পবিত্র সরকার: প্রত্যেক বছর স্কুলের পরে নানা গণপরীক্ষার (public examination)-এর ফল বের হয়, আর আমার মনে ভালো-মন্দের এক তীব্র, মিশ্র অনুভূতি খেলা করতে থাকে। দারুণ সফল ছাত্রছাত্রীদের, ওই ‘র‍্যাংকার’দের তালিকা বেরোয়, অনেকের নাম পাই, কারও কারও ছবি পাই, ভাল লাগে। মা মেয়েকে বা ছেলেকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন, পাড়ার লোকে, স্কুলের শিক্ষক বা দিদিমণিরা এসে হাতে ফুল তুলে দিচ্ছেন— এ ছবি বুক ভরিয়ে দেয়। ভাবি যে, একটা উজ্জ্বল প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, প্রতি বছর, ভরসা হারানোর কিছু নেই। এই ছবি আমার মতো লোককে এই নিদারুণ সত্যটা কয়েক মুহূর্তের জন্যে হলেও ভুলিয়ে দেয় যে, এখনও দেশের একশো জনের মধ্যে প্রায় কুড়ি জন মানুষ নিরক্ষর, মেয়েরা, সংখ্যালঘুরা, দলিত আর আদিবাসীরা আরও বেশি। যেখানে উত্তর কোরিয়াতে একশোতে একশো ভাগ স্বাক্ষর, সমস্ত প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলেতে সাক্ষরতা কমপক্ষে ৯৯ শতাংশ, কিউবাতে ৯৮.৫০, এমনকি শ্রীলঙ্কাতে  ৯২, ৬০ শতাংশ, সেখানে এই একই সূত্রে ভারতের সাক্ষর দেখাচ্ছে ৭১.২০ শতাংশ, যদিও ২০১১ সালের ভারতীয় জনগণনার  হিসেবে ৭৪.৪ শতাংশ।  ভাবা যায় যে, একটা দেশের এক চতুর্থাংশ মানুষ নিরক্ষর, এখানে বয়স্ক নিরক্ষরের সংখ্যাই হল ২৮ কোটি ৭০ লক্ষ! দেশের মধ্যেও এক কেরল, লাক্ষাদ্বীপ আর মিজোরাম ছাড়া আর কেউ নব্বইয়ের ঘরে নেই, পশ্চিমবঙ্গ ৭৭.০৮ শতাংশ নিয়ে কুড়ি নম্বরে।    
অবশ্যই বলা হবে এত বড় দেশ, এত লোক।  কিন্তু সময়ও তো পেলাম শতাব্দীর প্রায় চারভাগের তিন ভাগ। আর দু’বছর পরেই স্বাধীনতার প্লাটিনাম জয়ন্তী উদযাপন করব আমরা। দেশের শাসকেরা, ধর্ম নিয়ে, মন্দির নিয়ে, নেতাদের বিশাল আকাশ-গুঁতোনো মূর্তি নিয়ে আর রাষ্ট্রীয় পরিসেবাগুলোকে ইয়ারদোস্তদের কাছে বিক্রিতে যত উৎসাহী, মানুষকে লেখাপড়া শেখাতে তত উৎসাহী বলে মনে হয় না। নইলে বছর বছর শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কমে কেন, যেখানে ছাত্রের সংখ্যা প্রতিবছর (আশা করি) বেড়ে চলেছে !
তবু তারই মধ্যে, শিক্ষায় আমাদের মধ্যবিত্ত বা উচ্চতরদের দাপটের পাশাপাশি যখন দেখি, দিনমজুরের আর বিড়ি- শ্রমিকের মেয়ে হাই মাদ্রাসা পরীক্ষায় প্রথম হয়, বা ইটভাটার শ্রমিক বা রিকশাচালক বা সবজিবিক্রেতার বা ফুটপাথে জুতো-সারাইকারীর সন্তান পরীক্ষায় নিজেকে উজ্জ্বলভাবে প্রমাণ করছে, মধ্যবিত্ত উচ্চ-মধ্যবিত্তদের একাধিক প্রাইভেট টিউটরের প্রশিক্ষণ ধন্য, আহার-দুশ্চিন্তাহীন ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে, অনেককে হারিয়ে দিচ্ছে, তখন মনটা খুশি হয়ে ওঠে বইকি। মধ্যবিত্ত বা ধনী ছেলেমেয়েদের সম্বন্ধে আমার কোনও বিদ্বেষ নেই, আমি এখন তাদেরই শ্রেণিতে তলার কাছাকাছি মাঝারি জায়গায় আশ্রয় পেয়েছি। কিন্তু তারা নিজেরাই নিশ্চয়ই স্বীকার করবে, ওই সব ছেলেমেয়েদের চেয়ে তারা সুযোগ কত বেশি পেয়েছিল, বেশি পায়। এই দুঃসহ সুযোগহীনতার পাহাড় পার হয়ে তারা যখন চুড়োয় পৌঁছায় তখন তাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে তারাও নিশ্চয় কুণ্ঠিত হবে না। এমন ঘটনা বহুদিন ধরেই কিছু কিছু ঘটছে, ‘আজকাল’-এর পাতায় ‘অভাবী, মেধাবী’ বলে একটা অংশ বোধ হয় প্রায় চল্লিশ বছর ধরেই ছাপা হচ্ছে।   
