চিন্তক, গবেষক, জীবনীকার গোলাম মুরশিদ উভয় বাংলাতেই সুপরিচিত, সম্মানিত। তিরিশটি মূল্যবান গ্রন্থের প্রণেতা। মাইকেল মধুসূদনকে নিয়ে তঁার ‘‌আশার ছলনে ভুলি’ গ্রন্থটি বাংলা জীবনী‌সাহিত্যে একটি মাইলফলক।  তঁার নতুন গ্রন্থ ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত, নজরুল-জীবনী’ বাংলা জীবনী‌সাহিত্যের মুকুটে আরও একটি উজ্জ্বল পালক। দীর্ঘ গবেষণার ফসল। এই গ্রন্থে নজরুলকে পাওয়া গেল তঁার সত্যিকারের স্বরূপে। ২৪  মে কাজী নজরুল ইসলামের ১২০তম জন্মদিবস উপলক্ষে গ্রন্থটি নিয়ে এবং নজরুল ইসলামকে নিয়ে আলোচনা করলেন শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার। ‌

বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির একনিষ্ঠ গবেষক গোলাম মুরশিদের সম্প্রতি প্রকাশিত নজরুল জীবনী (‘বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত’, প্রথমা, ঢাকা, ৮০০ টাকা) পড়তে পড়তে মনে হল, নজরুল আমাদের প্রিয় কবি, হয়তো রবীন্দ্রনাথের পরেই তাঁর কবিতা আমরা বেশি করে পড়ি, মুখস্থ করি, আবৃত্তি করি, এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতের পরে তাঁরই গান আমরা বেশি করে গাই (এ কথাও অনেকে জানি যে, রবীন্দ্রনাথের গানের চেয়ে তাঁর গানের সংখ্যা প্রায় হাজারখানেক বেশি), কিন্তু তাঁকে নিয়ে বাঙালির নানারকম সঙ্কট আছে, তিনি আমাদের কাছে অনেকগুলি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করে রেখে গেছেন। তাঁর উত্থান ও প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন, তাঁর জীবন নিয়ে প্রশ্ন, তাঁর আত্মপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন, তাঁর সৃষ্টি-অভিমুখের বিবর্তন ও তাঁর সৃষ্টি-উৎস হঠাৎ রুদ্ধ হওয়া নিয়ে প্রশ্ন। তিনি বাঁচলেন প্রায় সাতাত্তর বছর, কিন্তু শেষ পঁচিশ বছর বেঁচে রইলেন প্রায় উদ্ভিদের মতো, অসহায়, অন্যনির্ভর এক অস্তিত্ব। তিনি দেশকে আর নতুন কিছু দিতে পারলেন না ওই পঁচিশ বছর, যা দিয়েছেন সেই অমূল্য দানের জন্য কৃতজ্ঞতা হিসেবেই উপমহাদেশের বঙ্গভাষী অঞ্চল তাঁকে লালন ও পূজা করল, যেমন করে বিশেষ বিশেষ ধর্মগোষ্ঠীর মানুষ মূর্তিকে পূজা দেয়।   
একটা প্রশ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া কোনও জীবনীকারের সাধ্যে আসে না, সেটা হল, কী করে নজরুল ইসলাম নামক ব্যক্তির দেহে এত বিপুল প্রতিভার আশ্রয় ঘটল? টুকরো-টুকরো বৃত্তান্ত হয়তো মেলে, ধারাবাহিক ইতিহাস নয়। তার ফলে আমরা অবিশ্বাসীরা ‘জিন’ বা ওই ধরনের কোনও বস্তুর ওপর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হই। মানুষের সভ্যতা প্রতিভার রহস্য এখনও সম্পূর্ণ উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি। সে প্রতিভা শুধু জন্মগত নয়। নজরুল অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন ইসলাম-হিন্দু-গ্রিক ইত্যাদি নানা পুরাণের আখ্যান জেনে তাঁর কবিতায় তার উল্লেখ আর সার্থক রূপক-ব্যবহারে আনতে, নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করেছেন