তিনি মঞ্জুদেবী। দেশের প্রথম মহিলা মালবাহক। জয়পুর স্টেশনে কাজ করেন আক্ষরিক অর্থেই পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। তাঁর সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা টেলিফোনে কথা বললেন দেবারতি দাশগুপ্ত। বাংলা সংবাদপত্রকে দেওয়া এটি তাঁর এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার।

 

মঞ্জুদেবীর বয়স ৩৫। পিতৃহারা তিন সন্তানকে ‘‌মানুষ’‌ করে তোলার স্বপ্নে বাধ্য হয়ে বেছে নিয়েছেন এমন এক পেশা, যেখানে উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে হয়। এমনই সেই পরিশ্রম যা আমাদের দেশের মহিলাদের জন্য কল্পনা করা যায় না। করা যায় না শারীরিক কারণে, করা যায় না সামাজিক কারণে, করা যায় না সংস্কারের ঘেরাটোপে। মঞ্জুদেবী সব বাধা টপকেছেন। ভারতীয় নারীর প্রতিনিধি হয়ে বলেছেন, ‘‌হম কিসিসে কম নহি।’‌
এ তো একধরনের যুদ্ধই। 
কথা বলতে হবে এই বিজয়িনীর সঙ্গে। যেভাবেই হোক, জানতে হবে তাঁর কাজের কথা, মনের কথা। যদি পারি, তবে তা হবে এক্সক্লুসিভ। সম্ভবত বাংলা সংবাদপত্রের জন্য প্রথম। কিন্তু কীভাবে করব?‌ জয়পুর স্টেশনে গেলে দেখা মিলবে তঁার। কিন্তু হুট বলতে তো জয়পুর ছুটে যাওয়া যাবে না। তাহলে?‌ একটাই উপায়— টেলিফোনে যদি ধরা যায়। কিন্তু ফোনের নম্বর?‌ জয়পুর রেলস্টেশনের এক সামান্য মালবাহিকা তো বিখ্যাত কেউ নন। তাঁর ফোন নম্বর কে দিতে পারবে?‌  
নেট খুলে উত্তর–‌‌পশ্চিম রেলের ডিরেক্টরি ঘাঁটলে কেমন হয়?‌ ডিরেক্টরিতে হাজার হাজার নাম। চোখে পড়ল জয়পুর ডিভিশন। সেখানেও লম্বা তালিকা। পরপর নম্বরে ফোন করেই চলেছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নম্বর হয় ভুল, নয় বেজে চলেছে। শেষ পর্যন্ত জয়পুরের ডিআরএম জি সি বুধলকোটি সাহেবের দপ্তরের ফোনটা পেয়ে গেলাম। ‘‌ইয়ে বুধলকোটিজি কা নম্বরই হ্যায় না?‌’‌ 
ওপার থেকে উত্তর এল, ‘‌ওহ তো বদলি হো চুকে হ্যায়!‌ আপ কৌন?‌’‌ 
পরিচয় দিয়ে উত্তরদাতার নাম জেনে নিলাম। উনি জয়পুর ডিভিশনের এডিআরএম প্রমোদ কুমার। বললাম, ‘‌একটা আবদার আছে স্যর, আপনাদের জয়পুর স্টেশনের মঞ্জুজি আছেন না.‌.‌.‌’‌ 
‘‌তাই বলুন, আপনার মঞ্জুর নম্বর চাই?‌’‌ 
উত্তজনায় এত জোরে ‘‌‌হ্যাঁ’‌ বললাম যে নিজেরই লজ্জা করল। তবে এটা বলার কারণ আমার কথা বলা নয়, মঞ্জুদেবী যে পরিচিত হয়ে উঠেছেন সেটা মালুম হল। 
‘‌১০ মিনিট পরে ফোন করতে পারবেন?‌’‌  
‘জরুর।’‌ 
