ত্রিচূড়ের কন্যা কারিন্দিমাতম অজয়ন কৃষ্ণা। দশম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল ঘোড়া ছুটিয়ে। সেই ছবি ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশ জুড়ে। সবাই বলেছে, সাধারণ ঘরের এই কন্যা দেখিয়েছে সাহস। নারী যে ‘‌অবলা’‌ নয়, এ কথা সে এই বয়সেই প্রমাণ করল। তার সঙ্গে কথা বললেন 
দেবারতি দাশগুপ্ত

মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে/‌ মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।/‌ তুমি যাচ্ছো পালকিতে মা চড়ে/‌ দরজা দুটো একটুকু ফঁাক করে/ আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার‌ ’‌পরে/‌ টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।/‌ রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে /‌ রাঙা ধুলোয়‌ মেঘ উড়িয়ে আসে।
কবিতার ঘোড়সওয়ারটি ছিল ‘‌বালক’। কবিতার শেষে মা বলেছে, ‌‘‌ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল’‌। আমাদেরও মনে হয়েছে, ‌‘‌ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল’‌। আচ্ছা, আগামী দিনে এরকম কোনও বীরসন্তানকে নিয়ে আবার যদি কেউ কবিতা লেখে কেমন হয়?‌ আর যদি সেই কবিতায় ঘোড়সওয়ারটি হয় এক ‘‌বালিকা’‌?‌ কেমন হয়?‌ সবাই তখন বলবে,‘‌‌ভাগ্যে খুকি সঙ্গে ছিল’। খুব ভাল হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীরপুরুষ’‌-‌এর বালক আর আগামী দিনে লেখা কবিতার বালিকা ছুটবে পাশাপাশি। কঁাধে কঁাধ মিলিয়ে।
ত্রিচূড়ের কিশোরী কারিন্দিমাতম অজয়ন কৃষ্ণা, সংক্ষেপে সি এ কৃষ্ণা এই স্বপ্ন উসকে দিয়েছে। 
ক্লাস টেনের (‌বোর্ডের পরীক্ষা দিয়েছে)‌ কৃষ্ণা এখন স্টার। ভোটে ব্যস্ত নেতানেত্রীর ছবির ফাঁকে সে সংবাদপত্রে, টিভি চ্যানেলে জায়গা করে নিয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষ যেমন হইহই করেছে, দেশের বড় শিল্পপতিও বলেছেন, এই ছোট মেয়েটির কথা। কী করেছে ত্রিচূড়ের এই কন্যা?‌ কেন সে স্টার?‌ কেন সোশ্যাল মিডিয়ায় তার ছবি ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়েছে?‌ 
এই তো গত বছর স্রেফ ‘‌চোখ মেরে’‌ ‘‌ভাইরাল’‌ হয়েছিল এক উঠতি অভিনেত্রী। ‘‌চোখ মারা’য়‌ খ্যাতি পেয়েছিলেন তিনি। কাগজে, টিভিতে তুলকালাম হল। আহা কী ‌ভঙ্গিমা!‌ গদগদ সবাই। ইন্টারভিউ দিতে দিতে বেচারি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অনেকে হিংসেও করেছে। ভেবেছে, চোখের ভঙ্গিমায় আমিই বা কী কম যাই? তা হলে কেন‌ আমি তারকা হতে পারলাম না! হায়রে!‌ 
