকে ওধারে’‌ ছবিটা মনে আছে?‌ বিবদমান দুই ঘটি–‌বাঙাল পরিবারের বালক–‌বালিকা নানু ও লিলি শুধু কথা নয় ‘‌হ্যালো— ডাকতে ডাকতে প্রাণটা গেল’‌ বলে গানও গেয়েছে।
খেলা ছেড়ে বিজ্ঞানে আসি। এরই মাঝে দূরে খবর পাঠানোর আরেক পদ্ধতি বার করে ফেলে মানুষ। উঁচু উঁচু টাওয়ার খাড়া করে ওপরে তৈরি হয় মাচা। সেই মাচা থেকে দেখানো হত সঙ্কেত বা অক্ষর। দূরের আরেক মাচা থেকে টেলিস্কোপ দিয়ে সেই সঙ্কেত দেখে পাঠানো হত দূরবর্তী আরেকজনকে। এইভাবে খবর চাউর হয়েছে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ফ্রান্সের ক্লাউড চ্যাপ প্রথম ১৭৯৪ সালে প্যারিস থেকে লিলি শহর, ১৫০ মাইল দূরে বার্তা পাঠানোর এই ‘‌সেমাফোর’‌ পদ্ধতি চালু করেন। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ান সেমাফোরকে রণকৌশলে প্রয়োগ করেছিলেন। ক্লাউডের দাদা এই পদ্ধতির রূপকল্পের নাম দেন ‘‌টেলিগ্রাফ’। আমাদের দেশও পিছিয়ে ছিল না। কলকাতা থেকে চুনার (‌১৮২৩–‌৩২)‌ এবং কলকাতা থেকে সাগর (‌১৮৩৪–‌৫১)‌ সেমাফোরের প্রচলন ছিল।
সেমাফোর–‌এর পরের ধাপই হল টেলিগ্রাফ। এদিকে বিজ্ঞান হাত গুটিয়ে নেই। স্থির–‌অস্থির বিদ্যুৎ আবিষ্কৃত। ডেনমার্কের হ্যান্স অরস্টেড ১৮২০ সালে লক্ষ্য করেন বিদ্যুতের তারের চারপাশে তৈরি হচ্ছে চৌম্বক ক্ষেত্র। ব্যস, আরোগা, স্টার্জন, জোসেফ হেনরি, ফ্যারাডে— দুদ্দাড় গতিতে ছুটতে লাগল তড়িৎ–‌চুম্বকীয় বিজ্ঞান। এতে ভর করেই স্যামুয়েল মোর্স পেয়ে গেলেন খবর পাঠানোর বিস্ময়–‌কৌশল। ছিলেন পেশাদার  চিত্রশিল্পী আর সখের বিজ্ঞানী। ছাত্র আলফ্রেড ভেলকে নিয়ে দূরে বিভিন্ন বর্ণকে পাঠিয়ে চমকে দিলেন বিশ্বকে। বৈদ্যুতিক স্পন্দন (‌পাল্‌স বিট)‌ ডট ও ড্যাশ হয়ে ফুটে উঠল কাগজে। বর্ণরাজি পেল সাঙ্কেতিক স্ফূরণ। সাধারণ মানুষ আদরে বলল ‘‌টরে টক্কা’‌। ৪ সেপ্টেম্বর ১৮৩৭ নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মোর্স কোড সিগন্যাল পাঠানোর মহড়ায় ভিড়ে–‌ভিড়াক্কার। সাত বছরের মাথায় ২৮ মে সুপ্রিম কোর্ট থেকে বাল্টিমোর, ৪১ মাইল দূরে প্রথম টেলিগ্রাম মেসেজটি গেল। সে কি রোমাঞ্চ!‌ শুরু হল টেলি–‌যোগাযোগ যুগ। ১৮৫০–‌এর দশকে দিকে দিকে গড়ে উঠছে শিল্প, ছুটছে রেললাইন। টেলিগ্রাফ হয়ে উঠল অপরিহার্য। ভারতেও টেলিগ্রাফ লাইন চলে আসে ১৮৫৩–‌য়। ১৮৭১–‌এ জুড়ে গেল লন্ডন–‌কলকাতা। 
‘‌টরে টক্কা’‌র জনপ্রিয়তার প্রমাণ ‘‌সাড়ে চুয়াত্তর’‌ ছবিতে তিনতলার রমলার সঙ্গে দোতলার রামপ্রীতির গোপন যোগাযোগকে কটাক্ষ করে সংলাপ— ‘ওপরে–‌নিচে ‌টরে টক্কা, টরে টক্কা, টক্কা টক্কা, টরে টরে!‌’‌ স্মরণ করুন।