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, এই যে খবরের কাগজে টেলিভিশন ইত্যাদিতে দু-একদিন ধরে তাদের মুখগুলো ভেসে উঠে আমাদের সুখী আর গর্বিত করে, তার পর তারা কোথায় যায়?  অনুমান করি যে, তারা নির্বিঘ্নে পরের স্তরে পৌঁছে যায়, কলেজে বিনা বিঘ্নে ভর্তি হয়, সমান স্বপ্ন আর শক্তি নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে, তার পর তাঁদের দরিদ্র আর সম্মানহীন বাবা-মা বা পরিবারকে তুলে আনে দারিদ্র্য থেকে মানহীনতা থেকে। অন্তত চিত্রনাট্যটা এ রকমই হওয়ার কথা। আমি এমন বলছি না যে, সকলের জীবন রূপকথার মতো ‘and they lived happily ever after’ দিয়ে শেষ হয়। আমাদের মধ্যবিত্তদের জীবনও তা হয় না। কিন্তু একটা সাফল্য নিশ্চয় তাদের অন্য সাফল্যের দিকে এগিয়ে দেয়, পরে আরও সাফল্যের দিকে, হয়তো আরও আরও সাফল্যের দিকে।
এমন হয় না বাস্তবক্ষেত্রে, তাও খুবই সম্ভব। একটা সাফল্যে তাদের সব রাস্তা গোলাপের পাপড়িতে বিছানো হয়ে গেল—এমন যে আশা করে সে বাতুল। কিন্তু কথা হল, আমরা কি তার খবর রাখি? তাদের ওই মিডিয়া-উদ্ভাসের পর আর কি আমরা তাদের খবর রাখি, বা আর কি আমাদের জানার কোনও সুযোগ আছে যে তারা কে কেমন করল জীবনে? কাগজে টেলিভিশনে তাদের খবর বেরোনোমাত্র তাদের সম্বন্ধে আমাদের যে বিপুল শুভেচ্ছা তৈরি হল, তা যেন মাঝপথে নিঃশেষ হয়, আবার পরের বছর নতুন দলের জন্য আমাদের শুভেচ্ছা নির্মাণ করতে হয়। আগের বছরের দলটা আমাদের শুভেচ্ছার বৃত্ত থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায়। তারা হয়ে যায় একটা লুপ্ত প্রজন্ম, তাদের সম্বন্ধে আর আমরা কোনও খোঁজ রাখব না, খোঁজ পাব না। এই ভাবে বছরের পর বছর ঘটবে।
আমি বলছিলাম, এই ব্যবস্থাটার কোনও বদল ঘটানো যায় কি না। মিডিয়ার বন্ধুরা, বা কোনও এনজিও বা সরকারি শিক্ষাদপ্তরের কোনও ব্যবস্থা এদের জীবনকে কোনওভাবে অনুসরণ করার একটা উপায় বার করতে পারেন কি না, যাতে বোঝা যায়— রাষ্ট্র, সমাজ, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাদের পাশে কীভাবে দাঁড়িয়েছে, কীভাবে তারা নিজেরা লড়াই করছে, জিতছে বা, এমনকি, হারছে। হারলে, কেন হারছে। হারার ক্ষেত্রে কেউ তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে কি না। 
আমার কেবলই মনে হয়, এবং নিশ্চয়ই আমার মতো আরও অনেকে ভাবেন, বছরের একটা সময় মিডিয়া তাঁদের উজ্জ্বল মুখগুলোকে আমাদের সামনে তুলে আনল, তাদের লড়াইকে কুর্নিশ করার সুযোগ দিল, কিন্তু তার পরেই তারা আমাদের মনোযোগের বৃত্ত থেকে একেবারে হারিয়ে গেল— এই ব্যাপারটা খুব একটা ন্যায্য ব্যাপার নয়। এই ‘অভাবী মেধাবী’দের এগিয়ে যাওয়ার ইতিবৃত্ত আসলে একটা দেশের আসল এগিয়ে যাওয়ার ইতিবৃত্ত। আমাদের দেশের একটা কেউ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনীদের তালিকায় চার নম্বরে পৌঁছেছেন, আমরা আত্মনির্ভরশীল হয়ে প্রতিবেশী কখনও-বন্ধু কখনও-শত্রু কোনও দেশের মুখে ঝামা ঘসে দিতে পারছি, তার চেয়ে এই ছেলেমেয়েগুলোর এগিয়ে যাওয়ার খবর অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।  মধ্যবিত্ত আর তাদের ওপরতলাকে নিয়ে আমার কোনও চিন্তা নেই, তারা তাদের নিজেদেরই দেখতে পারে। কিন্তু এই সব ছেলেমেয়েরা ? 
তারা এগোচ্ছে, এই খবরটা মাঝে মাঝে পেতে চাই। মিডিয়া-প্রক্ষেপের আড়ালে থেকেও এগোচ্ছ, একটা সাফল্য তাদের আর-একটা সাফল্যের ধাপ তৈরি করে দিচ্ছে, সকলে তাদের পাশে আছে—এই খবরগুলো মাঝে মাঝে আসুক না! তার ব্যবস্থা করা খুবই কি কঠিন? 

জনপ্রিয়

Back To Top