ত্রিচূড়ের কৃষ্ণা কি তেমন কিছু করেছে?‌ মুখ ভেংচেছে?‌ নাকি আবার চোখের ইশারা?‌ 
না, সেসব কিছুই করেনি ত্রিচূড়ের কিশোরী কারিন্দিমাতম অজয়ন কৃষ্ণা। 
দশম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষার শেষদিন ছিল সেটা। কোনও মেয়ে গেছে সাইকেলে, কোনও মেয়ে বাসে, কেউ আবার বাবার পিছনে মোটরবাইকে। কৃষ্ণা গেছে ঘোড়া ছুটিয়ে। সেই ছবি মোবাইল ফোনে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশজুড়ে। বাহবায় ভরে গেছে। সবাই বলেছে, সাধারণ ঘরের এই কন্যা দেখিয়েছে সাহস। দেখিয়েছে তেজ। নারী যে ‘‌অবলা’‌ নয়, এ কথা সে এই পনেরো বছরেই প্রমাণ করেছে। বলেছে, চাইলে মেয়েরা সব পারে।  
কেরলের আধা মফস্‌সল শহর ‘‌মালা’‌। কৃষ্ণা থাকে সেখানে। কলকাতাতে বসেই এই ঘোড়সওয়ার মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে। চাই ছবিও। ‘‌রবিবাসর’ থেকে এই অ্যাসাইনমেন্ট‌ পেয়ে রোমাঞ্চিত হলাম।‌ কিন্তু কোথায় পাব তারে?‌ অনেক ভেবেচিন্তে একটা সূত্র বেরোল। আচ্ছা কৃষ্ণার স্কুলে ফোন করলে কেমন হয়?‌ রাতারাতি বিখ্যাত ছাত্রীর দৌলতে ওর স্কুল হোলি গ্রেস আকাদেমিও এখন তো নিশ্চয় খ্যাত। ফোন নম্বর জোগাড় করলাম। ফোন তুললেন এক ভদ্রমহিলা। সম্ভবত স্কুলের কাউন্সেলর। আমার ইতস্তত প্রশ্ন, ‘‌আপনাদের স্কুলের ওই ঘোড়ায় চড়া মেয়েটি.‌.‌.‌’‌ পুরোটা বলতেও হল না। তার আগেই ওঁর পাল্টা প্রশ্ন, ‘‌কে?‌ কৃষ্ণা?‌ ওর নম্বর দরকার?‌ এক মিনিট।’‌ এক মিনিটও লাগল না। সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘‌লিখে নিন ৯৯৪৭.‌.‌.‌‌‌।’ এরপর আর দেরি করা চলে ‌না।‌ সঙ্গে সঙ্গে ফোন। ওপারে কৃষ্ণা। ইংরেজিতে কথা হল।
—‘‌‌হ্যালো, আমি কি কৃষ্ণার সঙ্গে কথা বলছি?‌’‌
—‌‘‌হ্যঁা।’‌
—‘‌ত্রিচূড়ের ‌কৃষ্ণা তো?‌’‌
— ‘‌ঠিক তাই।’‌‌
— ‘‌ঘোড়ায় ছুটিয়ে যে স্কুলে যায়, সেই কৃষ্ণাই কথা বলছো তো?‌’‌
—‘‌হ্যঁা, হ্যঁা এবং হ্যঁা।’‌
বারবার যাচাইয়ের পালা শেষে বললাম, কলকাতা থেকে বলছি। তোমার সঙ্গে একটু গল্প করতে চাই। আজ সময় হবে কি?‌ কৃষ্ণা জানাল, আগামিকাল হতে পারে।
—কাল সকালে করি?‌
—‘‌সকালে তো হবে না। আমাকে কাল এখানকার একটি চ্যানেলে লাইভ প্রোগ্রামে থাকতে হবে যে। দুপুর ৩টের পর হতে পারে।’‌
চ্যানেলে লাইভ!‌ বুঝলাম কৃষ্ণার খ্যাতি কতদূর ছড়িয়েছে। পরদিন যথাসময়ে ফোন করে জানলাম স্টুডিওয়ে ব্যস্ত কৃষ্ণা। বিকেলে ফোন করে জানাল, ‘‌স্টুডিও তো বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে। পথে আছি। সন্ধেতে ফোন করলে ভাল হয়।’‌