টেলিগ্রাফ পেয়ে গিয়ে লোকে এত খুশি হয় যে, মনে করতে থাকে, যোগাযোগের এর চেয়ে ভাল উপায় আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু বিজ্ঞান ধর্ম নয়;‌ বিজ্ঞানে চূড়ান্ত সত্য বলে কিছু নেই। সদা চরৈবেতি, এগিয়ে চলা। বিদ্যুৎ আর তড়িৎ–‌চুম্বক বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কার খুলে দিতে লাগল নানা দিগন্ত। যার হাত ধরেই এসে গেল টেলিফোন। ১৮৭৫ সালে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল টেলিফোনের আদিপুরুষ ‘‌হারমোনিক টেলিফোন যন্ত্র’‌ তৈরি করেন। তাঁর ভাষায়, ‘‌দ্য ইলেকট্রিক্যাল ট্রান্সমিশন অফ হিউম্যান স্পিচ অফ দ্য টেলিফোন।’‌ মানুষের কথার বৈদ্যুতিক প্রেরণ। এটিতে মূলত থাকত টেলিগ্রাফিক ট্রান্সমিটার আর শ্রবণযোগ্য একটি গ্রাহক (‌রিসিভার)‌। এটা সবার জানা, বিজ্ঞানের বহু আবিষ্কারই হয়েছে দুর্ঘটনা থেকে। টেলিফোনের ক্ষেত্রেও তাই। যন্ত্রটার মাধ্যমে কথাবার্তা চালানো যায় কিনা তা দেখতে দুটি ঘরের মধ্যে যন্ত্র বসিয়ে তার সংযোগ করেন গ্রাহাম বেল। ট্রান্সমিটারে ব্যবহার করেছিলেন পাতলা ধাতুর পাত (‌ফয়েল)‌। ফয়েলগুলো আলগা হয়ে শব্দ–‌চলাচলের পথ খুলে দেয়। টিউনিং ফর্কগুলো তৈরি হয়েছিল পিয়ানোর কৌশল অনুসারে। বেল নাম রেখেছিলেন রিড্‌স। ২ জুন দুপুরে সরকারি ওয়াটসন ট্রান্সমিটারের কন্ট্যাক্ট পয়েন্ট জুড়ছিলেন। হঠাৎ একটা সঙ্গীতের ধ্বনি কানে আসতেই বেল থমকে যান। সেই ঘটনার কথা পরে লিখেছিলেন— ‘‌দ্য ফার্স্ট টাইম আ হিউম্যান ইয়ার হার্ড দ্য টোন্‌স অ্যান্ড ওভারটোন্‌স অফ আ সাউন্ড ট্রান্সমিটেড বাই ইলেকট্রিসিটি।’‌— এই প্রথম মানুষের কান শুনল বিদ্যুৎ–‌বাহিত শব্দের সুরধ্বনি।
মোদ্দা বিজ্ঞান হল— টেলিফোনে কথা বললে যে শব্দতরঙ্গ তৈরি হয়, তা পার্চমেন্টের মাধ্যমে চলে যায় লোহার আর্মেচারে, যা চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে কাঁপতে থাকে। শব্দতরঙ্গ বদলে যায় তড়িৎ–‌চৌম্বকীয় তরঙ্গে। তারের মধ্যে দিয়ে তা ছুটে চলে। অন্য মাথায় ঠিক এর উল্টোটা ঘটে। তড়িৎ–‌চৌম্বকীয় তরঙ্গ আবার শব্দতরঙ্গে বদলে যায়, আমরা কথাটা শুনতে পাই।
বনফুলের ‘‌অগ্নি’‌ উপন্যাসে ভারি সুন্দরভাবে এসেছে এই আবিষ্কার–‌প্রসঙ্গ। গ্রাহাম বেল কাহিনীর নায়ক নানা দোলাচলে থাকা জেলবন্দী অংশুমানের সামনে হাজির হয়ে বলছেন, ‘মূক–‌বধিরদের নিয়ে অনেক কাল কাটিয়েছি। তাদের মুখে ভাষা দেওয়া সহজ। তারা জীবন্ত, তারা কথা কইতে উৎসুক। তার চেয়েও শক্ত কাজ আমি করেছি, জড়–‌লোহাকে কথা কইয়েছি বিদ্যুতের স্পর্শ দিয়ে। মড়ার কান চিরে যখন দেখলাম যে, সামান্য একটা পর্দার কম্পনই শ্রুতির কারণ, তখন মনে হ’‌ল, লোহার পাতলা পর্দায় সে কম্পন সঞ্চার করা অসম্ভব হবে কেন বিদ্যুতের স্পর্শ দিয়ে?‌ লেগে গেলুম.‌.‌.‌