এত দীর্ঘ ১০ মিনিট আগে এসেছে কি?‌ বুকের ধুকপুকানি নিয়ে ঠিক ১০ মিনিট পর প্রমোদ কুমারকে ফোন করলাম ফের। ওপার থেকে জবাব এল,‌ ‘‌লিখে নিন ৮২৭৮.‌.‌.‌।’‌ 
একটুও দেরি নয়। মঞ্জুদেবীর নম্বর ধরলাম দ্রুত হাতে। ওপারে পুরুষকণ্ঠ। এই রে!‌ নম্বর ঠিক তো?‌ জানতে চাইলাম এটা মঞ্জুজির নম্বর?‌
‘‌জি হঁা’‌
‘‌জয়পুরকি মঞ্জুজি?‌’‌
‘‌জি জি, দেশ কি পহেলি মহিলা কুলি।’‌
ইউরেকা!‌ নম্বর তবে ঠিকই আছে।‌ একটুও ঢোঁক না গিলে গড়গড়িয়ে হিন্দিতে বললাম, ‘‌কলকাতা থেকে বলছি। ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলব। একটা সাক্ষাৎকার চাই। কখন ফোন করলে পাওয়া যাবে?‌’‌
‘‌মঞ্জু তো এখন শুটিং করছে!‌ মিডিয়াওয়ালারা এসেছে। ওর ছবি তুলছে। এখন খুব ব্যস্ত আছে!‌’‌
মঞ্জুদেবী তাহলে সেলিব্রিটি হচ্ছেন?‌ দারুণ!‌ সবাই চিনুক তাকে। 
মঞ্জুর ফোন ধরেছিলেন যিনি তাঁর শুভনাম শুভদয়াল। মঞ্জুর সহকর্মী। ফোনটা তাঁর জিম্মায় রেখে সংবাদ মাধ্যমের বায়নাক্কা মেটাতে ক্যামেরার সামনে কখনও ট্রলি ঠেলছেন, কখনও মাথায় করে সুটকেস বইছিলেন মঞ্জু। সেসব ফটো তো আমরা পত্রপত্রিকায় ইতিমধ্যেই দেখছি।  
শুভদয়াল আশ্বস্ত করে বললেন, ‘‌মঞ্জু, আপনার সঙ্গে কথা বলবে। চিন্তার কিছু নেই। তার ওপর আপনি অতদূর থেকে ফোন করেছেন।’‌
‘‌কিন্তু কখন?‌ ঘণ্টাখানেক পর ফোন করি?‌’‌
‘‌দরকার নেই। ওই আপনাকে ধরে নেবে। এটাই আপনার নম্বর তো?‌’‌
ঘণ্টাখানেকও লাগল না। মেরেকেটে ৪০ মিনিট। ফোন করলেন মঞ্জু। মোবাইল স্ক্রিনে ওঁর নাম ফ্ল্যাশ হতেই, (‌‌লুকিয়ে লাভ নেই)‌ আমি ছোট একটা লাফ মারলাম। সল্টলেকে বসে জয়পুরের কাউকে ধরা কোনও বিষয় নয়। কিন্তু যোগাযোগের নম্বর পাওয়ার পথটা যদি এত জটিল হয় আর যার সঙ্গে কথা বলছি তিনি যদি মঞ্জুদেবীর মতো কেউ হন, তাহলে আনন্দে একটু উত্তেজিত হওয়া নিশ্চয় বড় অন্যায় নয়। পাঠক নিশ্চয় আমাকে ক্ষমা করবেন।‌ জয়পুরের হিন্দির সঙ্গে তাল মেলাতে একটু সমস্যা হলেও, কথা বুঝতে অসুবিধে হয় না মোটেও।
‘‌আরে মঞ্জুজি!‌ নমস্তে জি!‌ আপনি রাখুন, আমি ফোন করছি।’‌
মঞ্জুদেবী—‌আরে না না!‌ কোই বাত নহি। মেরা ফ্রি কা কল হ্যায়।
‘‌আপনি যে কাজটা করেন, তা খুবই প্রশংসাযোগ্য, খুবই সাহসের। আপনাকে অভিনন্দন‌। বধাই হো জি।‌’‌
মঞ্জুদেবী— ‌হ্যাঁ সবাই তো সেরকমই বলছে।‌ তবে কি জানেন, অতশত বুঝি না। দেখুন, এ কথা ঠিকই যে কোনও কাজ ছোট বড় হয় না। তবে কী, আমি কিন্তু বাধ্য হয়েই এই কাজে এসেছি। মজবুরি মেঁ করনা পঢ়তা হ্যায়।‌‌
‘‌কেন?’‌
