প্রচেত গুপ্ত: 

ঝগড়া হচ্ছে। 
তবে চাপা গলায়। কখনও গলা নেমে যাচ্ছে একেবারে ফিসফিসের পর্যায়ে। কেউ শুনলে ভাববে, বুড়ো–‌বুড়িতে প্রেমালাপ হচ্ছে। একটাই রক্ষে এদের ঝগড়া কেউ শুনতে পাচ্ছে না। ঝগড়া যে একটা কোনও বিষয় নিয়ে হচ্ছে এমন নয়। বিষয় নানারকম। দ্রুত বদলাচ্ছেও। বিষয় যেমল বদলাচ্ছে, তেমন পক্ষও বদলাচ্ছে। কে কার পক্ষ নিয়ে কতক্ষণ বলবে তার স্থিরতা নেই। মজার কথা হল, ঝগড়ার বিষয় অনেক সময় বোঝাও যাচ্ছে না। সন্দেহ হয়, তারা কি আদৌ ঝগড়া করছে?‌ 
এখন রাত অনেকটাই হয়েছে। এই দম্পতি বসে রয়েছে তাদের বেডরুমে। বিয়ের পর থেকেই এখানেই তারা শোয়। দীর্ঘদিন থাকার ফলে দোতলার পুবদিকের এই ঘরটাও যেন তাদের একটা অংশ। তাদের বহু সুখ–দুঃখের সাক্ষী। উত্তর কলকাতার পুরনো দিনের বাড়ি। ফলে ঘরটা বড়। ঘরের জানলাগুলোও বড়। ফার্নিচারগুলোও সেরকম।  
পরিতোষবাবু মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে বললেন, ‘‌সব ব্যাপারেই তোমার বাড়াবাড়ি। এত বয়স হয়ে গেল, একটু চুপ করে থাকতে শিখলে না?‌’‌
মঞ্জুলাদেবী বললেন, ‘‌এর মধ্যে বাড়াবাড়ি কী দেখলে?‌ ছেলের নামে এইটুকু বলতে পারব ‌না!‌’‌
পরিতোষবাবু বললেন, ‘‌অবশ্যই পারবে না। তীর্থ এখনও আর ছোট নেই। তার ছেলেও বড় হয়ে গেছে। সে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ছে। আর ব্যাপারটা এমন কিছু জটিল কিছু নয়। ওরা নিজেরা বুঝে নেবে।’‌
মঞ্জুলাদেবী গজগজ করে বললেন, ‘‌ছেলে বড় হয়েছে বলে যা খুশি করবে?‌ আমরা তো ওর গার্জেন নাকি?‌’
পরিতোষবাবু বললেন, ‘ছেলে যা খুশি করলে করবে। ‌এইসব ছোটখাটো সাংসারিক জিনিস নিয়ে অনেক কূটকচালি তো করেছ, এবার বাদ দাও।’‌
মঞ্জুলাদেবী বললেন, ‘‌সংসারে থাকতে হলে ছোটখাটো জিনিস নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়, নইলে সেগুলোই বড় চেহারা নেয়। এরকম আমি কত করেছি তুমি জানতেও পারোনি। আর এটা কোনও ছোটখাটো বিষয় নয়।’‌
পরিতোষবাবু বললেন, ‘বলছি তো ওদের মাথা ঘামাতে দাও। পর্ণা যথেষ্ট বুদ্ধিমতী মেয়ে। এই গোলমাল সে সামলে নেবে।’‌
‌মঞ্জুলাদেবী চুলের গোছায় চিরুনি টানতে টানতে বললেন, ‘‌সেটাই তো বিপদের কথা। বৌমার বেশি বুদ্ধি আর আমার মেয়েটা একটা গাধা। সারা জীবন শুধু ঠকবে।’‌
