সুদেষ্ণা গোস্বামী: বর্ষার প্রবল প্রবাহের মধ্যে জলকাদা, প্যাচপ্যাচ, ট্রাফিকে, ঝঞ্ঝাটে নাজেহাল জীবন। এর মধ্যে অতি শ্লথভাবে হলেও আমাদের জিভের ডগায় ঝুলতে থাকে একটি নাম— ইলিশ। প্রতি মরশুমে ছিটেফোঁটা বৃষ্টি হওয়া মাত্রই হাপিত্যেশ শুরু হয়ে যায়, কতক্ষণে বাজার ইলিশে–ইলিশে ভরে উঠবে। 
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের গোড়ার দিকে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় ইলিশ মাছের যাত্রাপথের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন—‘সকালে বিকেলে বাজারে ইলিশ কিনিয়া কলকাতার মানুষ ফিরিবে বাড়ি। কলিকাতার বাতাসে পাওয়া যাইবে পদ্মার ইলিশ মাছ ভাজার গন্ধ।’‌ 
কিন্তু এখন মুশকিল হচ্ছে গঙ্গার হোক বা পদ্মার– মাছের দাম এতটাই চড়া যে অধিকাংশ মধ্যবিত্তেরই নাগালের বাইরে। যদি কোনও মতে এক–আধ দিন বাড়িতে ইলিশ আনা হয়ও, তখন আমাদের সামনে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে একটি চূড়ান্ত অনুভূতি, ‘বারোশো–পনেরোশো টাকা কিলো মাছের স্বাদ মোটের ওপর প্রায় খয়রা ইলিশের!’ এই উপলব্ধির মাটিতে দাঁড়িয়ে ইয়ং জেনারেশনের খানিকটা তো বটেই এমনকী আগের প্রজন্মও কিছুটা মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন ইলিশের রোমান্টিকতা থেকে। 
এক সময় সিরাজগঞ্জের রুই আর গোয়ালন্দের ইলিশ ছিল বিখ্যাত। ঘাট থেকে সোজা ব্রডগেজ ট্রেনে করে চলে আসত কলকাতায়। আমি এ কথা জেনেছি চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষের কাছ থেকে। তিনি ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে যেতেন ভবানীপুর বাজারে। 
আজ এই ইলিশ নিয়েই চলবে এক্কেবারে অন্যরকম গল্প। শুটিংয়ে ইলিশের গল্প। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘মনের মানুষ’, ‘শঙ্খচিল’— গৌতম ঘোষ পরিচালিত ভারত–বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার এই তিনটি ছবির একটিতে আমি যুক্ত ছিলাম ইউনিট মেম্বার হিসেবে। বাকি দুটি ছবির অনেক গল্প, অভিজ্ঞতার কথা কখনও শুনেছি ইউনিট মেম্বারদের থেকে আবার কখনও বা স্বয়ং গৌতম ঘোষের কাছ থেকে। তা থেকে আমি আনন্দ ও বোধে ঋদ্ধ হয়েছি বারবার।      
এই গল্পের সূত্রপাত করিয়ে গৌতম ঘোষ প্রথমেই বললেন, ‘‌ইলিশের নস্টালজিয়া নিয়ে ছবি করেছিলাম— ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। মূলত মাটির কাছাকাছি একদল মানুষ যাদের ইলিশ মাছকে কেন্দ্র করেই জীবনধারণ তাদের নিয়ে। সেই সুবাদেই আমি দেখেছিলাম তখনকার দিনেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা গরিব জেলে–মাঝিদের নানা দিক থেকে বঞ্চিত করত। কাজেই, যত পরিমাণ মাছ জালে উঠত মাঝিরা অনেক সময়েই সম্পূর্ণটা বিক্রি করে উঠতে পারত না ব্যবসায়ীদের কাছে। অনেক মাছ রয়ে যেত। তখন সেই বাড়তি মাছগুলোকে কড়াইয়ে পরপর সাজিয়ে তাতে আঁচ দিয়ে তেল বের করত। সেই তেল ওদের কুপি জ্বালানোর কাজে ব্যবহার হত। আমি খানিকটা নিজের চোখে দেখেছি আর্থিক প্রতিকূলতার সঙ্গে ওদের জীবন-সংগ্রাম।’‌ 
‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ছবির শুটিং শুরু হয়েছিল ভাদ্র মাসে। তখন ঘোর বর্ষা। একেবারে ইলিশের মরশুম। ঠিক যে লোকেশনে শুটিং হয়েছিল, সেই সময় এখনকার মতো সর্বত্র এত হোটেলের আধিক্য ছিল না। ইউনিটের একদল থাকত একটি স্কুলবাড়িতে। আরেক দল ছোট কুঠুরি বাংলোতে। তবে রান্না, খাওয়াদাওয়া সবই একসঙ্গে হত। কলকাতার মানুষেরা অঢেল ইলিশ একসঙ্গে দেখে প্রায় দিশেহারা হয়ে গেল। হেঁশেলে প্রতিদিনই দু’‌বেলা করে চলতে থাকল নানা রকম ইলিশের পদ। কেউ-কেউ আবার সকালে জলখাবারে খেত মুড়ি ও ইলিশ মাছ ভাজা। তারপর দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকে ভাতের পাতে প্রথমে পড়ত তেতো ইলিশ— করলা দিয়ে ইলিশের ডিম ভাজা, লুকা–ভাজা, তা ছাড়া ভাজায়, ঝোলে, পাতুরিতে পরপর ইলিশের আইটেম। অফুরন্ত ইলিশ— যে যত ইচ্ছে খেতে পারে। গোনাগুনতির কোনও ব্যাপার ছিল না। খাওয়ার শেষে ইলিশের তেল গড়াগড়ি যেত। 
এই প্রসঙ্গে গৌতম ঘোষ বললেন, ‘‌আমাদের শুটিং যে চরে হচ্ছিল সেখানে টাটকা ইলিশ মাছ রান্না করে খাওয়া হয়েছিল একবারে অন্য রকম স্টাইলে। টাটকা ইলিশ মাছ তেল, নুন, কাচালঙ্কা দিয়ে চরে বালির মধ্যে সরায় করে পুঁতে রাখা হত। সত্যি বলতে কী, সেই ভাপা–ইলিশের স্বাদ অতুলনীয়। আজীবন আমার মুখে লেগে থাকবে। এ এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।’‌ 
এদিকে ইউনিট মেম্বাররা প্রাণ ভরে ইলিশ খাচ্ছে আর আনন্দ করে শুটিং করে চলছে। তবে এমনটা চলতে চলতে একটা সময় এল যখন কম-বেশি প্রত্যেকেই বলতে লাগল, ইলিশ আর খাব না। কারণ প্রতিদিন এত পরিমাণ ইলিশ হজম করা অতি দুরূহ কাজ। ততদিনে ইলিশ খেয়ে–খেয়ে পেটের একেবারে কাহিল অবস্থা। 
‘পদ্মা নদীর মাঝি’–র একটি দৃশ্যে দেখা যায় প্রধান চরিত্র কুবেরের ইলিশ মাছ খাওয়ার একটা নির্দিষ্ট স্টাইল। গৌতম ঘোষ চিত্রনাট্যে লেখা বা তার পরবর্তীকালে লোকেশন অনুসন্ধানের সময় থেকেই স্থানীয় জেলেদের চলন–বলন, সমাজজীবন নিয়ে চর্চা করেছিলেন। তখন তিনি লক্ষ করেছিলেন, ওরা বিশেষ কায়দায় মাছটাকে ধরে মাঝখানের বড় কাঁটাটাকে নিমেষের মধ্যে বের করে নেয়। তারপর অবশিষ্ট ছোট কাঁটাগুলোকে আলাদা করে। মানে, পেটের কাছে বড় দুটো কাঁটাকে প্রথমেই টেনে বের করে নিত। শুটিংয়ের সময় শটেও সেই ভাবে কুবেরকে ইলিশ মাছ খাওয়ানো হয়েছিল। 