মঞ্জুদেবী—‌কী করব বলুন তো?‌ আমার মতো আনপঢ় মহিলার ছোটখাটো কোনও চাকরিও কি জুটত?‌ অনেক ভেবে দেখলাম কারও কাছে হাত না পেতে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে গেলে কুলির কাজও যদি জোটে, তা–‌‌ই সই।
‘‌কতদিন ধরে এই কাজ করছেন?‌’‌
মঞ্জুদেবী—‌তা দশ বছর তো হল।‌‌
১০ বছর আগে মঞ্জুদেবীর জীবন কেমন ছিল?‌ আজকের মঞ্জুর সঙ্গে সেই মঞ্জুর কতটা তফাত?‌ 
জয়পুর জেলার ফুলেরা ব্লকের সুন্দরপুরা গ্রামে স্বামী, তিন সন্তানকে নিয়ে টানাটানি হলেও সুখের সংসার ছিল। মঞ্জু তখন আদ্যন্ত ‘‌কোনও এক গাঁয়ের বধূ’‌। দু’‌হাত ঘোমটা ছাড়া উঠোনেও বেরোতেন না। আর এখন লাল টকটকে কুলির পোশাকে, হাতে ১৫ নম্বর বিল্লা বেঁধে বিশাল জয়পুর স্টেশনে এমুড়ো ওমুড়ো চষে বেড়াচ্ছেন। একেই কি বলে হিম্মত? কাজকে ছোটো না ভেবে, অসম্ভব না ভেবে মাথা তুলে থাকা?‌‌
স্বামী মহাদেবও কুলি ছিলেন। জয়পুর স্টেশনেই কাজ করতেন। দশ বছর আগে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার অভাবে যখন মারা যান, বড় মেয়েটার তখন ৬ বছর বয়স। মেজো ছেলে ৫ বছর, আর ছোটোটা সবে ৩। ওদের নিয়ে কোথায় যাবেন, কী করবেন, ভেবে আকুল হয়ে পড়েন মঞ্জু। স্বামীকে হারানোর শোকের থেকে বড় হয়ে দেখা দেয় সন্তানদের বঁাচানোর চিন্তা, বড় করবার চিন্তা। 
বাপের বাড়ির অবস্থাও সঙ্গীন। এক ভাই, ছ’‌বোনের কোনওমতে টায়েটুয়ে দিন গুজরান। তার ওপর তিন সন্তান। বৃদ্ধা শাশুড়িও বেঁচে ছিলেন তখন। বোঝা বাড়াতে চাননি পঁচিশ বছরের মঞ্জু। কিন্তু একমাত্র রোজগেরে লোকটাই তো আর নেই। ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার তুলে দেবেন কীভাবে?‌‌
প্রয়াত স্বামীর সহকর্মীরা বললেন, তুমি বরং মহাদেবের কাজটাই করো না। জয়পুর স্টেশন আধিকারিকদের সঙ্গে দফায় দফায় তদ্বির করে ওরাই কাজটা জুটিয়ে দিয়েছিলেন। মহাদেবের উর্দি, তাঁরই ১৫ নম্বর বিল্লা ডানহাতে বেঁধে শুরু হল নতুন জীবন।
‘‌প্রথম দিনটা মনে পড়ে মঞ্জুজি?‌’‌
‌মঞ্জুজি— ‌‌আরে বাপ রে!‌ সে কী ভোলা যায়?‌‌ তখন সদ্য আমাদের সুন্দরপুরা গাঁ থেকে জয়পুরে এসেছি। এত বড় শহর!‌ যা দেখছি, চোখে ধাঁধা লেগে যাওয়ার জোগাড়। স্টেশনে পা রেখে তো কথাই নেই। সারি সারি প্ল্যাটফর্ম, কোথা থেকে ট্রেন আসছে, কোথা থেকে যাচ্ছে কিছুই জানি না। তারপর এত ভিড়, ধাক্কাধাক্কি। প্রথমদিন তো ধাক্কা খেতে খেতেই এগিয়ে গেলাম। স্টেশন থেকে বেরিয়ে আরেক চিত্তির। সাঁইসাঁই করে বড় বড় গাড়ি আসছে আর যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল শেষে চাপা পড়ে না মরি।