পরিতোষবাবু ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গের হেসে বললেন, ‘‌এটা কী বললে!‌ মান্তু বোকা?‌ বিয়ের আগে যদি বা বোকাসোকা ছিল, তোমার জামাইয়ের পাল্লায় পড়ে এখন ষথেষ্ট চালাকচতুর হয়ে গেছে। নিজেরটা বুঝে নিতে শিখেছে। দেখতে পাচ্ছ না নরেন্দ্রপুরের শ্বশুরবাড়িতে বসে বরানগরের এই বাপেরবাড়ির ওপর কেমন নজর রেখেছে?‌’
মঞ্জুলাদেবী মুখ দিয়ে ‘‌ফুঃ’‌ ধরনের আওয়াজ করে বললেন, ‘‌‌নজর রাখার নমুনা তো দেখতেই পাচ্ছি। আগে তাও আমাকে ফোন করে পরামর্শ চাইত, এখন তো নিজেকে লায়েক ভাবছে। ভাবছে আমি সব ম্যানেজ করে নেব। আরে, তুই গাধা মেয়ে, তুই কী ম্যানেজ করবি?‌’
পরিতোষবাবু বললেন, ‘‌অবশ্যই করছে। নিজের দুই ছেলে‌মেয়ে। তাদের মানুষ করছে না?‌ দুটোই তো লেখাপড়ায় ভাল হয়েছে।’‌
মঞ্জুলাদেবী চোখ বড় করে বললেন, ‘এতে তোমার মেয়ের কী কৃতিত্ব!‌ তোমার জামাই অত ভাল ছেলে বলেই সম্ভব হয়েছে। মান্তু লেখাপড়ার কী জানে!‌’‌
পরিতোষবাবু ‌মুখে ‘‌হুহু’ আওয়াজ করে‌ বললেন, ‘‌তাহলে বলো, এই ছেলেকে তো আমিই বেছে ছিলাম। আমাকে ক্রেডিট দাও। বলো সংসারে কিছু করিনি, এবার স্বীকার করো। মেয়ের জন্য ভাল ছেলে তো আমিই খঁুজে এনেছিলাম।’‌ 
মঞ্জুলাদেবী এই কথা এড়িয়ে গেলেন। পাছে স্বামীকে ক্রেডিট দিতে হয়। ঘটনা তো সত্যি। মেয়ের পাত্রর সন্ধানে মঞ্জুলাদেবী যখন হাবুডুবু খাচ্ছেন, তখন তীর্থর খবর নিয়ে এলেন পরিতোষবাবু। তীর্থ সত্যি ভাল ছেলে। কলেজে পড়ায়। প্রথম দিকে মঞ্জুলাদেবী একটু গঁাইগুঁই করেছিলেন। বেশি লেখাপড়া জানা ছেলের সঙ্গে তার বোকা মেয়ে কি মানিয়ে চলতে পারবে?‌ ‌পরিতোষবাবু জোর করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত বিয়ে হল। নিজের ছেলে অবশ্য নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছে। তার স্ত্রীর নাম পর্ণা।
মঞ্জুলাদেবী বললেন‌, ‘‌মান্তু যতদিন আমার পরামর্শমতো চলেছে ঠিক হয়েছে।’‌ 
পরিতোষবাবু বললেন, ‘‌ভাগ্যিস, তোমার পরামর্শ বন্ধ হয়েছে। পুরো ব্যাপারটা তুমি একেবারে নেড়েঘেঁটে দিতে।’‌
মঞ্জুলাদেবী ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন, ‘‌তোমার ছেলেকেও বলিহারি। অত বউয়ের কথা শোনার কী আছে?‌ নিজের বিচারবুদ্ধি বলে কিছু নেই?‌’‌
পরিতোষবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘‌আমরা ছেলে বলছ কেন?‌ ছেলে তো তোমারও। সন্তুর যথেষ্ট বিচারবুদ্ধি রয়েছে। ঠিক সামলে নেবে। ওরা ভাইবোন, ওদের নিজের মতো বুঝতে দাও দেখি।’‌
মঞ্জুলাদেবী রাগ রাগ গলায় বললেন, ‘‌আমার দেওয়া না দেওয়ায় কী আছে?‌ ওরা ভারী আমার কথা শুনছে।’