বিভিন্ন ঋতুতে পদ্মায় শুটিং চলেছিল। ছবিতে জেলেপাড়া বাদ দিয়ে যাবতীয় দৃশ্য নেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশে মানিকগঞ্জের কাছে। আর জেলে গ্রামটা তৈরি হয়েছিল কাকদ্বীপ অঞ্চলে। এখানে গঙ্গা প্রায় পদ্মার মতোই চওড়া। ফলে সিনেমায় গ্রামের পিছন দিয়ে বয়ে চলা গঙ্গাকে দেখে পদ্মা বলেই মনে হয়েছিল এবং গৌতম ঘোষ পদ্মার তীরবর্তী জেলেদের জীবনচিত্রকে নিখুঁতভাবে চিত্রায়িত করেছিলেন।    
কিন্তু তার আগেই হঠাৎ একটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। ভাদ্র মাসে তোলা ইলিশের যে শট নেওয়া হল তার কন্টিনিউটির কী হবে? অর্থাৎ শুটিংয়ের প্রথম শিডিউলের সেই একই মাছের শট চিত্রনাট্য অনুসারে আবার রয়েছে জেলে–গ্রামে। কিন্তু ওই গ্রামপর্বের শুটিং হওয়ার কথা জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি মাসে। সত্যি বেশ চিন্তার বিষয়। সহকারী পরিচালক থেকে আর্ট ডিরেক্টর সকলের মাথায় এই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রযোজক হাবিবুর রহমান খানের কাছে বড় ডিপ ফ্রিজার ছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল তাতে বড়–বড় সাইজের ইলিশগুলোকে রেখে দেওয়া হবে। এবং এর প্রায় পাঁচ–ছয় মাস পরে সেই পদ্মার ইলিশ দিয়ে আবার শুটিং করা হল ভারতের কাকদ্বীপে। 
সিনেমায় মাছের কন্টিনিউটি রক্ষার প্রসঙ্গে স্মৃতি রোমন্থন করে গৌতম ঘোষ হাসতে হাসতে বললেন, ‘‌ওই সিকোয়েন্সগুলো শুটিং হয়ে যাওয়ার পর প্রোডাকশন ম্যানেজার দিলীপবাবু এসে আমাকে বলেছিলেন, সবকটা ইলিশ ভাল আছে। এগুলো কি ইউনিট মেম্বারদের খাওয়ানো যাবে? প্রস্তাব শুনে সকলে রাজি। উৎপলদা (দত্ত), রবিদা (ঘোষ), রূপা (গঙ্গোপাধ্যায়)–সহ অন্যান্য অভিনেতা–অভিনেত্রী এবং সব টেকনিশিয়ানের সঙ্গে বসে তৃপ্তি করে আমিও সেই ইলিশ খেয়েছিলাম। শীতকালে অর্থাৎ অকালে ইলিশ খাওয়ার আনন্দ যে কতখানি হতে পারে তা আমার ধারণার অতীত ছিল। একটি বিশেষ মাছ নিয়ে এমন মাদকতা বোধহয় বাঙালি ছাড়া অন্য কোনও জাতির পক্ষে করা সম্ভব নয়।’‌  