সেদিনের কথা বলতে গিয়ে নিজেই হেসে ফেললেন মঞ্জু। শুধু বড় শহরের অনভ্যাস?‌ কাজটাও অজানা ছিল। জয়পুর স্টেশনের ১৭৭ জন কুলির মধ্যে তিনিই একা মহিলা যে। 
মঞ্জুদেবী—‌প্রথম দিনটা একেবারে কুঁকড়ে ছিলাম জানেন। একইসঙ্গে লজ্জা, সঙ্কোচ, ভয়। সে নানা অভিজ্ঞতা। যেদিকেই তাকাই সব পুরুষমানুষ। ওঁদের সঙ্গে কথা বলব?‌‌ লজ্জায় মরে যাই আর কি!‌ খেতেও পারিনি ওদের সামনে। কাজ না থাকলে এক কোণে চুপ করে বসে থাকতাম।‌‌
এরকম বেশ কিছুদিন গেছে। না খেয়ে, পরিশ্রমে অসুস্থ হয়ে শেষে হাসপাতালে অবধি ভর্তি হতে হয়েছিল। ছাড়া পাওয়ার পর মেয়েকে বোঝান মা মোহিনীদেবী। বলেন, ওদের সঙ্গেই যখন কাজ, ওদের সঙ্গে সহজভাবে মেলামেশাও করতে হবে। 
কথার মাঝখানে ফোন কেটে গেল। মঞ্জুকে আবার ধরতে বেশ কিছুক্ষণ লাগে। ফোনে সে কিন্তু অপেক্ষা করছিল। ফোন ফেলে চলে যায়নি অন্য কাজে। সামান্য ঘটনা কিন্তু ধৈর্যের একটা পরীক্ষা তো বটে।
‘‌সহকর্মীরা সব কেমন?‌ আপনাকে সাহায্য করেন?‌’‌
মঞ্জুদেবী— ‌খুব ভাল ম্যাডাম। খুবই ভাল। আমাকে মেয়ের মতো, বোনের মতো দেখেন। ওঁরা পাশে না থাকলে কী আর এতদিন এই কাজ টানতে পারি?‌‌
‘‌আর যাত্রীরা?’‌
মঞ্জুদেবী—প্রথম প্রথম তো আমাকে দেখে হাঁ হয়ে যেত। আগাপাশতলা দেখে চলে যেত। পালিয়ে যেত যেন। কুলির পোশাকে মহিলা!‌ এ আবার হয় নাকি!‌‌ মেয়েমানুষ আবার মাল বইতে পারে?‌‌‌ ভাবতেই পারত না। তারপর আমার মেহনত দেখে ভরসা করতে শিখেছে।  অভ্যেস হয়েছে। বুঝেছে, হম কিসিসে কম নহি। ‌(‌একটু থেমে)‌ ‌তাছাড়া এখন তো আমার একটু নামটাম হয়েছে। অনেকেই এসে খোঁজ করছেন। (‌ফোনের ‌ওপারে ঈষৎ লজ্জারাঙা মঞ্জুর মুখটা যেন দেখতে পেলাম)‌।
সত্যি নাম তো হয়েছে। সদ্য রাষ্ট্রপতি ভবনে ডেকে দেশের প্রথম মহিলা মালবাহক হিসেবে মঞ্জুদেবীকে সম্মানিত করেছেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। ঝলমলে সেই সভায় ১১২ জন কৃতী মহিলার মধ্যে ছিলেন প্রাক্তন বিশ্বসু্ন্দরী ঐশ্বর্য রাইও। সংবর্ধনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় মহিলা ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রক। সবাই প্রভাবিত, অনুপ্রাণিত। পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন।
‘‌তা ওরা কিছু দিয়েছে কি?‌’‌
‌মঞ্জুদেবী—‌ ‌দিল্লি যাতায়াতের ভাড়াটাই যা লাগেনি। আর কিছু না।‌‌
‘‌তা-‌ও এত বাহবা, অভিনন্দন, তালি। অচ্ছা লগতা হোগা নহি?‌’‌
মঞ্জুদেবী—শাবাশি সে পেট নহি ভরতা ম্যাডাম। ভুখ নহি মিটতি।‌ জানেন, এই জয়পুরে মাথা গোঁজার একচিলতে ঘরের জন্য কত ভাড়া দিই?‌