বাংলার সবচেয়ে কঠিন মাত্রাবৃত্ত বা সরল কলামাত্রিকের নানা চাল, মিশ্রবৃত্তে কম লিখলেও তার হাতে তার রূপ এতটুকু টাল খায়নি, সংস্কৃত, আরবি-ফারসি আর বাংলা শব্দকে সেই ছন্দে শুধু নিখুঁত নয়, ছত্রদেহে আর ছত্রান্ত মিলে চমকপ্রদভাবে আধারিত করেছেন, জ্ঞান আর আবেগের এমন এক বিশ্ব তৈরি করেছেন, এমন–কি পরাধীনতা আর অসাম্যের পবিত্র ক্রোধকে যুক্ত করেছেন তাঁর কবিতার আবেগে— তার সূত্র আমরা সব খুঁজে পাই না। বর্ধমান জেলার অখ্যাত গ্রাম চুরুলিয়ার এক অখ্যাত দরিদ্র ঘরে জন্ম, শিক্ষাদীক্ষা বিক্ষিপ্ত ও অসম্পূর্ণ (স্কুলের গণ্ডি অনতিক্রান্ত), গানেও তাঁর এত অন্তহীন রাগরাগিণীর দীক্ষা ১৮টি নতুন রাগ সৃষ্টির সূত্র, কোথায় কী সুনিশ্চিতভাবে পাব আমরা কিছুই জানি না। এই না-জানা আমাদের অসহায় এবং অপরাধী করে তোলে। স্বশিক্ষা আর আত্মপ্রকাশের ব্যাপারে তাঁর অস্থিরতা আর স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যেও একটা শৃঙ্খলা ছিল, কিন্তু নিজের জীবনীর উপকরণ তিনি নিজে কিছুই প্রায় যত্ন নিয়ে রক্ষা করেননি। আত্মজীবনী লেখেননি অন্য অনেকের মতো, তার জন্য এখন অভিমান করে লাভ নেই।  নিজে এক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠলেও প্রতিষ্ঠান নির্মাণও করেননি, তাই তাঁর তেমন শিষ্য জোটেনি যারা তাঁর জীবনীর উপকরণ সযত্নে সংগ্রহ করে রাখবে। বন্ধুদের আর সহকর্মী ও শিষ্যদের স্মৃতিকথাই তাঁর জীবনীর প্রধান অবলম্বন, কিন্তু বন্ধুরা মূলত তাঁর যৌবনের বন্ধু, সহকর্মীরা তাঁর উত্তর-যৌবনের সঙ্গী। তাঁর শৈশব, তাঁর নজরুল হয়ে ওঠার অনেকটা সময়ের সেই ইতিহাস নেই, যাকে বলা যায় কবির (এবং সেই সঙ্গে গায়ক ও গীতিকারের) প্রস্তুতির ইতিহাস। তাই নানারকম অনুমান, কল্পনা ও অতিরঞ্জন দিয়ে তাঁর জীবনের ফাঁকফোকর পূরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে— যেমন তাঁর মেসোপটেমিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার ভ্রান্ত আখ্যান।  তাও জীবনীকারদের কাজকে কঠিন করে তুলেছে।  
নজরুলকে নিয়ে বাঙালির কোনও কোনও বিচ্ছিন অংশের আর-একটা সঙ্কট হল নজরুলের ‘আইডেন্টিটি’ বা আত্মপরিচয় নিয়ে। এটা অবশ্যই তাঁর নিজের তৈরি নয়, অন্যেরা তাঁকে নিয়ে ‘আত্ম’ আর ‘অপর’-এর নানা মারাত্মক খেলায় মেতেছে, এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধেই নজরুলকে ক্লান্ত হতে হয়েছে, এমন কথা বলাই যায়। এমনিতে অধিকাংশ বাঙালি নজরুল কোন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মানুষ তা নিয়ে মাথা ঘামায় না, এবং যেমন দেখা গেছে, তাঁর পরিপূর্ণ বিকাশের কালেই তাঁর সম্বন্ধে ‘হিন্দু, না মুসলিম’ অথবা শব্দান্তরে ‘অহিন্দু, না অমুসলিম’— এই প্রশ্নটা অবান্তর হয়ে গিয়েছিল। ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর নজরুলকে একটি সংবর্ধনা দিয়েছিলেন সমগ্র বাঙালির পক্ষে অ্যালবার্ট হলে (এখনকার কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস ঘর) বাংলার বিশিষ্ট নাগরিকেরা, যেখানে উপস্থিত ছিলেন জলধর সেন, সুভাষচন্দ্র বসু, অপূর্বকুমার চন্দ, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, এস ওয়াজেদ আলী, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রভৃতি।  