এখনও মনে হচ্ছে, আমি করেছি। পড়েইছ তো, আসলে ব্যাপারটা ভূতুড়ে কাণ্ডের মত অদ্ভুত। ওয়াট্‌সনের ট্রান্‌সমিটিং স্প্রিং একটা বিগড়ে গেল, সে সেটা নিয়ে টানাটানি শুরু করতেই আমি পাশের ঘরে শব্দ শুনতে পেলাম। তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে দেখি, মেক–‌ব্রেক পয়েন্ট দুটো জেড়ে গেছে। ব্যস, টেলিফোন আবিষ্কারের খেই পেয়ে গেলাম!‌ কি করে জুড়ল, ঠিক ওই সময় জুড়ল কেন, আমারই বা কানে গেল কেন— সেইটেই রহস্য এবং সেইটেই বোধহয় আবিষ্কারের আসল কারণ।’‌‌
বেলের আবিষ্কার কথা জানাজানি হতেই চারিদিকে শোরগোল। বলা হতে লাগল, ‘‌দ্য রিভলিউশন ইন হিউম্যান কমিউনিকেশন হুইচ ওয়াজ স্টার্টেড বাই ‘‌দ্য টেলিগ্রাফ’‌ হ্যাজ বিন কমপ্লিটেড বাই ‘‌দ্য টেলিফোন’‌।’‌ দূরসঞ্চারে যে বিপ্লব ঘটিয়েছিল টেলিগ্রাফ, তা শেষ হল টেলিফোনে। 
১১ মার্চ ১৮৭৬ আমেরিকার বোস্টনের একটি হোটেলে বসে বেল গবেষণার কাজ চালাচ্ছিলেন। শার্লক হোমসের মতো তাঁর সহকারীর নামও ওয়াটসন। টমাস এ ওয়াটসন। নিজের ঘর থেকে বেল বলেছিলেন, ‘প্লিজ কাম হিয়ার, ‌মিস্টার ওয়াটসন— আই ওয়ান্ট ইউ।’‌ এই কটি কথাই প্রথম তারের মাধ্যমে সফলভাবে বাহিত কথা। ব্যস, শুরু টেলিফোন–‌যুগের।
যাঁরা বেলকে গবেষণায় অর্থ জোগাতেন, তাঁরা অত্যুৎসাহে ১৪ জানুয়ারি ১৮৭৬–‌এ পেটেন্ট চেয়ে দরখাস্ত করে ফেললেন। পেটেন্ট মিলে গেল ৭ মার্চ। নম্বর:‌ ১৭৪–‌৪৫৬ ইউ এস (‌১৮৭৬)‌। এই পেটেন্ট যে পরিমাণ অর্থ রোজগার করেছিল বিশ্বে তার নজির নেই। কিন্তু চুক্তি মাফিক মাত্র ১৮ বছর (‌১৮৭৬–‌৯৪) মেয়াদ ছিল পেটেন্টের। তারপর শুরু বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার।
বেলের এই সাফল্য নিরঙ্কুশ ছিল না। তাত্ত্বিক তর্কাতর্কির পাশাপাশি মামলা–‌মোকদ্দমাও কম হয়নি। প্রায় আট হাজার মামলা চলেছিল তিন দশক। তাতেও অবশ্য বেলকে তাঁর সিংহাসন থেকে নামানো যায়নি। মার্কনি–‌জগদীশের মতো তর্ক বেধেছিল কে আগে!‌ জার্মানি তো এখনও বিশ্বাস করে তাদের ফিলিপ রেইজই ‘‌দ্য ম্যান হু বিল্ট দ্য ফার্স্ট টেলিফোন।’‌ আর দেশে বেলের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এলিশা গ্রে। দু ঘণ্টার ফারাকেই ফসকে যায় ওঁর পেটেন্ট। বেলের সঙ্গে ওঁর অনেক জায়গাতেই তত্ত্বগত মিল ছিল। বিজ্ঞান গবেষণায় তা থাকতেই পারে।