সাড়ে ৬টায় করলাম ফোন। কৃষ্ণা তখন সবে বাড়ি ঢুকেছে। পথ ক্লান্ত। তবু কথা বলতে রাজি হয়ে গেল। 
—‘‌তা হলে শুরু করি?‌’‌
—‘‌হ্যাঁ, বলুন।’‌
—তুমি তো রাতারাতি সেলিব্রিটি হয়ে গেছো। সারা দেশ তোমাকে বাহবা দিচ্ছে। কেমন লাগছে?‌
—‘‌খুবই অবাক লাগছে। আবার দারুণ আনন্দও হচ্ছে। কিন্তু বুঝেই উঠতে পারছি না, কী এমন করেছি, যে আমাকে নিয়ে এত মাতামাতি?‌’‌
—‘‌জানো তো মাহিন্দ্রা গ্রুপের চেয়ারম্যান–‌এমডি আনন্দ মাহিন্দ্রা তোমার ঘোড়ায় চড়া ছবি দেখে মুগ্ধ। বলেছেন, তোমার ওই ঘোড়ায় চড়া ছবিটি তাঁর  কম্পিউটারে স্ক্রিনসেভার করতে চান।’‌
—‘‌জানি তো। এই তো পরশু ওনার লোক এসেছিলেন।’‌
—‘‌তাই?‌’‌
—‘‌হ্যাঁ। ওঁর কেরল শাখার কয়েকজন কর্মী আমার ছবি তুলে নিয়ে গেছেন। বলেছেন, মিস্টার মাহিন্দ্রা আমার সঙ্গে দেখা করবেন।’‌
—‘‌সে তো দারুণ ব্যপার.‌.‌.।‌’‌
—হ্যাঁ। কিন্তু কী করেছি তাই তো বুঝতে পারছি না। বাইরে বেরোলেই চেনা, অচেনা, স্বল্প চেনা লোকজন আমার সঙ্গে সেলফি তুলতে চাইছেন। সব দেখে–শুনে আমার বাবা–‌মা তো হেসে বাঁচেন না!‌ কী যে করেছি!‌ (‌কৃষ্ণার মুখে সেই একই কথা)‌। 
এবার বলতেই হল, ‘‌বলছো কী, তুমি তো এখনও বেশ ছোট। এই বয়সে অমন টগবগিয়ে ঘোড়ায় চড়া কী মুখের কথা!‌ ক’‌টা মেয়ে পারে?‌ ছেলেরাও কী পারে?‌
—‘‌আমি তো ঘোড়ায় চড়ে দুধ আনতে, বাজার করতেও যাই।’‌
—‘‌বলো কী!‌’‌
—‘‌মানে রোজ নয়। যখন সাইকেলে চড়তে ‘‌বোর’‌ লাগে, তখন ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে পড়ি।’‌
— ‘‌বাজারে তো হুলুস্থুল পড়ে যায়!‌’‌
—‘‌প্রথম দিকে লোকে খুবই অবাক হত। এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ঘোড়ার ক্ষুরের আওয়াজ শুনেই বুঝে যায় রানা কৃষকে নিয়ে কৃষ্ণা আসছে।’‌
—‘‌রানা কৃষ কে?’‌‌
—‘‌আমার ঘোড়া। ধবধবে সাদা। আরও একটা ঘোড়া আছে। মেয়ে ঘোড়া। ও–‌ও সাদা। লেজ আর গলার কাছটা কালো। নাম জাহ্নবী।’‌
—‘‌দু’‌দুটো ঘোড়া!‌’‌
—‘‌আরও একটা ছিল। আমার প্রথম ঘোড়া। ওর নাম দিয়েছিলাম জেনসি রানি। ওকে রানি বলে ডাকতাম। ও আর এখন আমাদের সঙ্গে নেই।’‌
—‘‌তা হলে তো প্রায়ই ঘোড়ায় চড়ো। স্কুলে বোধহয় এই প্রথম।’‌
—‘‌তা–‌ও নয়। ক্লাস নাইনের শেষ পরীক্ষাতেও ঘোড়ায় চড়ে গেছিলাম। এবার আমার দাদা ভিডিও করে ওঁর এক বন্ধুকে পাঠায়। সেই ভিডিও আবার ঘুরেফিরে আমার এক বান্ধবীর কাছে যায়। ও আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ করে। বুঝলাম ভিডিওটা ভাইরাল হয়ে গেছে!‌’‌