সভাপতি ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তাঁর ভাষণে তিনি বলেন, “নজরুল কবি, প্রতিভাবান মৌলিক কবি।... আজ এই ভেবে বিপুল আনন্দ অনুভব করছি যে, নজরুল ইসলাম শুধু মুসলমানের কবি নন, তিনি বাংলার কবি, বাঙালির কবি।”  এর প্রত্যুত্তরে নজরুল খুব সুন্দর করে বলেন, “আমি এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই, এই সমাজেরই নই।  আমি সকল দেশের সকল মানুষের।  সুন্দরের ধ্যান, তার স্তবগানই আমার উপাসনা, আমার ধর্ম।  যে কুলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই আমি জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই আমি কবি।”  নজরুলের এই কথা সত্ত্বেও কোনও এক গোষ্ঠী তাঁকে যে ‘কাফের কাজীও’ বলে বিশেষিত করে এবং আরেক গোষ্ঠী তাঁকে “পা’ত (পাতি) নেড়ে” বলে গালাগাল দেয়।  এই বিভ্রান্তি দূর হতে বেশি সময় লাগেনি, এবং অন্নদাশঙ্করের “ভাগ হয়নিকো নজরুল” কথাটা অন্তত সাহিত্যপাঠকদের কাছে সত্য হয়েছে। তার পরে নতুন রাষ্ট্র এসেছে, তার পিতৃঘাতনের পরে এক একাধিপতি শাসক তাঁকে প্রায় ছিনতাই করে নিয়ে গেছেন, তাঁকে নিজস্ব, জাতীয় ইত্যাদি বলে দাবি করেছেন, নজরুলের স্মৃতিচিহ্নকে ভারতীয় বাঙালির কাছে দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য করে তুলেছেন। সেই দেশের মাটিতে নজরুলের শেষ আশ্রয়ও জুটেছে। সে যাই হোক, এ নিয়ে উপমহাদেশের পরিসরে কোনও রাষ্ট্রীয় দ্বৈরথ বাধেনি, এই যা রক্ষা। তিনি নিজে যেমন, তেমনই বাঙালি পাঠকের কাছে তাঁর গ্রহণ বা reception-এর ইতিহাস তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের আত্মপরিচয়কে অগ্রাহ্য করেছে, রাষ্ট্রিক সীমানাকেও তুচ্ছ করেছে— যে কোনও মহৎ স্রষ্টার ক্ষেত্রেই যা করে থাকে।   
নজরুলের আত্মপরিচয়ের আর-এক সঙ্কট আছে, সেটা সাহিত্য–সমালোচকদের তৈরি— তিনি বিদ্রোহী, না বিদ্রোহী নন— তাই নিয়ে। বিদ্রোহী হলে কেন বিদ্রোহী, এবং এই বিদ্রোহ তাঁর কবিতার ভাল করেছে না মন্দ করেছে—  এই নিয়ে প্রচুর অবান্তর সংলাপ আমরা সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে লক্ষ্য করি।  আমার অনেক শিক্ষক ও শিক্ষকস্থানীয় সমালোচক, প্রমথনাথ বিশি, বুদ্ধদেব বসু প্রভৃতি নজরুলের বিদ্রোহের কবিতা বিশেষ পছন্দ করতেন না, বলেছেন নজরুলের আসল শক্তি তাঁর প্রেমের কবিতা ও গানে।  আমি সমালোচক বলে নিজেকে দাবি করি না, কিন্তু আমার ধারণা তাঁদের এই মতবাদ কিছুটা ‘শিল্প শিল্পের জন্য’— এই বিশ্বাসের দ্বারা আক্রান্ত, এবং এ বিশ্বাস নিশ্ছিদ্র নয়। যে নজরুল ‘বিদ্রোহী’তে ব্যক্তি ও আত্মতার স্পর্ধিত এবং বিস্ফোরক জয়সঙ্গীত রচনা করা সত্ত্বেও বলেন, “মহা বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ-কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না— চির-বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত’ সেই নজরুলকে উপেক্ষা করে কোনও সমালোচনা নিজেকে নির্ভুল বলে দাবি করতে পারে না। তাঁর ‘সাম্য’-র কবিতাগুলি, বিশেষ করে “আমার কৈফিয়ৎ”-এর ওই দুই অবিস্মরণীয় ছত্র— “প্রার্থনা করো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ’-কে যে সমালোচনা কবিতা বলে না সে সমালোচনা নিজেকে অপমানিত করে। ফলে নজরুল দুইই— বিদ্রোহীও বটে, প্রেমিকও বটে।  তাঁর প্রেমের কবিতা এবং তাঁর গজল ও অন্যান্য গান তাঁর বিদ্রোহ, কারাগার ভাঙার গান, আর মানবিক সাম্যের কবিতাগুলিকে বাদ দিয়ে নজরুলের পূর্ণ পরিচয় তৈরি করতে পারে না। তাই তাঁর নানামুখী বিস্তার তাঁর স্ববিরোধের  পরিচয় নয়। তাঁর সম্বন্ধে ওয়াল্ট হুইটম্যানের এই অহঙ্কার খুব সহজেই উদ্ধার করা যায়— Do I contradict myself?  Yes, I contradict myself.  I contain multitude!  তাঁর বহুত্ব, তাঁর স্ববিরোধ তাঁর বিরাটত্বেরই প্রমাণ।  
এই রকম আর-একটি অশিক্ষিত প্রশ্ন কোনও কোনও মহলে উঠেছিল একসময় (নাকি এখনও ওঠে?) ‘নজরুল, না রবীন্দ্রনাথ’?  সাহিত্য-সংস্কৃতিতে এটা বুদ্ধিমানের প্রশ্ন নয়।  আমাদের সকলকে দরকার, রবীন্দ্রনাথকে চাই, নজরুলকে চাই, জীবনানন্দকে চাই, আল মাহমুদকে চাই, ভাস্কর চক্রবর্তীকেও চাই।  সাহিত্য–সংস্কৃতির এই বহুত্বের বর্ণাঢ্য রূপ যারা প্রত্যাখ্যান করে তারা মানবতার বন্ধু নয়।
নিষ্ঠাবান নজরুল-গবেষকেরা এই বরেণ্য জীবনের পুনর্নির্মাণে অক্লান্ত প্রয়াস করে চলেছেন।  জীবনী যেহেতু ইতিহাস, তার মধ্যে একটি বিজ্ঞানসম্মত নিরপেক্ষতা রক্ষা করা দরকার।  মুজফফর আহমেদ ‘স্মৃতিকথা’ লিখলেও তাঁর একটি স্বাভাবিক, বিজ্ঞানসঙ্গত নিরপেক্ষতা ছিল। তা ছাড়া রফিকুল ইসলাম, মোস্তাফা নূরুল ইসলাম, আজহারউদ্দীন খান, মাহবুবুল হক, মোবাশ্বের আলী, অরুণকুমার বসু, বাঁধন সেনগুপ্ত, কল্পতরু সেনগুপ্ত, ব্রহ্মমোহন ঠাকুর (এঁর বিশেষ ক্ষেত্র নজরুলের গান) প্রমুখ অনেকেই নজরুল জীবন নিয়ে শ্রমনিষ্ঠ গবেষণা করেছেন।  এর মধ্যে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম এবং অরুণকুমার বসু নির্মাণ করেছেন দুটি পূর্ণাঙ্গ জীবনী।  তাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বাসময় আখ্যান লিখেছেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (‘জ্যৈষ্ঠের ঝড়’)। ঢাকায় মোহিত কামাল লিখেছেন তাঁর শিশুকাল নিয়ে উপন্যাস ‘দুখু’।  কিন্তু জীবনীলেখক নিছক ঘটনার বাইরে গিয়েও প্রভূত গবেষণার সঙ্গে বিচার, অপক্ষপাত সমালোচনা নিয়ে নিজের কাজে অগ্রসর হন।   
গোলাম মুরশিদ এই তালিকার শেষে নিজেকে স্থাপন করেন, ফলে তাঁর কিছুটা সুবিধা (এবং অসুবিধাও) তৈরি হয়। এই সুবিধা শুধু সময়ের নয়। তাঁর গবেষণায় অক্লান্ত নিষ্ঠার পরিচয় আমরা জানি, তাঁর ‘রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া : নারীপ্রগতির একশো বছর’, ‘পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ’, ‘বিলেতে বাঙালির ইতিহাস’, ‘‌বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’, ‘আশার ছলনে ভুলি’ (মধুসূদন-জীবনী), ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’, এবং সম্পাদিত ‘বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’ ইতালি ও বাংলার রেনেসাঁস সম্বন্ধে বইটিও বহুব্যাপ্ত জিজ্ঞাসা আর তাঁর নির্মোহ ঐতিহাসিক দৃষ্টির খবর দেয়।  