বেল কখনই অন্যদের কৃতিত্ব খাটো করেননি, ঋণস্বীকারে দ্বিধাও। মারা যাওয়ার কয়েক মাস আগে ‘‌প্রি–‌হিস্টরিক টেলিফোন ডেজ’‌ শীর্ষক যে লেখাটি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক–‌এর মার্চ ১৯২২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাতে পরিষ্কারভাবে লিখেছিলেন, সমসাময়িক মহান সব বিজ্ঞানী ও ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা, তাঁদের মূল্যবান অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ লাভ করেছিলেন বলেই তাঁর পক্ষে টেলিফোন আবিষ্কার সম্ভব হয়েছিল। লন্ডন ফিললজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি আলেকজান্ডার ইলিচ, পদার্থবিদ্যার দিকপাল বিজ্ঞানী গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের কেলভিন উইলিয়াম প্রমুখের কাছে থেকে কীভাবে উপকৃত হন তারও সকৃতজ্ঞ উল্লেখ করেছিলেন।

আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের জন্ম ১৮৪৭ সালের ৩ মার্চ। স্কটল্যান্ডের এডিনবরায়। জন্মসূত্রে স্কটিশ। গ্রাহাম কথাটা অবশ্য নামের সঙ্গে জুড়েছিল ১১ বছর বয়সের পর। বাবা আলেকজান্ডার মেলভিল বেল (‌১৮১৯–‌১৯০৫)‌ ছিলেন মূক–‌বধিরদের শিক্ষক ও বাচিকশিল্পী (‌এলোকিউশনিস্ট)‌। শিক্ষাদানের জন্য চিহ্ন ইত্যাদির সাহায্যে উনি এক ‘‌দৃশ্যমান শব্দ’ (‌ভিজিব্‌ল স্পিচ)‌ পদ্ধতির আবিষ্কারও করেছিলেন। মা এলিজা গ্রেস সাইমন্ডস ছিলেন প্রায় বধির। বাবার কারণেই বধিরদের শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে বেল উৎসাহী হন। ১১ বছর বয়সে এডিনবরার রয়্যাল হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু প্রথাগত শিক্ষা একেবারেই টানেনি। ১৫ বছর বয়সেই স্কুল ছাড়েন। ১৮৬৫–‌তে ওঁদের পরিবার চলে আসে লন্ডনে। ৬৮–‌র জুনে ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ লন্ডনে এনট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করেন। ম্যাট্রিকও। তবে পড়াশোনা আর এগোয় না। ১৮৬৭ ও ৭০–‌এ যক্ষ্মায় যথাক্রমে মারা যায় বেলের ছোটভাই এডোয়ার্ড ও দাদা মেলভিল। বেল–‌পরিবার আবার ঘরছাড়া। ১৮৭০–‌এ থিতু হয় কানাডার অন্টারিওর ব্র‌্যান্টফোর্ডে। বেল ১৮৭১–‌এ চলে যান বস্টনে। বস্টন স্কুল ফর মিউটস–‌এ শিক্ষকতা করতে। পরে ম্যাসাচুসেটস, কানেকটিকাট ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় মূক–‌বধির স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন।