—তোমার ‌দাদা?‌
—‘‌দাদা মানে আমার ট্রেনার ড্যানি ডেভিস।

আরও একজন ট্রেনার আছেন। অভিজিৎ। ওঁদের কাছে আমার ঘোড়ায় চড়া শেখা। আমার পরিবারের অংশ ওঁরা। নিজের দাদা তো নেই। ওঁরাই কখন আমার দাদা হয়ে গেছেন।’‌ 
বাবা–‌মার একমাত্র মেয়ে কৃষ্ণা। ত্রিচূড়ের ‌মালায় যেখানে কৃষ্ণাদের বাড়ি সেখানকার এক বিষ্ণু মন্দিরের পুরোহিত ওর বাবা অজয়ন কালিন্দী। মা ইন্দু অজয়ন গৃহিণী। 
—‘‌ঘোড়ায় চড়ে পরীক্ষা দিতে গেলে একটুকুও ভয় করেনি?‌’‌
—‘‌ভয় করবে কেন?‌’‌
— ‘‌যানজট হত যদি। তা হলে তো দেরি হয়ে যেত।’‌
—‘‌আমাদের ছোট শহরে যানজট বড় একটা হয় না। আর পরীক্ষার কথা মাথাতেই ছিল না।’‌
—‘‌তার মানে!‌ তুমি পড়াশোনায় খুবই ভাল.‌..‌।‌’‌
—‘‌আরে না না। একেবারেই না (‌কৃষ্ণার তীব্র প্রতিবাদ)।‌ পড়াশোনা করতে মোটে ভাল লাগে না। করতে হয় তাই.‌..। অঙ্ক, বিজ্ঞান একেবারে বিচ্ছিরি লাগে।’‌
‌‌‌—‘‌ঘোড়ায় চড়া ছাড়া আর কী করতে ভাল লাগে?‌’‌
—‘‌ড্রাম বাজাতে দারুণ লাগে। মিউজিশিয়ান হতে চাই।’‌
—‘‌আচ্ছা। ঘোড়ার প্রতি তোমার ঝোঁক হল কী করে?‌ ঘোড়া খুব পছন্দ বলে?‌’‌
—‘‌আমার হাতিও খুব পছন্দ। বেশি পছন্দ। মাঝেমাঝে এলিফ্যান্ট গার্লও হতে ইচ্ছে করে। সারা দিন হাতি নিয়ে থাকব। হাতির দেখভাল করব। হাতির পিঠে ঘুরে বেড়াব।’‌ 
‘‌আর ঘোড়াদের কী হবে?‌’‌
—‘‌ঘোড়া তো চড়বই। ইকোয়েস্ট্রিয়ান হওয়ার আমার কতদিনের স্বপ্ন!‌’‌
ইকোয়েস্ট্রিয়ান মানে ঘোড়া চালানো যাঁদের পেশা। ইকোয়েস্ট্রিয়ানিজমের উৎপত্তি ব্রিটেনে। সামার অলিম্পিকে ইকোয়েস্ট্রিয়ানিজম একটি জনপ্রিয় ইভেন্ট। ইউরোপ, আমেরিকার মেয়েরা তাতে খুবই দড়। বর্তমানে মহিলা ইকোয়েস্ট্রিয়ানদের মধ্যে নেদারল্যান্ডসের জেসিকা স্প্রিংস্টিন, ব্রিটেনের ইলেন পেইন, আয়ারল্যান্ডের ক্যামিলা স্পিয়ার্স এবং প্রয়াত ‘‌অ্যাপেল’‌ প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত স্টিভ জোবস কন্যা ইভ জোবস বেশ নামী। ইকোয়েস্ট্রিয়ান না হলেও ঘোড়ায় বঙ্গললনারাও পিছিয়ে নেই। বাঙালি মেয়েরা বহু জায়গায় শখে ঘোড়া চড়েন। কলকাতার বাইরে পড়তে গেলেও গল্ফ খেলা, ঘোড়ায় চড়ায় পটু হচ্ছেন তাঁরা। তবে সেটা অবশ্যই ধনী পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ সময়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এবং তঁার স্ত্রী কাদম্বরী দেবী ঘোড়ায় চেপে গড়ের মাঠে বেড়াতে যেতেন। তবে সেসব ঘোড়ায় চড়ার সঙ্গে কৃষ্ণার ঘোড়ায় চড়ায় তফাত অনেকটাই।  