সেই সঙ্গে এ কথা বলা দরকার এই ব্যাপ্তির সঙ্গে গভীরতার কোনও বিচ্ছেদ নেই।  তিনি যে বিষয়ে লেখেন সে বিষয়ে তিনি গবেষকদের কাছে এক চ্যালেঞ্জ খাড়া করেন।    
এ বইয়ের মোট দশটি অধ্যায়— জন্ম, পরিবার ও পরিবেশ, হাবিলদারের বিদ্রোহ, ক্ষণিকের ধূমকেতু, চিরদিনের আশা (লতা), ঘর বাঁধার পথে, রাজনীতির চোরাবালিতে, রণক্লান্ত, স্বপ্ন ও বাস্তবতা, স্বেচ্ছানির্বাসন, আধ্যাত্মিকতার পথে, নীরব কবি! একটি উপসংহার আছে, আর আছে প্রমীলার প্রতীক্ষা নামে একটি মর্মগ্রাহী পরিশিষ্ট, সেই সঙ্গে নজরুলের কী রোগ হয়েছিল সে বিষয়ে এক বিশেষজ্ঞের সংযোজন।  এ থেকেই বোঝা যায় নজরুলের জীবনের সব ক’‌টি বাঁক তিনি সযত্নে অনুধাবন করেছেন। উপসংহারে তিনি যে দাবি করেছেন এই জীবনীর সঙ্গে “পূর্ববর্তী বীরপূজামূলক, কিংবদন্তী-নির্ভর, অতিরঞ্জিত জীবনীগুলোর চোখে-পড়ার মতো পার্থক্য রয়েছে”— সেই দাবি একেবারে সর্বাঙ্গীণভাবে যথার্থ কি না সে তর্কে না গিয়েও বলা যায়, গোলাম মুরশিদ অত্যন্ত যত্ন নিয়ে, এবং কিছুটা নির্মোহভাবে নতুন জীবনী রচনার যে তিনটি ন্যূনতম শর্ত তা পূরণ করার চেষ্টা করেছেন।  একটি শর্ত হল আগেকার জীবনীগুলির তুলনায় আরও নানা তথ্যযোগে পূর্ণাঙ্গতর এক আখ্যান নির্মাণ, দ্বিতীয় শর্ত হল কল্পনা, অনুমান, অতিরঞ্জন ও কিংবদন্তি এবং ভ্রান্ত সিদ্ধান্তের (বীরপূজার মনোভাব থেকে যেগুলি উৎপাদিত হয়) সংশোধন করে যথাসম্ভব সত্যনির্ভর করে তোলা;  তৃতীয় শর্ত ক্রমভঙ্গ দোষের নিরাকরণ। বীরপূজা তিনি পরিহার করেছেন এতে অনেকে হতাশ হতে পারেন, কিন্তু নজরুলের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও মমতা এই কাজটির প্রতি ছত্রেও ফুটে ওঠে। নজরুলের স্ববিরোধগুলি তিনি দেখাতে দ্বিধা করেননি, এমনও বলেছেন যে, “কাব্যে তিনি উচ্চকণ্ঠ,—যা বলার সরাসরি বলেন— পাঠককে কল্পনা করে নেওয়ার অবকাশ দেন না। কাব্যে তাঁর সংযমও সীমিত, পুনরাবৃত্তি তাঁর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।”  ব্যক্তি নজরুলের দুর্বলতাগুলিও দেখাতে তিনি কার্পণ্য করেননি। কিন্তু মানুষটির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ দুর্লক্ষ্য নয়। 
নানা বিষয়ে চাঁছাছোলা কথা এ বইটিকে সাহসী এবং স্বতন্ত্র করে তোলে।  সুনির্মিত এই প্রকাশনায় ছাপার ভুল কিছু আছে (‘সেমিরিসি[মি]স’—২৮১ ; মনোজ বুস— ৪৭০, ‘ধরার[য়] পর— ৫১৩), কিন্তু ‘সখ্যতা’ (৩৮) সম্ভবত ছাপার ভুল নয়।  ‘শনিবারের চিঠি পত্রিকায় প্রকাশিত বিকৃত ছবিগুলো থেকে ‘কার্টুন’ কথাটার প্রচলন হয় (১৯৫)— কি মন্তব্য হিসেবে নির্ভুল? কোন ভাষায় প্রচলিত হয়? বাঙালি বিপ্লবীদের তিনি এখনও ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলবেন (২০৩)? 