বেলের এক ছাত্রী ছিলেন ম্যাবেল হুবার্ড। স্কারলেট ফিভারের কারণে ম্যাবেল বধির হয়ে যান পাঁচ বছর বয়সে। ১৮৭৩–‌এ যখন ম্যাবেল বেলের সঙ্গে কাজ শুরু করেন তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৫। বয়সের ফারাক ১০ বছর হওয়া সত্ত্বেও প্রেম। বিয়ে ১১ জুলাই ১৮৭৭। ওঁদের চারটি সন্তানের দুটি শৈশবেই মারা যায়। এলসি ও মারিয়ান দীর্ঘজীবী হন।
শিক্ষকতার সময়েই একটা তারের মধ্যে দিয়ে একাধিক টেলিগ্রাফিক বার্তা পাঠানো নিয়ে গবেষণা চালিয়ে তৈরি করে ফেলেছিলেন ‘‌হারমোনিক টেলিগ্রাফ’‌। তখন ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন আর গার্ডিনার হুবার্ডের টেলিগ্রাফ কোম্পানির জোড় লড়াই বাজার দখলের। হুবার্ড বেলকে গবেষণায় অর্থসাহায্য করতে থাকেন। বেলের কিন্তু মন পড়ে টেলিগ্রাফে নয়, টেলিফোনে।
কথা বলার সমস্যা নিয়ে গবেষণাই তাঁকে শব্দবিজ্ঞান (‌অ্যাকুস্টিক্স) ও টেলিগ্রাফিতে আকৃষ্ট করেছিল। বধির ছাত্রদের ঠিকভাবে উচ্চারণ শেখানোর যন্ত্র কীভাবে তৈরি করা যায়, সে ব্যাপারে ভাল ধারণাও ছিল। সেটা ১৮৭৫। মাল্টিপল হারমনিক টেলিগ্রাফ নিয়ে কাজ করতে করতেই তাঁর মাথায় ঘুরতে শুরু করেছে টেলিফোন–‌ভাবনা। বেল বলছেন, ‘‌If I could make a current of electricity vary in intensity precisely as the air varies in density (that is, vibrates) during the production of sound, I should be able to transmit speech telegraphically.‌‌’
 বাতাসের মতো বিদ্যুৎ তরঙ্গের তীব্রতা কমাতে–‌বাড়াতে পারলেই কথাকে টেলিগ্রাফ পদ্ধতিতে পাঠাতে পারব। যে ভাবনা সেই কাজ। এক যান্ত্রিক ত্রুটিতে তা পেরেও গেলেন। রিড থেকে অতিরিক্ত এক আওয়াজ কানে আসতেই তাঁর কাছে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। বুঝতে পারেন, কণ্ঠ–‌নিঃসৃত নানা স্বর একটা জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠানো যাবে। এক বছরের মধ্যেই তৈরি করে ফেলেন প্রথম টেলিফোন যন্ত্র। ১৮৭৬ সালে প্রথম লাইন বসিয়েও ফেলেন কানাডার ব্র‌্যান্টফোর্ডে, যেখানে বাবা থাকতেন। 
১৮৭৭–‌এর জুলাইয়ে বেল টেলিফোন কোম্পানি তৈরি হয়। বেল কারিগরি উপদেষ্টা। শুধু টেলিফোন আবিষ্কারেই থেমে থাকেননি। পরে সাউন্ড রেকর্ডিং থেকে শব্দ–‌আলোর যুগলবন্দী ঘটিয়ে স্ক্যানযন্ত্র আবিষ্কারে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছিলেন। পরেরটি তো বোয়ার যুদ্ধ (‌১৮৯৯–‌১৯০২)‌ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (‌১৯১৪–‌১৮)‌ আহত সৈনিকদের শরীরে ঢুকে–‌থাকা বুলেটের অবস্থান চিহ্নিত করে, অস্ত্রোপচারে বিপুল সাহায্য করেছিল। উড়ান–‌বিজ্ঞান