‘‌কত?‌’‌
মঞ্জুদেবী—‌‌‌ছ’‌হাজার!‌ তারপর জলের টাকা, বিদ্যুতের বিল। সব মিলিয়ে ১০ হাজার টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। এরপর আর হাতে কিছু থাকে?‌ ছেলেমেয়েগুলো বড় হচ্ছে। রোজ বাজার করতে গিয়ে মাথা খারাপ হয়ে যায়। জানেন, এখানে সবজির দাম কত?‌
‘‌রাজ্য সরকারও কিছু সাহায্য করে না?‌’‌
মঞ্জুদেবী—‌কোথায় আর?‌ এখানে–ওখানে নিয়ে যায়। সংবর্ধনা দেয়। লোকের মধ্যে হাজির করে। আর সবার ওই এক কথা— খুব ভাল কাজ করছেন। চালিয়ে যান। চালিয়ে যান। শালের পর শাল, ট্রফিতে ঘর ভরে যাচ্ছে। তাতে আখেরে লাভ কী হবে?‌
‘‌আর রেল?‌’‌
মঞ্জুদেবী—‌রেলই তো চাকরিটা দিল। ‌এই এত সাক্ষাৎকার দিচ্ছি রোজ, খবরের কাগজওয়ালাদেরও ওই এক কথা। এক কাজ পিঠ চাপড়ে দিয়ে খবর নিয়ে যাওয়া। কিসি কো দুখ নহি হোতা। দয়া নহি আতি। 
কয়েক সেকেন্ডের অপ্রস্তুত নীরবতা ভাঙলেন মঞ্জু নিজেই। খাস জয়পুরি হিন্দিতে কথা শুরু করলেন ফের।
মঞ্জুদেবী—‌আজ গিরমি বোহত হ্যায় ম্যাডাম। চালিশ–‌পচাশ ডিগ্রি তো হোগা হি!‌ তবে আমাদের অত গরম নিয়ে ভাবলে চলে না। গরমও যা, বৃষ্টিও তা, আবার শীতও তাই। রোজ আসতে হবে। ঘরসংসার চলবে কী করে?‌ শীতে এখানে কড়া ঠান্ডা পড়ে। কিন্তু আমাদের পোয়াবারো বলতে ওই সময়েই। কতজন রাজস্থান দেখতে আসেন। আপনাদের বঙ্গাল থেকেও কত লোকে আসেন। চারটে পয়সা বেশি কামানোর ওটাই তো সময়। 
‘‌দিনে কত রোজগার হয়?‌’‌
মঞ্জুদেবী—‌দিনটা ভাল গেলে ৩০০ টাকা মতো। নয়তো ১০০, ১৫০। আবার কোনও কোনও দিন খালিহাতেই ফিরতে হয়। 
‘‌ফিক্সড রেট বলে কিছু নেই না?‌’‌
মঞ্জুদেবী—না না। অধিকাংশ যাত্রীই টাকা বের করতে চান না। তখন দরদস্তুর চলে। সবাই অমন নয় অবশ্য। মেহনতের দাম দিতে জানেন। তবে তেমন লোক আর ক’‌জন মেলে?‌ এখন তো আবার অনেক যাত্রী নিজেরাই মাল বইছেন। কুলিটুলি লাগে না। শ’‌য়ে শ’‌য়ে যাত্রী দেখি ট্রলিব্যাগ টেনে চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যান। আমাদের দিকে ফিরেও তাকান না। কী যে হতাশ লাগে, বোঝাতে পারব না। তারপর আমাদের জয়পুর স্টেশনে একটা এসকেলেটরও বসেছে। ঝক্কি কী আর একটা?‌‌
খেয়াল হল, কথা বলতে বলতে প্রায় দুপুর ২টো বেজে।
‘‌দু‌টো তো বাজতে চলল। আপনি বরং খেয়ে আসুন। কথা তো পরেও বলা যাবে!‌’‌
মঞ্জুদেবী—‌না না। এখন খাওয়া যাবে না। আজ এক পয়সাও কামাই হয়নি। খুব গরম তো!‌ লোকজন প্রায় নেই। সেই সকাল সকাল একটু ছাঁচ খেয়ে বেরিয়ে পড়েছি (‌ছাঁচ মানে নোনতা ঘোল। রাজস্থানের গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে অব্যর্থ।)‌‌। আবার সন্ধেয় বাড়ি ফিরে খাব।‌ 