এ বইটি নজরুল-গবেষণার এক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে।‌‌‌‌ইতিহাস তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের আত্মপরিচয়কে অগ্রাহ্য করেছে, রাষ্ট্রিক সীমানাকেও তুচ্ছ করেছে— যে কোনও মহৎ স্রষ্টার ক্ষেত্রেই যা করে থাকে।   
নজরুলের আত্মপরিচয়ের আর-এক সঙ্কট আছে, সেটা সাহিত্য–সমালোচকদের তৈরি— তিনি বিদ্রোহী, না বিদ্রোহী নন— তাই নিয়ে। বিদ্রোহী হলে কেন বিদ্রোহী, এবং এই বিদ্রোহ তাঁর কবিতার ভাল করেছে না মন্দ করেছে—  এই নিয়ে প্রচুর অবান্তর সংলাপ আমরা সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে লক্ষ্য করি।  আমার অনেক শিক্ষক ও শিক্ষকস্থানীয় সমালোচক, প্রমথনাথ বিশি, বুদ্ধদেব বসু প্রভৃতি নজরুলের বিদ্রোহের কবিতা বিশেষ পছন্দ করতেন না, বলেছেন নজরুলের আসল শক্তি তাঁর প্রেমের কবিতা ও গানে।  আমি সমালোচক বলে নিজেকে দাবি করি না, কিন্তু আমার ধারণা তাঁদের এই মতবাদ কিছুটা ‘শিল্প শিল্পের জন্য’— এই বিশ্বাসের দ্বারা আক্রান্ত, এবং এ বিশ্বাস নিশ্ছিদ্র নয়। যে নজরুল ‘বিদ্রোহী’তে ব্যক্তি ও আত্মতার স্পর্ধিত এবং বিস্ফোরক জয়সঙ্গীত রচনা করা সত্ত্বেও বলেন, “মহা বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ-কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না— চির-বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত’ সেই নজরুলকে উপেক্ষা করে কোনও সমালোচনা নিজেকে নির্ভুল বলে দাবি করতে পারে না। তাঁর ‘সাম্য’-র কবিতাগুলি, বিশেষ করে “আমার কৈফিয়ৎ”-এর ওই দুই অবিস্মরণীয় ছত্র— “প্রার্থনা করো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ’-কে যে সমালোচনা কবিতা বলে না সে সমালোচনা নিজেকে অপমানিত করে। ফলে নজরুল দুইই— বিদ্রোহীও বটে, প্রেমিকও বটে।  তাঁর প্রেমের কবিতা এবং তাঁর গজল ও অন্যান্য গান তাঁর বিদ্রোহ, কারাগার ভাঙার গান, আর মানবিক সাম্যের কবিতাগুলিকে বাদ দিয়ে নজরুলের পূর্ণ পরিচয় তৈরি করতে পারে না। তাই তাঁর নানামুখী বিস্তার তাঁর স্ববিরোধের  পরিচয় নয়। তাঁর সম্বন্ধে ওয়াল্ট হুইটম্যানের এই অহঙ্কার খুব সহজেই উদ্ধার করা যায়— Do I contradict myself?  Yes, I contradict myself.  I contain multitude!  তাঁর বহুত্ব, তাঁর স্ববিরোধ তাঁর বিরাটত্বেরই প্রমাণ।  