পরিতোষবাবু খাটের ওপর বসে আছেন বালিশে হেলান দিয়ে। খাট সেগুনকাঠের। ছত্রি দেওয়া উঁচু। কালো বার্নিশে রং করা। পরিতোষবাবু পা দুটো লম্বা করে সামনে ছড়িয়ে রেখেছেন। একটার ওপর একটা তোলা। পা একটু একটু নড়ছে। দু’‌হাতে খবরের কাগজ খুলে ধরা। বাসি খবরের কাগজ। রাতে বাসি কাগজ পড়া মানু্ষটার নেশা।‌ নাকের ওপর চশমাটা এসে পড়েছে। খাটের উল্টোদিকে বসে আছেন মঞ্জুলাদেবী। চুল আঁচড়াচ্ছেন। চুলের পরিমাণ খুবই কম। বয়সের হিসেবে সব চুলই পেকে যাওয়ার কথা। কোনও এক আশ্চর্য কারণে তা হয়নি। অনেকটা সাদা হয়েও থমকে গেছে। এমনটাই বোধহয় ঘটে। কখনও বয়েস থমকে যায়। প্রতি রাতেই এই বৃদ্ধ দম্পতি এভাবে বসেন। দুজনের কথা হয়। যদিও রোজই তাঁদের মনে হয়, একসঙ্গে একটা জীবন ফুরিয়ে গেছে। সেই জীবন অনেক লম্বা। আর কোনও কথাই বাকি নেই। সব কথাই শেষ। তারপরে টুকটাক এটা–সেটা দিয়ে শুরু হয়। বকবকানি চলতেই থাকে।
এখন শ্রাবণ মাস। যখন–তখন বৃষ্টি হচ্ছে। এখনও তাই। বাইরে ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ছে। পায়ের কাছের জানলাটা খোলা। বৃষ্টির ছাট ঢুকছে।
মঞ্জুলাদেবী বললেন, ‘‌আষাঢ়ে তেমন বৃষ্টি হয়নি। এবার শ্রাবণে বেশি করে ঢালবে।’‌
পরিতোষবাবু বললেন, ‘‌সেটাই তো চিন্তার। বাড়িটার যা অবস্থা। দেখছ না দেয়ালে কেমন ড্যাম্প ধরেছে। ছাদে জল জমে যাচ্ছে। এ ঘরের জানলার কার্নিসেও ফাটল। যত বৃষ্টি হবে তত এরকম হবে। তোমার ছেলের তো বাড়ির দিকে কোনও খেয়াল নেই।’‌
মঞ্জুলাদেবী বললেন, ‘‌আর কত খেয়াল করবে?‌ এত বড় বাড়ি সামলানো চাট্টিখানি কথা নাকি?‌ কত খরচ বলো তো!‌ নাতির লেখাপড়ার পিছনে কম টাকা ঢালতে হয়?‌’‌
পরিতোষবাবু কাগজ থেকে মুখ সরিয়ে বললেন, ‘‌তা বলে নিজের বাড়ি মেরামত করবে না?‌’‌
মঞ্জুলাদেবী বললেন, ‘‌কেন করবে?‌ এত বড় বাড়ি রেখে কী হবে?‌ লেখাপড়া শেষ করে নাতি কোথায় চাকরি করে তার নেই ঠিক। সবাই তো আর আমাদের আঁকড়ে থাকতে চায় না। তোমার ছেলে‌মেয়ে দুজনেই এই বাড়ি বিক্রি করে দেওয়ার পক্ষে।’‌ 
পরিতোষবাবু ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। হাতের কাগজ পাশে সরিয়ে রেখে বললেন, ‘‌কী বলছ মঞ্জুলা!‌ এই বাড়ি বিক্রি করে দেবে!‌’‌
মঞ্জুলাদেবীর চুল অঁাচড়ানো শেষ হয়েছে। তিনি খাট থেকে নেমে দু–‌একটা কাপড় ভঁাজ করতে লাগলেন। এটা তাঁর বহুদিনের স্বভাব। সেই বিয়ের পর থেকেই। ঘর অগোছাল রেখে মোটে ঘু্মোতে পারেন না। একসময় পরিতোষবাবু রাগারাগি করতেন। 