‘‌এভাবে না খেয়ে কী করে চলবে?‌’‌
মঞ্জুদেবী—‌খেতে গেলে যদি কোনও যাত্রী ফিরে যান?‌
‘‌কিছু মনে করবেন না। এত বোঝা বয়ে চলেছেন, আপনার ওজন কত?‌’‌
শহর জয়পুরের কোলাহল ভেদ করে ভেসে এল উচ্চকিত কণ্ঠস্বর। 
মঞ্জুদেবী— ‌বললে বিশ্বাস করবেন না। প্রথম প্রথম আমার ওজন ছিল ৩০ কেজি।‌
‌‌ঠিক শুনলাম তো?‌  আমি বললাম,‘‌কত?‌’‌
মঞ্জুদেবী—‌‌৩০ কেজি। আর ওই ৩০ কেজি ওজনে ৩০ কেজি মাল টেনেছি, এমনও কতদিন গেছে!‌ এখন আমার ওজন কত জানেন?‌ ৬০ কেজি।‌
‘‌সে কী!‌’‌
মঞ্জুদেবী—মেহনত করি ম্যাডাম। আর এই হাড়ভাঙা মেহনতের সঙ্গে শরীর মানিয়ে নিয়ে পোক্ত হয়ে গেছে বোধহয়!‌ তিন শিফটে কাজ করি। ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা। দুপুর ১২টা থেকে ৩টে। আবার বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা। সত্যি বলতে কী, তিন সন্তানকে বড় করে তোলার দায়িত্বের চেয়ে তো এই বোঝা ভারী নয়।‌
‘‌ছেলেমেয়েরা সব কত বড় হল?‌’‌
মঞ্জুদেবী—‌বড় মেয়ের এখন দশ ক্লাস। ছোটটা নবম। আর ছেলেটা সাত ক্লাসে পড়ছে। ‌ছেলেমেয়েদের যাতে ওদের বাবা-‌মায়ের মতো হতে না হয়, তার জন্যই তো এত খাটুনি।
আবেগঘন মঞ্জু। নিজেকে সামলে, গুছিয়ে নিলেন ফের।
মঞ্জুদেবী—জানেন ম্যাডাম, ছেলের সেনাবাহিনীতে যাওয়ার খুব ইচ্ছে। বড় মেয়ে চায় আইএএস হতে। আর ছোট মেয়ের ইচ্ছে হাওয়াই জাহাজ চালাবে। বড় বড় সব স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখতে তো মানা নেই।‌
‘‌জয়পুর মেঁ কভি জানা হুয়া তো আপ সে জরুর মিলেঙ্গে।’
উচ্ছ্বসিত মঞ্জু বললেন , ‘‌‌জি জরুর। জরুর মিলনে আনা।’ 
জয়পুরের আরেক নাম ‘‌পিঙ্ক সিটি’‌। গোলাপি শহর। গোলাপি নাকি মেয়েলি রং, মেয়েদের রং। হাওয়ামহল–‌খ্যাত গোলাপি শহরের নতুন পরিচিতি এই মেয়েকে ঘিরেও। এই রাজপুতানির দেহে ইস্পাতের শক্তি, মনে বজ্রকঠিন দৃঢ়তা। আবার একইসঙ্গে অপার কোমলতা। কারণ দেশের প্রথম মহিলা মালবাহক আদতে এক মা। সন্তানদের আঁকড়ে স্রোতের বিপরীতে ঝাঁপিয়ে কূল খুঁজে চলেছেন।‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ ■

 

পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে মঞ্জুদেবী। যাত্রীর অপেক্ষায়। ছবি: পিটিআই

রাজস্থানের জয়পুর রেলস্টেশনে মাল টেনে নিয়ে যাচ্ছেন মঞ্জুদেবী। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top