এই রকম আর-একটি অশিক্ষিত প্রশ্ন কোনও কোনও মহলে উঠেছিল একসময় (নাকি এখনও ওঠে?) ‘নজরুল, না রবীন্দ্রনাথ’?  সাহিত্য-সংস্কৃতিতে এটা বুদ্ধিমানের প্রশ্ন নয়।  আমাদের সকলকে দরকার, রবীন্দ্রনাথকে চাই, নজরুলকে চাই, জীবনানন্দকে চাই, আল মাহমুদকে চাই, ভাস্কর চক্রবর্তীকেও চাই।  সাহিত্য–সংস্কৃতির এই বহুত্বের বর্ণাঢ্য রূপ যারা প্রত্যাখ্যান করে তারা মানবতার বন্ধু নয়।
নিষ্ঠাবান নজরুল-গবেষকেরা এই বরেণ্য জীবনের পুনর্নির্মাণে অক্লান্ত প্রয়াস করে চলেছেন।  জীবনী যেহেতু ইতিহাস, তার মধ্যে একটি বিজ্ঞানসম্মত নিরপেক্ষতা রক্ষা করা দরকার।  মুজফফর আহমেদ ‘স্মৃতিকথা’ লিখলেও তাঁর একটি স্বাভাবিক, বিজ্ঞানসঙ্গত নিরপেক্ষতা ছিল। তা ছাড়া রফিকুল ইসলাম, মোস্তাফা নূরুল ইসলাম, আজহারউদ্দীন খান, মাহবুবুল হক, মোবাশ্বের আলী, অরুণকুমার বসু, বাঁধন সেনগুপ্ত, কল্পতরু সেনগুপ্ত, ব্রহ্মমোহন ঠাকুর (এঁর বিশেষ ক্ষেত্র নজরুলের গান) প্রমুখ অনেকেই নজরুল জীবন নিয়ে শ্রমনিষ্ঠ গবেষণা করেছেন।  এর মধ্যে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম এবং অরুণকুমার বসু নির্মাণ করেছেন দুটি পূর্ণাঙ্গ জীবনী।  তাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বাসময় আখ্যান লিখেছেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (‘জ্যৈষ্ঠের ঝড়’)। ঢাকায় মোহিত কামাল লিখেছেন তাঁর শিশুকাল নিয়ে উপন্যাস ‘দুখু’।  কিন্তু জীবনীলেখক নিছক ঘটনার বাইরে গিয়েও প্রভূত গবেষণার সঙ্গে বিচার, অপক্ষপাত সমালোচনা নিয়ে নিজের কাজে অগ্রসর হন।   
গোলাম মুরশিদ এই তালিকার শেষে নিজেকে স্থাপন করেন, ফলে তাঁর কিছুটা সুবিধা (এবং অসুবিধাও) তৈরি হয়। এই সুবিধা শুধু সময়ের নয়। তাঁর গবেষণায় অক্লান্ত নিষ্ঠার পরিচয় আমরা জানি, তাঁর ‘রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া : নারীপ্রগতির একশো বছর’, ‘পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ’, ‘বিলেতে বাঙালির ইতিহাস’, ‘‌বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’, ‘আশার ছলনে ভুলি’ (মধুসূদন-জীবনী), ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’, এবং সম্পাদিত ‘বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’ ইতালি ও বাংলার রেনেসাঁস সম্বন্ধে বইটিও বহুব্যাপ্ত জিজ্ঞাসা আর তাঁর নির্মোহ ঐতিহাসিক দৃষ্টির খবর দেয়।  সেই সঙ্গে এ কথা বলা দরকার এই ব্যাপ্তির সঙ্গে গভীরতার কোনও বিচ্ছেদ নেই।  তিনি যে বিষয়ে লেখেন সে বিষয়ে তিনি গবেষকদের কাছে এক চ্যালেঞ্জ খাড়া করেন।    