—‘‌কিন্তু এখনও তো তুমি খুবই ছোট।’‌
—‘‌এখনই তো যাচ্ছি না। আর দু’‌তিন বছর পর চেষ্টা করব। তবে এখনই কিন্তু অনেকেই নানান প্রতিযোগিতায় ডাকে। হুবলি থেকে, মহীশূর থেকে। তবে পেশাদার ঘোড়া সওয়ার তো হইনি এখনও।’‌
—‘‌ইকোয়েস্ট্রিয়ান হওয়ার প্রশিক্ষণ কোথায় নেবে?‌ কেরলে হয়ে এসব?‌’‌
—‘‌না, না। জার্মানিতে সবচেয়ে ভাল হয়। ওখানেই যাব।’‌
—‘‌বাবা–‌মা রাজি হবেন?‌’‌
—‘‌দেখুন, আমার বাবা–‌মা খুবই সাপোর্টিভ। সব সময়ে পাশে থাকেন। তবে জার্মানিতে যেতে দিতে রাজি হবেন কিনা, জানি না। কথাটা এখনও ওঁদের বলিনি। সেরকম হলে দাদাদের দিয়ে বলাব। ওরা নিশ্চয় রাজি করিয়ে নেবে।’‌
‌ইকোয়েস্ট্রিয়ান হওয়ার, জার্মানি যাওয়ার স্বপ্নে কৃষ্ণা এক লহমায় অন্য জগতে। সংবিৎ ফিরল পরের প্রশ্নে।‌
—‘‌আচ্ছা কৃষ্ণা, ঘোড়ায় চড়া শিখতে গিয়ে নিশ্চয় পড়ে গেছো, এক আধবার.‌.‌.।‌’‌
—‘‌সে আর বলতে। অনেক বার। অনেক বার পড়ে গেছি। লাথি খেয়েছি, কামড় খেয়েছি।’‌
—‘‌ভয় করেনি?‌ মনে হয়নি, ঘোড়ায় চড়ে কাজ নেই!‌’‌
—‘‌ভয় পেলে তো হয়েই গেছিল। তা হলে তো সবাই বলত, ঘোড়া চড়া মেয়েদের কাজ নয়।’‌
প্রথম ঘোড়ায় চড়ার স্মৃতিতে ফিরল কৃষ্ণা। তখন সে ১১ বছরের বালিকা। বাবার কাছে বায়না করে প্রথম ঘোড়া, মানে জেনসি রানির পিঠে ওঠার কথা। প্রথমবারই পপাতো চ।
—‘‌সেদিন না, রাগের চেয়ে দুঃখ হয়েছিল বেশি। মনে হয়েছিল আমার রানিকে আমি এত ভালবাসি, আর ও আমাকে এভাবে ছুঁড়ে ফেলে দিল!‌ তারপর দাদাদের থেকে ঘোড়ায় ওঠার, ঘোড়ার চড়ার খুঁটিনাটি শিখে বুঝেছি। ওরা আমার পেছনে খুব পরিশ্রম করেছে। শিখিয়েছে কোথায় লাগাম ধরতে হয়। আর কোথায় লাগাম টানতে হয়।’‌
কৃষ্ণা জানাল, জেনসি রানি চলে যাওয়ার পর মন ভাল করতে জাহ্নবীকে নিয়ে এসেছিলেন ওঁর বাবা। বছর তিন আগে। জাহ্নবীতে অভ্যস্ত হওয়ার পর গত বছর এসেছে রানা কৃষ।
—‘‌আরও একটা ঘোড়া কেন?‌’‌
—‘‌কারণ আর কিছুই না। অনেকেই আমার ঘোড়া চড়া দেখে বলেছিল, মেয়ে তো, মেয়ে ঘোড়াই চালাতে পারবে। পুরুষ ঘোড়ায় কখনও চড়তেই পারবে না। চেহারায়, ওজনে মার খেয়ে যাবে। ওদের ভুল সাব্যস্ত করতেই রানা কৃষকে আনা।’‌
—তার মানে এরকম শুনতে হয়?‌
—‘‌স্কুলেই শুনতে হয়েছে। যখন প্রথম ঘোড়ায় চড়ায় অনুমতি চেয়েছিলাম, প্রিন্সিপাল সটান বলে দেন, না কৃষ্ণা। তুমি একটা মেয়ে। তোমার নিরাপত্তা আমাদের বাড়তি ভাবনার কারণ। তোমাকে অ্যালাও করা যাবে না। ছেলে হলে অন্য কথা ছিল।’‌