‘এই রাতে ঘর গোছানোর কী হয়েছে?‌’‌
‘গোছাচ্ছি কই?‌ একটু ঠিকঠাক করে রাখছি।’‌
‘‌ওসব সকালে করবে, এখন লাইট নিভিয়ে তাড়াতাড়ি এসো দেখি। আমার আর তর সইছে না।’
তরুণী মঞ্জুলা লজ্জা পেয়ে বলেতেন, ‘‌যাঃ, তুমি না.‌.‌. ‌মুখে কিছু আটকায় না।’‌
যুবক পরিতোষ হাত উল্টে বলতেন, ‘‌যা বাবা, নিজের বউকে রাতে আদর করবার জন্য কাছে ডাকছি, মুখে আটকানোর কী আছে?‌’
মঞ্জুলাদেবী আরও লজ্জা পেয়ে বলতেন, ‘‌আচ্ছা বাবা, থাক থাক। আর বলতে হবে না।‌’‌
সেই গোছানো স্বভাব আজও যায়নি মঞ্জুলাদেবীর। একটা শাড়ি নামিয়ে দু’‌হাতের আঙুলে কুঁচি করতে করতে বললেন, ‘‌দেবে কিনা জানি না। ভাইবোনে টুকটাক কথা হচ্ছে। ঠিকই হচ্ছে। আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলতাম, যত তাড়াতাড়ি পারিস বেচে দে। এখানে প্রোমোটার বড় বাড়ি তুলবে। তোরা ভাইবোনে দুটো ফ্ল্যাট নিয়ে নিবি। আবার টাকাও পাবি।’‌
পরিতোষবাবু উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘ছেলেমেয়ে দুটো খেপেছে নাকি!’‌
মঞ্জুলাদেবী বললেন, ‘‌এতে খেপার কী হয়েছে?‌ আজকাল এরকম গোটা বাড়ি নিয়ে কেউ থাকে নাকি?‌ ওসব আমাদের আমলে হত। এখন একতলা–দোতলা কে ওঠানামা করবে? কে ঘুরে ঘুরে দেখবে বাড়ির কোথায় ভাঙল, কোথায় ফাটল, কোথায় চিড় খেল? এত ঝক্কি সামলানোর সময় কোথায়‌?‌ এখন সবাই ফ্ল্যাটে থাকে।’
পরিতোষবাবু বিরক্ত গলায় বললেন, ‘‌কেন? আমি দিনের পর দিন রোদজলে দঁাড়িয়ে বাড়ি বানাইনি?‌ তুমিও তো কতদিন আসতে মঞ্জুলা। আর এখন একটু ফুটোফাটা সারাতেই দম বেরিয়ে যাচ্ছে?‌’‌
মঞ্জুলাদেবী বললেন, ‘‌তুমি বুঝতে পারছ না তোমার সময় আর তোমার ছেলের সময় এক নয়।’‌
‌‌পরিতোষবাবু রেগে গিয়ে বললেন, ‘‌আমার জীবন থাকতে এ বাড়ি বিক্রি করতে দেব না।’‌
মঞ্জুলাদেবী শাড়ি গোছানো থামিয়ে স্বামীর দিকে ঘাড় ঘোরালেন। বিদ্রুপের হাসলেন। ফের কাজে মন দিলেন। পরিতোষবাবুও খানিকটা থতমত খেয়ে গেলেন। আবার বালিশে হেলান দিয়ে মুখের ওপর কাগজ তুললেন।  
মঞ্জুলাদেবী বললেন, ‘‌ওষুধগুলো খেয়েছ?‌’‌
পরিতোষবাবু গজগজ করে বললেন, ‘‌না দিলে খাব কী করে‌?‌’‌
মঞ্জুলাদেবী হাতের শাড়ি আলনার ওপর রেখে দিয়ে পাশের টেবিলের সামনে গেলেন। টেবিলের ওপর ওষুধের বাক্স। বাক্স খুলে দুটো ট্যাবলেট এনে স্বামীর হাতে দিলেন। ঢাকনা সরিয়ে জলের গ্লাস দিলেন।