নিয়েও ওঁর কাজ ছিল তারিফযোগ্য। বিজ্ঞান–‌তথ্য প্রসারে উদ্যোগী ছিলেন। বিখ্যাত ‘‌সায়েন্স’‌ পত্রিকা চালাতেন। ‘‌ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি’র‌ অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। ২ আগস্ট ১৯২২ কানাডার নোভা স্কটিয়ায় নিজের এসটেটে প্রয়াত হন। ওখানেই সমাধিস্থ করা হয়।  ‌
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে বেল যে টেলিফোন যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন, তা বদলে যেতে থাকে। এই কাজে বড় অবদান টমাস আলভা এডিসনের। এই ক্ষণজন্মা বিজ্ঞানীর কথা বারান্তরে বলা যাবে। ১৯৬২ সালেই ব্রিটেনে অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ চালু হয়ে যায়। আগে কেউ ফোন করলে লাইন যেত এক্সচেঞ্জে। ফোনকারী মানে কলার ফোন তুললেই জ্বলে উঠত আলো। অপারেটর জানতে চাইতেন, ‘‌নাম্বার প্লিজ?‌’‌ তিনি লাইনটি সংশ্লিষ্ট লাইনে জুড়ে দিতেন, যেটি সোজা চলে যেত উদ্দিষ্ট ব্যক্তির টেলিফোনে। ব্যাপারটা ছিল সময়সাপেক্ষ। অপারেটরের ভুলে গোলমালও লেগে থাকত। পরে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি আসে। তখনও দূরের কলে, যাকে ট্রাঙ্ককল বলা হত, অপারেটরকে নম্বর ধরে দিতে বলতে হত। এই সূত্রে ‘‌সাড়ে চুয়াত্তর’‌ ছবির রামপ্রীতির বোর্ডিংয়ে লাইন চাওয়া এবং রমলার ফোন ধরা নিয়ে বিপত্তি উল্লেখ্য। পরে দূরের কলের জন্যও চালু হয় এসটিডি— সাবস্ক্রাইবার ট্রাঙ্ক ডায়ালিং। প্রথম চালু হয়েছিল ব্রিস্টলে ১৯৫৮ সালে। কিছুদিন আগেও পাড়ায় পাড়ায় টেলিফোন (‌এসটিডি) বুথ দেখা যেত। ফোর জি, স্মার্ট ফোন সবার কফিনে পেরেক ঠুকে দিয়েছে। ‌‌‌

রামপ্রসাদ ভবিষ্যৎ–‌দ্রষ্টা ছিলেন। বলে গিয়েছিলেন— ‘‌সময় তো থাকবে না গো মা কেবলমাত্র কথা রবে।’‌ কথাই রয়ে যাচ্ছে। এখনকার কথাসর্বস্ব জীবনের কথা ছেড়ে দিন, ছ দশক আগের হিসেব বলছে, বছরে ব্রিটেনের লোকেরা শুধু কথাতেই খরচ করেছে ৪৫ হাজার বছর!‌ ধাঁধা ঠেকছে?‌ ধাঁধা নয়, হিসেবটা এরকম— ১২ মাসে ব্রিটেনবাসী  ৪০ হাজার লক্ষ টেলিফোন কল করেছে। এক–‌একজন যদি তিন মিনিট করে সময় নিয়ে থাকেন, তাহলে মোট সময় গিয়েছে ২ হাজার লক্ষ ঘণ্টা‌, মানে ২২,৮৩১ বছর। দুজনের টেলিফোন কল ধরলে সময়টা ৪৫,৬৬২ বছর!‌ 
এখন নানা সংস্থার ‘‌অনন্ত–‌কথন’–‌এর দৌলতে দিবসে–‌রজনীতে, গণে–‌বেগণে পরিসংখ্যানটা কী দাঁড়িয়েছে, ভাবনায় আনাটাও অসম্ভব।
বেলের দৌলতেই আমাদের বাক্যবাগীশ, বকতিয়ার বা বকন্দাজ হয়ে ওঠা। ওঁকে সেলাম।‌ ■ 

জনপ্রিয়

Back To Top