২০১০ সালে ‘মনের মানুষ’–এর সময় বাংলাদেশ পর্বের শুটিংও হয়েছিল শীতকালে। এই ছবির কথায় গৌতম ঘোষ বলে উঠলেন—‘‌মনের মানুষ’–এ একটা বিশেষ দিনের কথা আমার মনে পড়ে। ভোর থেকে চলছে সেদিন ছবির শেষ দৃশ্যের শুটিং। আর ওদিকে খাবার মেনুতে ছিল খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা। খাওয়া-দাওয়া করে ইউনিট আবার সেই দিনই রওনা দেবে কলকাতায়। আর আমি কয়েকটা কাজ মিটিয়ে তিন–চারদিন পরে ফিরব। প্রত্যেকের ফেরার টিকিট কাটা হয়ে গেছে। কিন্তু এদিকে আমার শুটিং শেষ হল না। কিছু শট বাকি থেকে গেছে। অগত্যা শুটিং স্পট থেকে আমরা নৌকো করে ক্যাম্পের দিকে ফিরে আসছি এমন সময় দেখি পদ্মার ওপর হঠাৎ ঘনঘটা করে মেঘে ছেয়ে গেল। আমি সঙ্গে সঙ্গে লাইট মিটারে দেখলাম আলোর একেবারে সঠিক কন্টিনিউটি পজিশন ও কারেক্ট এক্সপোজার অর্থাৎ আমার দৃশ্যের আলোর আনুপাতের সঙ্গে এই মেঘলা আকাশের আলো হুবহু মিলে যাচ্ছে। তখন হুটোপাটি করে নৌকো ঘুরিয়ে আমি তো শুটিং লোকেশনে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু গোটা ইউনিটকে আবার নৌকো করে দ্রুত শুটিং স্পটে ফিরিয়ে আনা ছিল রীতিমতো কঠিন কাজ। কাপড় নেড়ে প্রায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ইউনিটকে লোকেশনে আনার ব্যবস্থা করেছিল প্রোডাকশন টিম। আমার বাংলাদেশের প্রযোজক দারুণ খুশি হয়ে বলেছিলেন—‘আলবৎ গৌতমের সঙ্গে ওপরওয়ালার হটলাইনে যোগাযোগ আছে, ঠিক কেমন কন্টিনিউটি আলোয় আকাশ ভরিয়ে দিল!’ যাই হোক, নানা ঝক্কি সামাল দিয়ে ‘মনের মানুষ’–এর শুটিং শেষ করলাম। কিন্তু সেই দিন কপালে ধোঁয়া–ওঠা খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা জোটেনি। সেই দুঃখ সবারই ছিল। শুধু ইলিশ খাওয়ার বাসনা রয়ে গেল মনে।‌  
‘শঙ্খচিল’–এর শুটিং হয়েছিল বাংলাদেশে সুন্দরবনের কাছে নীলডুমুরে। সাতক্ষীরা অঞ্চলের মধ্যে পড়ে জায়গাটা। সেখানে একেবারে ইলিশের নৌকো থেকে টাটকা মাছ কিনে আনা হয়েছিল ইউনিট মেম্বারদের জন্য। তারপর বাঁধুনিদের চমৎকার রান্না প্রত্যেকে হুল্লোড় করে খেয়েছিল।   
আসলে বেপরোয়া, নিয়ম–ভাঙা চেনা মেজাজ ও চির লাবণ্য যাকে ছুঁয়ে থাকে সেই তো হল ইলিশ। এ–ক্ষেত্রে ভারত–বাংলাদেশ কোনও ভেদ নেই। এই ইলিশ কিন্তু বাঙালির অন্যতম সেরা আইকন। সমকালের প্রেক্ষাপটেও এ কথা সত্য।  
এত কথার শেষে গৌতম ঘোষ সংযোজন করলেন—‘‌পদ্মা নদীর মাঝি’ চিত্রনাট্য লেখার পর্যায়ে আমি গবেষণা করতে গিয়ে জেনেছিলাম ইলিশের একটা অদ্ভুত নাম। জেলেরা বা গ্রামীণ লোকেরা ‘রাজেশ্বরী’ বলে সম্বোধন করে। এই নামটা আমি ব্যবহার করি। দৃশ্যে একটা সময় যখন কুবেরের জালে আর ইলিশ উঠছে না তখন ধনঞ্জয় ও অন্য যারা ছিল তারা বলে, ‘‌কোন অতলে হারাইলি ওরে আমার রাজেশ্বরী!’‌ 
ভোজন–রসিক বাঙালি ও তার ইলিশের টান বোধহয় স্তিমিত হওয়ার নয়। মনের অতলে এই টান গঙ্গা–পদ্মাকে একাকার করে সান্দ্রতা নিয়ে থাকুক বেঁচে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top