‘‌এত বছর তো আমি দিলাম, এবার নিজে করো।’‌
পরিতোষবাবু ওষুধ মুখে দিয়ে জল খেলেন। নিচু গলায় বললেন, ‘‌এত তো ওষুধ খেলাম, লাভটা কী হয়েছে‌?’‌
মঞ্জুলাদেবী বললেন, ‘তাহলে আর খাচ্ছ কেন?‌’‌
পরিতোষবাবু বিড়বিড় করে বললেন, ‘‌অভ্যেসে খাচ্ছি।’‌
দুজনে চুপ করে রইলেন। পরিতোষবাবু কাগজ পড়তে লাগলেন, মঞ্জুলাদেবী একটা কৌটো খুলে খুটখাট করছেন। কাঠের চৌকো মতো এই কোটোয় অতি তুচ্ছ সব জিনিস রয়েছে। সেলাইয়ের সুতো খানিকটা, কটা বোতাম, কিছু তামার পয়সা, একটা হলুদ হয়ে আসা ফটো, একফালি কাগজে কিছু হিসেব লেখা। এত পুরনো সবকিছু যে চেনা–বোঝার উপায় নেই। কাগজে কীসের হিসেব লেখা পড়া যাচ্ছে না। ফটোটাও চেনা যাবে না। একটা হাফপ্যান্ট পরা বাচ্চা ছেলে। মুখের ওপর থেকে চলটা উঠে গেছে। বাক্সটা নিয়ে খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করে আবার আলমারিতে তুলে রাখলেন মঞ্জুলাদেবী। এটা তিনি মাঝেই মাঝেই করেন। পরিতোষবাবুও রেগে যান।
‌‘‌ফেলে দেওয়া জিনিসগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া এবার বন্ধ করো। অনেকদিন তো হল।’‌
মঞ্জুলাদেবী গা করেন না। বেশিবার বললে জবাব দেন,
‘‌তোমার সমস্যা কী‌?‌’
আজ অবশ্য পরিতোষবাবু কিছু বললেন না। খবরের কাগজের ফঁাক দিয়ে একবার উঁকি মেরে ভুরু কোঁচাকালেন। বৃষ্টির দাপট বাড়ছে। এই ঘরের কাছাকাছি কেউ টিনের চালা দিয়েছে। বৃষ্টি পড়বার ভারী সুন্দর আওয়াজ হচ্ছে।
মঞ্জুলাদেবী জানলার কাছে গিয়ে দঁাড়ালেন। এত বয়স হয়েছে, চেহারার আভিজাত্য নষ্ট হয়নি।
‘শুনেছ, তোমার নাতি এবারের সেমিস্টারেও খুব ভাল রেজাল্ট করেছে।’‌
পরিতোষবাবু কাগজ ভঁাজ করতে করতে আনন্দিত গলায় বললেন, ‘‌আমি জানতাম। কার নাতি দেখতে হবে না!‌’‌
মঞ্জুলাদেবী হেসে ফেলে বললেন, ‌‘‌আর আমার নাতনির সুখবরটা শুনবে?‌’‌
পরিতোষবাবু হাসি হাসি মুখে বললেন, ‘‌তার আবার কী হল?‌’‌
মঞ্জুলাদেবী বললেন, ‌‘কিঙ্কি রাঁচির ডান্স অ্যান্ড মিউজিক কনফারেন্সে চান্স পেয়েছে। জুনিয়র আর্টিস্ট বিভাগে নাচবে। কত্থক নাচ।’‌
পরিতোষবাবু বললেন, ‘‌বাঃ, মান্তু মেয়েটার জন্য খেটেছে।’‌
মঞ্জুলাদেবী অভিমান মাখা গলায় বললেন, ‘‌আহা, শুধু মেয়ের প্রশংসা করছ?‌ আমি যে ওকে বারবার বলতাম, যতই স্কুলে চাপ বাড়ুক মেয়েকে নাচ ছাড়াবি না, তার কোনও দাম নেই?‌’‌
পরিতোষবাবু উৎসাহভরা গলায় বললেন,‌ ‘‌অবশ্যই আছে। তোমার বোকা মেয়ের পিছনে পড়ে না থাকলে এতসব ও করতে পারত?‌’‌