এ বইয়ের মোট দশটি অধ্যায়— জন্ম, পরিবার ও পরিবেশ, হাবিলদারের বিদ্রোহ, ক্ষণিকের ধূমকেতু, চিরদিনের আশা (লতা), ঘর বাঁধার পথে, রাজনীতির চোরাবালিতে, রণক্লান্ত, স্বপ্ন ও বাস্তবতা, স্বেচ্ছানির্বাসন, আধ্যাত্মিকতার পথে, নীরব কবি! একটি উপসংহার আছে, আর আছে প্রমীলার প্রতীক্ষা নামে একটি মর্মগ্রাহী পরিশিষ্ট, সেই সঙ্গে নজরুলের কী রোগ হয়েছিল সে বিষয়ে এক বিশেষজ্ঞের সংযোজন।  এ থেকেই বোঝা যায় নজরুলের জীবনের সব ক’‌টি বাঁক তিনি সযত্নে অনুধাবন করেছেন। উপসংহারে তিনি যে দাবি করেছেন এই জীবনীর সঙ্গে “পূর্ববর্তী বীরপূজামূলক, কিংবদন্তী-নির্ভর, অতিরঞ্জিত জীবনীগুলোর চোখে-পড়ার মতো পার্থক্য রয়েছে”— সেই দাবি একেবারে সর্বাঙ্গীণভাবে যথার্থ কি না সে তর্কে না গিয়েও বলা যায়, গোলাম মুরশিদ অত্যন্ত যত্ন নিয়ে, এবং কিছুটা নির্মোহভাবে নতুন জীবনী রচনার যে তিনটি ন্যূনতম শর্ত তা পূরণ করার চেষ্টা করেছেন।  একটি শর্ত হল আগেকার জীবনীগুলির তুলনায় আরও নানা তথ্যযোগে পূর্ণাঙ্গতর এক আখ্যান নির্মাণ, দ্বিতীয় শর্ত হল কল্পনা, অনুমান, অতিরঞ্জন ও কিংবদন্তি এবং ভ্রান্ত সিদ্ধান্তের (বীরপূজার মনোভাব থেকে যেগুলি উৎপাদিত হয়) সংশোধন করে যথাসম্ভব সত্যনির্ভর করে তোলা;  তৃতীয় শর্ত ক্রমভঙ্গ দোষের নিরাকরণ। বীরপূজা তিনি পরিহার করেছেন এতে অনেকে হতাশ হতে পারেন, কিন্তু নজরুলের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও মমতা এই কাজটির প্রতি ছত্রেও ফুটে ওঠে। নজরুলের স্ববিরোধগুলি তিনি দেখাতে দ্বিধা করেননি, এমনও বলেছেন যে, “কাব্যে তিনি উচ্চকণ্ঠ,—যা বলার সরাসরি বলেন— পাঠককে কল্পনা করে নেওয়ার অবকাশ দেন না। কাব্যে তাঁর সংযমও সীমিত, পুনরাবৃত্তি তাঁর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।”  ব্যক্তি নজরুলের দুর্বলতাগুলিও দেখাতে তিনি কার্পণ্য করেননি। কিন্তু মানুষটির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ দুর্লক্ষ্য নয়। 
নানা বিষয়ে চাঁছাছোলা কথা এ বইটিকে সাহসী এবং স্বতন্ত্র করে তোলে।  সুনির্মিত এই প্রকাশনায় ছাপার ভুল কিছু আছে (‘সেমিরিসি[মি]স’—২৮১ ; মনোজ বুস— ৪৭০, ‘ধরার[য়] পর— ৫১৩), কিন্তু ‘সখ্যতা’ (৩৮) সম্ভবত ছাপার ভুল নয়।  ‘শনিবারের চিঠি পত্রিকায় প্রকাশিত বিকৃত ছবিগুলো থেকে ‘কার্টুন’ কথাটার প্রচলন হয় (১৯৫)— কি মন্তব্য হিসেবে নির্ভুল? কোন ভাষায় প্রচলিত হয়? বাঙালি বিপ্লবীদের তিনি এখনও ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলবেন (২০৩)? 
এ বইটি নজরুল-গবেষণার এক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে।‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top