তারপর কৃষ্ণার বাবা অজয়ন কালিন্দীই গিয়ে স্কুলের অধ্যক্ষকে বোঝান, ঝাঁসির রানি ঘোড়া চড়েছেন, আমার মেয়ে পারবে না কেন। তা ছাড়া ওর ট্রেনাররাও তো সঙ্গে থাকবেন। এরপর একরকম বাধ্য হয়েই সায় দেয় স্কুল।
—জানেন তো আমার ছবি ভাইরাল হওয়ার পর প্রিন্সিপাল স্যর বাড়িতে দেখা করতে এসেছিলেন। স্কুলে সবাই বেশ উত্তেজিত। (‌কৃষ্ণার উচ্ছ্বাস আর ধরে না)‌।
—‘‌সে আমি বুঝতেই পেরেছি।’‌
‌কৃষ্ণাকে জানালাম, কেমন করে ওর ফোন নম্বর পেয়েছি। স্কুলই করেছে সাহায্য।‌
—ঘোড়াদের দেখভাল তুমিই করো?‌ একা পারো?‌
—(‌কৃষ্ণার পাল্টা প্রশ্ন)‌ ‘‌আমারই তো ঘোড়া, আমি না করলে কে করবে? তবে যদি আমি না থাকি, তখন মা করে দেয়।‌’‌
—‘‌কী, কী করো?‌’‌
—‘‌প্রথমে তো আস্তাবল সাফাই করি। এটা রোজকার কাজ। আমার পোষ্যদের তো অপরিচ্ছন্ন রাখা যায় না। তারপর গ্রুমিং করি।’‌
—গ্রুমিং?‌
—‘‌স্নান করাই, সাজিয়ে গুছিয়ে রাখি। খেতে দিই। গ্রুমিং করাও দাদাদের থেকেই শেখা।’‌‌
সারাদিনের ধকলে ক্লান্ত কৃষ্ণা। ইতস্তত হয়ে বলেই ফেলল, —এবার কি আমি যেতে পারি?‌’‌
কিন্তু এখনও একটা জরুরি প্রশ্ন বাকি যে!‌ এবার আমিই খানিক ইতস্তত। বলেই ফেললাম,— একটা কথা বলো তো কৃষ্ণা, ঘোড়া পোষা তো খুবই খরচসাপেক্ষ ব্যাপার। তোমার বাবা আপত্তি করেননি কখনও?‌
—আমাদের একটা গরু, একটা ষাঁড়ও আছে। তাই দু’‌টো ঘোড়া পোষা খরচ সাপেক্ষ তো বটেই। খুবই দামি শখ। তবে কী, তেমন দামি নয়। মানে, আমার স্বপ্নের চেয়ে দামি নয়। আমার বাবার কাছে আমার স্বপ্নগুলো অনেক বেশি দামি। 
একটু থমকে কৃষ্ণা বলল— ‘‌বাবা পুরোহিতের কাজ করেন। আমার স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে সারাদিন পুজো করেন। বেশি করে পুজোর কাজ নেন।’‌
বাবা তো এমনই হয়। সর্বশক্তি দিয়ে খেটে চলেছেন, মেয়ের মুখে হাসি দেখবেন বলে। আর কৃষ্ণা যখন টগবগিয়ে ঘোড়ায় চড়ে যায়, তখন ক্ষুরের দাপটে শুধু পথের ধুলোই ওড়ায় না। উড়িয়ে দেয় সমাজের যত জরাজীর্ণ বিশ্বাসও। ঘোড়ায় পীঠে দৃপ্ত কৃষ্ণাকে দেখে জনৈকের টুইট ছিল, ‘‌ওয়ান্ডার উওম্যান অ্যান্ড দ্য রিয়েল হর্স পাওয়ার। দিস ইজ উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাট ইটস বেস্ট!‌’‌ কৃষ্ণাকে কুর্নিশ জানাতে এর চেয়ে যথার্থ প্রশংসা হয় না। ■
‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌

 

 

ঘোড়ায় চড়ে স্কুলের পথে কৃষ্ণা
সব ছবি কৃষ্ণার সৌজন্যে

জনপ্রিয়

Back To Top