মঞ্জুলাদেবী নিচু গলায় বললেন,‌ ‘‌সংসারের জন্য তুমিও অনেক করেছ। ছেলেটা আজ এত ভাল মানুষ হয়ে চাকরিবাকরি করে সে তো তোমার জন্যই।’‌
পরিতোষবাবু গদগদ গলায় বললেন, ‌‘‌আমি একা কেন, তুমিও তো সবসময় আমার পাশে থেকেছ মঞ্জুলা।’‌
মঞ্জুলাদেবী কপট রাগ দেখিয়ে বললেন, ‘‌এখন নেই বুঝি?‌’‌
পরিতোষবাবু খাট থেকে নেমে স্ত্রীর পাশে এসে দঁাড়ালেন। জানলা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আর জলের ছাট এসে বুড়োবুড়ির গায়ে লাগছে। প্রকৃতি যেন দুজনকে নিজের পরশ পৌঁছে দিচ্ছে।
পরিতোষবাবু স্ত্রীর কাছ ঘেঁষে, ফিসফিস করে বললেন, ‘‌মনে আছে মঞ্জুলা, মনে আছে বিয়ের পর আমরা কেমন রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে ছাদে উঠে বৃষ্টিতে ভিজতাম?‌’‌
মঞ্জুলা গাঢ় স্বরে বললেন, ‘‌মনে নেই আবার!‌ ইস্‌, তুমি যা করতে। একবার শাশুড়ি দেখে ফেললেন.‌.‌.‌।’‌
দুজনে চুপ করে দঁাড়িয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনতে লাগলেন।
পরিতোষবাবু অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘‌মন কেমন করে।’‌
মঞ্জুলাদেবী অস্ফুটে বললেন, ‘‌আমারও।’‌
পরিতোষবাবু বললেন, ‘‌একটা গান শোনাবে?‌’‌ 
মঞ্জুলাদেবী চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘‌বুড়ো বয়েসে খেপেছ?‌’
‌পরিতোষবাবু স্ত্রীর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে, ‘‌হ্যঁা। খেপেছি। প্লিজ।’‌
মঞ্জুলাদেবী কিছুক্ষণ চুপ করে নিচু গলায় গান ধরলেন।
‘‌আমিও একাকী, তুমিও একাকী, আজি এ বাদল রাতে। নিদ্‌ নাহি অঁাখিপাতে.‌.‌.‌।’‌
আকাশ আলো করে বিদ্যুৎ জ্বলে উঠল।
সেই আলো জানলার ফঁাকফোকর দিয়ে একতলার ঘরেতেও ঢুকেছে। সেখানে শুয়ে আছে পর্ণা আর তীর্থ। পর্ণার ঘুম আসছে না। সে অনেকক্ষণ ধরে বৃষ্টির আওয়াজ শুনছে। স্বামীর গায়ে হাত দিয়ে বলল, ‘‌অ্যাই শুনছ?‌’‌
তীর্থ ঘুমজড়ানো গলায় বলল, ‘‌কী হয়েছে?‌’‌
‘‌খুব বৃষ্টি হচ্ছে।’‌
তীর্থ বিরক্ত গলায় বলল, ‘‌বর্ষাকালে বৃষ্টি তো হবেই।’‌
পর্ণা বলল, ‘‌এবার বাবা–‌মায়ের ঘরটার একটা ব্যবস্থা করো। ওঁরা চলে যাওয়ার পর এত বছর হয়ে গেল, ঘরটা ফঁাকা পড়ে আছে। কেমন একটা লাগে যেন। ওপরে উঠলে মনে হয়.‌.‌.‌।’‌
তীর্থ পাশ ফিরতে ফিরতে বলল, ‘চিন্তা কোরো না। গোটা বাড়িটারই ব্যবস্থা করব। বেচে দেব। এখন ঘুমোও তো।’‌
গম্ভীর অথচ শান্ত ভঙ্গিতে মেঘ ডেকে উঠল। ■

জনপ্রিয়

Back To Top